নিজেকে ভালোবাসো:
“ও মেয়ে হাসো,
নিজের দিকে দু’চোখ দাও,
নিজেকে ভালোবাসো।” — তসলিমা নাসরিন
‘বইয়ের পাতা’-র অগাস্ট সংখ্যায় আমি নিয়ে এসেছি তসলিমা নাসরিনের কবিতা ‘দুঃখ পোষা মেয়ে’ থেকে আমার প্রিয় কয়েকটি পঙক্তি। এই কথাগুলো বারবার আমাকে ভাবায়। কবিতায় কবি এক দুঃখবাহী মেয়ের কথা বলেছেন, যে নিজের কষ্টগুলোকে বুকের গভীরে জমিয়ে রাখে। কবি যেন তার দুঃখগুলো একে একে মেপে দেখেন, তারপর সেগুলোকে বাতাসে উড়িয়ে দেন, রোদের আলোয় শুকিয়ে দেন, আর শেষে তাকে বলেন হাসতে, নিজেকে ভালোবাসতে।
আসলে দুঃখ-কষ্ট শুধু কোনো মেয়ের একার সম্পদ নয়। তা মানুষের সহজাত সঙ্গী। প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই কিছু না কিছু না-বলা কষ্ট, অপূর্ণতা কিংবা গোপন বেদনা লুকিয়ে থাকে। কেউ সেগুলো প্রকাশ করে, কেউ আবার হাসিমুখের আড়ালে যত্ন করে লুকিয়ে রাখে।
তবে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি, মেয়েরা একটু বেশি দুঃখবিলাসী হয়। তারা প্রায়ই তাদের কষ্টগুলোকে এমন মমতায় আগলে রাখে, যেন পৃথিবীতে সেই দুঃখের একমাত্র অধিকারী তারাই। অনেক সময় তারা দুঃখকে ছেড়ে দিতে চাইলেও পারে না; বরং স্মৃতি আর আবেগের সুতোয় তাকে আরও শক্ত করে বেঁধে রাখে।
কিন্তু আবেগ তো শুধু নারীর বৈশিষ্ট্য নয়। মানুষ মাত্রই আবেগপ্রবণ। সে নারী হোক কিংবা পুরুষ। পার্থক্য শুধু প্রকাশের ধরনে। মেয়েরা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে কিছুটা স্বস্তি পায়। কাঁদতে পারে, বলতে পারে, ভেঙে পড়তে পারে। অথচ ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় শক্ত হতে, কান্না চেপে রাখতে, দুর্বলতা আড়াল করতে। ফলে তারা অনেক সময় নিজের ভেতরের ঝড় একাই সামলায়।
সমাজ যেন অলিখিত এক নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে, পুরুষ কাঁদবে না। পুরুষের চোখের জল তার ব্যক্তিত্বকে ছোট করে দেয়। কিন্তু কেন? কান্না কি শুধুই নারীর অধিকার? পুরুষের কি মন নেই, অনুভূতি নেই, ভাঙন নেই?
মেয়েরা যদি বুক ভরে কাঁদতে পারে, তবে পুরুষ কেন পারবে না? তারাও তো প্রকৃতিরই সন্তান। আনন্দ, বেদনা, অভিমান, ভালোবাসা কিংবা হারিয়ে ফেলার কষ্ট, সব অনুভূতিই তাদের ভেতরেও সমানভাবে কাজ করে। চোখের জল দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং তা মানুষের সংবেদনশীলতার প্রমাণ।
তাই হয়তো তসলিমা নাসরিনের ওই আহ্বান শুধু একটি মেয়ের জন্য নয়, আমাদের সবার জন্যই প্রযোজ্য। দুঃখকে চিরকাল বুকে পুষে না রেখে, একদিন তাকে রোদে মেলে দিতে হয়। নিজের দিকে দু’চোখ মেলে তাকাতে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজেকে ভালোবাসতে শিখতে হয়।
তাই আমি পুরুষদেরকেও বলবো–
“ও ছেলে হাসো
নিজের দিকে দু’চোখ দাও
নিজেকে ভালোবাসো।”

