পড়শী খেলা খেলা এক বিশ্বকাপ, হাজার মাইলের পথ

এক বিশ্বকাপ, হাজার মাইলের পথ

Post Views: 4
7 min read

২৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার সময় বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে নয় দিন আগে। কিন্তু প্রায় ৪০ দিন ধরে যে টুর্নামেন্টকে ঘিরে প্রতিটি দিন কেটেছে, সেটি থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগছিল। শরীর ক্লান্ত, ঘুমের ছন্দ এলোমেলো, কিন্তু মাথার ভেতর তখনো ঘুরছে স্টেডিয়াম, ম্যাচ, বিমানবন্দর আর এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে চলার স্মৃতি।

টুর্নামেন্ট শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছিলাম। এরপর বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত এবং তার পরও কয়েক দিন ছিলাম উত্তর আমেরিকায়। এই সময়ে সান ফ্রান্সিসকো, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, হিউস্টন, আটলান্টা, কানসাস সিটি, ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সি— এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটেছি। এটি ছিল আমার তৃতীয় বিশ্বকাপ কাভারের অভিজ্ঞতা। এর আগে রাশিয়া ২০১৮ এবং কাতার ২০২২ কাভার করেছি।

তিনটি বিশ্বকাপ, তিন রকম অভিজ্ঞতা। তবে উত্তর আমেরিকার মতো বিশাল পরিসরের টুর্নামেন্ট আগে দেখিনি। ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ এবং ১৬টি ভেন্যু নিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। কিন্তু একজন সাংবাদিকের জন্য এই বিশালত্বের অর্থ শুধু বেশি ম্যাচ বা বেশি গল্প নয়; এর অর্থ ছিল অনেক বেশি দূরত্ব, বেশি সময় এবং অনেক বেশি পরিকল্পনা।

রাশিয়া আয়তনে বিশাল দেশ। কিন্তু ২০১৮ বিশ্বকাপ কাভারের সময় সেই দূরত্ব খুব একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি। বিশেষ ট্রেনব্যবস্থা সাংবাদিক ও দর্শকদের জন্য যাতায়াতকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল। কখনো মস্কোতে একটি ম্যাচ কাভার করে রাতে ট্রেনে উঠে পরদিন সামারায় গিয়ে আরেকটি ম্যাচ কাভার করেছি। প্রায় ১১০০ কিলোমিটারের যাত্রা হলেও রাতের ট্রেনেই ঘুমিয়ে নেওয়া যেত। দূরত্ব ছিল অনেক, কিন্তু ভ্রমণ ছিল স্বস্তির।

কাতার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আটটি স্টেডিয়াম ছিল খুব কাছাকাছি। কার্যকর শাটলব্যবস্থার কারণে এক দিনে দুটি ম্যাচ কাভার করাও সম্ভব হয়েছে। ম্যাচ শেষ করে দ্রুত আরেক স্টেডিয়ামে পৌঁছানো ছিল খুবই সহজ। উত্তর আমেরিকায় ছিল না সেই সুবিধা।

এবারের বিশ্বকাপে শুধু একটি ম্যাচের টিকিট থাকলেই সেটি কাভার করা সম্ভব— এমন ছিল না। দূরত্বের সঙ্গে যোগ হয়েছে যাতায়াতের খরচ ও সময়। একটি ম্যাচের পর অন্য ম্যাচের জন্য হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়েছে। বিশেষ করে নকআউট পর্বে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। কোন দল পরের রাউন্ডে যাবে, তার ওপর নির্ভর করছিল পরবর্তী গন্তব্য। ফলে অনেক সময় শেষ মুহূর্তে বিমান বা বাসের ব্যবস্থা করতে হয়েছে, আর তখন ভাড়া যেমন বেশি, বিকল্পও তেমন সীমিত।

অনেক ম্যাচ কাভার করার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব ছিল না। টিকিট পাওয়া গেলেও দূরত্ব, সময় ও খরচ— তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়েছে। বিশ্বকাপ কাভারের ক্লান্তিটাও তাই এবার অন্য রকম ছিল।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর প্রথম ধাক্কা ছিল সময়ের পার্থক্য। এরপর এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যেতে যেতে বদলেছে সময় অঞ্চল। পশ্চিম উপকূল থেকে পূর্ব উপকূলে, আবার দক্ষিণের শহর থেকে উত্তরে— শরীরকে বারবার নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে। একসময় মনে হয়েছে, জেট ল্যাগ কাটার আগেই আরেক জেট ল্যাগ শুরু হয়ে যাচ্ছে। তবে ফুটবল সব ক্লান্তিকে ছাপিয়ে গেছে।

এই বিশ্বকাপে ঘটেছে এত বেশি কিছু যে সবকিছুর সঙ্গে তাল মেলানোই ছিল কঠিন। ৪৮ দলের নতুন কাঠামো নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নানা প্রশ্ন ছিল। কিন্তু মাঠে নামার পর নাটক, অঘটন, প্রত্যাবর্তন ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্য সেই আলোচনার অনেকটাই পেছনে ফেলে দেয়।

মেসির শেষ বিশ্বকাপ, লামিনে ইয়ামালের উত্থান, আর্জেন্টিনার নাটকীয় নকআউট জয়, স্পেনের ধারাবাহিকতা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের শক্তিশালী পারফরম্যান্স— প্রতিদিনই নতুন গল্প তৈরি হয়েছে। কখনো মনে হয়েছে, একটি গল্প শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শুরু হয়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড— চার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আর ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। অর্থাৎ এত বড়, এত দীর্ঘ এবং এত বিস্তৃত একটি টুর্নামেন্ট শেষ হয়েছে এমন এক ফাইনালে, যেখানে দুদলই নিজেদের জায়গা যথেষ্ট জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার হার এবং মেসির শেষ বিশ্বকাপের সমাপ্তি তাই হয়ে উঠেছে আমার এই দীর্ঘ অভিযানেরও শেষ বড় অধ্যায়।

কিন্তু বিশ্বকাপ কাভার করা শুধু ম্যাচ কাভার করা নয়। ম্যাচের বাইরের জীবনটাও এর বড় অংশ—রাস্তাঘাট, নানারকম মানুষ, নানাপদের খাবার, বিমানবন্দর, হোটেল, সংবাদ সম্মেলন, মিক্সড জোন, ডেডলাইন, যাতায়াত এবং পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রতিদিনের দেখা-সাক্ষাৎ। আর ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ।

ফুটবল যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সংস্কৃতিতে এখনো বাস্কেটবল, আমেরিকান ফুটবল বা বেসবলের জায়গা দখল করেনি। কিন্তু বিশ্বকাপের এক মাসে দেখা গেছে, দেশটির ফুটবল-আগ্রহ দ্রুত বদলাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের পাশাপাশি স্থানীয় দর্শকদের মধ্যেও বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা আমার কাছে এর বিস্তার।

রাশিয়া দেখিয়েছে, বিশাল একটি দেশেও পরিকল্পিত পরিবহনব্যবস্থা থাকলে বিশ্বকাপ কাভার করা সহজ হতে পারে। কাতার দেখিয়েছে, ছোট ভৌগোলিক পরিসর কীভাবে একটি টুর্নামেন্টকে সাংবাদিক ও দর্শকদের জন্য প্রায় আদর্শ করে তুলতে পারে। আর উত্তর আমেরিকা দেখিয়েছে, বিশ্বকাপ যখন একটি মহাদেশের বিস্তৃতিতে ছড়িয়ে যায়, তখন শুধু মাঠের ফুটবল নয়, ভ্রমণও হয়ে ওঠে টুর্নামেন্টের অংশ।

২৮ জুলাই যখন ফিরছিলাম, তখন স্বস্তি ছিল—অবশেষে বাড়ি ফেরা। কিন্তু একই সঙ্গে একটা শূন্যতাও তৈরি হয়েছিল। প্রায় ৪০ দিন ধরে যে টুর্নামেন্টের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছি, সেটি হঠাৎ থেমে গেছে। রাশিয়া ও কাতারের পর উত্তর আমেরিকা আমাকে বিশ্বকাপের আরেকটি চেহারা দেখিয়েছে— যেখানে ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়, বরং শহর, দূরত্ব, সময়, অর্থ ও মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলারও পরীক্ষা।

আমি বিশ্বকাপ কাভার করতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত ৪০ দিন ধরে শুধু ম্যাচের পেছনে ছুটিনি; ছুটেছি এক মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটি বিশ্বকাপের পেছনে। এই বিশ্বকাপ তাই আমার কাছে শুধু ১০৪টি ম্যাচের গল্প নয়। এটি মাইলের পর মাইল পেরিয়ে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চকে কাছ থেকে দেখার গল্প।

১১ আগস্ট, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

সাংবাদিক, শিক্ষা উন্নয়নকর্মী, শিক্ষা ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।