পড়শী মূল রচনাবলী সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাস: শঙ্কা কাটেনি আজও

সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাস: শঙ্কা কাটেনি আজও

Post Views: 98
9 min read

সেই যে ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে আল ক্বায়দার সন্ত্রাসীদের অকষ্মাৎ হামলায় বিশ্ব প্রকম্পিত হয়েছিল, আজ ২৫ বছর পরও সেই ত্রাসের আশঙ্কা কাটেনি আদৌ। সেদিনের সেই আক্রমণ ছিল সুনির্দিষ্ট ভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করেই কিন্তু সেই আক্রমণের প্রভাবও প্রতিক্রিয়া স্থান-কাল-পাত্রকে ছাড়িয়ে গেছে।

একটি নতুন শতকের সূচনার কিছু পরেই এই সন্ত্রাসী হামলা ছিল সকল অনুমানের বাইরে। এই হামলায় আত্মঘাতী বিমান ছিনতাইকারি সন্ত্রাসীরা দু’টি বিমান নিয়ে নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার, একটি বিমান নিয়ে পেন্টাগনে আক্রমণ চালায় এবং পেনসিলভেনিযায় চতুর্থ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। আল ক্বায়দার তদানীন্তন নেতা ওসামা বিন লাদেনের নির্দেশে পরিচালিত এই আক্রমণে প্রায় ৩,০০০ আমেরিকান প্রাণ হারান, যাঁদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মের লোক অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

এই বীভৎস ঘটনাকে বর্ণনা করা সহজ নয় কিন্তু যেটা সহজেই বলা যায়, সেটা হলো এই ঘটনায় মানবতাবোধ এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যে সেই শঙ্কা আজ এই সিকি শতাব্দি পরেও কাটেনি। এই আশঙ্কা কেবল প্রাণহানির ভয় নয়, এই আশঙ্কা মানবিক চেতনার বিকাশ রুদ্ধ হওয়ার, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, জাতিতে জাতিতে, এমনকী মানুষে মানুষে অবিশ্বাসের বিস্তৃতি।

একুশ শতকের এই প্রায় প্রথম প্রহরে এই হামলা প্রমাণ করেছিলো যে আমরা কেবল পঞ্জিকার পাতা উল্টেছি, সময়ের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে এসেছি অনেকদূর কিন্তু মানবিক মূল্যবোধে রয়ে গেছি এমন এক অন্ধ গলিতে যেখানে কেবলই বিরাজ করে ত্রাস। সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক একাধিক বইয়ের লেখক ব্রায়ান মাইকেল জেঙ্কিন্স বলছেন, “সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসের মাপকাঠিতে এটি ছিল নজিরবিহীন হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এটি ছিল কোন বিদেশি সত্ত্বার সব চেয়ে বড় ধরণের হামলা”। জেঙ্কিন্স ২০০৮ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি বিখ্যাত বই “ Will Terrorists Go Nuclear”-এ লিখছেন যে সন্ত্রাসবাদীরা পারমাণবিক সন্ত্রাসের আবহ সৃষ্টিতে ক্রমশই পারদর্শী হয়ে উঠছে। বস্তুত একটিও পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াই তারা ভীতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্বপ্রথম পরমাণু সন্ত্রাসবাদী হয়ে উঠতে পারে। জেঙ্কিন্স বলেন হয়তো এ শঙ্কা সম্পূর্ণ কাল্পনিক তবে এই পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিক বাস্তবতা থেকে কল্পনাকে পৃথক করে দেখতে পারে না।

১১ই সেপ্টেম্বরের এই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে পাল্টে দেয়, তা নয়। এই ঘটনার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া গোটা বিশ্বের চালচিত্রেও আনে এক ধরণের বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি যতখানি আন্ত-রাষ্ট্রিক বিষয়, ততটাই আন্ত-সামাজিক এবং এই ঘটনা মানুষে-মানুষে সম্পর্কেও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। সমাজে সংশয় ও সন্দেহ মানুষকে মানুষ থেকে পৃথক করে ফেলেছে।

আসলে সন্ত্রাস হলো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার কিন্তু সন্ত্রাসবাদ হলো এক ধরণের অপ-নীতি বা অপ-আদর্শ যার মর্মমূল হচ্ছে, সন্ত্রাস। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া হলো নানান ভাবে। আশঙ্কা, দুঃখ এবং ক্ষোভের সম্মিলিত প্রভাবে দেশে এবং বিদেশে সন্ত্রাসবাদীদের উৎখাত করার লক্ষ্যে কংগ্রেস এবং হোয়াইট হাউজ সামরিক বাহিনী, আইন প্রয়োগ সংস্থা এবং গোয়েন্দাবাহিনীর ক্ষমতাকে সম্প্রসারিত করে। এই সময়ে ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং বিমানে আরোহণ ইচ্ছুক ব্যক্তিদের নিষেধাজ্ঞার তালিকা কয়েক হাজারে উন্নীত করা হয়।

৯/১১-এর এই ঘটনার পর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০শে সেপ্টেম্বর কংগ্রেস ও জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন ধরণের সামরিক প্রতিক্রিয়ার কথা ঘোষণা করেন। এটি অতএব কেবল মাত্র কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সীমিত রাখা হয়নি, সেটি একটি ব্যাপক ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পরিণত হয়। প্রেসিডেন্ট বুশ বলেছিলেন, “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাাদের লড়াই শুরু হয়েছে আল ক্বায়দাকে কেন্দ্র করে, কিন্ত সেটি শেষ সেখানেই নয়। এই যুদ্ধ ততদিন পর্যন্ত শেষ হবে না, যতদিন না বিশ্বের সকল সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠিকে চিহ্নিত করে তাদের নিশ্চিহ্ন করা যায়”। ১১ই সেপ্টেম্বরের মাসখানেকেরও কম সময়ের মধ্যে আমেরিকান সৈন্যরা যখন আফগানিস্তানে অভিযান চালায় তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সেটি ছিল দীর্ঘতম সামরিক অভিযান।

আল ক্বয়াদা এবং তালিবানকে নিশ্চিহ্ন করতে এবং ৯/১১-এর আক্রমণের ঘাতক হোতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার ব্যাপারে- এই অভিযানে যেমন আমেরিকান জনগণের সমর্থন ছিল, তেমনি সমর্থন ছিল নেটোরও। এই লড়াইয়ে হাজার হাজার আমেরিকান সৈন্য প্রাণ হারায়। আরও এক দশকেরও বেশি সময় পরে পাকিস্তানে লুকিয়ে থাকা ওসামা বিন লাদেনকে আমেরিকান বাহিনী হত্যা করতে সমর্থ হয়, কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত বিশ্ব থেকে সন্ত্রাসবাদকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়নি।

৯/১১-এর ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিমান ভ্রমণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং সাধারণ ভাবে মুসলিমদের প্রতি সন্দেহ ও কোন কোন ক্ষেত্রে ঘৃণা দেখা দেয়। যদিও সন্ত্রাসবাদের পক্ষে ইসলাম ধর্মের কিংবা সাধারণ কোন মুসলমানের আদৌ কোন সমর্থন ছিল না। প্রকৃত পক্ষে ধর্মের নাম ব্যবহার করে, উগ্রবাদী সন্ত্রাসীরা যেমন ৯/১১তে নজিরবিহিন সন্ত্রাস চালায়, তেমনি এ রকম ঘটনা এখনও ঘটছে বিশ্বের অনেক জায়গায়।

এই ধর্মীয় উগ্রবাদ থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশও। তবে বাংলাদেশে এই উগ্রবাদী বিষয়টি ব্যাপক ভাবে সহিংস নয় কিন্তু আদর্শিক ভাবে বাংলাদেশ যে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে জন্মলাভ করে আজ থেকে ৫৫ বছর আগে, সেই নীতিকে পরিহার করে বর্তমানে এক ধরণের সাম্প্রদায়িকতা গুরুত্ব পাচ্ছে। এখনকার তরুণ প্রজন্মের মস্তিষ্ক ধোলাই করে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প তাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমন শ্লোগানও শোনা গেছে- ‘আমরা সবাই তালিবান, বাংলা হবে আফগানিস্তান’।

বাংলাদেশের তালিবানের (শিক্ষার্থীদের) মগজ ধোলাই বর্তমানে এমন এক স্তরে পৌঁছেছে যেখানে তারা বাঙালি জাতীয়তাবোধের বিপরীতে ইসলামি জাতীয়তার কথা বলছে। ধর্ম ও জাতি যে এক নয়, এই বিষয়টি তারা বুঝতে রাজি নয়। বাংলাদেশকে সেই পাকিস্তানে পরিণত করতে চায় তারা, যে পাকিস্তানে লুকিয়ে ছিল আল ক্বায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেন। বাংলাদেশে আল ক্বায়দা নামের কোন সংগঠনের সন্ধান না পাওয়া গেলেও খেলাফাত আন্দোলন, হেফাজতে ইসলাম-এর মতো বাহ্যত মধ্যপন্থি ইসলামি দলগুলি যেমন সক্রিয় তেমনি রয়েছে জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী (হুজি-বি) এবং আনসারউল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)-এর মতো কিছু নিষিদ্ধ উগ্রবাদী দলও বাংলাদেশে লুকিয়ে রয়েছে। তারা এক সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল কিন্তু পরবর্তীতে এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকার এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ায় এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আর প্রকাশ্যে আসেনি।

তবে এ ধরণের গোষ্ঠীর সঙ্গে যারা অন্তত তাত্ত্বিক ভাবে সম্পৃক্ত তাদের উত্থান আমরা লক্ষ্য করছি বাংলাদেশে ৫ই আগস্টের পর। জামাত-শিবির এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে হয়তো আক্ষরিক অর্থে সন্ত্রাসবাদী বলা যাবে না কিন্তু কথিত ইসলামি শাসন ব্যবস্থা স্থাপনের ব্যাপারে তাদের অভিমত এবং সন্ত্রাসবাদী দলগুলির অভিমতের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, পার্থক্য কেবল পদ্ধতিতে। তবে এ সব দলও যে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিতে পারে না তেমনতো কোন নিশ্চয়তাই নেই।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা এদের ভূমিকা প্রত্যক্ষ করেছি। ৯/১১-এর পর ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা যেমন প্রসারিত হয়েছে, তেমনি তার বিপরীতে সন্ত্রাসবাদীরা গোপনে গোপনে আরও অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র বাহিনী দীর্ঘদিন অবস্থান করা সত্ত্বেও, আফগানিস্তান যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। ইরানেরও অবস্থা প্রায় একই রকম। বোরকায় আবদ্ধ যেন গোটা সমাজ।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসের তাৎক্ষনিক লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এর আদর্শিক লক্ষ্য কেবল মাত্র যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমিত ছিল না, লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে দূর্বল করে তাদের কথিত ইসলামি চিন্তাধারাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া। আসলে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ ব্যবহারিক এবং আদর্শিক উভয় অর্থেই এক ধরণের সংক্রামক ব্যাধি। এই সংক্রমণ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয় এখনও। ভারতে হিন্দুত্ববাদের প্রসার বাংলাদেশের কট্টরপন্থি মুসলমানদের আরও উগ্রবাদী করে তোলে, তারা ফিরে যেতে চায় ১৯৭১ সালে পরিত্যক্ত সেই দ্বিজাতি অপতত্বের দিকে।

তাইতো বলি সেপ্টেম্বরের সেই সন্ত্রাস আমাদের ভাবিয়ে তোলে আজও, বিশেষত এখন যখন মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইলের সংঘাত তীব্রতর হয়ে উঠছে তখন ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদকে উগ্রবাদীরা আরও ব্যাপক করার চেষ্টা চালাবে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও, বিশ্বের অন্যান্য দেশকে, এই মানবতাবিরোধী উগ্রবাদী সন্ত্রাস থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। আর সে জন্যে যেমন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে উগ্রবাদী ধারণার প্রচার ও প্রসার বন্ধ করা, যাতে করে ধর্মের অজুহাত দিয়ে কোথাও কোন দল ক্ষমতা দখল করতে না পারে।

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র

গবেষক, লেখক এবং বিবিসি ও ভয়েস অফ আমেরিকার প্রাক্তন বেতার সাংবাদিক। স্বনামে ও ছদ্ম নামে দেশ বিদেশের পত্রপত্রিকায় অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।