৯/১১ নিয়ে গত দুই দশকে যত লেখা, গবেষণা, রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে, আধুনিক ইতিহাসে সম্ভবত খুব কম ঘটনাই ততটা চর্চিত। সময়ের সাথে সাথে ঘটনাটিকে দেখার দৃষ্টিও বদলেছে। একে নিছক সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; বরং এটি ছিল এমন এক হামলা যা বদলে দিয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষা। তাই সন্ত্রাসবাদ, নিরাপত্তা, যুদ্ধ, নজরদারি, সীমান্ত— এসব শব্দের অর্থ আর বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামোকে পালটে ফেলা এই ঘটনার ফলে কোন পক্ষ কতটা লাভবান হল— সেই হিসাবও খুব সরল-সোজা নয়।
৯/১১-কে প্রকৃতপক্ষেই যে অন্যান্য জঙ্গি হামলার সাথে এক করে দেখার সুযোগ নেই তার একটি বড় কারণ হল এর পরে ঘটা নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনগুলো; যেগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে থাকেনি। প্রথম এবং সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটেছে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে এবং নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক রাষ্ট্র ধারণা (Security State)-এর বিস্তারে।
৯/১১-এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানে বড় ধরনের ত্রুটি ছিল, যা ৯/১১ কমিশনের তদন্ত রিপোর্টেও উঠে আসে। হামলার পর সেই দুর্বলতা মোকাবিলার নামে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। ২০০২ সালের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে ডিপার্টেমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি তৈরি হয় এবং ২২টি সংস্থা ও দপ্তরকে একটি নতুন কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে আনা হয়। ব্রুকিংস ইন্সটিটিশনের বিশ্লেষণেও ৯/১১-কে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগকে নতুনভাবে সংগঠিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আর এর সঙ্গে বাড়ে রাষ্ট্রের নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতাও। ২০০১ সালের ইউএসএ প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট সরকারকে যোগাযোগ, আর্থিক নথি এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বিস্তৃত ক্ষমতা দেয়, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও তথ্যের সুরক্ষার ভারসাম্য নিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক তৈরি করে। নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এখানে অস্বীকার করার সুযোগ নেই বটে; কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নটি থেকে যায়, সন্ত্রাস ঠেকানোর জন্য নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের উপর রাষ্ট্রের কতটা ক্ষমতা ও নজরাদারি থাকা উচিৎ এবং সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়?
শুধু নিজ দেশের নাগরিকের উপর নজরদারি না, সন্ত্রাস দমনে কোন একটি রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিতে পারে, সেই ধারণাও আমূল বদলে যায় ৯/১১-এর পর, ‘ওয়ার অন টেরর’-এর মাধ্যমে। কংগ্রেসের Authorization for Use of Military Force (AUMF) অনুমোদনের ভিত্তিতে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু হয় এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়া ও সিরিয়াতেও মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনার আইনি ভিত্তি হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘস্থায়ী, বৈশ্বিক যুদ্ধে পরিণত হয়, যা চিরতরে পালটে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যকে।
এখানেই তৃতীয় পক্ষের লাভের প্রশ্নটি সামনে আসে— সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্প। যুদ্ধ মানে শুধু সৈন্য মোতায়েন নয়; অস্ত্র, বিমান, নজরদারি প্রযুক্তি, সামরিক ঘাঁটি, নিরাপত্তা সেবা এবং বিপুল সরকারি চুক্তিও। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘Costs of War’ প্রকল্পের গবেষণা অনুযায়ী, আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর পর পেন্টাগনের খরচের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু সামরিক ঠিকাদারদের কাছে গেছে। সেই সাথে যুদ্ধকালীন দ্রুত ব্যয় ও কৌশলগত ভুল কিছু ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় কিংবা অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগও দিয়েছে। অর্থাৎ এই ধরনের ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারকারী একটি সন্ত্রাসী হামলার পর যে দীর্ঘ যুদ্ধ-সংঘাত প্রায় পুরো বিশ্বকেই প্রভাবিত করেছিল, মধ্যপ্রাচ্যে কতগুলো রাষ্ট্র ও প্রাচীন সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে, সেই একই যুদ্ধে বড় একটি আর্থিক সুবিধাভোগী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প।
শুধু তাই নয়। এই হামলার পরে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনের সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে Status of Forces Agreement (SOFA), Defense Cooperation Agreement, এবং Base Access Agreement-এর মতো ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ২০০২ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, Operation Enduring Freedom চালু ও টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্রুত এই ধরনের চুক্তি করা হয়েছিল, যাতে মার্কিন সামরিক সদস্যদের আইনি সুরক্ষা, সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার এবং আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত হয়।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো মার্কিন বাহিনীকে যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র বিক্রির সুযোগ দিয়েছে। ৯/১১-এর পর এই সম্পর্কগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়, কারণ উপসাগরীয় ঘাঁটিগুলো আফগানিস্তান ও পরবর্তী সময়ে ইরাকে সামরিক অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলায় আক্রান্ত হলেও, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ যে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প, অস্ত্র ব্যবসায়ী, এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী নীতির পক্ষে কাজ করে, তা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।
ইরাক এই ব্যাপারটিকে আরও স্পষ্ট করে। সাদ্দাম হোসেনের ইরাক ৯/১১ হামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল— এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবু ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে, যার প্রধান যুক্তিগুলোর একটি ছিল weapons of mass destruction বা WMD-এর হুমকি। যুদ্ধের পর কোনো WMD মজুত পাওয়া যায়নি। কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস-এর নথিতেও যুদ্ধের আগে ব্যবহৃত WMD যুক্তি এবং পরবর্তী বাস্তবতার এই বৈপরীত্য নথিভুক্ত হয়েছে। ইরাক যুদ্ধ তাই ৯/১১-পরবর্তী আমেরিকার আধিপত্যবাদী আগ্রাসনেরই একটি উদাহরণ।
একটি সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছিল, যা ইরাক যুদ্ধকে বৈধতা দেয়, ৯/১১ এর সঙ্গে ইরাকের কোন ধরনের সরাসরি সম্পর্ক না থাকার পরেও। আর সেই যুদ্ধের ফল শুধু সাদ্দাম সরকারের পতন নয়; ইরাকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং পরবর্তী সময়ে আল-কায়েদা ইন ইরাক ও আইএস-এর মতো গোষ্ঠীর উত্থানের জন্য নতুন পরিবেশ তৈরি হওয়া, যা এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যকে ভোগাচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হয়েছে চতুর্মুখী— ইরাকের প্রাকৃতিক তেলের উপর নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত শক্তি বাড়ানো, সবই দিন-শেষে ৯/১১ পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সাথেই সম্পর্কিত।
মজার ব্যাপার হল ২৫ বছর পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যে যুদ্ধ আবার মধ্যপ্রাচ্যকে চরম অস্থিতিশীল করে তুললো, সেই ইরানও ৯/১১-এর আরেকটি অপ্রত্যাশিত সুবিধাভোগী। আফগানিস্তানে তালেবান সরকার এবং ইরাকে সাদ্দাম হোসেন— দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীই মার্কিন সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত হয়। ফলে ইরাক যুদ্ধের পর দেশটির রাজনৈতিক দুর্বলতা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।
এটাও ঠিক যে আল-কায়েদাও তাদের নিজস্ব অর্থে কিছু কৌশলগত ফল পেয়েছিল। কারণ এই হামলার উদ্দেশ্য শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানি ছিল না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা যা আল কায়েদা বেশ ভালোভাবেই করতে পেরেছিল।
তবে এতসব লাভের মধ্যে লোকসান হয়েছে কেবল সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর। ফলে ৯/১১-এর ২৫ বছর পরে এসে এর লাভ-লোকসান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মানবিক ও রাজনৈতিক যে মূল্য দিতে হয়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে, সেই বিবেচনাই মুখ্য হওয়া উচিৎ। কারণ শেষ পর্যন্ত ৯/১১ শুধু সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস নয়; পরবর্তী দুই দশকের আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, আগ্রাসন ও ক্ষমতার কাঠামো বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

