হজমী গুলি

Post Views: 108
5 min read

সঞ্চয়িতা হাতে মুম্বাই বিদ্যাবিহার ওএনজিসি কলোনির পাঁচ তলার ছাদে তড়তড়িয়ে চলে যায় কেয়া, তারপরেই এক ছুটে ছাদের কারনিশ ঘেষে দাঁড়িয়ে যায়। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস আসার সময় হল যে। ওই আসছে সে কালো ধোঁয়া ছেড়ে।.আলতো চুল পীঠে ছড়িয়ে কেয়া একটু ঝুঁকে যায় জেনারেল কম্পার্টমেন্ট থেকে নামা মানুষগুলোকে দেখবে বলে, কারুর হাতে মাদুর, কারুর বা টিনের বাক্স।

এই সেই সব মানুষ যারা বাংলার মাটি ছুঁয়ে আসছে। হুইসেল বাজিয়ে এসে থামল মহারানী জ্ঞানেশ্বরী কুরলা স্টেশনে, সাথে নিয়ে এল বাংলার ভাই বোনেদের। এই হুইসেলটা ঠিক যেন আদুরী পিসিদের ফুটবল মাঠের থেকে ভেসে আসা সেই বাঁশিটার মতো, সে কোন কালের কথা। পরদিন কুরলা থেকেই সময় মতো ট্রেন ধরল কেয়া। এবার পুজোয় সে চলল বাপের বাড়ি। জ্ঞানেশ্বরীর ঘষা কাচে তখন ভেসে ওঠে ভোরের বাংলার জল পদ্ম, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে যায়।

দুরে বাজছে বিষাদের ঢাক, সদ্য মা হারা হয়েছে কেয়া।

বাগানের পেরিয়ে, শিউলিকে পাশ কাটিয়ে, সবুজ ঘাস মাড়িয়ে বাড়ি ঢোকে কেয়া। এই ত সেই তালগাছ যেখানে আছে ব্যাঙ্গমা ব্যংগমীর বাসা, যা কিনা একসময় ছিল ঠাকুমার আম তেল মাখা মুড়ির বাটিতে। নিভু নিভু আলোয় ঠাকুমা বলে যেত ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমীর গল্প। চারদিকে ঘিরে থাকা নাতি নাতনিদের ফাঁক গলে কি করে যেন ব্যাঙ্গমীএসে জুটত এই তালগাছে, ব্যাঙ্গমা পড়ে থাকত উঠোনের চাপ চাপ অন্ধকারে।

বাপের বাড়িতে কাঁচের আলমারিতে থরে থরে সাজানো বই। মলাট বাঁধানো বইয়ে সোনার জলে নাম লেখা, জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাস। ওগুলো বসুমতি পত্রিকা, যা দাদু বাঁধিয়ে রেখেছিলেন তাঁর উত্তরসুরীর জন্য, সুন্দর সুন্দর গল্প। পরীক্ষা শেষ হলেই কেয়ার নজর যেত ওই বইগুলোর ওপর, পড়ত বললে ভুল হবে যেন গোগ্রাসে গিলত।

কিন্তু বসুমতির পাশে এটা কি? ইতিহাস বই না? এই ত সেদিন স্কুল থেকে ফিরে গন্ধ মাখা মায়ের আঁচল ঘেষে ইতিহাস বই পড়ছিল কেয়া। সযত্নে পৃষ্ঠা কতক ছুঁয়ে যায়, পঁচিশ আর ছাব্বিশের মাঝের পাতায় এসে থমকে যায় কেয়া,গোল মতো এটা কি? লাল লাল ছোপ পাতা জুড়ে–

টিফিনের সময় স্কুলের তালা দেয়া গেটের গরাদের ফাঁকে হাত গলিয়ে লাল হজমী কিনল কেয়া। হজমী গুলি কেয়ার খুব প্রিয়। সপ্তাহের এই একটা দিন টিফিন কেনার পয়সা দেয় মা। বাকি দিন বাড়ি থেকেই টিফিন আসে।কাঁধের দু পাশ থেকে ঝুলে পড়া দুই বিনুনি সামলে স্কুলের বড় লোহার দরজার গরাদের ফাঁকে গলানো হাতটা টেনে নিয়ে বেশ কয়েকটা লাল হজমী কিনে, টপাটপ গালে পুড়ে দেয় কেয়া। কাগজের ঠোঙা ছিঁড়ে সযত্নে দুটি হজমী মুড়ে নেয়, ভরে দেয় ইতিহাস বইয়ের পাতার ফাঁকে। তার মা যে খুউব ভালবাসে, যদিও মা বলে হজমী বেশি খেওনা,গলা নষ্ট হবে।

স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই, সদর গেট থেকেই- “মা… খুব খিদে পেয়েছে যে—”

তাই তো এই হাঁক ডাক। সেই ডাক সামনের বাগান পেরিয়ে ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিফলিত হয়ে ছাদের ঘরে…..। ছাদের কার্নিশ ঘেষে দাঁড়িয়ে তার মা, মার শাঁখা পলা হাতে তখন সঞ্চয়িতা। ছাদের গোল গোল অলিন্দ বেয়ে আওয়াজ আসে- “হাত মুখ ধুয়ে নাও, খেতে দিচ্ছি।”

কেয়ার মুখে মুচকি হাসি, মা ছাদ থেকে নামতেই মা কে জড়িয়ে বলে “একটা জিনিস এনেছি তোমার জন্য, চোখ বন্ধ কর।” একটা মার গালে, আর একটা ইতিহাস বইয়ের মাঝে। তারপর ইতিহাসের বইয়ের পাতা উল্টে উল্টে খোঁজ খোঁজ হজমির খোঁজ।

পঁচিশের পাতায় এসে থমকে যায় কেয়া। পঁচিশ আর ছাব্বিশের মাঝে তার কেনা লাল লাল হজমি গুলি কাগজ ভেদ করে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়, সেখানে লেখা—

জাহানারা, বৃদ্ধ শাহজাহানের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে তাজমহলের দিকে। সাল দুহাজার পঁচিশ- কেয়ার বৃদ্ধ পিতা সদ্য তার সহকধর্মীণীকে হারিয়ে শোকাচ্ছন্ন। কেয়া কি জাহানারা হতে পারবে? সব সন্তান ঔরঙ্গজেব হয় না যে।

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কলকাতা. পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

সঙ্গীতশিল্পী, পদার্থবিদ্যার শিক্ষিকা, নাট্য কর্মী, চলচ্চিত্রে অভিনেত্রী ও নেপথ্য কন্ঠ শিল্পী।


Previous
Next

1 Comment

  • Biswanath Bhaumik

    Khub bhalo laglo.

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।