পড়শী সাহিত্য ও শিল্প ভাতিছ গগন মাঝে

ভাতিছ গগন মাঝে

Post Views: 86
9 min read

নিঝুমের ঘরে পুরোনো জিনিসপত্রের জন্য আলাদা একটি কাঠের আলমারি আছে। খুব বড় কিছু নয়। অথচ সেই আলমারির দরজা খুললেই নিঝুমের মনে হতো, সে যেন কোনো জাদুর ঘরের দরজা খুলেছে। কারণ এখানে আছে তার স্মৃতি। পুরোনো হয়ে গেছে যেসব জিনিস। একেবারেই অচল সেসব জিনিস যত্ন করে রাখা। মায়ের চেঞ্জার, পুরোনো রেকর্ড যেখানে কালোর মাঝে একটা কুকুর বসে আছে। বাবার জীবনে প্রথম শখের সাদাকালো ক‍্যামেরা, নানার দিকদর্শন যন্ত্র, দাদুর পান ছেচনি ও চামচ, নানার কাঠের খরম, সাহেবী টুপি, কোট। দাদুর কোরআন শরিফ ও ফুপুর ওজিফা বই।

এছাড়াও আছে অনেক অনেক জিনিস পুরানো ফোন থেকে শুরু করে মোবাইল পর্যন্ত। সেদিন দুপুরে হঠাৎ করেই তার এই গানটি মনে পড়ল। কোথা থেকে গানটা মনে এলো, নিঝুম জানত না। বহু বছর গানটি শোনা হয়নি। তবু প্রথম পঙ্‌ক্তিটা মনে আসতেই যেন তার ভেতরে কোথাও একটা পুরোনো দরজা খুলে গেল। গুনগুন করে গাইতে লাগলো

“আমি যামিনী তুমি শশী হে ভাসিছ গগন মাঝে…”

কয়েকটা লাইন জানে বাকিটুকু মনে নেই, তাই ইউটিউবে গানটা ছাড়ল। তখনই গানটা শুনে চমকে গেল। আরে এটা তো ‘ভাসিছ’ নয়, এখানে বলছে ‘ভাতিছ’ এটা মানে কী?

এতোদিন ভুল গান শুনে আসছে আর ভুলভাল গেয়ে আসছে!! মায়ের মুখ মনে পড়ল। সেই সঙ্গে মনে পড়ল চেঞ্জারটার কথা। তখন রেকর্ডারকে তারা চেঞ্জারই বলত। লাল রঙের হাল্কা একটা যন্ত্র যা বাবা মাকে উপহার দিয়েছিলেন ১৯৭৪ সনে। তার গায়ে সময়ের আঁচড়। এক পাশে পিন বসানোর জায়গা। মা খুব যত্ন করে রেকর্ড চালাতেন। রেকর্ডের কালো গোল চাকতিটা ঘুরতে শুরু করলেই ঘরটা যেন অন্যরকম হয়ে যেত। বাজতো রবীন্দ্র সঙ্গীত আর সেই পুরোনো দিনের আধুনিক গান।

নিঝুম তখন ছোট। গানের অর্থ বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু গান শুনতে তার ভালো লাগত। মা যখন রান্না করতেন, ঘর গোছাতেন কিংবা জানালার পাশে বসে কাপড় ভাঁজ করতেন, তখন চেঞ্জারে গান বাজত। একদিন যখন সে একটু বড় হয়েছে সেই গানটাই বাজছিল।

“আমি যামিনী তুমি শশী হে…”

নিঝুম মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল- মা, যামিনী কী?” মা হেসে বলেছিলেন- রাত্রি।”
– আর শশী?
– চাঁদ। যেমন তুই আমার গগনের চাঁদ।

নিঝুম কিছুক্ষণ ভেবে বলেছিল, “তাহলে যামিনী যদি রাত হয়, শশী রাতে থাকে?”

মা হেসে তার মাথায় হাত রেখেছিলেন। “থাকে তো। রাতকে আলো দেয়।”

নিঝুম তখন আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। গান চলছিল। “ভাতিছ গগন মাঝে…” শব্দটা সে বুঝতে পারেনি। তার কানে মনে হয়েছিল, “ভাসিছ গগন মাঝে।”

ছোট্ট নিঝুমের কল্পনায় তখন চাঁদ যেন আকাশে ভাসছে। বছর কেটে গেল। শৈশব গেল। কৈশোর গেল। যৌবন এল। জীবন তার নিজের মতো করে নিঝুমকে ব্যস্ত করে তুলল।

মা বুড়ো হলেন। চেঞ্জারটি ঠিক আছে কিন্তু তার পিনটি একদিন নষ্ট হয়ে গেল। তার বদলে এলো ক‍্যাসেট প্লেয়ার, ভিসিআর। যুগ, দিন পাল্টাতে লাগলো আমরা বড় হতে থাকলাম আর ব‍্যস্ত হতে থাকলাম।

চেঞ্জার বাজানো বন্ধ হলো। তবু নিঝুমের মা সেটি ফেলে দিলেন না। যত্ন করে তুলে রাখলেন। মাঝে মাঝেই বের করে পরিষ্কার করে আবার রেখে দেয়।
কেউ বলেছিল, -নষ্ট জিনিস রেখে কী হবে? নিঝুম উত্তর দেয়নি। কারণ সে জানত, চেঞ্জারটি নষ্ট হয়নি। তার কাছে সেটি এখনো বাজে। শুধু শব্দ শোনা যায় না।

নিঝুম একদিন রেকর্ডগুলো প‍্যাকেটে মুড়ে আলমারির ভেতর রেখে দিয়েছিল। খুব যত্ন করে। যেন কালো গোল চাকতিগুলোর ভেতর মায়ের কণ্ঠ, হাতের স্পর্শ, রান্নাঘরের গন্ধ আর তার নিজের শৈশব আটকে আছে।

তারপর পঞ্চাশ বছর কেটে গেল। সেদিন দুপুরে গানটি হঠাৎ মনে পড়ার পর নিঝুম আলমারি খুলল। চেঞ্জারটি বের করল। ধুলো যদিও জমেনি তবু অতি যত্নে ও আদরে আঙুল দিয়ে মুছতে মুছতে তার চোখ ভিজে উঠল।

– শৈশব তুমি এখনো লুকিয়ে আছ এসবের মাঝেই!” সে আস্তে করে বলল। চেঞ্জার অবশ্য কোনো উত্তর দিল না।

নিঝুম রেকর্ডগুলোর বাক্স খুলল। একটির পর একটি রেকর্ড বের করল। তারপর হঠাৎ সেই রেকর্ডটি পেল। কালো চাকতি। সাদা লেবেল, কুকুরের ছবি। কত বছরের পুরোনো!

নিঝুম রেকর্ডটির ওপর হাত রাখল। মনে হলো, তার আঙুলের নিচে সময় ঘুরছে। সে গানটির কথাগুলো গুগলে খুঁজে পড়তে শুরু করল। “আমি যামিনী তুমি শশী হে…” তারপর থেমে গেল। “ভাতিছ…”

এত বছর পর শব্দটির দিকে তার চোখ আটকে গেল। ভাতিছ!!! সে এতদিন তো ভাসিছ ভেবেছে! নিঝুম ফোন হাতে নিল। শব্দটির অর্থ খুঁজল। কিছুক্ষণ পর সে নিঃশব্দে বসে রইল। ভাতিছ মানে – দীপ্ত হয়ে আছ। প্রকাশিত হয়ে আছ। আলো ছড়িয়ে আছ।

তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা শব্দ হলো। পঞ্চাশ বছর আগে যে ছোট্ট মেয়েটি মায়ের পাশে বসে “ভাসিছ” শুনেছিল, সে আজ হঠাৎ বুঝতে পারল, গানটি আসলে কী বলেছিল। “আমি যামিনী, তুমি শশী হে, ভাতিছ গগন মাঝে।”

নিঝুম চোখ বন্ধ করল। তার মনে হলো, মা যেন পাশে বসে আছেন। সেই পুরোনো ঘর। সেই চেঞ্জার। সেই ঘূর্ণায়মান রেকর্ড। আর মা বলছেন- শশী মানে চাঁদ আর তুই আমার সেই চাঁদ যে আমার বুকে আলো ছড়িয়ে আছে।“ নিঝুম মৃদু হেসে বলল- “মা, আজ বুঝেছি।”

কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো, গানটির অর্থ জানার পরও সে যেন কোনো একটা অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না। সে আবার পড়ল। “মম সরসীতে তব উজল প্রভা বিম্বিত যেন লাজে…”

তার মনে হলো, এতদিন সে শুধু গান শুনেছে। আজ প্রথমবার সে গানটি দেখছে। শব্দের মধ্যে সরোবর দেখছে। চাঁদের আলো দেখছে। কুমুদিনীর বুকে শিশির দেখছে। আর সেইসব দৃশ্যের ভেতর দিয়ে মায়ের মুখটাও যেন ভেসে উঠছে।

নিঝুমের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে রেকর্ডটি বুকের কাছে টেনে নিল। তারপর খুব আস্তে বলল- মা, তুমি জানো? তোমার সেই গানটার অর্থ আমি আজ পঞ্চাশ বছর পর বুঝলাম।“ ঘরে কেউ ছিল না। তবু নিঝুমের মনে হলো, উত্তর এসেছে। খুব পরিচিত এক নরম হাসির মতো।

সন্ধ্যায় নিঝুম চেঞ্জারটাকে আবার তার জায়গায় রেখে দিল। পিনটি আর ঠিক হলো না। রেকর্ডও বাজল না।

তবু সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে সে চেঞ্জারের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। একটু থেমে মৃদু হাসল। জানালার বাইরে তখন চাঁদ উঠেছে। নিঝুম অনেকক্ষণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, এত বছর আগে মা যে গানটি শুনেছিলেন, আজ সেই গানই তাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।

শৈশব থেকে বার্ধক্যের পথে মানুষ কত কিছু ভুলে যায়। মুখ ভুলে যায়। ঘরের রং ভুলে যায়। কবে কী খেয়েছিল, তাও ভুলে যায়। কিন্তু কোনো কোনো গান কোথাও হারায় না। তারা অপেক্ষা করে। একটি নির্দিষ্ট দুপুরের জন্য। একটি নির্দিষ্ট বয়সের জন্য। একটি নির্দিষ্ট মানুষের জন্য। তারপর হঠাৎ একদিন ফিরে আসে মনের মাঝে যেন সে এখানেই ছিল নিভৃতে।

নিঝুম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করল। দূরে যামিনী গভীর হচ্ছে। আকাশে শশী জ্বলছে। আর তার মনে, বহু বছর নীরব থাকা সেই গানটি আবার বাজছে। “আমি যামিনী তুমি শশী হে…”

এইবার নিঝুম জানে, শশী শুধু চাঁদ নয়। আর “ভাতিছ” শুধু একটি শব্দ নয়। এগুলো তার মায়ের স্মৃতির আলো। যে আলো কোনো চেঞ্জারের পিন নষ্ট হলে থেমে যায় না। যে আলো রেকর্ডের ঘূর্ণন বন্ধ হয়ে গেলেও থামে না। যে আলো পঞ্চাশ বছর পরেও একটি মেয়েকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে।

সেই আলোই হয়তো ভালোবাসা। আর কিছু ভালোবাসা কখনো পুরোনো হয় না। শুধু মানুষ বড় হয় কিন্তু ভালোবাসার গানটি থেকে যায় মনের নিভৃত কোণে।

১৫ অগাস্ট, ২০২৬

হিউস্টন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত বই – ‘গোধূলির ছোঁয়া’ ও ‘প্রতিবিম্বের কাছাকাছি’। প্রকাশিত ছোট গল্পের ই-বুক – “যা কিছু গল্প হয়ে রয়”।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।