আজ থেকে প্রায় চার দশক আগের কথা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ক্লাসরুমে বসে শিক্ষক পরম যত্নে আমাদের পড়াচ্ছিলেন, ভরের নিত্যতা সূত্র। পরম সত্যের মতোই তিনি শিখিয়েছিলেন, পদার্থের কোনো বিনাশ নেই, এটি কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়। সেদিন ভাবনা জুড়ে ছিল শুধুমাত্র পরীক্ষার খাতা আর ভালো নম্বর। কিন্তু সময়ের দীর্ঘ আবর্তে হাসপাতাল পরিচালনা, ব্যবসা আর নীতি-নির্ধারণী কিংবা সামাজিক আন্দোলনের মাঠে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করি, ওটা তো কেবল রসায়নের পড়া ছিল না; ওটাই মূলত অর্থনীতির সবচেয়ে চিরন্তন ও সুগভীর দর্শন।
আজ বিশ্বজুড়ে সেমিনার আর করপোরেট টেবিলে বহুল উচ্চারিত এক ধারণা, সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি। পরিভাষাটি ইউরোপীয় ও আধুনিক মনে হলেও এর সারকথা কিন্তু সেই ভরের নিত্যতা সূত্রের ব্যবসায়িক রূপ। প্রকৃতি কিংবা অর্থনীতি, কোনো ব্যবস্থার ভেতরেই বর্জ্য বলে আসলে কিছু নেই। যা আমরা ফেলে দিই, তা হারিয়ে যাওয়া কোনো বস্তু নয়; বরং ভুল জায়গায় পড়ে থাকা অব্যবহৃত সম্পদ।
একইভাবে বহুল আলোচিত ESG-(Environment, Social & Governance), অর্থাৎ পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসন, কোনো জটিল গোলকধাঁধা নয়, এটি মূলত করপোরেট বিবেকের কাছে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন। পরিবেশের ক্ষেত্রে প্রশ্ন: আপনার প্রতিষ্ঠান প্রকৃতির কতটুকু ক্ষতি করছে? সমাজের ক্ষেত্রে: শ্রমিকের ঘাম ও অধিকারের প্রতি আপনি কতখানি শ্রদ্ধাশীল? আর সুশাসনের ক্ষেত্রে: আপনার প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা কতটুকু রক্ষিত হচ্ছে? বিশ্ববাজার এখন আর মোড়কের সৌন্দর্যে সন্তুষ্ট নয় বরং তারা পণ্যের পেছনে থাকা নৈতিকতার প্রমাণ চায়।
শিল্পবিপ্লব আমাদের শিখিয়েছিল রৈখিক ও ধ্বংসাত্মক পথ, প্রকৃতি থেকে সম্পদ তোলো, পণ্য বানাও এবং ব্যবহার শেষে তা বর্জ্যে পরিণত করো। অথচ বৃত্তাকার অর্থনীতি আমাদের এক চক্রাকার সৌন্দর্য শেখায়: উৎপাদন করো, পরম যত্নে ব্যবহার করো এবং মেয়াদ শেষে তাকে পুনরায় কাঁচামালে রূপ দাও। এই আধুনিক দর্শন আসলে আমাদের লোকজ ঐতিহ্যেরই পুনর্বিকাশ। আমাদের নানি-দাদিদের কথাই ধরা যাক, পুরোনো শাড়ি না ফেলে সূচ-সুতোর বুননে তাঁরা তৈরি করতেন নকশী কাঁথা, যা ব্যবহৃত হতো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। ওটাই ছিল পৃথিবীর আদিতম সার্কুলার ইকোনমির বাস্তব রূপায়ণ।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিকে তাকালে পোশাক খাতের কথাই আগে আসে। প্রতি বছর দেশের পোশাক কারখানাগুলো থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টন ‘ঝুট’ বা টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মাত্র ৫ শতাংশ আমরা পুনর্ব্যবহার করতে পারছি। বাকিটা নামমাত্র মূল্যে রপ্তানি হয়ে আবার মূল্যবান সুতা হিসেবে ফেরত আসছে। এই বর্জ্যের পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ দেশে ধরে রাখতে পারলে বছরে অন্তত ৫০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তিনির্ভর এই উদীয়মান সবুজ শিল্পের মালিকানা কি আমাদের নারীদের হাতে পৌঁছাবে?
কারণ, সবুজ অর্থনীতির পথে এই যাত্রায় আমাদের নিশ্চিত করতে হবে ‘ন্যায্য রূপান্তর’ বা Just Transition। অর্থাৎ, খেয়াল রাখতে হবে যেনো- বিশ্ব অর্থনীতি বদলে ফেলার এই দৌড়ে প্রান্তিক মানুষ ও নারী শ্রমিকদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। একসময় আমাদের তৈরি পোশাক খাতে ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক থাকলেও তা এখন কমে ৫৩ শতাংশে ঠেকেছে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু নারীদের তা পরিচালনার দক্ষতা ও সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রযুক্তির নতুন যুগেও যদি নারীর প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বিনিয়োগ না করা হয়, তবে এই সবুজ বিশ্ব তৈরি হবে নারীকে আড়ালে রেখেই। যে রূপান্তরে নারীর সম-অংশীদারিত্ব নেই, তা কেবল রঙের বদল, প্রকৃত রূপান্তর নয়।
একদিকে ইউরোপীয় বাজারের ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট, জোরপূর্বক শ্রম আইন ও সাপ্লাই চেইন দায়বদ্ধতা আইনের কঠোর শর্তাবলি, অন্যদিকে প্রথাগত ব্যাংকিং সেক্টরের মানসিকতা, দুই প্রান্তেই দরকার কাঠামোগত পরিবর্তন।
নকশী কাঁথার সেই চিরন্তন সূচ-সুতোর টান আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে অপ্রয়োজনীয় বা ফেলনা বলে কিছু নেই। গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে আজ বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আধুনিক বিশ্ব ঘুরেফিরে আমাদের এই লোকজ জ্ঞান ও দর্শনের কাছেই নতিস্বীকার করছে। আর এই বৃত্তাকার, টেকসই ও সুষম ভবিষ্যৎ নির্মাণের নেতৃত্বে আমাদের দেশের নারীরাই হতে পারেন প্রধান নিয়ামক।


1 Comment
Dear Madam,
I must respect your values and excellence execution is important in future part of future generations.
Thanks much !