পহেলা বৈশাখ ও অর্থনীতি – যে সম্পর্ক চার শতাব্দীর

আলী নাসিক আইমান | এপ্রিল ৫, ২০২৬
April 16, 2026

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ এখন বাঙালীদের এক সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গেই নয়, বরং সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালী সমাজগুলোতেও এখন কোন না কোন রূপে নববর্ষ পালন করা হয়। এই নববর্ষের উৎসব এখন বাঙালীর সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পরিচয়ের একটি প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এখন এই উৎসবকে সাংস্কৃতিক অবয়বে দেখা হলেও এর সাথে যে অর্থনীতির এক ঐতিহাসিক ও অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক রয়েছে, তা হয়ত অনেকেরেই অজানা। মাঝে নববর্ষের সাথে অর্থনীতির এই সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পড়লেও, নানা মোড় ঘুরে বিগত কয়েক দশকে পহেলা বৈশাখ ও অর্থনীতির এই সম্পর্ক আবারও প্রকট হতে আরম্ভ করেছে।

এই সম্পর্কের শুরুটা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে চার শতাব্দীরও বেশি সময় পূর্বে – মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে। সে সময়ে দিনের হিসাব রাখতে ব্যবহৃত হত চন্দ্রমাসের হিজরী পঞ্জিকা। এটিই ছিল অর্থবছর, অর্থাৎ এই পঞ্জিকা ধরেই আদায় হত খাজনা। কিন্তু চন্দ্রমাসের হিসেবে হওয়ায় তা ঋতুর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। আর খাজনা দিত কৃষকরা, যাদের ফসলের ফলন ছিল সৌরনির্ভর। এই অসামঞ্জস্যতার কারণে প্রায় প্রতিবছরই কৃষকদের খাজনা দিতে বেগ পেতে হত।

সম্রাট আকবর সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব দেন বিখ্যাত জ্যেতির্বিদ ফতুল্লাহ শিরাজিকে। তার প্রচেষ্টায় তৈরি হয় বঙ্গাব্দ। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ এটি প্রণয়ন করা হয়। তবে সম্রাট আকবরের সম্মানে, তাঁর সিংহাসনে আরোহণের বছর অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে বঙ্গাব্দের হিসেব শুরু করা হয়। হিজরি সনের সাথে মিল রেখে বঙ্গাব্দ ১ থেকে আরম্ভ না হয়ে ৯৬৩ থেকে শুরু করা হয় – কারণ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে চলছিল ৯৬৩ হিজরি সাল। কাকতালীয়ভাবে, ৯৬৩ হিজরির মুহররম মাস (হিজরি বছরের প্রথম মাস) ও বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাস একই সময়ে পড়ে যাওয়ায় বৈশাখকেই বঙ্গাব্দের প্রথম মাস হিসেবে চালু করা হয়। এর আগে বাংলায় চৈত্র ছিল বছরের প্রথম মাস।

অর্থাৎ, বঙ্গাব্দের প্রচলন ও পহেলা বৈশাখের গোড়াপত্তনই হয়েছিল খাজনা আদায় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য। বঙ্গাব্দ প্রচলনের পর থেকে চৈত্রের শেষ দিন ছিল খাজনা আদায়ের সময়, আর খাজনা আদায় শেষে বৈশাখের প্রথম দিন ভূমিপতি প্রজাদের মিষ্টিমুখ ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতেন। ধীরে ধীরে এই সামান্য আয়োজনেই মানুষের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব বাড়তে থাকে। যোগ হতে থাকে বৈশাখী মেলা, উৎসব আয়োজন সহ নানা মাত্রা। এসবকে ঘিরেই আবার বাড়তে থাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সময়ের পরিক্রমায় পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠে গৃহস্থালী ও সামাজিক জীবনের এক বড় অংশ।

আগের বছরের খাজনা পরিশোধ করে নতুন বছর আরম্ভ করার প্রথা ছড়িয়ে পড়ে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও। এটিই হয়ে যায় হালখাতার আয়োজন। বণিকরা পহেলা বৈশাখে পুরনো বছরের হিসেবের খাতা বন্ধ করে পহেলা বৈশাখে নতুন খাতা খুলতেন। খাজনা পরিশোধ ছাড়াও মানুষ চেষ্টা করত বণিকদের কাছে বিগত বছরের ব্যক্তিগত দেনা মিটিয়ে নতুন বছরের খাতায় শূন্য থেকে তাদের হিসেব আরম্ভ করতে। বণিকরাও খরিদ্দারদের মিষ্টিমুখ করিয়ে নতুন বছরের ব্যবসা ধরার চেষ্টা করতেন। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের প্রভাব রাজকীয় কোষাগার থেকে ব্যবসায়িক অর্থনীতিতে প্রবেশ করে ফেলে।

ঔপনিবেশিকতা, শিল্পবিপ্লব, আধুনিক অর্থব্যবস্থাপনা সহ অন্যান্য নানা কারণে পহেলা বৈশাখ তার খাজনা আদায়ের ইতিহাস থেকে অনেকটা সরে আসে। মাঝে অনেকটা সময় পহেলা বৈশাখ অনেকাংশেই শুধুমাত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও প্রভাবেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বিগত কয়েক দশক ধরে পহেলা বৈশাখ আবারও অর্থনীতির সাথে তার সেই আদি ও অকৃত্রিম সম্পর্ক চাঙ্গা করে চলেছে। বাংলাদেশে ইতোপূর্বে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎসব বলতে মোটাদাগে বোঝাতো দুই ইদকে, আর পশ্চিমবঙ্গে তা ছিল পুজোর আয়োজন। তবে কয়েক দশকে সেই চিত্রটা এখন অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। এখন বাংলাদেশে দুই ঈদ ছাড়াও পহেলা বৈশাখ স্বমহিমায় এক তৃতীয় বৃহৎ উৎসব হিসেবে আসন করে নিয়েছে। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটি ঘোষণার পর থেকে ধীরে ধীরে এর অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বাড়তে থাকে। পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠিত মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ২০১৬ সালে ইউনেস্কো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করায়, পহেলা বৈশাখের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

একবিংশ শতাব্দীর সিকি ভাগ পেরিয়ে এখন নববর্ষ উৎসব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক প্রভাবশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। একই সাথে প্রকাশ পাচ্ছে এর বহুমাত্রিকতা।

তবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির কোন বিষয় বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে পরিসংখ্যানের অভাব। পহেলা বৈশাখ ঘিরে অর্থনীতি বিষয়ে কোন গবেষণা বা পরিসংখ্যান প্রায় নেই বললেই চলে। তবুও কিছু কিছু সূত্র থেকে এ বিষয়ে খন্ডিত কিছু চিত্র পাওয়া যায়, যার উপর ভিত্তি করে পহেলা বৈশাখের অর্থনৈতিক অবদান সম্পর্কে কিছুটা ধারণা লাভ করা সম্ভব।

কয়েক বছর আগের এক হিসেব অনুযায়ী পহেলা বৈশাখকে ঘিরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে, যার বৃহদাংশই হয় পোশাক খাতে। পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় প্রভাবটি পড়ে পোশাক ও আনুষাঙ্গিক দ্রব্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে। ধারণা করা যায়, নববর্ষ উপলক্ষ্যে যেসব পণ্য বেশি বিক্রি হয় সেগুলোর মধ্যে আছে পোশাক ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক জিনিস যেমন, জুতা, ব্যাগ, ইত্যাদি। দোকান মালিকদের মতে, বছরে পোশাকের মোট বিক্রির প্রায় ২০ শতাংশই পহেলা বৈশাখ ঘিরে হয়। অর্থাৎ পোশাক খাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে পহেলা বৈশাখের কেনাবেচা এখন প্রায় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সূত্র মতে, রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার বুটিক ও ফ্যাশন হাউজ রয়েছে। এগুলোর ব্যবসার একটি বড় অংশই এখন পহেলা বৈশাখকে ঘিরে।

আবার দোকান মালিক সমিতির আওতায় দেশব্যাপী রয়েছে প্রায় ২৬ লাখ দোকান। পোশাকের দোকানের বাইরেও এর মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের দোকানও। দেখা যায় উৎসবের সময়ে মানুষের মধ্যে ব্যয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়; নববর্ষও এর ব্যতিক্রম নয়। এর ফলে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে দোকানগুলোতে বিক্রি বেশ খানিকটা বাড়ে। এসবের মধ্যে উপহার সামগ্রীর দোকান, মুদি দোকানসহ অন্যান্য নানা দোকানই রয়েছে।

পহেলা বৈশাখ ঘিরে ব্যবসার আরেকটি ক্ষেত্র হল মিষ্টি। পহেলা বৈশাখের দিনে মিষ্টি বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন ব্যবসায়ী এখনও হালখাতার উৎসব করেন, যাতে মিষ্টি একটি অপরিহার্য অংশ। আবার বর্তমানে করপোরেট ক্ষেত্রেও নববর্ষ উপলক্ষ্যে মিষ্টি খাওয়া ও উপহার দেওয়ার একটা চল লক্ষ্য করা যায়, যার ফলে করপোরেট অর্ডারগুলো মিষ্টি বিক্রির ক্রমবর্ধমান অংশ হয়ে উঠছে। দেখা যায়, পহেলা বৈশাখের আগে থেকেই মিষ্টি কারখানাগুলো পুরোদমে মিষ্টি উৎপাদনে চলে যায়। এক সূত্র মতে, অন্যান্য সাধারণ দিনের তুলনায় পহেলা বৈশাখে চার গুণ বেশি মিষ্টি বিক্রি হয়। এর বাইরেও বৈশাখী মেলা ও চৈত্রসংক্রান্তি মেলা ঘিরে গ্রামেগঞ্জেও মিষ্টির চাহিদা বাড়ে। বিভিন্ন হিসেব অনুযায়ী বৈশাখ উপলক্ষ্যে দেশ জুড়ে ২৪৫ থেকে ২৭০টি মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

এরপরেই চলে আসে ফুলের বাজার। পহেলা বৈশাখে ফুলের বাজার একেবারে রমরমা হয়ে উঠে। এক হিসেব থেকে দেখা যায়, পহেলা বৈশাখ ঘিরে প্রায় ৬০-৭০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়।

নববর্ষে আজকাল খাদ্যপণ্যের বাজারও সরগরম হয়ে উঠে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনে সারাদিনই চলতে থাকে নানা খাবারের আয়োজন। এর মধ্যে থাকে পান্তা, ইলিশ, মাছ, মাংস, পিঠা, চটপটি, জুস, ইত্যাদি। এগুলো তৈরিতে আবার লাগে তেল, চিনি, গুড়, মসলাসহ অসংখ্য উপাদান। এর ফলে বেড়ে যায় খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যের চাহিদা। তাতে কৃষক পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় উৎপাদন, পরিবহন, আমদানি, পাইকারী, ‍ও খুচরা বিক্রি – প্রতিটি ক্ষেত্রেই লেনদেন হয় বিপুল অর্থ।

নববর্ষ উপলক্ষ্যে হয়ত সবচেয়ে দৃশ্যমান লেনদেন হয় পহেলা বৈশাখের দিন ও তার আগের দিন, অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিতে। এক হিসেবে, উৎসবের এই ক’দিনে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়। এসব লেনদেনের মধ্যে রাজধানী সহ বড় শহরগুলোতে উল্লেখযোগ্য একটি খাত হচ্ছে রেস্টুরেন্টে খাওয়া। এসময়ে রাজধানীসহ শহর এলাকার রেস্টুরেন্টগুলো বিপুল ক্রেতা পায়। জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টগুলোর বাইরে পহেলা বৈশাখে লম্বা লাইনও প্রায়শই চোখে পড়ে। রেস্টুরেন্টগুলোও আজকাল নানা অফারের মাধ্যমে লুফে নেওয়ার চেষ্টা করে এই উৎসবকে ঘিরে ব্যবসার সুযোগ।

এর বাইরেও এদিন সরকারি ছুটি থাকায় প্রচুর মানুষ ঘোরাফেরা করতেও বের হয়। তাতে বাড়ে রিকশা, অটোরিকশাসহ নানা বাহনের ব্যবহার। পহেলা বৈশাখের ছুটি সাপ্তাহিক ছুটির সাথে মিলে গেলে অনেকেই এই লম্বা ছুটি কাজে লাগিয়ে নিজ পরিবারের কাছে বা এলাকায় চলে যান। সেক্ষেত্রে বাড়ে বিমান, বাস, ট্রেনসহ অন্যান্য পরিবহনের ব্যবসাও। আবার অনেকে নববর্ষের ছুটিতে পর্যটনের সুযোগটা হাতছাড়া হতে দেন না। এতে হোটেল, রিসোর্ট সহ পর্যটন খাতের অন্যান্য ব্যবসা এসময়ে অনেকটাই চাঙ্গা হয়ে উঠে।

হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে হয়ত নববর্ষের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব আর নেই। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হস্ত ও কারুশিল্পের প্রসারে নববর্ষের গুরুত্ব স্বীকার না করলেই নয়। বৈশাখী মেলা থেকে আরম্ভ করে বৃহৎ শোরুম – সবখানেই হস্ত ও কারুশিল্পের এক বড় অংশ বিক্রি হয় নববর্ষে। উপহার সামগ্রী হিসেবেও এসব সামগ্রী নববর্ষে বিশেষ স্থান করে নেয়। নববর্ষ ঘিরে এক্ষেত্রে নতুন নতুন নকশা ও পণ্যও বাজারে আসে – যার ফলে নববর্ষ এ খাতে গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখে। কয়েক বছর আগের এক হিসেবে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের হস্তশিল্প সামগ্রী বিদেশে রপ্তানী হয়। বিদেশে বসবাসকারী বাঙালি সমাজে এই হস্তশিল্প যথাযথভাবে পৌঁছতে পারলে এই সংখ্যা বাড়বে বলেই আশা করা যায়। সাথেসাথে বিদেশীদের মাঝেও এর কদর পাওয়া একেবারেই অসম্ভব কিছু নয়।

এসব পণ্য ও সেবা ছাড়াও নববর্ষ ঘিরে গৃহস্থালী আসবাব ও ইলেকট্রনিক্সের বাজারেও কিছুটা প্রভাব পড়ে। অনেকেই এসময়ে নানা অফারের সুযোগ নিয়ে আসবাব ও ইলেকট্রনিক্স কিনে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, ইত্যাদি। এর পেছনে একটি কারণ থাকতে পারে পহেলা বৈশাখের উৎসব ভাতা। ২০১৬ সাল থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা বা বোনাস পাচ্ছেন। এখন কিছু ব্যাংক সহ বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও বৈশাখী বোনাস দেওয়ার প্রথা চালু হয়েছে। প্রকাশিত এক প্রাক্কলনে, বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বৈশাখী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই এই ভাতা আসবাব বা ইলেকট্রনিক্সের মত গৃহস্থালীর বড় ব্যয়গুলো মিটিয়ে নিতে ব্যবহার করেন।

আজকাল বিনোদন খাতেও নববর্ষ বেশ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে আরম্ভ করেছে। আগে শুধুমাত্র ইদ উপলক্ষ্যে নতুন চলচ্চিত্র মুক্তির চল থাকলেও, এখন নববর্ষেও এই ধারা লক্ষ্য করা যায়। নববর্ষের ছুটিতে সিনেমা হলগুলোতে থাকে উপচেপড়া ভিড়। এছাড়াও ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতেও এসময়ে নতুন নতুন কন্টেন্ট প্রকাশ হতে দেখা যায়। পহেলা বৈশাখ ও চৈত্র সংক্রান্তিতে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে শিল্পীদের আয় উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন হতে দেখা যায় কনসার্টও। টেলিভিশনেও আয়োজন করা হয় বৈশাখের বিশেষ অনুষ্ঠান। তাতে আমন্ত্রিত হন শিল্পী, কলাকুশলী, ও সংস্কৃতিকর্মীরা। এসব অনুষ্ঠানের স্পন্সর থেকে প্রাপ্ত আয় ছাড়াও টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকাগুলোও নববর্ষে বিপুল বিজ্ঞাপন পেয়ে থাকে, যা গণমাধ্যমের আয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বিনোদনকেন্দ্রগুলোও নববর্ষে ব্যাপক দর্শনার্থী পেয়ে থাকে, ফলে তাদেরও এসময় ঘিরে আয় নেহাত কম না।

নববর্ষ ঘিরে এত লেনদেনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও আবার আয় হয় বেশ। বিশেষ করে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলোতে বৈশাখী লেনদেনের একটি বড় অংশ যায়, যাতে তাদের ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ তারা পায়। এই সার্ভিসের সহজলভ্যতা ও ব্যাপকতায় মানুষ এসময়ে বেশ কিছু অর্থ সহজেই গ্রামেও পাঠাতে পারে – যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে রক্তসঞ্চালন করে। গ্রামেগঞ্জে আয়োজিত বৈশাখী মেলা স্থানীয় অর্থনীতি ও উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব মেলা গ্রামীণ অর্থনীতিকে কৃষিভিত্তিক থেকে সেবা ও উৎপাদন কেন্দ্রীক অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। ফুলের মালা, পিঠা, চুড়ি তৈরি, ইত্যাদি সামগ্রীর বেচাকেনা গ্রামের কৃষিপ্রধান গৃহস্থালীগুলোকে কৃষির পাশাপাশি উৎপাদনমুখী হতে উৎসাহ দেয়।

বিগত কয়েকবছরে প্রযুক্তির প্রসারে বৈশাখের অর্থনীতি ছড়িয়ে গিয়েছে অনলাইন জগতেও। সময় স্বল্পতা, পরিবহন জটিলতা, ইত্যাদি নানা কারনে অনেকেই আজকাল বৈশাখের কেনাকাটার জন্য ঝুঁকছেন ই-কমার্সের দিকে। কোভিড মহামারী এই প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে ইট-কাঠের দোকানগুলোর মত অনলাইন দোকান ও ব্যবসাগুলোও বৈশাখে বেশ ব্যবসা বাগিয়ে নিচ্ছে। আবার প্রথাগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও আজকাল তাদের বৈশাখী ব্যবসার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করছে ই-কমার্সের উপর।

তবে, বেশ কিছু দুর্বলতার কারনে বৈশাখী অর্থনীতির পূর্ণ সুফল আমরা নিতে পারি না। থাইল্যান্ডের সংক্রান বা ভারতের দিওয়ালি যেমন আজ পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে বিশ্ব পরিচিতি পেয়েছে – যাতে অংশগ্রহণে সারা বিশ্ব থেকে পর্যটকেরা ছুটে আসেন । ব্র্যান্ডিং, পরিকল্পনা, অবকাঠামোর অভাব, ইত্যাদি আমাদের পহেলা বৈশাখের অর্থনীতির বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে নিরাপত্তার ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সমন্বিত ও কাঠামোগত নীতিমালার অভাব, ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অবহেলা। এছাড়াও, ২০২০ সাল থেকে বৈশ্বিক মহামারী এবং তার পরের কয়েক বছর ইদ বা রোজার সময়ে পহেলা বৈশাখ হওয়ায় বৈশাখী অর্থনীতি কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। তবে, আশা করা যাচ্ছে এবছর থেকে তা আবার আগের অর্থনৈতিক শক্তিতে ফিরতে আরম্ভ করবে।


আলী নাসিক আইমান | ঢাকা, বাংলাদেশ

সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Previous Story

শুভ হোক নবরূপা ‘পড়শী’র যাত্রা

Next Story

বাংলাদেশের শিক্ষার বর্তমান অবস্থা: কিছু ভাবনা

Latest from অর্থচিত্র