শেষ পর্যন্ত মোটামুটি একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশে। তবে দুঃখজনক হলো— এবারের সংসদেও গত তিনটি সংসদের মতো সব দলের অংশীদারত্ব নেই। দেশের অন্যতম বৃহৎ দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচন করতে না দেওয়ায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তথ্য মতে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ভোটারের মতামত এ নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়নি। কাজেই যে যাই বলুক, এ সংসদকেও প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ বলে গণ্য করা যাবে বলে মনে করেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর নানা ঘটনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়ে ড. ইউনূসের ইন্টেরিম সরকার, তাদের যাত্রা শেষ করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যতগুলো অস্থায়ী সরকার দায়িত্ব পালন করেছে—নানান নামে—তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ও অজনপ্রিয় ছিল ড. ইউনূসের ইন্টেরিম সরকার। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর এবং শেখ হাসিনা সরকারের রোষানলে পড়ার ফলে দেশে ড. ইউনূসের যে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছিল, তা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার কারণে।
১.
দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করতে না পারা, ‘মবোক্রাসি’ বন্ধ করা তো দূরের কথা—বরং শুরুতে তা উস্কে দেওয়া এবং আমেরিকার সঙ্গে গোপন ও অগ্রহণযোগ্য চুক্তি করা—ইত্যাদি কারণে একদা ‘ইউনূস সুহৃদ’ নামে সুশীলদের একটি অংশের অনেকেই তাঁর ওপর বিরাগভাজন হয়েছেন। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় গত ১৮ মাসের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলেছে বলে মনে করে দেশের অধিকাংশ মানুষ। তার আগে এক অভূতপূর্ব আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনকালের ইতি ঘটে। শেখ হাসিনাসহ সরকারের মন্ত্রী, এমপি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং দলের মধ্যম সারির নেতাকেও পর্যন্ত দেশত্যাগ করতে হয়। দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছর ধরে নানা আন্দোলন-সংগ্রামের পরেও সরকারের পতন ঘটাতে ব্যর্থ রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশ কাটিয়ে কোটা-বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলনই শেখ হাসিনার মতো দেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন সফলভাবে শাসন করা রাষ্ট্রনায়ককে বিদায় নিতে বাধ্য করে।
২.
২০০৬ সালে দেশের রাজনৈতিক দুর্যোগপূর্ণ সময়ে সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় বাংলাদেশের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। নাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলেও, সে সরকারের পেছনে সামরিক বাহিনী—বিশেষ করে সে সময়ের সেনাবাহিনী প্রধান মইনুদ্দিন—ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সে রাজনীতিহীন সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাপক ধরপাকড় করা হলেও ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের সর্বাত্মক চেষ্টা নেওয়া হয়েছিল—মূলত ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলাকে সামনে রেখে। তবে সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি, কারণ জনগণ সে প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করেনি। দুই বছর পরে সে সরকারের অধীনে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আওয়ামী লীগ ব্রুট মেজরিটি নিয়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সরকার গঠন করে। এরপরের তিনটি নির্বাচন—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—সব দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অভাবে বিতর্কিত ছিল। যদিও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করে মাত্র ৬টি আসনে জয়লাভ করেছিল।
বাংলাদেশের জনগণ ঐতিহাসিকভাবে ‘অ্যান্টি-এস্টাব্লিশমেন্ট’ মনোভাবাপন্ন। দীর্ঘদিন এক দলের ক্ষমতায় থাকা, দুর্নীতির অভিযোগ, ছাত্রসংগঠনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড—এসব কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। যদিও শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছিল। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ তাদের বেড়ে ওঠার সময় শুধু আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় দেখেছে। ফলে অন্য কোনো শাসনের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ তাদের ছিল না। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা সম্পর্কেও তাদের মধ্যে পরিষ্কার ধারণা সবসময় গড়ে ওঠেনি।
৩.
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা ছিল না—বরং তাদের অনেকেই এর বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিলেন, পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেন। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পরও তারা যুগপৎ আন্দোলন ও সরকার গঠন করেছে—যদিও এবারের নির্বাচন ব্যতিক্রম।
২৪-এর আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের ভূমিকার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে তারা এবার এককভাবেই সরকার গঠন করতে পারবে। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।
৪.
এখন প্রশ্ন—তারেক রহমান কতটা সফল হবেন? সংসদ কার্যকর হবে, নাকি আবার রাজপথ উত্তপ্ত হবে? সরকারের মেয়াদ মাত্র এক মাস হওয়ায় এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় নয়। তবে ইংরেজি প্রবাদ—‘Morning shows the day’—সেই হিসেবে বড় কোনো আশাব্যঞ্জক সূচনা এখনও দেখা যায়নি। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিও অনিশ্চিত—মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, জ্বালানি সংকট, আমদানি নির্ভরতা—এসব বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে পারে। অন্যদিকে, গত ১৮ মাসে দেশের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। অতএব, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা—এই দুইটি বড় চ্যালেঞ্জ এখন নতুন সরকারের সামনে। কিন্তু মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি নিয়ে অনেকের উদ্বেগ রয়েছে।
৫.
তবে তারেক রহমানের জন্য কিছু স্বস্তির জায়গাও আছে। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং আইনগত চাপ—এগুলো তাঁর রাজনৈতিক কৌশলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি রাজপথে অস্থিরতা ঠেকাতে বিচারিক বিষয়গুলোও সামনে আনা হতে পারে। সংসদের প্রথম অধিবেশন দেখে মনে হয়েছে—আগামী দিনে ‘আওয়ামী লীগ ঠেকাও’ ঐকমত্য ছাড়া সংসদ ও রাজপথে দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে। আমরা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির দুই মেয়াদ দেখেছি। এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় শুরু হলো। সামনে কী অপেক্ষা করছে—তা দেখার জন্যই দেশবাসী অপেক্ষায়।

কামরুল হাসান বাদল | চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ এবং কলাম লেখক, কবি, ছড়াকার, গল্পকার, টেলিভিশন উপস্থাপক ও গ্রন্থনাকারী, সাংস্কৃতিক সংগঠক।
