১৯৭২ সালের দিকে মাও সে তুং-এর একটি খ্যাত উক্তি চীনপন্থি বামপন্থিদের যেমন উদ্বুদ্ধ করেছিল, তেমনি তারা সেটির ব্যাপক প্রচারও করেছিল। দেয়াললিখনে শোভা পেত— ‘বন্দুকের নলেই সমস্ত ক্ষমতার উৎস’। ওই উক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে যে তারা গোপন সশস্ত্র বিপ্লবের পথ গ্রহণ করেছিল, সেটি নিশ্চয় বিবেচনার দাবি রাখে। পশ্চিমবঙ্গের সিপিআই(এম) এবং সিপিআই(এমএল) বিভক্তির মূলে মাও সে তুং-এর লং মার্চ ও ‘গ্রাম থেকে শহর দখল’ তত্ত্ব গ্রহণ করে নকশালবাড়ী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল। চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল, সুশীতল রায়চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে নকশালবাড়ীতে তারা সংগঠিতভাবে এলাকাটি ‘মুক্ত’ করে শ্রেণিশত্রু খতম করার সশস্ত্র পথ অবলম্বন করেছিল।
সিপিআই (এম) ও সিপিআই (এমএল) দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ফলে তারা পরস্পরের শত্রুতায় পরিণত হয়েছিল। গণ-সংগঠন লুপ্ত করে গোপন সশস্ত্র বিপ্লবের তত্ত্ব পূর্ববঙ্গের চীনপন্থি বামপন্থিদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে প্রয়াত কমরেড সত্য মৈত্র বলেছিলেন, তাঁদের পার্টির (ইপিসিপি) পক্ষ থেকে তিনি চারু মজুমদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তত্ত্বের দলিল সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। এবং গণসংগঠন বিলুপ্তির বিষয়ে তিনি মৃদু দ্বিমতও প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু চারু মজুমদার লড়াইতে সকলের একত্রিত হওয়ার ক্ষেত্রে পৃথক গণসংগঠনের বিষয়টি নাকচ করে সবাইকে এক কাতারভুক্ত করতেই গণসংগঠন বিলুপ্তিকে সঠিক বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ওই তত্ত্ব শুরুতে ইপিসিপি’র সংখ্যাগরিষ্ঠরা আগ্রহী না হলেও আব্দুল হক, আমজাদ হোসেন প্রমুখের জোরালো ভূমিকা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পরে গৃহীত হয়েছিল। সত্য মৈত্র, আব্দুল মতিনসহ অনেকেই এই তত্ত্বকে মেনে না নিলেও দলীয় শৃঙ্খলার কারণে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সত্য মৈত্র বলেছিলেন, মাও সে তুং-এর উল্লেখিত উক্তিটি কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেত। শ্রেণিশত্রু খতমের ওই ধারা বাংলাদেশে বামপন্থি আন্দোলনকে মতাদর্শিক বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়ে প্রকৃতই বাম আন্দোলনকে সর্বাধিক ক্ষতিসাধন করেছিল। মাও-এর ওই উক্তিটি খণ্ডনেও তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান পাল্টা উক্তি প্রদান করে বলেছিলেন— ‘বন্দুকের নল নয়, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস।’ তাঁর উক্তিটির ব্যাপক প্রচার করা হয়েছিল। গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থায় তাঁর উক্তিটি নিশ্চয়ই নির্ভুল ছিল—এটা মানতেই হবে।
কিন্তু বাস্তবতা অপেক্ষা করেনি; তাঁর উক্তিটিকে নাকচ করে পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টে পরিবারসহ তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। যারা সেদিন তাঁর হত্যা এবং ক্ষমতা— দুটোই দখল নিয়েছিল, সেটি বন্দুকের নলের সাহায্যেই। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান-ও বলেছিলেন— ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস।’ অথচ তাকেও প্রাণ দিতে হয়েছিল তাঁরই সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দিক-দিশাহীন জনগণ তখন প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। যেমনটি ঘটেছিল ২৫ মার্চের গণহত্যা-এর সময়। প্রস্তুতিবিহীন জনগণ সেদিন অসহায় হয়ে পড়েছিল। তবে বাঙালি সেনা, ইপিআর, পুলিশ এবং ছাত্র-জনতা যে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নিতে পেরেছিল, সেটিও অস্ত্রের সাহায্যেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধও সংঘটিত হয়েছিল সশস্ত্র পন্থায়। ভারতের সহায়তায় প্রশিক্ষণ নিয়ে অস্ত্র হাতে পাকিস্তানিদের মোকাবিলা সম্ভব হয়েছিল। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ খালি হাতে আসেনি— এসেছে আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে।
আমাদের সময়ে আমরা তিনটি গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য নিয়ে কৃতিত্বের দাবি করি— ১৯৬৯, ১৯৯০ এবং ২০২৪। জনগণের অংশগ্রহণে এগুলো সফল হয়েছে— এ ধারণা প্রচলিত। কিন্তু অন্তর্গত বাস্তবতা আরও জটিল। ১৯৬৯-এর অভ্যুত্থানে আইয়ুব খান-এর পতনের পেছনে সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রত্যাহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০-এ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর পতনেও একই ঘটনা ঘটে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানেও সেনাবাহিনীর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অর্থাৎ, বন্দুকের নলেই যে সকল ক্ষমতার উৎস— আমাদের ইতিহাসের বহু ক্ষেত্রে তা সত্য হয়েছে বললে ভুল হবে না।
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা এসেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দেশভাগের মাধ্যমে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র পরাজয়ের মাধ্যমে নয়, বরং কৌশলী ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে। পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের সংগ্রাম শেষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু একাত্তরের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাও মানুষের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই মুক্তির সংগ্রাম থেমে থাকেনি— তা চলছে এবং চলবেই— সরবে ও নীরবে।

মযহারুল ইসলাম বাবলা | ঢাকা, বাংলাদেশ
লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫টি।
