ইতিহাসের মুক্তির প্রশ্ন

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী | ২৭ মার্চ ২০২৬
April 14, 2026
32 views
12 mins read

ইতিহাসে স্তব্ধতা বলে কোনো বস্তু নেই, এমনকি স্থিতাবস্থাও নয়। হয় এগোনো, নয়তো পেছানো; অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো— যেখানে জয় থাকে, নয়তো পরাজয়। আমাদের ইতিহাস এগুচ্ছে কি? কোন ইতিহাসের কথা বলছি আমরা? ইতিহাস ব্যক্তিরও থাকে, পরিবারেরও থাকে, থাকে অনেক কিছুর। আমরা অবশ্যই ভাবছি সমষ্টিগত ইতিহাসের কথা। সেই ইতিহাস এগুচ্ছে কি? এগুচ্ছে বলেই আশা করি, নইলে তো পরিণতি হবে ভয়াবহ—আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব, পরিণত হব প্রত্নতাত্ত্বিকদের কৌতূহলে কিংবা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীতে। অনেক কিছু ঘটেছে, যেগুলো ভালো লক্ষণ।

মানুষ সচেতন হয়েছে—যেমন বিশ্ব সম্পর্কে, তেমনি নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও। তারা ভালো-মন্দ বোঝে। শিক্ষিতের হার বেড়েছে, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে। দেশের লোক বিদেশে গিয়ে নাম করেছে। অবকাঠামোতেও উন্নতি ঘটেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়ে ভালো। খাদ্যে একধরনের স্বয়ংসম্পূর্ণতাও এসেছে। কিন্তু অন্ধকারের দিকটাও আছে। সেদিকে তাকালে অগ্রগতির বিষয়ে আশাবাদ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। হতাশ মানুষের সংখ্যা কমছে— এমন বলা যায় না, বরং বাড়ছেই। ইতিহাস এগুচ্ছে ঠিকই, কিন্তু খুব ধীরে। অন্য অনেকেই যে আমাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে, সেটি অবধারিত মনে হয়। আরও ভয়ঙ্কর আশঙ্কা হলো— নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া-ফ্যাসাদ, খুনোখুনি, রক্তপাত ঘটিয়ে আমরা অগ্রগতির ধারাটিকেই স্তব্ধ করে দেব। বিদেশি হানাদারেরা যা ঘটাতে পারেনি, নিজেরাই তা ঘটিয়ে বসব।

হতাশা তৈরির পেছনে যে কারণগুলো কাজ করছে, সেগুলোর মূল বিষয়টি একটিই—দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার। প্রকৃতির জগতে এই নিয়ম কার্যকর থাকলেও মানবসমাজে তা ন্যায়সংগত নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে সেটিই চলছে অবিরত। সন্ত্রাস, ঘুষ, ছিনতাই, হয়রানি, ধর্ষণ—যে নামেই ডাকি না কেন, ঘটনা একটাই— দৈত্য মানুষের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। বিচার নেই। পুলিশ ক্রমশ এক আতঙ্কসৃষ্টিকারী বাহিনীতে পরিণত হচ্ছে। তাদের কাছে মানুষ নিরাপত্তা আশা করে না। বিচার বিভাগের ওপর আস্থা আগেও খুব বেশি ছিল না, এখন তা আরও কমেছে। দুর্বলদের তালিকাও স্পষ্ট—গরিব মানুষ, নারী, সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তা। তারা দ্বিগুণ-তিনগুণভাবে নিপীড়িত।

পীড়ন ঘটে সমাজে, আর তার পাহারাদার হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্র। এ দেশের মানুষ নিপীড়নকারী রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে ফেলার জন্য আন্দোলন করেছে। একাত্তরে হানাদার বাহিনী ও মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে বিভাজনরেখা ছিল স্পষ্ট। যুদ্ধে জনগণ জয়ী হয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে গেলেও আদর্শগতভাবে ভাঙেনি; তাই নিপীড়ন আজও চলছে। ইতিহাসের মুক্তি তাই সংশয়াচ্ছন্ন। নিরাপত্তার প্রশ্নটি একেবারেই প্রাথমিক। একাত্তরের নয় মাসে কেউই নিরাপদ ছিল না, কিন্তু তখনই ইতিহাস তৈরি হচ্ছিল। মানুষ লড়ছিল মুক্তির জন্য— যেখানে নিরাপত্তা ছিল প্রধান চাহিদা। ইতিহাসের অগ্রগতির জন্যও সেটিই প্রথম প্রয়োজন। কিন্তু এখন সর্বত্র আতঙ্ক—ঘরের দরজায়, মনের কোণে। গরিবের ভয় অনাহারের, নারীর ভয় অসম্মানের। এমনকি ধনীও নিরাপদ নয়। রাষ্ট্র যেন মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ—এ কথার প্রমাণ আমরা পেয়েছি রাষ্ট্রপতিদের হত্যার ঘটনাতেও, যার পূর্ণ বিচারও হয়নি। আতঙ্কিত মানুষ সৃষ্টিশীল হতে পারে না। বিনিয়োগ বাড়ে না, কর্মসংস্থান হয় না। ভেজাল, প্রতারণা বাড়ে। মানুষ একে অপরের প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে পড়ে। সমাজে বিচ্ছিন্নতা ও সংকীর্ণতা বাড়ে। এই অবস্থা ইতিহাসের অগ্রগতির জন্য অনুকূল নয়।

তাহলে দায় কার? আমরাই দায়ী— এ কথা আংশিক সত্য। কিন্তু তাতে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা হয় না। প্রকৃত শক্তি দুটি—সাম্রাজ্যবাদ ও শ্রেণি। সাম্রাজ্যবাদ বাইরে থেকে কাজ করে, কিন্তু ভেতরের মানুষকে ব্যবহার করে। শ্রেণিবিভাজন সমাজকে বিভক্ত করে রাখে। রাষ্ট্র বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু শ্রেণিবিভাজন ভাঙে না। উপরতলা শক্তিশালী থাকে, নিচের তলার ওপর নিপীড়ন চালায়। এই ব্যবস্থার পেছনে পুঁজিবাদ কাজ করে— অর্থনৈতিক ও আদর্শিক দুই দিক থেকেই। দেশের মানুষ বহুবার আন্দোলন করেছে— তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু শাসক বদল নয়, ব্যবস্থার পরিবর্তন। কিন্তু শ্রেণিব্যবস্থা ভাঙেনি, বরং ঐক্য ভেঙে গেছে। কেন? সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী স্বার্থে। শাসকশ্রেণি চায় না এই বিভাজন ভাঙুক। ফলে আন্দোলনগুলো বিভ্রান্ত হয়, লক্ষ্যচ্যুত হয়।

১৯৪৫-৪৬ সালে বাংলার জনগণ প্রায় বিপ্লবী পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দিয়ে সেই ঐক্য ভেঙে দেওয়া হয়। ফলাফল— ভাগ হয়ে যায় অবিভক্ত বাংলা।


সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী | ঢাকা, বাংলাদেশ

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষক ও লেখক।

প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১২০ টি। সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

লীগের ভোট ও ভবিষ্যৎ

Next Story

নির্বাচন-পরবর্তী জনমত: আশা, সংশয় ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

Latest from মূল রচনাবলী

চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল-এর সাথে পড়শীর একান্ত সাক্ষাৎকার

তানভীর মোকাম্মেল কাহিনী ও প্রামাণ্যচিত্র মিলিয়ে মোট চব্বিশটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তানভীর ... সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ড. জাকিয়া আফরিন।

রূপালী পর্দার বিবর্তন

লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় প্যারিসে বাণিজ্যিকভাবে বায়োস্কোপ প্রদর্শনী শুরু করেন ১৮৯৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বর। ... লিখেছেন কুবলেশ্বর ত্রিপুরা।

উচিৎ সাজা

এই শহরে এক সিনেমা হল ছিলো প্রায় ২০টির মতো। ভাঙাভাঙির পর আজ এসে দাঁড়িয়েছে একটিতে। ... লিখেছেন অনোয়ার হোসেন পিন্টু।

শতবর্ষে পুডভকিনের ‘মাদার’

চলচ্চিত্রের প্রথম তিন দশকে এমন কিছু কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল, যেগুলো সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের মর্যাদা পেয়ে গেছে। ... লিখেছেন শৈবাল চৌধুরী।