ফুটবল ছিল আমার আর আমার বাবার মধ্যে মূলবন্ধনের সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে অপূর্ব অথচ সবচেয়ে আন্তরিক উপায়। এবং সেই ফুটবলের মধ্যেও একটু বেশি আপন ছিল বিশ্বকাপ। আজও যখন আমি চোখ বুজি, তখন আমার শৈশবের যে স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে, তার মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠে ইতালিয়া ১৯৯০।
তখন আমি খুব ছোট—মাত্র দশ বছর বয়স, সবে মাত্র শৈশবের গড়ি পাড় করছি। বেশিরভাগ খেলাগুলোই হতো গভীর রাতে। ঘুমে ঢুলে পড়া চোখ, কিন্তু তবুও প্রাণপণ চেষ্টা করতাম জেগে থাকার। বাবার পাশে বসে, তার উষ্ণতায় নিজেকে জড়িয়ে রেখে, আমি দেখছি সেই দূর দেশের খেলা— যেখানে মাঠে দৌড়াচ্ছে অপরিচিত বাইশটা মুখ, অথচ তাদের নিয়ে বাবার উত্তেজনা আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে অপূর্ব এক আবেগে।
সেই সময়টা আমার জীবনের এক মধুর মুহূর্ত ছিল। কারণ, সেই প্রথম আমি অনুধাবন করতে পারছিলাম যে আমি আর বাবা, আমরা দুজন একসাথে কিছু অনুভব করছি, কিছু ভাগ করে নিচ্ছি। এতদিন যিনি আমার কাছে শুধু একজন কঠোর, দায়িত্বশীল অভিভাবক ছিলেন, হঠাৎ করেই তিনি যেন হয়ে উঠলেন একজন সঙ্গী, একজন সতীর্থ, এমনকি বন্ধুও। ফুটবল আমাদের মধ্যে এমন এক ভাষা তৈরি করেছিল, যেখানে কোনো বাক্যেরও প্রয়োজন হতো না অনেক ক্ষেত্রে, শুধু দৃষ্টির বিনিময়েই বোঝা যেত আবেগ, উত্তেজনা, হতাশা আর আনন্দ।
তারপর থেকে খেলাধুলাই যেন হয়ে উঠল আমাদের সম্পর্কের মূল ভিত্তিগুলোর অন্যতম। ফুটবল ছিল প্রধান, কিন্তু সেটাই একমাত্র ছিল না। ২০০১ সালের শেষ দিকে আমি যখন ইউরোপে চলে যাই উচ্চ শিক্ষার জন্য, তার আগ পর্যন্ত আমাদের বাড়ির টেলিভিশন যেন এক অবিরাম ক্রীড়া উৎসবের জানালা হয়ে ছিল বাপ-ব্যাটার জন্য। কখনো ESPN, কখনো Star Sports—চ্যানেল বা খেলা বদলালেও আমাদের উৎসাহ কখনো বদলায়নি। ফুটবল বিশ্বকাপ, ফুটবল ইউরো, প্রিমিয়ার লিগ, ক্রিকেট বিশ্বকাপ, অ্যাশেজ, উইম্বলডন, এমনকি মাঝে মাঝে বাস্কেটবল বা আমেরিকান ফুটবল, কোনো কিছুই বাদ যেত না। যেন পৃথিবীর প্রতিটি খেলার সাথে আমাদের একটা অদৃশ্য সংযোগ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
মজার ব্যাপার হলো, আমরা বলতে গেলে কখনই একই দলকে সমর্থন করতাম না। ব্যতিক্রম ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল— সেখানে আমাদের হৃদয় এক হয়ে যেত। আর টেনিসে আমাদের দুজনেরই এক ভালোবাসা ছিল পিট সাম্প্রাসের প্রতি। কিন্তু বাকিটা? পুরোপুরি ভিন্ন। বাবা ছিলেন এক নিষ্ঠ ইংল্যান্ড সমর্থক—ফুটবল হোক বা ক্রিকেট, ইংল্যান্ডই তার প্রাণ। আর আমার কাছে ইংল্যান্ড ছিল যেন এক চিরশত্রু। আমি ফুটবলে সমর্থন করতাম ইতালিকে, আর ক্রিকেটে (বাংলাদেশ বাদে) দক্ষিণ আফ্রিকাকে।
ক্লাব ফুটবলেও আমাদের এই বিভাজন স্পষ্ট ছিল। বাবা সত্তরের দশকের শেষ দিকে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে মার্চ করতে গিয়েছিলেন, তখন থেকেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং সাউদাম্পটনের প্রতি তার একটা দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল। আর আমি? আমি ছিলাম একেবারে হৃদয় দিয়ে আর্সেনালের সমর্থক—একজন নিখাদ, অভক্ত।
এই ভিন্নতা থেকেই জন্ম নিত অসংখ্য তর্ক, ঠাট্টা, খুনসুটি। আমরা একসাথে খেলা দেখতাম, একে অপরকে খোঁচা দিতাম, কখনো কখনো উত্তেজনা এতটাই বেড়ে যেত যে তা প্রায় ঝগড়ার পর্যায়ে চলে যেত। কিন্তু এর মধ্যেও ছিল এক অপূর্ব, গভীর বন্ধন। এইসব মুহূর্তই আমাদের সম্পর্ককে আরো গাঢ় করে তুলছিল, নিয়ে যাচ্ছিল আরেক গভীরতায়।
আমার জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ স্মৃতিগুলোর একটা হলো ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের সেই অবিশ্বাস্য ম্যাচ—আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। আমরা দুজন একসাথে বসে সেই খেলা দেখছিলাম। মাইকেল ওয়েনের সেই একক গোল—আজও আমি ভুলতে পারি না বাবার প্রতিক্রিয়া। তিনি যেন মুহূর্তের মধ্যে আবার হয়ে উঠেছিলেন বছর কুড়ির এক তরুণ, যেন প্রথম প্রেমে পড়া এক কিশোরের মতো উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন। তার চোখে সেই আনন্দ, সেই বিস্ময়— সেটা আমার মনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে মনে হয় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তা কখনো মুছে যাবে না। অবশ্য ইংল্যান্ড যখন শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে গেল, তখন তার মুখের হতাশাও দেখার মতো ছিল। অথবা ২০০২ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে যখন ইংলিশ গোলরক্ষক ডেভিড সিম্যান রোনালদিনহোর সেই অবিশ্বাস্য শটটি ঠেকাতে ব্যর্থ হলেন—বাবার মুখের অভিব্যক্তি ছিল একেবারে অবর্ণনীয়। সেই মুহূর্তগুলো আমাদের সম্পর্কের এক অদৃশ্য অ্যালবামে চিরায়ত হয়ে আছে।
২০০২ সালের বিশ্বকাপই ছিল শেষ টুর্নামেন্ট, যেটা আমরা পুরোপুরি একসাথে বসে দেখেছিলাম। এরপর আর কখনো এমনটা হয়নি যে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে আমরা একই জায়গায় ছিলাম— হোক সেটা বাংলাদেশে, বা আমেরিকায়। সময়ের সাথে সাথে জীবন বদলাতে শুরু করল। দায়িত্ব বাড়ল, ব্যস্ততা বাড়ল, আর অজান্তেই আমাদের একসাথে খেলা দেখা কমে যেতে লাগল।
সত্যি বলতে, এর একটা বড় দায় আমার নিজের উপরই বর্তায়। বড় হওয়ার সাথে সাথে আমি যেন একটু একটু করে বাবার কাছ থেকে দূরে সরে গেলাম। হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়, কিন্তু তবুও সেই দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আর সেই দূরত্বের ফাঁক গলে হারিয়ে গিয়েছিল আমাদের সেই পুরনো অভ্যাস—একসাথে বসে খেলা দেখা, একসাথে হাসা, তর্ক করা, আবার শেষে সব ভুলে যাওয়া।
এখন যখনই কোনো ক্রীড়া অনুষ্ঠান সামনে আসে, তখন আমার ভেতরে এক প্রকার বিষণ্ণতা আর অনুশোচনা কাজ করে। গত চব্বিশ বছরে কত সুযোগ হারিয়েছি! এবারও জুন মাসে ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জানি এবার একসাথে দেখার সুযোগ মিলবে কিনা, নাকি ভৌগোলিক রাজনীতির জটিলতায় আবারও আমরা মাইলের পর মাইল দূরে বসে খেলা দেখব— নিজ নিজ জীবনের ব্যস্ততায় ডুবে থেকে। এবার মা-ও নেই, কতটা একাকিত্বের সাথে বাবা এমনিতেই জীবনযাপন করছেন…
তাই এবার, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি করে, আমার মনে হয় ইশ, যদি আবার সেই দিনগুলো ফিরে পেতাম! যদি আবার বাবার সাথে সেই পুরনো দিনের মতো পুরো বিশ্বকাপ দেখতে পারতাম! সেই অনুভূতি, সেটা আবার একবার ছুঁয়ে দেখতে চাই।
কে জানে? জীবন কখন কোন সুযোগ এনে দেয়, তা তো আমরা আগে থেকে বুঝতে পারি না। কিন্তু এই আশাটুকু, এই টুকু বেঁচে থাকুক জুন পর্যন্ত। কারণ কিছু সম্পর্কের গভীরতা ভাষায় বোঝানো যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। আর আমার আর আমার বাবার সম্পর্কের সেই গভীরতাকে ফুটবল বললে খুব ভুল বলা হবে কি?

ইয়ামেন হক | পোর্টল্যান্ড, ওরেগন, যুক্তরাষ্ট্র
পুরকৌশল প্রকৌশলী। বর্তমানে ইউএস আর্মি কোর অফ ইঞ্জিনিয়ার্সে চাকরিরত।
