২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় পরিবর্তন আসে। অভ্যুত্থানের পর দেশের একমাত্র নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে অনেকের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়। প্রত্যাশা ছিল, তিনি রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করবেন এবং দেশকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাবেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রত্যাশার বড় অংশই প্রশ্নের মুখে পড়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ কমানোর পরিবর্তে আরও বাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, দুর্নীতি এবং আন্দোলন দমনে কঠোরতার মতো গুরুতর অভিযোগ আছে, যেগুলোর সত্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এসব অভিযোগের কারণেই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি হয়েছিল, তবে একই সঙ্গে এটাও বাস্তবতা যে আওয়ামী লীগের এখনও উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন রয়েছে। দেশের একটি বড় অংশ, হয়তো প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভোটার, এখনও দলটিকে সমর্থন করে। নির্বাহী আদেশে এতো বড় জনসমর্থন থাকা একটি দলকে নিষিদ্ধ করা কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে লংঘন করর সামিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিভিন্ন স্থানে মবের তৎপরতা, বিচারবহির্ভূত সামাজিক চাপ এবং ছাত্রনেতাদের অতিরিক্ত প্রভাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্ররা দেশের পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, তাদের একটি অংশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার কোনো লক্ষণ আমরা দেখিনি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পুনর্মিলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দেখা যায় স্বাধীনতার পর। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবর রহমান যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্তদের বাদ রেখে বহু মানুষকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় এনেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় পুনর্গঠনের পথ প্রশস্ত করা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ব্যাপকহারে মামলা দায়েরের প্রবণতা দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের সমর্থক বা কর্মী হিসেবে পরিচিত অনেকেই নিজেদেরকে সন্দেহ ও শাস্তির সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বলে মনে করেছেন। ব্যক্তিগত অপরাধ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য না করে যদি পুরো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়, তাহলে তা জাতীয় বিভাজন আরও গভীর করতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে সত্য উদ্ঘাটন ও জাতীয় পুনর্মিলনের (Truth and Reconciliation) একটি প্রক্রিয়া বিবেচনা করা হলে, যেখানে অপরাধের বিচার যেমন হতো, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে সত্য প্রকাশ, স্বীকারোক্তি ও সামাজিক পুনর্মিলনের সুযোগও থাকত, তাহলে হয়তো জাতির মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস ও বিভক্তি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো।
পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকা দলটি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি, প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা তো বটেই, এর উপর যুক্ত হয়েছে একটি গভীরভাবে বিভক্ত জাতিকে পুনরায় এক সুতোয় গাঁথা।
বিএনপি ইউনুস আমলের দেওয়া আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে গেলে ভয়ানক রাজনৈতিক সমস্যাতে পড়তে হবে তাদের। আওয়ামী লীগের সমর্থক, বিএনপির সমর্থক, অভ্যুত্থানের পক্ষের তরুণ প্রজন্ম এবং নিরপেক্ষ নাগরিক— সবার মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আন্দোলন আর অসন্তোষ তৈরি হলে সেটা দেশে অনেক সহিংস ঘটনার জন্ম দিতে পারে।
প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সবার জন্য সমান রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাই হতে পারে জাতীয় পুনর্মিলনের পথ। বাংলাদেশের ইতিহাস দেখিয়েছে যে কোনো দল একা জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে না। বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন সফল হয়েছে যখন সব কয়টি বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। দুঃখের বিষয় সেই জাতীয় ঐক্য আন্দোলনের পরে ধরে রাখা সম্ভব হয় নি। ২০২৪ এর আন্দোলনটি ছিল দেশের প্রধানতম দলগুলোর একসঙ্গে একটি দলের বিরুদ্ধে, আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে তাদের নাম নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। গণতন্ত্রের জন্য এটা কোনো সুখের সংবাদ নয়। বিএনপি ও তার নেতৃত্ব যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে, শত্রু হিসেবে না দেখে; যদি তারা আইন ও প্রতিষ্ঠানের শক্তিকে ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়; তাহলে বিভক্ত বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
সেই সদ্দিচ্ছা, প্রজ্ঞা বা রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কি বিএনপি দেখাতে পারবে?
৮ মে, ২০২৬

তাসনীম হোসেন | অস্টিন, টেক্সাস
কম্পিউটার প্রকৌশলীর, কাজ করছেন আইবিএম কর্পোরেশনে। লেখালেখি মূলত বাংলা ব্লগ সচলায়তনে।
