পড়শী মূল রচনাবলী অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল – “আমরা আছি তোমাদের পাশে”

অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল – “আমরা আছি তোমাদের পাশে”

Post Views: 146

পোর্টল্যান্ড— একটি শহর, যেখানে নরম সুরে নেমে আসা বৃষ্টি, আর পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা মৃদু কুয়াশা প্রতিদিন নতুন করে লিখে যায় জীবনের কবিতা। এই শহরের বুকেই গড়ে উঠেছে এক ছোট্ট বাংলাদেশী কমিউনিটি— সংখ্যায় কম, কিন্তু হৃদয়ে সমুদ্রের মতো গভীর। কয়েক দশক আগে, যখন তারা নতুন দেশে নিজেদের জীবন সাজাচ্ছিল, তখনই জন্মভূমির স্মৃতি, নদীর গন্ধ, মানুষের সংগ্রাম, আর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো তাদের অনুপ্রানিত করে কিছু একটা করার জন্য। এই কিছু একটা করার অনুপ্রেরনাই একদিন অঙ্কুরিত হয়— অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল (Ankur International)।

অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল এর তহবিল সংগ্রহের নীতি হোল “বড় কর্পোরেট অনুদান নয়—বরং কমিউনিটির ছোট ছোট অবদানই এর প্রাণ”। কেউ মাসে কয়েক ডলার দেয়, কেউ বার্ষিক ফান্ডরেইজারের সন্ধ্যায় অংশ গ্রহন করে, কেউ আবার সময় দিয়ে কাজ করে। এই ক্ষুদ্র অবদানগুলো একসময় নদীর মতো মিলেমিশে তৈরি করে একটি মানবিক স্রোত—যা পরে রূপ নেয় প্রকল্পে, মানুষের জীবনে, নতুন শ্বাসে। আজ এই ছোট্ট কমিউনিটির ভালবাসা এবং আপানাদের মত সারা বিশ্বের মানুষের ভালবাসায় ও সমর্থনে অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল এর বার্ষিক তহবিল দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে! বাংলাদেশ ছাড়াও অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল গাজায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং এতিম শিশুদের সহায়তায় কাজ করছে। গাজা সহায়তার বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১,০০,০০০ মার্কিন ডলার।

এই স্রোতের প্রথম ঢেউ পৌঁছে যায় চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা মানুষের কাছে। প্রতি বছর প্রায় শতাধিক মানুষ ক্যান্সার, কিডনি, লিভার, হৃদ রোগ ও চোখের রোগে আক্রান্ত মৃত্যু পথ যাত্রী মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় জরুরী চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় ব্যয় এর সহায়তা পেয়ে নুতন জীবনের আশা দেখে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় হাজারের অধিক মানুষ এই আশার আলোর স্পর্শ পেয়েছে। কোনো শিশুর জন্মগত রোগের চিকিৎসা, কোনো মায়ের জরুরি অস্ত্রোপচার—এসব গল্প যেন রাতের আকাশে জ্বলে ওঠা প্রদীপের মতো। আর যারা একদিন চিকিৎসকের সাদা কোট পরে মানুষের জীবন বাঁচাবে— সেই মেডিকেল ও নার্সিং শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য বৃত্তি প্রকল্প পরবর্তী প্রজন্মে সেবা প্রদানের ধারাবাহিকতার প্রেরণা।

অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল

শিক্ষার ক্ষেত্রেও এই আলো ছড়িয়ে পড়েছে দূরদূরান্তে। প্রতি বছর প্রায় আশি জনের অধিক দরিদ্র শিক্ষার্থী অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল এর Undergraduate Scholarship পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত হাজারের অধিক শিক্ষার্থী এই সুযোগ গ্রহণ করেছে— যারা অন্যথায় হয়তো প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিত। আর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (অটিস্টিক) শিশুদের জন্য— যারা প্রতিদিন পৃথিবীকে একটু ভিন্নভাবে দেখে— আঙ্কুর তৈরি করেছে টাচপ্যাড ভিত্তিক শিক্ষণ ডিভাইস, BUET ও MIST এর মেধাবী শিক্ষার্থীদের সাথে যৌথভাবে। স্কলাস্টিকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সাথে যৌথভাবে প্রতিবছর সামার ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ২০ জন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যেখানে অটিস্টিক শিশুদের সাথে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

কমিউনিটি উন্নয়নের চেষ্টাও কম নয়। অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল একাধিক অনাথাশ্রম “নীলিমায়”, “শামন্তা” “পালগের চর”-এ প্রতি বছর পূর্ণ সহায়তা দেয়। বাংলাদেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলের প্রায় পয়ত্রিশটি গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী— প্রতি বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সহায়তা পায়। এই সহায়তাগুলো শুধু প্রকল্প নয়—এগুলো মানুষের জীবনে ফিরে পাওয়া মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং আশার গল্প। এ ছাড়া এক শত-এরও বেশি মেধাবী কিন্তু সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিকে আউটসোর্সিং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ল্যাপটপ প্রদান করা হয়েছে, তারা আজ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করেছে। এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজারেরও বেশি গৃহহীন পরিবারের জন্য স্বল্প ব্যয় এর ঘর নির্মাণ করেছে অঙ্কুর। Tube well, sanitation, women’s training— শতাধিক কমিউনিটি প্রকল্প বদলে দিয়েছে হাজারো মানুষের জীবন।

অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল

আর যখন দুর্যোগ আঘাত হানে— ঝড়, বন্যা, শীতপ্রবাহ— তখন আঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল এর ত্রাণ কার্যক্রম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এ পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ বন্যা ত্রাণ পায়, প্রায় একই সংখ্যক মানুষ শীতবস্ত্র পায়। অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল প্রতি বছর রমজান মাসে বাংলাদেশের দুস্থ পরিবার এর পাশে দাড়ায় প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা নিয়ে। এ ছাড়া গত কয়েক বছর যাবত অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল দুস্থ গাজাবাসিদের পাশে আছে। অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল বিগত বছর গুলোতে বাংলাদেশ ও গাজাতে কোরবানির আয়োজন করে এবং কোরবানির মাংস দুস্থ পরিবারের মাঝে বিতরণ করে। প্রায় দশ হাজারেরও বেশী প্রিবার উপকৃত হ্য় এই প্রকল্পের মাধ্যমে।

একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে তাদের দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় তহবিল ব্যবস্থাপনা, প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যয়ের স্বচ্ছতা— এ সবকিছুই নিয়মিতভাবে অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল তাদের বার্ষিক ফান্ড রেইজিং অনুষ্ঠানে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করে। বার্ষিক প্রতিবেদন, আর্থিক বিবরণী, প্রকল্পভিত্তিক আপডেট—এসবের মাধ্যমে তারা দাতাদের জানায়: “আপনার অবদান কোথায় গেল, কীভাবে গেল, এবং কাদের জীবনে আলো জ্বালালো।” এই স্বচ্ছতা শুধু বিশ্বাসযোগ্যতা নয়— এটি তাদের নৈতিক অবস্থানের ভিত্তি।
পোর্টল্যান্ডের দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি আমেরিকান তরুণ- তরুণীরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছে, ফান্ডরেইজার পরিচালনা করছে, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে, এবং মানবিক কাজকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করছে। তাদের অংশগ্রহণ যেন নতুন প্রজন্মের একটি জলন্ত উদাহরণ, “মানবিকতা উত্তরাধিকার হতে পারে।”
হাজার গল্পের মাঝে একটি ছোট্ট গল্প – ঝিনাইদহের এক ছোট্ট গ্রামে আয়েশা নামের একটি মেয়ে স্বপ্ন দেখত স্কুলে যাওয়ার। কিন্তু দারিদ্র্য তার সেই স্বপ্নকে আটকে রেখেছিল। দিনমজুর বাবার পক্ষে সংসার চালানোই ছিল কঠিন। অসুস্থতা এলে চিকিৎসা ছিল কল্পনারও বাইরে।ঠিক তখনই আপনাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে আঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল। একটি কমিউনিটি স্কুল খুলে যায়—আয়েশার শিক্ষার পথ শুরু হয়। অঙ্কুর ভিলেজ হাসপাতাল তার মায়ের জীবন রক্ষা করে। স্বনির্ভরতা কর্মসূচি থেকে তার মা পান সেলাই মেশিন ও প্রশিক্ষণ, আয়েশা পায় শিক্ষা বৃত্তি। আজ আয়েশা নিয়মিত স্কুলে যায়। তার মা নিজের উপার্জনে গর্বিত। তাদের পরিবারে ফিরে এসেছে সম্মান ও আশার আলো।

অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল

শেষ পর্যন্ত, অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনালএর গল্পটি একটি সেতুর গল্প—যে সেতু পোর্টল্যান্ডের আলোকে পৌঁছে দেয় বাংলাদেশ ও গাজা অথবা আফ্রিকা কিংবা আফগানিস্তান এর মতো দূরদেশের অগণিত দুস্থ মানুষের কাছে। এটি সেই অদৃশ্য সংযোগের গল্প, যা বলে: “মানবিকতা হলো সেই আলো, যা দূরত্বকে অতিক্রম করে দুই প্রান্তের হৃদয়কে এক সুরে বাঁধে।” আর সেই সুরেই প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার সুযোগ পায় অসংখ্য মানুষ। তাই অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল যখনি কোন দুস্থ জীবনের খবর পায়, নির্দ্বিধায় বলে উঠে “ আমরা আছি তোমাদের পাশে”।

অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল এর প্রেসিডেন্ট ডঃ শায়েস্তাগীর চৌধুরী এবং পোর্টল্যান্ড বাংলাদেশী কমুনিটির অক্লান্ত প্রচেষ্টা একটু খানি মুখের হাসি ফুটিয়ে তুলুক অসহায় ও দুস্থ মানুষের মাঝে।


পোর্টল্যান্ড, ওরেগান, যুক্তরাষ্ট্র

পোর্টল্যান্ড বাসী ও স্বেচ্ছাসেবক কর্মী।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।