পড়শী ভ্রমণ ও রোমন্থন উন্মোচন করা হলো না বালির পাহাড়

উন্মোচন করা হলো না বালির পাহাড়

Post Views: 8

(শেষ পর্ব – ৩ পর্বে বিভক্ত)

পরদিন ১৫ ডিসেম্বর। বিকাল তিনটায় কনসাল জেনারেলের অফিস প্রাঙ্গণে গতবারের একই স্থানে বইমেলা ও বিজয় উৎসবের উদ্বোধন ও প্রথম দিনের অনুষ্ঠান। গত বইমেলায় পুরো তিন দিনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছি, সঙ্গে ছিল আবৃত্তিশিল্পী ড. শাহাদাত হোসেন নিপু এবং মমতাজ আইয়ুব। এবার আমাকে একাই করতে হবে। এছাড়া আলোচনা, কবিতা পাঠ কিম্বা কোনো সেশনে সভাপতিত্বও করতে হবে। যাহোক, বিকাল তিনটায় উৎসব শুরু হবে, আমরা নাস্তা সেরে সকাল দশটায় বেরিয়ে গেলাম দুবাইয়ের দেইরাতে। দুবাই শহরের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ জেলা তারা বলেন। এর পাশেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রিক, সারজা ও আল আউইর সীমান্ত। এখানে দুবাইয়ের সবচেয়ে দামী আধুনিক বাড়িগুলো গড়ে উঠছে। গাড়ির ড্রাইভারই আমাদের গাইড। যাবার পথে সে একটি জায়গায় নাস্তা করার জন্য গাড়ি থামাল এবং বলল, স্যার এটি বাঙালি রেস্টোরেন্ট, নামুন আপনারা চা খান, আমি নাস্তা সারি। নামলাম, দারুণ একটা কফি খেলাম, সে বলল, বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা এই রেস্টোরেন্টে এসে খায় এবং আশেপাশে অনেক বাংলাদেশি বাঙালি থাকে। তারপর নিয়ে গেল, সমুদ্র সংলগ্ন একটি জায়গায়। পাড়ে দাঁড়িয়ে ও আমাদেরকে দেখালো, সমুদ্রের ভিতর পাথর ফেলে একটি সমুদ্র শাসিত অত্যাধুনিক শহর গড়ে তুলছে আমিরাত সরকার, দেখলাম কাজ চলছে এবং বেশ কিছু জায়গা ভরাট করা হয়েছে। কড়া রোদ তাই, ওখান থেকে ঢুকলাম একটি মাছের বাজারে। মাছের বাজার বলতে আমাদের কাচা বাজার নয়। পাশেই একটি বিশাল শপিং মল, এর তৃতীয় তলায় মাছের আড়ত বলে মনে হবে কিন্তু না? নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের বিশাল বড় বাজার, চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না। দেখছি আর বিস্ময় খেলা করছে, এমনও হতে পারে? অনেক মাছ আগে কখনই দেখিনি? ঘুরে ঘুরে দেখলাম আর ভিডিও করলাম। বেড়ানোর এই ভিন্নমাত্রিক অভিজ্ঞতা। এরপর ফিরে এলাম হোটেলে এবং গোছল সেরে, খাওয়া-দাওয়া করে হাজির হলাম কনসাল জেনারেলের অফিস প্রাঙ্গণে তিন দিনের উৎসবে অংশ নিতে।

বিকেল ৩টার দিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, আমার উপস্থাপনায় শুরু হলো ঘন্টা খানেক পর বিকেল চারটায়। কারণ আবুধাবী থেকে রাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, যিনি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, তিনি জরুরী কাজ থাকায় আসতে পারলেন না। যাহোক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম উদ্বোধনী করলেন। এরপর এক এক করে শুরু হলো বিভিন্ন সেশন, গান, নাচ ও আলোচনা। গতবারও দেখেছি, কনসাল জেনারেল কবি জামাল হোসেন অত্যন্ত সুন্দর পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও সুদক্ষতায় তিন দিনের উৎসব পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, এবারও প্রথম দিনের অনুষ্ঠানটি দারুণ হলো। আগেও বলেছি, দুবাইয়ে প্রায় ১২ লক্ষ বাংলাদেশি থাকে এবং এই বইমেলায় এদের মধ্য থেকে অসংখ্য জন আসেন, বাংলা বইয়ের স্টলগুলো ঘুরে দেখতে, বাংলা গান, বাংলা বই নিয়ে নানা পর্ব এবং প্রঙ্গণ ঘিরে বসা চটপটি থেকে শুরু করে নানান ধরনের বাঙালি খাবার-দাবার আর হস্তশিল্পের নানা পশরা কেনাকাটা করতে। অনুষ্ঠান চলে রাত গভীর পর্যন্ত, যদিও আমিরাত সরকার অনুষ্ঠান করার সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছে রাত দশটা পর্যন্ত। দেখা গেল বিভিন্ন সেশনগুলো দর্শক কম থাকলেও সবশেষে গানের পর্বে দর্শক পরিপূর্ণ থাকে, বোঝা যায় নদীর দেশের মানুষ গান পছন্দ করে।

2026.07 13 01 01
আমি (শিহাব শাহরিয়ার), মমতাজ ও নিপু- তিনজন পালাক্রমে তিনদিনের উৎসব উপস্থাপনা করেছি

অনুষ্ঠান শেষে রাতের খাবার খেয়ে আমরা অর্থাৎ স্বস্ত্রীক আমি, কবি সজল আহমেদ, সংগীত শিল্পী তামান্না হক এবং কবি মেহেদি হাসান। আপনারা জানেন সারাদিন, সারারাত জেগে থাকে দুবাই শহর। আগের বারও অনুষ্ঠান শেষ করেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছি রাতের দুবাই দর্শনে। বলে রাখি, ২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিলাম কবি কামাল চৌধুরী, কবি তারিক সুজাত, আবৃত্তিশিল্পী শাহদাৎ হোসেন নিপু, কবি সাদাত হোসাইন, প্রকাশক ও কথাসাহিত্যিক মাজহারুল ইসলাম, কবি ও প্রকাশক সজল আহমেদ, লন্ডন থেকে সংগঠক গোলাম মোস্তফাসহ ঢাকা ও কলকাতা এবং আসাম থেকে অনেক লেখক। সবাই উঠেছিলাম একই হোটলেই। যাইহোক আমরা অনুষ্ঠান শেষ করে খাওয়া-দাওয়া করে বেরিয়ে পড়লাম পৃথিবীর বিখ্যাত শপিংমল দুবাই মলের দিকে যাচ্ছি। আমি গতবার গিয়েছিলাম নীপুসহ। আমার স্ত্রী প্রথম বারের দুবাই মল দেখতে যাচ্ছে, বাকি মেহেদি এখানেই থাকে, সজল ও তামান্না বহু বার দুবাই এসেছে এবং মল দেখেছে। পর্যটকসহ দুবাই যারাই বেড়াতে আসেন, তারাই এখানে আসেই, কারণ মলের সামনেই রয়েছে দুবাইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থাপনা বুর্জখলিফা। আমরা যখন মলের কাছে পৌঁছালাম তখন রাত অনেক, মল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোনো রকম দু’তলা পর্যন্ত উঠতে পারলাম। কিছু ছবি তোলা ও মলের চেহারাটা দেখে বেরিয়ে এলাম এবং মুখোমুখি হলাম বুর্জখলিফার। এর আগের বছর আমরা এসেছিলাম দিনের বেলা, আজ এলাম রাতের বেলা, তাই রাতের লাইটসজ্জিত বুর্জখলিফাও দেখতে অন্যরকম লাগছে। আইফেল টাওয়ার, কেএল টাওয়ার, সিএন টাওয়ারে উঠার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু বুর্জখলিফায় উঠার সুযোগ হলো না। অনেকক্ষণ ঐ চত্বরে ঘোরাফেরা ও ছবি তুলে ফিরে এলাম হোটেলে।

পরদিন ১৬ ডিসেম্বর। বইমেলা ও বিজয় উৎসবের দ্বিতীয় দিন। আগেই বলেছি আমরা যে হোটেলে উঠেছি, সেটির মালিক বাংলাদেশি, তাই বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে নিচের লবিতে বেশ বড় একটি কেক রেখেছি, সেটি কাটার জন্য আমাকে প্রধান অতিথি হিসেবে হোটেল কর্তৃপক্ষকে বলে রেখেছেন কনসাল জেনারেল কবি জামাল হোসেন। রুম থেকে নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তারা আমাকে কেক কাটার স্থলে নিয়ে গেলেন। আমার সঙ্গে ছিলো আমার স্ত্রী ও কবি সজল আহমেদ এবং সংগীতশিল্পী তামান্না হক। তারা বললেন, স্যার কেক কাটার আগে বাংলাদেশের বিজয় দিবস সম্পর্কে কিছু বলতে হবে। ভালই লাগল, ১৯৭১ সাল, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ, এই বিষয়ে চারা-পাঁচ মিনিটের একটা বক্তৃতা দিলাম। হাততালি পড়ল, কিন্তু আমি জানতাম ওদের একজন কর্মকর্তা একজন পাকিস্তানি ছিলেন, যেহেতু একাত্তর সালে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমরা যুদ্ধ করে জিতেছি, তাই সে কথাগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে বলেছি। হঠাৎ দেখি সামনের অনেকের মুখ একটু ম্লান, একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, আমার পাশে দাঁড়ানো দাড়িওয়ালা ভদ্রলোককে দেখিয়ে কানে কানে জানাল, স্যার আপনার পাশের উনি পাকিস্তানি। আমি তৎক্ষণাৎ তাকে বললাম, আমি কি সত্য বলেছি, তিনি বললেন, ইয়েস স্যার। যাক কেক কাটা ও খাওয়া হয়ে গেলে আমরা বেরিয়ে গেলাম। আগেই বলেছি সকালটা বেড়ানো, বিকেল ও সন্ধ্যা উৎসবে অংশগ্রহণ। আমরা বেড়াতে যাবো দুবাইয়ের আকর্ষণীয় স্থানের অন্যতম মিরাকেল গার্ডেনে। আমি গত বছর বন্ধু শাহাদাৎ হোসেন নিপুকে নিয়ে ওখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু আজও দ্বিতীয় বার যাচ্ছি, কারণ আমার স্ত্রী, প্রফেসর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শিল্পী তামান্না হক, এরা আগে যাননি, সুতরাং হোটেল থেকে বের হয়ে গার্ডেনের দিকে রওয়ানা করলাম।

হাইওয়ে ধরে আমাদে গাড়ি চলছে, সামনে, দুই পাশের বিউটিফুল দুবাইকে দেখছি। আপনারা জানেন, দুবাই এখন পৃথিবীর মধ্যস্থলে বিশ্ব বাণিজ্যকেন্দ্র, গড়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত আধুনিক শহর হিসেবে। চমৎকার সড়ক পথ, নান্দনিক ফ্লাইওভার, দারুণ দারুণ বিল্ডিংগুলো সকালের রোদের ভেতর জ্বল জ্বল করছে। আমরা প্রায় চল্লিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম, কড়া রোদ, আমরা টিকিট কেটে গার্ডেনে প্রবেশ করলাম। বিভিন্ন দেশের অসংখ্য পর্যটক ও দর্শক দেখছে, ছবি তুলছে। মিরাকেল গার্ডেন সম্পর্কে আপনারা প্রায় সবাই জানেন যে, মিরাকেল গার্ডেন হলো একটি ফুলের বাগান। ২০১৩ সালের বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে এটি গড়ে তোলা হয়। এটি বিশ্বের বৃহত্তর প্রাকৃতিক ফুলের বাগান। এর আয়তন ৭২,০০০ বর্গকিলোমিটার। এই বাগানে ৫০ মিলিয়নেরও বেশি ফুল এবং ২৫০ মিলিয়ন গাছপালা রয়েছে। এটি অত্যন্ত সাজানো গোছানো, পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এবার দেখার মজাটা হলো আমার স্ত্রী তো আছেই, আছেন ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, তিনি হাঁটছেন আর নানান গল্প করছেন, যা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ঝুলি বড় হচ্ছে। খুব পণ্ডিত ও বিনয়ী মানুষ তিনি। প্রায় ঘন্টা খানেক সময় ধরে দেখে আমরা ফিরে এলাম। আপনারা যদি দুবাই যান, তাহলে কেউ মিরাকেল গার্ডেন না দেখে আসবেন না।

ফিরে হোটেলে এসে ফ্রেস হয়ে এবং খাওয়া দাওয়া করে কনসাল জেনারেলের অফিস প্রাঙ্গণে। আজ বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস এবং উৎসবের দ্বিতীয় দিন। আমার উপস্থাপনা দিয়ে শুরু হলো অনুষ্ঠান। বেশ কয়েকটি পর্বে সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো। অংশগ্রহণ করলেন অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামসহ কলকাতা, আসাম থেকে আসা বাংলা ভাষার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কয়েকজন আরবী ভাষার লেখক ও কবিবৃন্দ। এরপর নতুন বই পরিচিতি, লেখক-প্রকাশক সংলাপ হলো। আবৃত্তি করলেন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া আবৃত্তিশিল্পী আহকামউল্লাহ ও দুবাইয়ে বসবাসরত কয়েকজন আবৃত্তিশিল্পী। কনসাল জেনারেল জামাল হোসেনের সহধর্মিনী শিল্পী আবিদা হোসেনের নেতৃত্বে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ক সেরাদের পুরস্কার, পরিবেশ ও মানবতার জন্য এগিয়ে আসা সফল ব্যক্তিদের পুরস্কার প্রদান এবং সবশেষে সংগীতানুষ্ঠান চললো মধ্যরাত পর্যন্ত। গতবারও দেখেছি, এবারও দেখলাম সংগীত পরিবেশন পর্বে প্রচর দর্শক সমাগম ঘটে। পুরো অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে আনন্দিত হলাম।
পরদিন ১৭ ডিসেম্বর। সকাল বেলা বাংলাদেশ থেকে আগত এবং কনসাল জেনারেলসহ কয়েকজন হোটেল থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম সোজা দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে। এশিয়া যুব ক্রিকেট কাপের ফাইনাল খেলা চলছে-বাংলাদেশ বনাম সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে। এ এক ঐতিহাসিক ও আনন্দময় সময়। ভিভিআইপি গ্যালারিতে বসে খেলা দেখলাম, কনসাল জেনারেলের সৌজন্যে। খেলায় বাংলাদেশ জিতে চ্যাম্পিয়ন হলো-আরো বাড়তি আনন্দ। স্টেডিয়াম থেকে তামান্না হক ও আমরা দুজন চলে গেলাম সানসেট বিচে। আরব সাগরের নীল জলের বালুকাময় বিচ। বিভিন্ন দেশের নানা দর্শনার্থীরা সৈকতজুড়ে। আমরাও বিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। তবে কক্সবাজার বিচ সেরা। তখন মধ্যদুপুরের প্রচণ্ড কড়া রোদ। বিচের পাশেই পৃথিবী বিখ্যাত বুর্জ আল আরব হোটেল। আমরা কিছুটা কাছে গিয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষদের মতো কয়েকটা ছবি তুললাম। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, ২৮০ মিটার একটি কৃত্রিম দ্বীপের মধ্যে পাল তোলা নৌকার মতো সমুদ্র তীরে অত্যাধুনিক স্থাপত্যের এই হোটেলটি নির্মাণ করা হয়েছে। একটি সাঁকো দিয়ে হোটেলে যেতে হয়। এর সাজসজ্জাও দারুণ আকর্ষণীয়। খুবই দর্শনীয়।

এরপর আমরা চলে গেলা দুবাইয়ের আরেক আকর্ষণীয় স্থান স্বর্ণের বাজারে। আমি গতবারও দেখেছি, কিন্তু কিনিনি, কেন কিনবো, অতো টাকা কই? এবার কিন্তু সমস্যা, গিন্নি সঙ্গে? তবে আমার গিন্নিও দেখার জন্যেই এসেছে বলে জানালো। যাক স্বস্তি। কারণ নারী আর গহনা যেন অভিন্ন? এখান থেকে কেনার বায়না ধরলে মুশকিলে পড়ে যাবো। যাহোক চাইলো না। পরে ঘুরে ঘুরে দেখলাম বিশাল স্বর্ণের বাজারটি। বাহরাইনেও দেখেছি কিন্তু দুবাইয়ের স্বর্ণের বাজার অতুলনীয়। স্বর্ণের দাম বাংলাদেশের চেয়ে কম এবং খাঁটি সোনা। অনেক বাংলাদেশি এখান থেকে স্বর্ণের চেইন, আঙটি, কানের রিংসহ নানা রকমের আইটেম কিনে আনেন। আসলে পৃথিবীতে স্বর্ণ আর মাটির দামই সবচেয়ে বেশি। কারণ মাটি আর স্বর্ণের দাম বাড়তেই থাকে দ্বিগুণ আকারে। প্রায় পুরো বাজারটি ঘুরে ফিরে এলাম হোটেলে।

হোটেলে এসে গোছল ও খাওয়া-দাওয়া করে রওয়ানা হলাম কনসাল জেনারেলের অফিসে, আজ বইমেলা ও বিজয় উৎসবের শেষ দিন। যথারীতি আমার উপস্থাপনায় আজও শুরু হলো দিনের অনুষ্ঠান পর্বগুলো। শেষ দিনেও দুবাই প্রবাসী অসংখ্য বাঙালি এসেছে উৎসবে যোগ দিতে। তারা শুধু অনুষ্ঠানেই অংশগ্রহণ করছেন না, ঘুরে ঘুরে দেখছেন বইয়ের স্টল ও অন্যান্য নানান পশরা দিয়ে সাজানো স্টলগুলো। কেউ চটপটি খাচ্ছেন, পিঠা খাচ্ছেন, চা-কফি খাচ্ছেন এবং দলে দলে আড্ডা দিচ্ছেন। একদিকে অনুষ্ঠান অন্যদিকে এসব গছিপিং, সব মিলিয়ে বাঙালির এক মিলন মেলায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো প্রাঙ্গণ। শেষ দিনেও অনেক রাত অব্দি অনুষ্ঠান চলল এবং সংগীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হলো দিনের বইমেলা ও বিজয় উৎসব। সমাপানী ভাষণে কনসাল জেনারেল কবি জামাল হোসেন বললেন, বাঙালি উৎসব প্রিয় জাতি, তারা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, উৎসব নিয়েই বাঁচতে চায়। আমি এখানে দায়িত্ব নিয়ে আসার পর পরই এই বিষয়টি অনুভব করেছি এবং গত বছর ও এ বছরের এই আয়োজনটি করার চেষ্টা করলাম, আশা করি আপনারা উপভোগ করেনে। আমি যদি ভবিষ্যতে এখানে নাও থাকি, এই উৎসব যেন চলে।

পরদিন ১৮ ডিসেম্বর, আমাদের ঢাকায় ফিরে আসার কথা, রাতে ফ্লাইট, আমরা হাতে পাচ্ছি সারাদিন। আমাদের ঘুরবার জন্যই এই দিনটি বেছে নিয়েছিলাম। আমাদের পূর্বে থেকেই ইচ্ছে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবীতে অবস্থিত শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ দেখা এবং মরুভ্রমণ করা। সে মোতাবেক হোটেল থেকে সকাল বেলায় বেরিয়ে পড়লাম আবুধাবীর উদ্দশ্যে। হাইওয়ে ধরে গাড়ি চলছে, আধুনিক সড়ক, অসংখ্য ফ্লাইওভার, নান্দনিক সব হাইরাইজ বিল্ডিং আর যেতে যেতে দেখছি দূরের মরুভূমি। আগেরবার এখানে আসতে পারিনি, কিন্তু আমরা মানে আমি ও আমার সহধর্মিনী সুমী ও কবি-প্রকাশক সজল আহমেদ যাচ্ছি। ভিতরে ভিতরে অনেক পুলকিত হচ্ছি, কারণ বাংলাদেশ থেকে আগে যারা এসে পৃথিবীর এই অষ্টম সেরা অত্যাধুনিক মসজিদটি দেখে গেছেন কিংবা মসজিদ সম্পর্কে সামান্য পড়াশোনা ও ইউটিবে দেখে যেটুকু সৌন্দর্য পান করেছি, তা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবো। প্রায় দুই ঘন্টা সময় লাগল, সত্যি আধুনিক সেরা স্থাপত্যের মুখোমুখি হয়ে গেলাম। বাইরে তখন দুপুরের কড়া রোদ, প্রচণ্ড তাপ কিন্তু ভিতরে খেলা করছে এক রোমাঞ্চ। প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম, আহা কী করেছে আমিরাত সরকার। উইকিপিডিয়া থেকে এই মসজিদ সম্পর্কে সামান্য তথ্য আপনাদের জন্য তুলে ধরছি- ‘গ্র্যান্ড মসজিদটি ১৯৯৪ এবং ২০০৭ সালের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল এবং ডিসেম্বর ২০০৭ সালে উদ্বোধন করা হয়েছিল। বিল্ডিং কমপ্লেক্সের পরিমাপ প্রায় ২৯০ বাই ৪২০ মিটার, যা ১২ হেক্টর এর বেশি এলাকা জুড়ে রয়েছে। ল্যান্ডস্কেপিং এবং যানবাহন পার্কিং। প্রকল্পটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান দ্বারা চালু করা হয়েছিল, যিনি একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যা স্থাপত্য ও শিল্পের ঐতিহাসিক এবং আধুনিক মূল্যবোধের সাথে ইসলামী বিশ্বের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে একত্রিত করবে। ২০০৪ সালে, শেখ জায়েদ মারা যান এবং তাকে মসজিদের আঙ্গিনায় সমাহিত করা হয়। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মস্ক সেন্টার (SZGMC) অফিসগুলি পশ্চিম মিনারে অবস্থিত। SZGMC প্রতিদিনের ক্রিয়াকলাপগুলি পরিচালনা করে এবং শিক্ষামূলক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং দর্শনার্থী প্রোগ্রামগুলির মাধ্যমে শেখার এবং আবিষ্কারের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

উত্তর-পূর্ব মিনারে অবস্থিত লাইব্রেরিটি ইসলামিক বিষয়গুলির একটি পরিসীমা সম্বোধন করে ক্লাসিক বই এবং প্রকাশনাসহ সম্প্রদায়কে পরিবেশন করে: বিজ্ঞান , সভ্যতা , ক্যালিগ্রাফি , শিল্পকলা এবং মুদ্রা, কিছু বিরল প্রকাশনাসহ। সংগ্রহে আরবি, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, ইতালীয়, স্প্যানিশ, জার্মান এবং কোরিয়ানসহ বিস্তৃত ভাষার উপাদান রয়েছে। চলমান দুই বছর ধরে, এটি TripAdvisor দ্বারা বিশ্বের দ্বিতীয় প্রিয় ল্যান্ডমার্ক হিসেবে ভোট দিয়েছে। মসজিদটি শেখ জায়েদের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিল, যাকে ২০০৪ সালে তার মৃত্যুর পর এখানে সমাহিত করা হয়েছিল। মসজিদটি সিরিয়ার স্থপতি ইউসেফ আবদেলকে এবং সিরিয়ার আরও তিনজন স্থাপত্য ডিজাইনারের পরিচালনায় ডিজাইন করা হয়েছিল যারা নকশাটি সম্পূর্ণ করেছিলেন এবং কাজ করেছিলেন। এটির উন্নয়নে, বাসেম বারঘৌতি, মোয়াতাজ আল-হালাবি এবং ইমাদ মালাস। মসজিদের স্থপতি ইউসেফ আবদেলকি বেশ কয়েকটি উৎস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন।

আলেকজান্দ্রিয়ার আবু আল-আব্বাস আল-মুরসি মসজিদ, ১৯২০-এর দশকে মারিও রসি ডিজাইন করেছিলেন; লাহোর, পাকিস্তানের বাদশাহী মসজিদ; এবং পারস্য, মুঘল এবং ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য মসজিদের গম্বুজ বিন্যাস এবং মেঝে পরিকল্পনা বাদশাহী মসজিদ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এর খিলানপথগুলি মূলত মুরিশ এবং এর মিনারগুলো ক্লাসিকভাবে আরব। ইতালীয় ঠিকাদার ইমপ্রেগিলো এবং রিজানি ডি ইচারের মধ্যে একটি যৌথ উদ্যোগে, ৩,০০০ টিরও বেশি কর্মী এবং ৩৮টি সাব-কন্ট্রাক্টিং কোম্পানি এটির নির্মাণে নিযুক্ত হয়েছিল।

২০০৪ এবং ২০০৭ সালের মধ্যে বেলজিয়ান কোম্পানি বেসিক্স গ্রুপের অংশ যৌথ মসজিদটি সম্পন্ন হয়েছিল মার্বেল পাথর, সোনা, আধা-মূল্যবান পাথর, স্ফটিক এবং সিরামিকসহ তাদের দীর্ঘস্থায়ী গুণাবলীর কারণে । সিরিয়াসহ অনেক দেশ থেকে কারিগর এবং উপকরণ এসেছিল, বিশেষ করে দামেস্ক এবং আলেপ্পো আরও কিছু দেশ যেমন ভারত, ইতালি, জার্মানি, তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইরান, চীন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, উত্তর মেসিডোনিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। মসজিদটি ৪০,১০০ জনের বেশি উপাসককে স্থান দেয়ার জন্য যথেষ্ট বড়, যেখানে প্রধান প্রার্থনা হল ৭,০০০ জনেরও বেশি ধারণ করতে পারে। এখানে দুটি ছোট প্রার্থনা হল রয়েছে, যার প্রতিটির ধারণক্ষমতা ১,৫০০, যার মধ্যে একটি হল মহিলাদের প্রার্থনা হল৷ প্রাঙ্গণের চার কোণে চারটি মিনার রয়েছে যেগুলির উচ্চতা প্রায় ১০৭ মিটার। ফুলের নকশাসহ প্রাঙ্গণটি প্রায় ১৭,০০০ মিটার এবং বিশ্বের মার্বেল মোজাইকের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উত্তর মেসিডোনিয়ার প্রিলেপ থেকে সিভেক বাহ্যিক ক্ল্যাডিংয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল মিনারসহ মসজিদে ১১৫,১১৯ মিটার।

লাস, দক্ষিণ টাইরল, ইতালির লাসা অভ্যন্তরীণ উচ্চতায় ব্যবহৃত হয়েছিল ভারতের মাকরানা থেকে মাকরানা সংযুক্তি এবং অফিসগুলিতে ব্যবহৃত হতো ইতালি থেকে Acquabianca এবং Bianco চীন থেকে ইস্ট হোয়াইট এবং মিং গ্রিন। তুলনা করার জন্য, শারজাহের রাজা ফয়সাল মসজিদ, পূর্বে শারজাহ এবং দেশের বৃহত্তম মসজিদ। হলের কার্পেট অনেকেই বিবেচনা করেন ইরানি শিল্পী আলী খালিকি দ্বারা ডিজাইন করা বিশ্বের বৃহত্তম কার্পেট হতে হবে। এর পরিমাপ ৫,৬২৭ এবং প্রায় ১,২০০-১,৩০০ কার্পেট নটার দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। এই কার্পেটের ওজন ৩৫ টন এবং এটি প্রধানত উল দিয়ে তৈরি (নিউজিল্যান্ড এবং ইরান থেকে উদ্ভুত)। কার্পেটের মধ্যে ২,২৬৮,০০০,০০০ নট রয়েছে এবং এটি সম্পূর্ণ হতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে। গ্র্যান্ড মসজিদে মিউনিখ, জার্মানির ফাউস্টিগ কোম্পানি থেকে সাতটি আমদানি করা ঝাড়বাতি রয়েছে যাতে লক্ষ লক্ষ স্বরোভস্কি ক্রিস্টাল রয়েছে। বৃহত্তম ঝাড়বাতি হল মসজিদের অভ্যন্তরে দ্বিতীয় বৃহত্তম পরিচিত ঝাড়বাতি, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এবং এটির ১০ মিটার ব্যাস এবং ১৫ মিটার উচ্চতা রয়েছে। তোরণ বরাবর পুলগুলো মসজিদের কলামগুলোকে প্রতিফলিত করে, যা রাতে আলোকিত হয়।’

অনেক দেশের পর্যটকদের সঙ্গে আমরাও নিয়ম ও নিরাপত্তা মেনে ঢুকে গেলাম মসজিদ কমপ্লেক্সে। সত্যি অসম্ভব সুন্দর পুরো মসজিদ এলাকা। দুপুরের রোদে সাদা মার্বেল পাথরের চত্বর ঝিকঝিক করছে। মূল মসজিদের প্রবেশ দ্বারে দুই পাশে স্বচ্ছ জলের লেক ও ফোয়ারা। এতো পরিচ্ছন্ন ও পরিষ্কার পুরো জায়গাটি, যেন পাওয়ার মতো চাওয়া বা বলা যায় স্বপ্নে দেখা সুন্দর। মসজিদের মেঝে, ঝাড়বাতি থেকে শুরু করে সব সব এতো সুন্দর যে উইকিপিডিয়ার বর্ণনার সাথে হুবুহু মিলে যাচ্ছে। দেখে মনে হলো, এটি প্রার্থনার ঘর তো বটেই পাশাপাশি এটি বিশ্বের এক অসাধারণ শিল্প-স্থাপনা। যে ব্যক্তিই দেখবে, সে-ই রোমাঞ্চিত হবে। এখানে শুধু মুসলিমরাই শুধু আসে না, বিভিন্ন ধর্মের মানুষরাই আসে। যেন ধর্ম যার যার, সৌন্দর্য সবার। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম, সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। মনে মনে ভাবলাম মুঘলরাও বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ শ’ বছর আগে অনেক নান্দনিক কারুকাজের মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, যার অনেকগুলো এখনো সৌন্দর্য ও নান্দনিক স্থাপত্য হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচ শ’ বছর পরে এই মসজিদটিও ইতিহাস এবং ঐতিহ্যে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। যাহোক আমরা প্রায় দেড় ঘন্টা সময় নিয়ে আমরা দেখলাম এবং সুন্দর অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলাম দুবাইয়ে। বলে রাখি, মরুভূমি ঘোরাটা হলো না কোনো একটা কারণে, সেটি আর নাই-ই বললাম। তবে আমার আর গিন্নির একটি ভীষণ ইচ্ছে ছিল মরুর বালির আচরণ দেখা ও অনুভব করা, কিন্তু তা আর হলো না? পূরণ না করেই অর্থাৎ উন্মোচন করা হলো না বালির পাহাড়, তবুও অসাধারণ এক ভ্রমণ তৃষ্ণার তৃপ্তি নিয়ে রাতের ফ্লাইট ধরে ফিরে এলাম ঢাকায়।

 

(লেখাটির ৩য় ও শেষ পর্বের এখানেই সমাপ্তি।)

২৯ এপ্রিল, ২০২৬


shihab-shariar

ঢাকা, বাংলাদেশ

কবি, ফোকলোর গবেষক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, কলামিস্ট, উপস্থাপক। সম্পাদনা করছেন লোকনন্দন বিষয়ক পত্রিকা ‘বৈঠা’। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৩১টি।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।