পড়শী ⁠নারী স্বনির্ভর নারী, সচেতন বিনিয়োগ, সুরক্ষিত পরিবার এবং সমৃদ্ধ আগামী

স্বনির্ভর নারী, সচেতন বিনিয়োগ, সুরক্ষিত পরিবার এবং সমৃদ্ধ আগামী

Post Views: 8
8 min read

“নারীর হাতে সংসারের চাবি থাকে, কিন্তু নিজের ভবিষ্যতের চাবিটা কি সবসময় তাঁর নিজের হাতে থাকে?”

প্রশ্নটি হয়তো সহজ, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের এক গভীর বাস্তবতা। আজ নারীরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, বিজ্ঞান, সাহিত্য— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। তবুও আর্থিক পরিকল্পনা, সেভিংস ও ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রে এখনও অনেক নারী নিজেকে পিছিয়ে রাখেন। অথচ নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সেই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অধিকার প্রত্যেক নারীরই রয়েছে। এমনকি অনেক সময় কর্মজীবী নারীদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। তাঁরা নিজের পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ স্বামীর হাতে তুলে দেন, যাতে তিনিই ইনভেস্টমেন্টের দায়িত্বটা নেন। এতে ভুল কিছু নেই— অনেক পরিবারেই আর্থিক সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেওয়া হয়। তবে প্রশ্ন হলো, তাঁরা কি চাইলে নিজের অর্থের পরিকল্পনা বুঝতে, জানতে বা সেই সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। সমস্যাটা সক্ষমতার নয় সমস্যাটা অভ্যাসের।

একজন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমি একটি বিষয় বারবার উপলব্ধি করেছি— অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নিজের অর্থ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে এই উপলব্ধি আমার একদিনে আসেনি। সত্যি বলতে কী, এক সময় আমি আমার অনেক বান্ধবীর মতোই ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাতাম না। আমার স্বামী কোথায় টাকা সঞ্চয় করছেন, ভবিষ্যতের জন্য কী পরিকল্পনা করছেন— এসব বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। মনে হতো, সে নিশ্চয়ই আমার থেকে বেশি জানে, তাই সেই সব ঠিকভাবে সামলে নেবে।

আমি শুধু চেষ্টা করতাম সংসারের খরচ সামলে যতটা সম্ভব টাকা বাঁচাতে। কিন্তু সেই সঞ্চিত টাকা কোথায় রাখা হচ্ছে, কীভাবে তা ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগছে, বা কোন ইনভেস্টমেন্ট আমাদের স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবে— এসব নিয়ে কখনও ভাবিনি।

আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি আমি কত বড় একটি দায়িত্ব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম।

ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে কাজ করার পর ধীরে ধীরে বুঝলাম, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কোনো একজন মানুষের দায়িত্ব নয়; এটি পরিবারের যৌথ দায়িত্ব। এখন আমাদের কোথায় কী ইনভেস্টমেন্ট রয়েছে, কোন লক্ষ্য পূরণের জন্য কোন পরিকল্পনা করা হয়েছে, কোন অর্থ কোথায় রাখলে ভবিষ্যতে ভালো ফল পাওয়া যাবে— এসব বিষয় নিয়ে আমরা দুজন একসঙ্গে আলোচনা করি। প্রয়োজনে আমিও মতামত দিই, তথ্য সংগ্রহ করি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অংশীদার হই।

এই পরিবর্তন আমাকে শুধু আর্থিকভাবে সচেতন করেনি, মানসিকভাবেও অনেক বেশি নিশ্চিন্ত করেছে। কারণ এখন আমি জানি, আমাদের প্রতিটি সঞ্চয়ের একটি উদ্দেশ্য আছে, প্রতিটি ইনভেস্টমেন্টের একটি লক্ষ্য আছে। একটু একটু করে জমানো অর্থ যখন একদিন সন্তানের উচ্চশিক্ষা, একটি নতুন বাড়ি, অবসরজীবনের নিরাপত্তা কিংবা বহুদিনের কোনো স্বপ্ন পূরণ করে, তখন সেই আনন্দ সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

আমাদের সমাজে অধিকাংশ নারী সংসারের দায়িত্ব সামলান। আমার কাছে সংসার শুধু একটি পরিবার নয়, বরং সবচেয়ে বড় ম্যানেজমেন্টের বিদ্যালয়। সীমিত আয়ের মধ্যে বাজেট তৈরি, খরচ নিয়ন্ত্রণ, সঞ্চয় করা এবং পরিবারের প্রয়োজনের ভারসাম্য রক্ষা— এসবই দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনার বাস্তব উদাহরণ। অথচ যাঁরা এত সুন্দরভাবে সংসার পরিচালনা করেন, তাঁদের অনেকেই নিজের নামে সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করেন না।

কর্মসূত্রে কিছুদিন আগে একজন বড় ব্যবসায়ী কাস্টমারের সাথে রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলাম। তিনি সব শুনে বললেন, “এই বিষয়গুলো আমার স্ত্রী দেখেন। আপনি ওঁর সঙ্গে কথা বলুন।” পরে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হলো। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পুরো প্ল্যানটা বুঝলেন, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করলেন এবং জানালেন, খুব শিগগিরই প্ল্যানটি গ্রহণ করবেন। কথোপকথনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, উনি কর্মজীবী মহিলা নন, সংসারের সমস্ত খুঁটিনাটি নিপুণ ভাবে সামলান এবং পরিবারের বড় বড় আর্থিক সিদ্ধান্তেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।

সেদিন আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হলো— সুযোগ, সঠিক তথ্য এবং আত্মবিশ্বাস পেলে নারীরা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তবে ইনভেস্টমেন্টের আগে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। অনেকেই মনে করেন, বড় অঙ্কের অর্থ না থাকলে তা সম্ভব নয়। বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। স্বনির্ভরতার শুরু হয় ছোট ছোট অভ্যাস দিয়ে।

একজন গৃহিণী বাড়িতে টিউশন পড়াতে পারেন, রান্নার অর্ডার নিতে পারেন, সেলাই, হস্তশিল্প, বুটিক বা বিউটি সার্ভিস শুরু করতে পারেন। আবার বর্তমান ডিজিটাল যুগে নতুন দক্ষতা অর্জন করে বা পার্ট-টাইম কাজের মাধ্যমেও অতিরিক্ত আয়ের পথ তৈরি করা সম্ভব। আর এখনকার দিনে অনলাইনে ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও জুয়েলারি, গার্মেন্টের মতো বেশ কিছু ছোট ছোট বিজনেস করতে পারেন।

তারপর নিজেদের উপার্জন করা অর্থ নিজেরাই সঞ্চয় করার অভ্যেস তৈরি করতে পারেন। আর চাকুরীজীবী নারীরা তাদের আয়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত সেভিংস করতে পারেন বা মিউচুয়াল ফান্ডে ইনভেস্ট করতে পারেন। যদি চাকরিতে পেনশন না থাকে তাহলে অবশ্যই একটা রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান করে রাখা উচিত। কিছু কমন ইনভেসমেন্ট যেমন PPF, NPS বা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কোন রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান। খুব অল্প সঞ্চয়ের মধ্য দিয়েও এই ধরনের ইনভেস্টমেন্ট করা যায়।

আর একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি। আজকাল খুব সহজেই ব্যক্তিগত ঋণ (Personal Loan), ইএমআই (EMI) এবং ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা পাওয়া যায়। অনেক সময় আমরা তাৎক্ষণিক ইচ্ছা পূরণের জন্য অপ্রয়োজনীয় ঋণ নিয়ে ফেলি বা ক্রেডিট কার্ডে এমন খরচ করি, যা আমাদের সামর্থ্যের বাইরে। মনে রাখতে হবে, ঋণ তখনই উপকারী- যখন তা পরিকল্পিতভাবে নেওয়া হয় এবং সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব হয়। অনেকেই মনে করেন, ইনভেস্টমেন্ট শুরু করতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, বড় মূলধনের চেয়ে বড় অভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাসে ৫০০ বা ১০০০ টাকা নিয়মিত সঞ্চয়ও একদিন বড় মূলধনে পরিণত হতে পারে। এর সঙ্গে এমার্জেন্সি ফান্ড, লাইফ ইন্স্যুরেন্স, মেডিকেল ইন্সুরেন্স- একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করে। আর এটা খুব সহজ একটা পদ্ধতি।

আমার প্রত্যেক নারীর কাছে আন্তরিক আহ্বান— নিজের নামে একটি সঞ্চয় রাখুন। নিজের নামে একটা রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান করুন। যেটা ভবিষ্যতে আপনার নিজের একাউন্টে আসবে। মনে রাখবেন বয়স বাড়লে আমাদেরও একটা মানসিক শান্তি লাগে। এটা তারই রাস্তা। জীবনের এই ছোট্ট একটা পরিবর্তন আমার মতো আপনার জীবনেও আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক শান্তি অনেকটা বাড়িয়ে দেবে।

একজন স্বনির্ভর ও আর্থিকভাবে সচেতন নারী শুধু নিজের জীবনই বদলান না; তিনি একটি পরিবারকে নিরাপদ করেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎকে শক্ত ভিত্তি দেন এবং একটি উন্নত সমাজ গড়ার কারিগর হয়ে ওঠেন।

২০ জুলাই, ২০২৬

উত্তর কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

পেশায় আক্সিস ম্যাক্স লাইফ ইন্স্যুরেন্সে এডভাইজার এবং এজেন্সি অ্যাসোসিয়েট পার্টনার হিসেবে কর্মরত। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজসেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।