পড়শী প্রযুক্তি ও শিক্ষা অনলাইনে নেই, তাই কি হারিয়ে গেছি?

অনলাইনে নেই, তাই কি হারিয়ে গেছি?

Post Views: 6
11 min read

আমার মা মাঝে মাঝে এমন একটি প্রশ্ন করেন, যার উত্তর দেওয়ার আগে বুঝতে পারি না হাসব, নাকি একটু বিরক্ত হব। “তোমাকে অনলাইনে দেখছি না, সব ঠিক আছে তো?” আমি কোথাও হারিয়ে যাইনি। হয়তো ফোনটি অন্য ঘরে রেখেছি, কাজে ডুবে আছি, অথবা কয়েক ঘণ্টার জন্য পর্দা থেকে চোখ সরিয়েছি। কিন্তু মায়ের কাছে আমার নামের পাশে জ্বলে থাকা ছোট্ট সবুজ বাতিটি এখন নিশ্চিন্ত হওয়ার একটি সংকেত। সেটি জ্বললে আমি ভালো আছি, নিভে গেলে তাঁর চিন্তা শুরু হয়। আগে বাড়ির বারান্দায় আলো জ্বলছে কি না দেখে বোঝা যেত কেউ ঘরে আছে। এখন সেই আলো জ্বলে মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপের পর্দায়।

আমি চীনে থাকি, মা বাংলাদেশে; দূরত্বের কারণে তাঁর এই দুশ্চিন্তাও একটু বেশি। তার এই অভ্যাসের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ভালোবাসাই বেশি। তবু তাঁর মেসেজ আমাকে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: কখন থেকে অনলাইনে থাকা মানে নিরাপদ থাকা, আর উত্তর দিতে দেরি করা মানে কাউকে উপেক্ষা করা হয়ে গেল? স্মার্টফোন যোগাযোগ সহজ করেছে, কিন্তু আমরা কখন অনলাইনে আছি, সেটিও সবার চোখের সামনে এনে দিয়েছে। “অ্যাকটিভ নাউ”, “লাস্ট সিন”, নীল টিক, মেসেজ পড়ার চিহ্ন, এমনকি কেউ উত্তর টাইপ করছেন কি না, সবই অন্য মানুষ দেখতে পারেন। ফলে নীরবতাও এখন একটি বার্তা। একজন বন্ধু ভাবতে পারেন আমি তাঁকে এড়িয়ে যাচ্ছি, পরিবারের কেউ দুশ্চিন্তা করতে পারেন, আর সহকর্মী মনে করতে পারেন আমি দায়িত্বশীল নই।

2026 08 10 01 01

এই অনুভূতিকে গবেষকেরা বলেন “অ্যাভেইলেবিলিটি প্রেসার”, মানে সব সময় নাগালে থাকার চাপ। চাপটি কেউ মুখে স্বীকার না করলেও তার নিয়ম আমরা দ্রুত শিখে ফেলি। ফোনে বার্তা এলে মনে হয় এখনই দেখতে হবে। পড়ে ফেললে উত্তর না দিয়ে থাকা আরও কঠিন। উত্তর দেওয়ার মতো সময় বা মানসিক শক্তি না থাকলেও অপরাধবোধ কাজ করে। মায়ের মেসেজে আমি সাধারণত লিখি, “আছি, কাজ করছিলাম।” উত্তরটি দিতে কয়েক সেকেন্ড লাগে, কিন্তু এর পেছনে থাকা অদৃশ্য প্রত্যাশাটি সারা দিনই সঙ্গে থাকে: আমাকে সব সময় পাওয়া যাবে, আর না পাওয়া গেলে তার ব্যাখ্যাও দিতে হবে।

সব সময় নাগালে থাকার চাপের সবচেয়ে গভীর প্রভাব সম্ভবত এখানেই। বিশ্রামের সময়ও মনের একটি অংশ ফোনের কাছে পাহারা দেয়। কোনো জরুরি খবর এলো কি না, কেউ অপেক্ষা করছে কি না, অথবা আমার দেরিকে কেউ ভুল বুঝল কি না, সেসব ভাবনা পুরোপুরি থামে না। এতে সবারই বিষণ্নতা বা উদ্বেগ হবে, তা নয়। সামাজিক যোগাযোগ অনেককে একাকিত্ব থেকে বাঁচায় এবং দূরের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে। কিন্তু যোগাযোগ যখন নিজের পছন্দের বদলে বাধ্যবাধকতা মনে হয়, তখন তা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। ২০২৪ সালে গবেষক শুয়েচিং লি ও মাইকেল চ্যান চীনের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, এই চাপ মানুষকে বারবার ফোন দেখতে বাধ্য করে; আর যিনি যত বেশি ফোন দেখেন, তাঁর কথাবার্তার মান তত কমে এবং সম্পর্ক নিয়ে অসন্তুষ্টিও তত বাড়ে। তবে একই চাপ কাছের মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার অনুভূতি বাড়িয়ে সম্পর্ককে শক্তিশালীও করতে পারে। প্রভাবটি তাই একমুখী নয়।

এই চাপ বড় কোনো সংকটের মতো হঠাৎ আসে না। ছোট ছোট মুহূর্তে জমতে থাকে। কাজের মধ্যে ফোন জ্বলে উঠলে মনোযোগ সরে যায়; ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটি বার্তা দেখতে গিয়ে আরও কয়েকটি অ্যাপ খুলে ফেলি; উত্তর দিতে দেরি হলে অকারণে ক্ষমা চাই। ফোনটি নীরব থাকলেও মনে হয় কিছু মিস করছি। দিনের পর দিন এভাবে সজাগ থাকলে মন ক্লান্ত হতে পারে, মেজাজ খিটখিটে হতে পারে, ঘুমও ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা আগে থেকেই কাজের চাপ, উদ্বেগ বা একাকিত্বে আছেন, তাঁদের কাছে প্রতিটি অপঠিত বার্তা নতুন একটি অসমাপ্ত কাজের মতো মনে হতে পারে।

উত্তর দেওয়ার এই তাড়াহুড়ো কত দ্রুত নতুন সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়েছে, তার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে। স্বেচ্ছায় দেওয়া ৮৮৯টি কথোপকথনের ৩৪ লাখ বার্তা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, প্রায় ৭০ শতাংশ হোয়াটসঅ্যাপ ও ৪৪ শতাংশ ইনস্টাগ্রাম বার্তার উত্তর পাঁচ মিনিটের মধ্যে দেওয়া হয়েছিল। একজন যত দ্রুত উত্তর দিয়েছেন, তাঁর কথোপকথনের সঙ্গীর মধ্যেও দ্রুত উত্তর দেওয়ার প্রবণতা তত বেশি ছিল। এই ফল সবার আচরণের নিখুঁত ছবি নয়। তবে বদলে যাওয়া সামাজিক নিয়মটি এতে স্পষ্ট: পাঁচ মিনিটে উত্তর পাওয়া যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন আধা ঘণ্টার নীরবতাও অস্বাভাবিক মনে হয়।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইনফরমেশন ওভারলোড, অর্থাৎ আমরা যতটা সামলাতে পারি, তার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য একসঙ্গে সামনে এসে পড়া। সকালে ফোন খুলে কয়েক মিনিটের মধ্যে বন্ধুর বিয়ের ছবি, যুদ্ধের ভিডিও, রাজনৈতিক তর্ক, চাকরির বিজ্ঞাপন, দুর্ঘটনার খবর, রান্নার রেসিপি এবং কোনো পণ্যের ছাড় চোখের সামনে চলে আসে। এক মুহূর্তে হাসছি, পরের মুহূর্তে ভয় পাচ্ছি, তারপর রাগ করছি। মনের এক অনুভূতি থেকে অন্য অনুভূতিতে যাওয়ার কোনো বিরতি নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডটি যেন এমন একটি ঘর, যেখানে শত শত মানুষ একসঙ্গে কথা বলছেন এবং প্রত্যেকে দাবি করছেন, তাঁর কথাটিই এখন সবচেয়ে জরুরি।

এটি শুধু অনেক কিছু দেখার সমস্যা নয়। কোন তথ্য সত্য, কোনটি জরুরি, কোনটির উত্তর দিতে হবে এবং কোনটি ছেড়ে দেওয়া যায়, প্রতিমুহূর্তে সেই সিদ্ধান্তও নিতে হয়। একটি মিথ্যা খবর যাচাই করতে সময় লাগে, কিন্তু শেয়ার করতে কয়েক সেকেন্ড। কোনো ভয়াবহ ভিডিও এড়িয়ে গেলেও অ্যালগরিদম সেটি আবার সামনে আনতে পারে। সবকিছু থেকে দূরে গেলে আবার মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাদ পড়ে যাচ্ছে। ক্লান্ত বলে ফোন বন্ধ করতে চাই, কিন্তু কিছু হারানোর ভয়েই আবার সেটি হাতে নিই।

এই স্রোতে আমাদের সময়ও কম যাচ্ছে না। ডেটারিপোর্টালের ‘ডিজিটাল ২০২৬’ বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সামাজিক ও ভিডিও ফিডে সপ্তাহে গড়ে ১৮ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট সময় কাটান। বছরে হিসাব করলে তা প্রায় ৯৬৭ ঘণ্টা, অর্থাৎ ৪০টি পূর্ণ দিনের সমান। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি আলাদা আলাদা মানুষের নিখুঁত হিসাব নয়, কারণ একজনের একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। তবু আমাদের পরিবার ও দৈনন্দিন জীবনে এই মাধ্যমের বিস্তার বোঝার জন্য সংখ্যাটি যথেষ্ট।

এত তথ্য আমাদের সব সময় বেশি সচেতনও করছে না। অনেককে উল্টো এড়িয়ে যাওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট অনুযায়ী, ৪৮টি দেশে চালানো জরিপে গড়ে ৪২ শতাংশ মানুষ কখনো কখনো বা প্রায়ই সংবাদ এড়িয়ে চলেন। ২০১৭ সালে এই হার ছিল ২৯ শতাংশ। যুদ্ধ, সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং একই খবরের পুনরাবৃত্তি এমন ক্লান্তি তৈরি করতে পারে যে গুরুত্বপূর্ণ খবর পড়ার মানসিক শক্তিও আর থাকে না। তথ্যের এই বাড়াবাড়ির সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ সম্ভবত এটাই: সামনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তথ্য আছে, অথচ সবকিছু দেখতে দেখতে কখনো কিছুই আর দেখতে ইচ্ছা করে না।
তারপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেবল সমস্যার উৎস বললে আমার মায়ের মেসেজটির অর্থ ধরা যাবে না। এই মাধ্যমেই দূরে থাকা সন্তানকে দেখে বাবা-মা নিশ্চিন্ত হন, পুরোনো বন্ধুত্ব টিকে থাকে এবং বিপদের সময় দ্রুত সাহায্য পাওয়া যায়। সমস্যা যোগাযোগে নয়, যোগাযোগের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায়। কখন অনলাইনে থাকব, সেটি যখন আমি ঠিক করতে পারি, তখন যোগাযোগে স্বস্তি থাকে। কিন্তু অফলাইনে থাকার সুযোগ না থাকলে সেই যোগাযোগই বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

আমি এখন মাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, অনলাইনে না দেখলেই যে আমি বিপদে আছি, তা নয়। জরুরি হলে তিনি ফোন করবেন; সাধারণ মেসেজের উত্তর একটু দেরিতে এলেও চিন্তার কারণ নেই। কথাটি বলা সহজ, অভ্যাস বদলানো কঠিন। তাঁর উদ্বেগ একদিনে যাবে না, আমারও বারবার ফোন দেখার অভ্যাস একদিনে বদলাবে না। তবু আমাদের আবার শিখতে হবে, সব মেসেজের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে হয় না, সব খবর জানা সম্ভব নয়, আর কিছু সময় কারও নাগালের বাইরে থাকা অসামাজিকতা নয়।

মা হয়তো এরপরও আমাকে অনলাইনে না দেখে লিখবেন, “সব ঠিক আছে তো?” আমি ফিরে এসে উত্তর দেব, “হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। একটু অফলাইনে ছিলাম।” আমাদের সম্পর্কের জন্য সবুজ বাতিটি সব সময় জ্বলে থাকার প্রয়োজন নেই। কখনো সেটি নিভে থাকার অর্থ হারিয়ে যাওয়া নয়। তার অর্থ হতে পারে, আমি ঘুমাচ্ছি, বই পড়ছি, কারও সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলছি, অথবা কোনো স্ক্রিন ছাড়াই নিজের মতো করে একটু সময় কাটাচ্ছি।

তথ্যসূত্র

৩০ জুলাই, ২০২৬


সাংহাই, চীন

সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও যোগাযোগ বিষয়ে মাস্টার্স করছেন।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।