পড়শী ⁠নারী ক্ষমতা, যৌনতা ও সম্পর্কের প্রতিবিম্বঃ সহিংস নারী চিন্তার রূপান্তর

ক্ষমতা, যৌনতা ও সম্পর্কের প্রতিবিম্বঃ সহিংস নারী চিন্তার রূপান্তর

Post Views: 18
7 min read

একটি সমাজকে বোঝার সহজ উপায় হলো— সেই সমাজ নারী ও পুরুষকে কীভাবে দেখে, কীভাবে বিচার করে এবং কী ধরনের ভূমিকার মধ্যে আটকে রাখে, তা পর্যবেক্ষণ করা। একসময় ‘সেক্সিজম’ বলতে প্রায় একচেটিয়াভাবে নারীর প্রতি বৈষম্যকেই বোঝানো হতো। ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় সেই ব্যাখ্যার যথেষ্ট ভিত্তিও রয়েছে। কিন্তু সমাজ পরিবর্তিত হয়েছে, সম্পর্কের ভাষা বদলেছে, ক্ষমতার ভারসাম্যও নতুন রূপ পেয়েছে। ফলে একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে— সেক্সিস্ট মানসিকতা কি কেবল পুরুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি নারীও কখনও লিঙ্গভিত্তিক পূর্বধারণার বাহক হয়ে ওঠেন?

কোনো সভ্যতার পরিপক্বতা কেবল তার প্রযুক্তি বা অর্থনীতিতে নয়, বরং মানুষকে দেখার দৃষ্টিতে নির্ধারিত হয়। অথচ বিস্ময়করভাবে, একবিংশ শতাব্দীতেও নারী ও পুরুষকে আমরা প্রায়ই ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং পূর্বনির্ধারিত ভূমিকার বাহক হিসেবে বিচার করি। সেখান থেকেই জন্ম নেয় একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন— সেক্সিজম কি কেবল পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি নারীও কখনও লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতের অংশীদার হয়ে ওঠেন?

প্রথমেই একটি বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি। ‘সেক্সি’ এবং ‘সেক্সিস্ট’ এক বিষয় নয়। প্রথমটি ব্যক্তিগত উপস্থাপনার ধারণা; দ্বিতীয়টি এমন এক মানসিক প্রবণতা, যেখানে একজন মানুষকে তার চরিত্র, যোগ্যতা বা আচরণের আগে তার লিঙ্গের ভিত্তিতে বিচার করা হয়। এই বিচার নারী বা পুরুষ— উভয়ের বিরুদ্ধেই কাজ করতে পারে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীরা বৈষম্য, সম্পত্তির অধিকারহীনতা, শিক্ষাবঞ্চনা, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, যৌন সহিংসতা এবং কর্মক্ষেত্রে অসমতার মুখোমুখি হয়েছেন। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে— সমাজের প্রতিটি নিপীড়নের নেপথ্যে সবসময় পুরুষই একমাত্র কার্যকর শক্তি ছিলেন না। বহু সমাজে পণপ্রথা টিকিয়ে রাখা, বধূ-নির্যাতন, কন্যাসন্তানের প্রতি বৈষম্য, পুত্রসন্তানের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক কিংবা পারিবারিক চরিত্রহননের মতো ঘটনায় পরিবারের নারীরাও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। সমাজবিজ্ঞানীরা এটিকে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের সামাজিক পুনরুৎপাদন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন— অর্থাৎ একটি বৈষম্যমূলক কাঠামোকে অনেক সময় ভুক্তভোগীরাই অনিচ্ছাকৃতভাবে বহন করেন।

আধুনিক নারীর অবস্থান এই চিত্রকে নতুনভাবে রূপ দিয়েছে। আজকের নারী শিক্ষিত, আত্মসচেতন এবং অধিকার সম্পর্কে অধিক স্পষ্ট। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, তাৎক্ষণিক মতামতের সংস্কৃতি এবং সম্পর্কের দ্রুত বিচার— অনেক ক্ষেত্রেই একটি বিপজ্জনক সাধারণীকরণ তৈরি করেছে। কিছু আলোচনায় ‘পুরুষ’ যেন একক পরিচয় নয়; বরং সম্ভাব্য প্রতারক, সম্ভাব্য নির্যাতক বা সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রতীক। বাস্তবে অবশ্য অপরাধ ব্যক্তি করে, লিঙ্গ নয়। এই পার্থক্যটি হারিয়ে গেলে সেটিও এক ধরনের সেক্সিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিণত হতে পারে।

এখানেই একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী যখন ‘পুরুষ’ সম্পর্কে কথা বলেন, তখন তাঁর মনে প্রথমে কে আসেন? অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরটি হয়— স্বামী, প্রেমিক বা সঙ্গী। অথচ তাঁর বাবা, ভাই, শিক্ষক, সহকর্মী কিংবা পুত্রও পুরুষ। অর্থাৎ ‘পুরুষ’ শব্দটি কখনও কখনও অজান্তেই যৌন বা দাম্পত্য সম্পর্কের সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এই প্রবণতা ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার ফল হতে পারে, কিন্তু সেটি সমগ্র পুরুষ সমাজের প্রতিচ্ছবি নয়।

অন্যদিকে পুরুষের অভিজ্ঞতার একটি অংশ দীর্ঘদিন সামাজিক আলোচনার বাইরে থেকেছে। বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষও গার্হস্থ্য সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, সামাজিক অপমান, সম্পর্কের ভেতরে আবেগগত প্রভাব বিস্তার, এমনকি যৌন হয়রানির শিকার হন। কিন্তু সামাজিক ধারণা — “পুরুষ কাঁদে না”, “পুরুষ দুর্বল হয় না” — এই অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রায়ই অদৃশ্য করে রাখে। ফলে বহু পুরুষ অভিযোগ জানান না, সাহায্য চান না, কিংবা নিজের যন্ত্রণা প্রকাশ করতেও সংকোচ বোধ করেন। এটি কোনো প্রতিযোগিতামূলক ভুক্তভোগিতার গল্প নয়; বরং একটি অসম্পূর্ণ সামাজিক আলোচনার ইঙ্গিত।

এখানে ফেমিনিজমের কথাও আসে। নারীবাদ ইতিহাসে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে— ভোটাধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। তবে নারীবাদের ভেতরেও বহু ধারা ও মতভেদ রয়েছে। অনেক গবেষক ও নারী লেখকই দেখিয়েছেন যে, কিছু চরমপন্থী ব্যাখ্যায় পুরুষকে একটি অভিন্ন প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা সংলাপের পরিবর্তে বিভাজন বাড়াতে পারে। কিন্তু এটিকে পুরো ফেমিনিজমের পরিচয় বলা যেমন ভুল, তেমনি ফেমিনিজমের নামে সব বক্তব্যকেই প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়াও সমানভাবে অনুচিত।

আরও একটি পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়ে। একসময় নারীর শরীর ছিল বাজারের প্রধান পণ্য। আজ সেই বাজার পুরুষকেও ছেড়ে দেয়নি। একজন পুরুষকে বিচার করা হচ্ছে তার আয়, উচ্চতা, শারীরিক গঠন, সামাজিক অবস্থান, মানসিক দৃঢ়তা ও ভোগক্ষমতার ভিত্তিতে। অন্যদিকে একজন নারীও এখনো সৌন্দর্য, বয়স ও সামাজিক প্রত্যাশার চাপে মূল্যায়িত হন। অর্থাৎ বস্তুতায়নের শিকার আজ উভয় লিঙ্গই, যদিও তার রূপ ও মাত্রা ভিন্ন।

তাহলে প্রশ্নটি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

সমস্যা নারী নন। সমস্যা পুরুষও নন। সমস্যা সেই মানসিকতা, যা মানুষকে তার লিঙ্গের পরিচয়ে বন্দি করে। একজন পুরুষকে যদি জন্মগতভাবেই সম্ভাব্য অপরাধী ভাবা হয়, কিংবা একজন নারীকে জন্মগতভাবেই অযৌক্তিক বা আবেগনির্ভর বলে ধরে নেওয়া হয়— দুই ক্ষেত্রেই মানবিক বিচারবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সভ্যতার পরবর্তী ধাপ নারীকে পুরুষের বিপরীতে দাঁড় করানো নয়; বরং উভয়কে একই মানবিক মানদণ্ডে বিচার করা। কারণ ন্যায়বিচারের ভাষা কখনো একমুখী হতে পারে না। যে সমাজ নারীর কান্না শুনতে শেখে কিন্তু পুরুষের নীরবতা শুনতে শেখে না; কিংবা যে সমাজ পুরুষের বেদনা তুলে ধরতে গিয়ে নারীর সংগ্রাম অস্বীকার করে— দুই সমাজই শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থাকে।

সেক্সিজমের প্রকৃত প্রতিপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ নয়; প্রতিপক্ষ হলো পূর্বধারণা। আর সেই পূর্বধারণা ভাঙার প্রথম শর্ত— মানুষকে নারী বা পুরুষ হিসেবে নয়, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখতে শেখা।

২১ জুলাই, ২০২৬

কলকাতা. পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

লেখক, সাংবাদিক এবং ভাষা গবেষক। চিফ ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আন্তর্জাতিক মিডিয়া সেন্টার।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।