কলকাতা শহরের অনেক মুখ। এই শহর আমাকে বিমোহিত করে, আমাকে কখনো সময়ের সরণী বেয়ে পিছন দিকে নিয়ে গিয়ে অদ্ভুত এক নস্টালজিয়ায় ভরিয়ে দেয়। কখনো আবার সামনের দিকে এগিয়ে জেন-জির কলকাতায় পৌঁছে দেয়। যেখানে এ আই এর দাপাদাপি, চ্যাট বক্সের এই কলকাতা বড় বেশি অচেনা। কিন্তু, সময়ের দাবি তো মানতেই হয়। কে যেন আমাদের এই প্রিয় শহরকে মৃত নগরী আখ্যা দিয়েছিলেন? যিনিই দিয়েছিলেন, বড় ভুল করেছিলেন। এই শহর জীবন্ত। এখানে প্রাণের স্পন্দন অন্য যে কোনো শহরের থেকে বেশি।
ফিরে যাই সেই পাঁচ কিংবা ছয়ের দশকে। কলকাতার রাস্তায় তখন ডাবল ডেকার বাস চলে, সদ্য আমবাসাডার গাড়ি বেরিয়েছে বিড়লাদের হিন্দ মোটরের কারখানা থেকে। কলকাতা শহরে ট্যাক্সিকে তখন ডাকা হয় বেবি ট্যাক্সি নামে। তখন চাল মেলে পঞ্চাশ পয়সা থেকে একটাকা কেজি দরে। সর্ষের তেল আড়াই টাকা থেকে চার টাকা প্রতি কেজি। ইলিশ মাছ কেজি পিছু আড়াই টাকা থেকে পাঁচ টাকা। খাসির মাংস প্রতি কেজি পাঁচ থেকে সাত টাকা। বাস ট্রামের ভাড়া পাঁচ থেকে দশ পয়সা। সোনা ভরি প্রতি ১০০ টাকা থেকে ১১০ টাকা।
ষাটের দশকে এই কলকাতা দেখেছে নিদারুণ খাদ্য সংকট। রাতারাতি জিনিস পত্রের দাম বেড়েছে ১৯৬৬ সালের পর। সেই সময়ের একটি স্লোগান বিখ্যাত ছিল– রুখতে চিন, গড়তে দেশ, কংগ্রেসকে ভোট দিন। জোড়া বলদ, গাই বাছুর থেকে ভারতের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটি তখন হাতে পরিণত হয়েছে।
সত্তরের দশকটি বড় ঝোড়ো দশক। দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা যে বাঙালি একদিন চিনকে রুখে দিতে চেয়েছিল, সেই বাঙালিই চিনের চেয়ারম্যানকে আমাদের চেয়ারম্যান ঘোষণা করে এক বিপ্লবে নামলো। বহু পুলিশ মারা গেল, বহু উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ছাত্রর প্রাণ গেল। নকশাল আন্দোলন এই কলকাতাকে কুরে কুরে খেল। কলেজ স্ট্রিটে বহু ট্রাম-বাস পুড়লো। বিপ্লব তো হলই না– এই কলকাতা বহু দুর্নামের ভাগিদার হল।
এরপর কলকাতা দেখলো বাম শাসন। বেশ কিছু রক্ত ও ঘাম ঝরানোর পর যুক্তফ্রন্ট আর বামফ্রন্টের কচকচানির পর এই শহর পুরোপুরি বামেদের হয়ে গেল ১৯৭৭ সালে। তারপর একটানা ৩৪ বছর লেফটিস্ট শহর হয়ে থেকেছে কলকাতা। এই সময়েই জন্ম হয়েছে আই টি সেক্টরের। কলকাতা নতুন চেহারা নিয়েছে রাজারহাটা– নিউ টাউন এর উন্মেষের পর।
দীর্ঘ ৩৪ বছর বামেদের রাজত্বের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক সুনামির আত্মপ্রকাশ। ২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান দেখেছে কলকাতা। আবার এই ২০২৬ সালে তাদের পতনও দেখেছে। কলকাতা এখন বিজেপির দখলে। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের গর্বে বলীয়ান। রাজনীতি বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে বলেই এই কলকাতা দশকের পর দশক রাজনীতির রঙে রাঙা হয়েছে।
কিন্তু কলকাতার বাঙালি ছাড়েনি তার তিন সিগনেচারকে। দুর্গাপুজো, আড্ডা, আর ফুটবলকে। আজও ঢাকের বাদ্য বাজলেই কলকাতা উদ্বেলিত হয়– পুজো এসে গেছে। আজ আর কংক্রিটের জঙ্গলে কাশফুল ফোটে না ঠিকই। কিন্তু, পুজো এলেই অদ্ভুত এক সুঘ্রাণ যেন ভেসে বেড়ায় এই কলকাতায়। যেমন সেই সুঘ্রাণের আভাস মেলে কফি হাউস কিংবা কলকাতার সাবেক ক্যান্টিনগুলোর আড্ডায়। ডেকার্স লেনে চিত্তদার ঠেকে কিংবা নিজামের কাঠি রোল অথবা দক্ষিণ কলকাতার লেক মার্কেটে রাদু বাবুর চায়ের আড্ডায়। আর কলকাতার ফুটবল মরতে মরতেও বেঁচে আছে কালকেশিয়ান আর ঘটি-বাঙালের চিরন্তন লড়াইতে। যতদিন কলকাতা থাকবে ততদিন মুক্তি নেই মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের এই লড়াই থেকে।
আহা, বেঁচে থাক কলকাতা– রাজনীতি, আড্ডা, ফুটবল কিংবা দুর্গাপুজোর উর্দ্ধে থেকে। এই শহরটার অনেক কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু, অনেক কিছুই আছে যা আজও অলংকার। ন্যাপথলিন জড়ানো পুরোনো কাপড়ের গন্ধের মতো যা আজও অমলিন। অনাঘ্রাত।

