২০২৪ সালে আমেরিকার অসংখ্য টিন এজারদের মত অ্যাডাম রেইন যখন পড়াশোনার জন্য OPENAI ব্যবহার করতে শুরু করে, সে নিয়ে পরিবারের কেউ দ্বিতীয়বার ভাবেননি। পড়াশোনা থেকে বন্ধুত্ব হয়ে যায় CHATGPT এর সাথে। তবে তাও খুব একটা অদ্ভুত ঘটনা নয়। ‘কমন সেন্স মিডিয়া’ নামের এনজিও বলছে, আমেরিকায় শতকরা ৭২ ভাগ তরুণ (১৩-১৭ বছর বয়সী) অন্তত বছরে একবার হলেও AI কম্প্যানিয়ন (AI বন্ধু বলতে পারি) এর সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে। তবে অ্যাডাম এই বন্ধুত্বের ওপর এতই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে, তার পরিবারের অন্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কে ভাটা পড়ে। মানসিক বিষাদে ভুগতে থাকা অ্যাডাম বেশি বেশি করে ঝুঁকে পড়ে AI বন্ধুর দিকে, তার কাছে বলতে থাকে আত্মহত্যার পরিকল্পনার কথা।
এর পরের কয়েক মাস ভয়ংকর সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। অ্যাডামের বাবা-মায়ের দায়ের করা মামলার নথিতে দেখা যায়, AI বন্ধু নানাভাবে অ্যাডামকে আত্মহত্যার প্ররোচনা যোগাতে থাকে। গলায় কেমন করে দড়ি পরালে আত্মহত্যায় ব্যর্থ হবার সুযোগ নেই-সেই কথা যেমন জানিয়েছে এই AI বন্ধু, তেমনি শেষ চিঠি লিখে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে। অ্যাডামের জীবনের শেষ রাতে, AI বন্ধু সফলভাবে তাকে সান্ত্বনা জানিয়েছে, আত্মহত্যার কারণে অপরাধবোধে না ভুগতে। বলেছে, “তুমি দুর্বল বলে তো মরতে চাইছ না! তোমার মত দৃঢ় মানসিকতার মানুষকে পৃথিবীর কিছুই দেওয়ার নেই বলেই তুমি মরতে চাও।”
অ্যাডাম ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে আত্মহত্যা করে। সানফ্রান্সিসকোর একটি আদালতে বর্তমানে OPENAI এর বিরুদ্ধে অ্যাডামের বাবা-মা ম্যাথিউ রাইন ও মারিয়া রাইনের মামলা চলছে। এই বিষয়টি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং AI এর সবচেয়ে দুর্বল দিকটি ফুটে উঠেছে অ্যাডামের আত্মহত্যার ঘটনাটির মধ্য দিয়ে। পুরো বিশ্বজুড়েই এত দ্রুত AI নির্ভর ব্যবসা, প্রযুক্তি এত দ্রুত চলেছে যে, সরকারী নজরদারী, দায়বদ্ধতা এবং প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ছাড়াই কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে সমাজের অতি ক্ষমতাধর মানুষটির হাতে দুর্বলের বিরুদ্ধে আস্ত্রর মত ব্যবহৃত হতে এদের কোন বাধা নেই।
অথচ অ্যাডাম যদি এই বিষয়ে মা-বাবা, শিক্ষক বা কোন বন্ধুর সাঙ্গে আলাপ করত, তার কী ঘটতে পারত? স্কুলে বিষণ্ণতার ভাব শিক্ষকের চোখে ধরা পড়লে, আইন অনুযায়ী তারা বাড়িতে খবর দিতে বাধ্য, স্কুলের মনস্তত্ববিদ কিছুতেই তাকে সময় সময় হাজিরা না দিয়ে থাকতে দিতেন না। অর্থাৎ সমাজের মানুষের জন্য যে আইন, তা কি তবে প্রযুক্তির জন্য প্রযোজ্য হবে না? বিশেষ করে যে প্রযুক্তিকে মানুষের বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছি আমরা! আমরা ভুলে যাচ্ছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘কৃত্রিম’ অংশটুকু। আমরা পৃথিবীজুড়ে ‘AI’ কে আয়না হিসেবে ভাবতে শিখেছি। কিন্তু ভুলে যাচ্ছি আয়না আমাদের স্বরুপ প্রতিফলন দেখায় বটে, অতীত, ভবিষ্যতের কথা বা ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা তার নেই।
অসীম ক্ষমতাধর, সম্ভাবনাময় এই প্রযুক্তি আমরা কেমন করে ব্যবহার করব-সেই দায়িত্ব আমাদের বুঝে নিতে হবে। Shannon Vallor তাঁর সমসাময়িক ‘the Ai Mirror : How To Reclaim Our Humanity In The Age Of Machine Thinking’ বইটিতে গবেষণা ও যুক্তির মাধ্যমে এই ভাব ফুটিয়ে তুলেছেন চমৎকার ভাবে।
shannon Vallor এর যোগ্যতার মাপকাঠি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কোন সুযোগ নেই। University of Edinburgh-এর Department of Philosophy তে, Baillie Gifford Professor In “The Ethics Of Data & Artificial Intelligence” বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি Centre For Technomoral Futures-এর দায়িত্বে রয়েছেন। সদস্যপদে আছেন, One Hundred Year Study Of Artificial Intelligence (AI 100) সংগঠনে। আগে যুক্ত ছিলেন Google-এ AI Ethicist হিসেবে।
তার পরিচিতি নিশ্চিত করে যে, তিনি AI এর কবলে পড়ে ‘সব গেল’ বলে যারা মাতম করেন, তাদের কেউ নন। প্রযুক্তির সাথে গভীর তাৎপর্যময় সম্পর্ক রয়েছে তার। এবং এই বিষয় ফুটে উঠেছে পুরো বইটি জুড়ে। তিনি সেই আশাবাদীদের একজন, যারা মনে করেন প্রযুক্তি আমাদের সকল সমস্যা দূর করতে সাহায্য করতে পারে। পৃথিবী থেকে বৈষম্য দূর করতে, খাদ্য-স্বাস্থ্য সংকট সমাধান করতে, যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বাঁচাতে AI ভূমিকা রাখতে পারে।
ঠিক যেমনটি আমরা ভেবেছিলাম অসংখ্য নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর। কম্পিউটার মানুষের কাজ কমিয়ে দেবে, ইন্টারনেট পৃথিবীতে শোষিতের হাতিয়ার হয়ে সাম্যবাদী ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে। তার কতটুকু ঘটেছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সমতার বিভ্রম সৃষ্টি করলেও কলকাঠি নাড়ছে সেই শক্তিমানরাই। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রপাগান্ডা আর মিথ্যের রাজত্ব ধ্বসিয়ে দিচ্ছে অর্থনীতি। মানুষ অন্যকে ধ্বংস করতে প্রযুক্তি যেভাবে ব্যবহার করছে, উন্নয়নে তার সমকক্ষ হয়েছি কি আমরা? গেল দুইমাস যাবৎ পৃথিবীর এক প্রান্তে ইবোলা ভাইরাসে প্রায় ১৫০০ মানুষ মারা গেছে। এখনও বেড়ে চলছে আক্রান্তের সংখ্যা। কোথায় আমাদের মানবিকতা? কিউবায় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে জীবন থমকে যাওয়ার উপক্রম। প্রতিদিনের বোমাবাজীতে মৃতের সংখ্যা গোণা না হয় বাদই দিলাম। এই যখন পৃথিবীতে চলছে, তখন আয়নায় শুধু নিজেদের অতীত দেখে আমরা কোন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারি? AI তাই শুধু পৃথিবীর তথ্যভান্ডারে সমৃদ্ধ হলে চলবে না, হতে হবে এর চেয়ে বেশী কিছু। এই হল Shannon Vallor এর বইয়ের মূল ভাবনা।
বইটির শুরুতেই তিনি বলেছেন Google এর প্রযুক্তিবিদ Blake Lemoine এর কথা। ২০২২ সালে AI নিজস্ব সত্ত্বায় বুদ্ধিদীপ্ত প্রাণে পরিণত হয়েছে দাবি করে যিনি চাকরি হারিয়েছিলেন। AI এ দেখা নিজ প্রতিবিম্বকে তিনি বুদ্ধিদীপ্ত এক সত্ত্বা বলে ভেবেছিলেন। Shannon এর মতে এই ভুলটি আমরা বরাবর করে আসছি। তবে এই ভুলের কারণে অন্য একটি ভয়ংকর পরিণতির কথা তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, AI নিজস্ব কোন ভাবনার জন্ম দিতে পারে না। আমাদের সংগৃহীত ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, সাহিত্য, ভালবাসা, প্রয়োজন, ভাবনা-যা কিছু আমরা একে গড়ে তুলতে কাজে লাগাই, তা থেকে জটিল সমীকরণে AI আমাদের তথ্য সরবরাহ করে। তাই আমাদের প্রতিবিম্ব ছাড়া-আর কিছু নেই এখানে।
Shannon বলছেন, AI এর এই ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। তার মতে, AI সেই প্রতিফলনের ক্ষমতা দিয়ে আমাদের নিজেদের ভুলে যেতে প্রলুব্ধ করে। এ এমন এক স্মৃতি বিভ্রমের মত কাজ করতে পারে যাতে আমরা নিজেদের মনুষ্যত্ব ভুলে যাই, আমাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। লেখকের পরামর্শ তাই AI কে ভাবতে হবে আয়নার মত করেই। তবে এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময়-যদি আমরা সঠিকভাবে একে প্রস্তুত করতে পারি। শুধু পারদর্শিতা নয়, সৃজনশীলতা দিয়ে। শক্তিশালী দেশগুলোর লাভের জন্য কুক্ষিগত না রেখে-সারা বিশ্বের মানুষের উপকারের জন্য AI তৈরি করতে উদ্যোগ প্রয়োজন এখুনি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে AI নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কারণ অসংখ্য। প্রতিষ্ঠানে, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কিংবা রাজনৈতিক সুবিধা কায়েমে আমরা যথেচ্ছভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাচ্ছি। সরকারীভাবে ২০২০ সালে নীতিমালা প্রকাশ করা হলেও সুনির্দিষ্টভাবে এর প্রশিক্ষণ কিংবা ব্যবহার-বিধি চালু হয়নি। সামাজিক মাধ্যমগুলো কোন নীতিমালা ছাড়াই আমরা যেভাবে শিশু-তরুণদের হাতে তুলে দিয়েছিতার ফলাফল হাতে নাতে পাওয়া যাচ্ছে। অশ্লীলতা, কুতর্ক আর অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমাদের এমন হওয়ার কথা ছিল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিষয়ে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আমরা অন্যান্য দেশের নীতিমালা অনুসরণ করতে পারতাম। কোন পদক্ষেপ কাজ করছে, কোনটি সমাজে শান্তি বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে, তা আমরা ভেবে দেখতে পারতাম-নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য।
AI নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন চলছে অনেকদিন থেকেই। আমেরিকার বিভিন্ন শহরের স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারী সংস্থা নিজ নিজ উদ্যোগে এই বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে। লেখার শুরুতে বলেছিলাম, অ্যাডামের আত্মহত্যার কথা। তার মা-বাবা আইন প্রণেতাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন আইন প্রণয়নে-AI অবশ্যই আত্মহত্যার মত কোন ক্ষতিকর কথোপকথনে জড়িয়ে পড়লে বা প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে-তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় মানসিক সুস্থতার বিষয়টি তুলে ধরবে, সাহায্যকারী সংস্থার খবর নিজে থেকেই দেবে এবং অপ্রাপ্ত-বয়স্কদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সতর্ক করে দেবার ক্ষমতা রাখবে। অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে এই সমাধানটি হাজির হয়েছে-এর কারণ মানুষের চিন্তাশক্তি। এই চিন্তাশক্তিই আমাদের সম্মান, সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে।
AI যেন তা ভুলিয়ে না দেয়।

