কেন বলুন তো এমন হলো? অকথ্য বা নোংরা গালিতে কেন ভরে যাচ্ছে বাংলা ভাষা? কারা এই নোংরা গালির স্লোগান তৈরি করছে? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা কি এই স্লোগান তৈরির কারিগর, কেন? আমরাও তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে এসেছি, আমরাও তো শুনেছি অনেক স্লোগান— সেইসব স্লোগান তো প্রতিবাদী ছিল, সুন্দর, জননন্দিত, গ্রহণযোগ্য, এবং শ্রুতিমধুর ছিল। একটু পিছন ফিরে যদি তাকাই অথবা শুনি অথবা পড়ি—তাহলে দেখবো স্লোগানগুলো প্রতিবাদী হয়েও আজকালকার স্লোগানের মতো নোংরা, শ্রুতিকটু কিম্বা জনঘৃণিত নয়। আমারা জানি বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সুতিকাগার ১৯৫২। মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার সেই দাবী ওঠে—১৯৪৮ সালেই, যখন পাকিস্তানের প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ঢাকায় এসে বলেন, ‘উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা’। সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠলো ঢাকার ছাত্রসমাজ। নির্মাণ করলো প্রতিবাদী স্লোগান—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে’ এবং ‘রক্ত দিয়েছি, বাংলা চাই’। পরের স্লোগানই ছিল ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’— যা আন্দেলনরত ভাষা সংগ্রামীদের গভীর রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচায়ক। আর এই স্লোগানগুলো ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনাকে প্রতিফলিত করে, যার লক্ষ্য ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। পাশাপাশি পোস্টার, কবিতা— স্লোগানের সুরকে আরো তীব্র করেছে। যেমন— ভাষা আন্দেলনের প্রথম কবিতার প্রথম কয়েকটি চরণ ‘এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে রমনার উর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়…’ বা বর্ণমাল আমার দুঃখিনী বর্ণমালা…’ ইত্যাদি। এছাড়া গান, কার্টুনসহ নানা মাধ্যমে প্রতিবাদ হয়েছে।
এবার আসি ভাষার রক্তসিঁড়ি পেরিয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে। ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশের দশক এবং ষাটের উত্তাল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন পেরিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির নির্মিত বা তৈরিকৃত স্লোগানগুলো দেখুন, তুলে ধরছি, যেমন— ১. জয় বাংলা: এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রধান স্লোগান, যা সব মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছিল। এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ২. জয় বাংলা, বাংলার জয়: এই স্লোগানটি ১৯৭১ সালে সমগ্র বাঙালিকে মুক্তির অগ্নিশপথে জাগিয়ে তুলেছিল। ৩. বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো: এই স্লোগান তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের দেশ স্বাধীন করার মহান দায়িত্বে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ৪. তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা: এই স্লোগানটি আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র বাংলাদেশকে এক সূত্রে গেঁথেছিল। ৫. তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব: এই স্লোগান বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার নেতৃত্বকে সবার মাঝে বাঁচিয়ে রেখেছিল। লেখক অন্নদাশংকর রায় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লিখলেন—‘যতকাল রবে পদ্মা মেঘনা যমুনা গৌরি বহমান/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’—এই কবিতার চরণও যেন অমর স্লোগানোত্তর কবিতা। আর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যই যেন এক একটি স্লোগান, এক একটি অমর কবিতা।
এরপরে আমরা যখন— স্বাধীন ও সার্বভৌম লাল-সবুজের পতাকার বাংলাদেশে দুঃশাসনে স্বৈরশাসকরা দানব হয়ে ওঠে—তখনও ছাত্র-জনতা নানা রকম স্লোগান নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে। বিশেষ করে পুরো আশির দশকজুড়ে স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে স্লোগানগুলো ছিল— ‘হটাও এরশাদ বাঁচাও দেশ’ ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ‘আমার ভাই জেলে কেন/ স্বৈরচার জবাব দে’ ‘বসুনিয়ার রক্ত বৃথা যেতে পারে না’ ‘আমার ভাই মরলো কেন/ খুনি এরশাদ জবাব দে’ ‘এরশাদ তুই কবে যাবি’— ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন গড়ে উঠলো কবিতা পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তারা মঞ্চ তৈরি করে কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদ শুরু করলো, পোস্টারে লিখলো— ‘শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা।’
এছাড়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাজপথে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডত্তোর স্লোগান দিচ্ছে—‘এক মুজিব লোকান্তরে/ লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’ ‘আমরা সবাই ছাত্রলীগ/ নেতা মোদের শেখ মুজিব’ ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়/ রাজাকারের ঠাঁই নাই’। আবার জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও ছাত্রলীগের আদলে স্লোগান দেয়— ‘এক জিয়া লোকান্তরে/ লক্ষ জিয়া ঘরে ঘরে’। বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর স্লোগান বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, তবে এর মধ্যে সাধারণ স্লোগানগুলো হলো— ‘শিক্ষা আমার অধিকার’ ‘শোষকের প্রতি ঘৃণা, শ্রমিকের প্রতি ভালোবাসা’, ‘শিক্ষার মান, ছাত্রের অধিকার,’ ‘গণমুখী শিক্ষা চাই, ‘জাতীয় সম্পদ রক্ষা করো’ এবং ‘প্রতিরোধ, সংগ্রাম, এগিয়ে চলো’। এই স্লোগানগুলো ছাত্র অধিকার, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে সমর্থন করে।
শুরুর কথায় আসি— সাম্প্রতিক অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ও আন্দোলনোত্তর সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র-জনতার কিছু অশ্লীল শব্দে অর্থাৎ নোংরা ভাষায় কিছু স্লোগান বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই ঐতিহ্যের ধারায় যে স্লোগানগুলো ছিল সেগুলোকে দারুণভাবে ম্লান করে দিয়েছে। বিশেষ করে জেনারেশন-জি— যারা এই আন্দোলনকে সংঘটিত করেছে, তাদের মুখে এই সময়ে এসে এরকম স্লোগান সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলে অভিজ্ঞ ও সভ্যরা মত দিয়েছেন। প্রথমতঃ যখন কোটা ইস্যুতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের সময় মূল স্লোগান ছিল—‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’। ঠিক আছে ভালো। কিন্তু পরবর্তীতে এই স্লোগানটির প্যারোডি ভার্সন—‘কোটা না মেধা, তোর মায়ের সেডা’— কেন এরকম হলো? তারপর— ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’ ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’ ‘তুমি কে আমি কে রাজকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরচার স্বৈরচার’ ‘চাইলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ/ যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমিই বাংলাদেশ’।
এসময় ছাত্রলীগের স্লোগান এলো— ‘আছিস যত রাজাকার/ এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’। আবার এর পাল্টা স্লোগান শোনা যায় ‘স্বৈরাচার, স্বৈরাচার/ এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’। ছাত্রলীগের পরের স্লোগান—‘জনে জনে খবর দে/ এক দফা কবর দে’। এর জবাবে পাল্টা স্লোগান—‘জনে জনে খবর দে/ ছাত্রলীগের কবর দে’। এরপর স্লোগান তৈরি ও বলা ক্রমশঃ চলে—‘আমার খায়, আমার পরে/ আমার বুকেই গুলি করে’ ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়/ বুক পেতেছি গুলি কর’ ‘তোর কোটা তুই নে,/ আমার ভাই ফিরিয়ে দে’ ‘লাশের ভিতর জীবন দে/ নইলে গদি ছেড়ে দে’। এর বিপরীতে ছাত্ররা স্লোগান দেয়—‘তুমি কে? আমি কে?/ বিকল্প, বিকল্প’। আন্দোলনকারীদের আবার স্লোগান ওঠে ‘আপস না সংগ্রাম?/ সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘দালালি না রাজপথ?/ রাজপথ, রাজপথ’ ‘কে এসেছে? কে এসেছে?/ পুলিশ এসেছে।/ কী করছে? কী করছে?/ স্বৈরাচারের পা চাটছে’ ‘এক দুই তিন চার,/ শেখ হাসিনা, গদি ছাড়’, ‘দফা এক দাবি এক,/ শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ কিংবা ‘এক দফা, এক দাবি/ স্বৈরাচার তুই কবে যাবি’ ‘ঢাকায় আসো জনতা,/ ছাড়তে হবে ক্ষমতা’ ‘পালাইছে রে পালাইছে,/ হাসিনা পালাইছে’….ইত্যাদি ইত্যাদি। ধরুন এ পর্যন্ত ঠিক আছে, কিংবা ‘আমিও জানি তুমিও জানো/ ছাত্রশিবির পাকিস্তানি’। এর পাল্টা শিবির ও সেই পন্থীদের স্লোগান হলো—‘গোলাম আজমের বাংলায় স্বৈরচারের ঠাঁই নাই’। কিন্তু পরবর্তীতে স্লোগানের ভাষা কেন নোংরা হলো? যেমন— ‘পা চাটলে সঙ্গী, না চাটলে জঙ্গি’ ‘টিনের চালে কাউয়া, তারেক রহমান শাওয়া’ ‘এক দুই তিন চার তারেকেরে পুটকি মার’ ‘খানকি মাগী হাসিনা/ তোরে আমরা চুদি না’ ‘পাতার নাম পুদিনা/ বিএনপি তোরে চুদি না…’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আচ্ছা শেষের দিকের গুলোকে কি স্লোগান বলবেন? না এগুলো প্রতিহিংসার চরম ও জঘন্য গালি। বাংলা ভাষায় গালি আছে তবে যে শিক্ষিত ছাত্র-সমাজ যারা দেশের নেতৃত্ব নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ ও উদগ্রীব তাদের মুখে কি নোংরা ভাষার এসব স্লোগান মানায়? এরা যদি এরকমই হয়— তাহলে ভবিষ্যতে আমরা কেমন বাংলাদেশ পাবো? প্রশ্ন…?

শিহাব শাহরিয়ার | ঢাকা, বাংলাদেশ
কবি, ফোকলোর গবেষক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, কলামিস্ট, উপস্থাপক। সম্পাদনা করছেন লোকনন্দন বিষয়ক পত্রিকা ‘বৈঠা’। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৩১টি।
