আত্মধাম: পরিচয় একটাই, কথাও একখান

শামীম আজাদ | মার্চ ২৩, ২০২৬
April 16, 2026

‘পরিচিতি’ বা ‘আইডেন্টিটি’ শব্দটি কোনো যাদু না যে দুম করে যে কোন কিছুতে জব্দ হয়ে যাবে। এর নির্মাণে লেগুন, লেগেসি ও লিজেন্ডসহ আরো বহুবিধ অনু পরমাণু কাজ করে। অন্যদিকে বস্তুর্নিভর, বস্তুকেন্দ্রিক মানুষের এ থেকে নিস্তার নেই। তারা নিস্তার চায়ও না। ব্যতিক্রমও আছে, যার বা যাহাদের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে গৌরব নেই। আমরা প্রথম দলের। পরিচিতি প্রাপ্ত যে কোনো কিছুর অস্তিত্বের কিন্তু বিনাশ না হওয়া পর্যন্ত তার পরিবর্তন প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকে। সে প্রক্রিয়ায় তার বিলোপ যদি হয়ও, তথাপি পরিচিতি র্নিধারিত হয় তার পরিক্রমণ ইতিহাস দ্বারাই। হয় যাচাই বাছাইয়ের পর। এক পরিচিতি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও তা যে কোনো কার্য-করণে, সামাজিক অভ্যুত্থানে তা কিঞ্চিত বদলে গেলেও পুরো পাল্টে যেতে পারে না। ভাষার মতই এ এক চলমান প্রক্রিয়া। ‘আইডেন্টিটি’ শব্দটিকে নিমিত্ত ধরলে তার ‘চিহ্নায়ন’, ‘মার্কিং’ অথবা ‘ব্রান্ডিং’ শব্দের প্রক্রিয়াতেই তা ব্যাখ্যাত হতে পারে। সনাক্তি-স্বরূপ পরিচয়ের প্রক্রিয়াতে পঞ্চইন্দ্রীয় প্রসূত অভিজ্ঞতার সবগুলো ছাপিয়ে যা ডমিনেট করে তাই হয় প্রধান সূচক।

মানুষ চিহ্নিত হয় ব্যতিক্রমী আচারে। সড়কের সনাক্তি হয় কিলোমিটার ফলকে। একটি দেশের ছায়া থেকে আরেকটি দেশের ছায়া আলাদা করার অন্যতম বিষয় তার সম্পদ – ভৌগলিক, আকার ও পরিবেশ এবং সে দেশের মানুষের অবদান। প্রাকৃতিক নির্যাতনে বা অনুগ্রহে কোন দেশের নিজস্ব ভূমিকা না থাকলেইবা কি, তাতেও দেশ হয় ব্রান্ডেড।

একটি দেশের চারিত্রিক স্খলন অথবা প্রচার উল্লম্ফণেও তার চিহ্নায়ণ সম্ভব হয়। চিহ্নায়ণ চলে সে দেশ অভ্যন্তরের শিল্প-সাহিত্য, চিত্রকলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এবং সে দেশের মানচিত্রের বাইরে থাকা মানুষের আচার আচরণেও। দেশের সাধারণ মানুষ তাদের রাজনৈতিক অভিব্যক্তিতে ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বার বার তার বির্নিমাণ করেছে। লাগাতার ক্ষমতায় থাকার কারণে রাজনৈতিক নেতা ও নেতৃরা তা গুলিয়ে ফেল্লেও সাধারণ মানুষ তা গুলায় না, বিভ্রান্ত হয় না। কত রকমের কত আন্দোলন বিপ্লব ঘটে এবং আমাদের দেশেও তা ঘটেছে। আর তাতেই আত্মপরিচিতির সুষ্পষ্ট একটা রেখা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। এখন দেখা যায় একটাই রেখা যা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে হয়েছে আঁকা। যা ছাপিয়ে উঠতে পারেনি আর কিছুই।

গাত্রবর্ণের কথা বাদই দিলাম। আমি কি আহার করি, মাংস না মাছ ভোজী, জন্মসূত্রে কোন ধর্ম পেয়েছি, ভাবনাসূত্রে কি বিশ্বাস? কোন সে ভূগোল, দেশ, জাতীয়তা? লিঙ্গ, সংস্কৃতি, বিচ্যুতি? কে আমার জৈবিক অভিভাবক? আমার ভাষা কি? বিত্ত কত পরিমাণ? নাহ, বিভাজনে তালিকা বাড়ছেই কেবল! কিন্তু এমন এমনই অনেক কিছুই ছেনে নির্ণয় করা হয় আমি কাহার জন্ম বা কি আমার পরিচিতি। আমি শুধু আমি কে, বলে যে ভাবি তা নয়। এখানে পৃথিবীর অন্যরা আমাকে আমি কে বলে চিহ্নিত করেন, সেটাও কথা এবং কোন মাটিতে বসে চিহ্নিতকারী তার চিহ্নায়ণের যোগ বিয়োগ করছে তাও উল্লেখ্য।

ঘটনাগুলো এরকম, সমুদ্র ফেঁড়ে ওঠা এই বদ্বীপে বিভিন্ন সময়ে অনুপ্রবেশ করেছে ভিনদেশী লেবাস ও ধর্ম। আমাদের জাতিসত্তার চিহ্নায়ণে বাঙালিয়ানার স্থানে যুক্ত হয়েছে নানান বিভ্রান্তি। দেশ থেকে উপ্ত সে বিষ ছড়িয়েছে বিদেশেও। আমরা রিব্রান্ডেড হতে চলেছি একটি একদেশদর্শী, ধর্মীয় এক জঙ্গী জাতি হিসেবে। তাই হয়তো আমরা বৈশ্বিক চাপে ঠেকেই একটি ভয় দেখানো পরিচিতির খোঁজ করেছি। কিন্তু সর্বজনীন বৈশ্বিক অভিব্যক্তি খোঁজার চেয়ে দেশের কি রয়েছে তাই খোঁজা দরকার। আমার মায়ের প্রাকৃত ও প্রধান বেশ রেখে অন্যের পোশাক পরে ক্যাট ওয়াকে নামার কি কোন দরকার আছে? নেই। একথা মনে করে বাংলাদেশের ঘটনার রঙ খুঁজলেই কিন্তু আমরা সর্বজনীন প্রতীকি কিছু উৎসব পেয়ে যাই। শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বাংলা নববর্ষ উদযাপন। সাদা-কালো, লাল-সবুজ এবং লাল-সাদা এসব দিনের প্রতীকি রঙ। এ আমাদের অবয়বে পরিচয় তিলক বা সাইন পোস্ট হয়েছে। এতে আমাদের পোশাক-আশাক, আহার-আচরণ, আপ্যায়ন-আমোদ, রুচি ও রাগ, সঙ্গীত ও সাহিত্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, চেতনা ও চাঞ্চল্য সবই মূর্ত।

উক্ত দিবসগুলো উদযাপনে আমাদের দেশ চিহ্নিত হয় মানবধর্মবাদী এক অসাম্প্রদায়িক, আনন্দপ্রিয় প্রাচীন জাতি হিসেবে। উনিশ শ’ বাহান্নতে রোপিত প্রশ্নচিহ্ন বীজের উত্তর খুঁজে খুঁজে আমরা হেঁটেছি দীর্ঘ। বিভিন্ন আন্দোলনে, রঙে ও রেখার র্নিমাণে আমাদের দেশের যে চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে তার অন্যতম প্রতিসরন ঘটে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে। যেখানে সকল ধর্ম, বর্ণ, নৃ-গোষ্ঠি, সম্পদবান, সম্পদহীন, বিভিন্ন নেশা ও পেশার মানুষ এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে যান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বাঙালির পরিচিতি ঠিক ততটাই পরিস্ফূট করা সম্ভব হয়, যতটা বর্হিবিশ্বে আর সবার কাছ থেকে আমাদের জাতিসত্তাকে আলাদা করা যায়। দেশের ভেতরে থাকলে দেখা যায় এর অসুখ-বিসুখ। আর দেশান্তরী হলে দূর থেকে দেখা যায় তার প্রকৃত রূপ। আমি তাই দেখি।

আচ্ছা, স্মৃতি কি আমাদেরকে মুক্তোর মতো ভেতরে রেখে বাইরে পরিচিতির ঝিনুক তৈরি করে? নাকি ব্যক্তি পরিচিতি স্মৃতিগুলোকে শুকনো কাপড়ের মতো গুছিয়ে রোদ বৃষ্টি থেকে তুলে নিজের ইচ্ছেমত ঘরে বসিয়ে রাখতে পারে? আত্মপরিচিতির মত একটি জটিল বিষয়ের নিষ্পত্তি এই দু’চার কথায় সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষে মানুষে ক্রমবর্ধমান বিভাজন আমাদের বিপন্ন করে তুলছে। আমরা ভাবতে বাধ্য হচ্ছি। অথচ বিভাজন বাদ দিয়ে একটি সম্মিলন-সূচক তুলে নিলে তালিকা ছোট হয়ে যায়। জীবন সোজা হয়ে যায়। অস্ত্রব্যবসায়ী জাতি গর্তে পড়ে যায়। যে সূচকের নাম ‘মানুষ’। আমরা সবাই প্রথমত ‘মানুষ’। দ্বিতীয়তও আমরা ‘মানুষ’, এবং শেষ পর্যন্ত আমরা মানুষ।

বৈশ্বায়ণের কারণে যে কোন সংস্কৃতির পরিবর্তন, নবায়ন ও যুগোপযোগিকরণ অপরিহার্য। বিবর্তন না হলে এগুনো তো ব্যাহত হয়। তবু আমার যে বুকটা চিন চিন করে তার কারণ কি? সে কি আমার নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতির উপমা হারিয়ে যাচ্ছে বলে, নাকি আমাদের সমষ্ঠিগত আত্মবিক্ষণের অনুপান হারিয়ে ফেলছি বলে। কেউ কেউ ভাবতে পারেন তারও কি কোন দরকার আছে? ইমোশনের কারনে কিছু ধরে রাখা কি ঠিক? আমার ধারণা নিটোল বর্তমান বলে কিছু নেই। সবই আসলে অতীতের উপর। তাই বর্তমান নিয়ে ভাবলে বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের আত্ম-পরিচয় একদিন লুপ্তও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তার নতুন নির্মাণ হতে হবে, পুরাতন মুছে নয়। জীব-বৈচিত্র্য যেমন জীবের টিকে থাকার জন্য জরুরি। তেমনি মানুষের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বৈচিত্র্য ও তাদের মনের স্থিতিশীলতার জন্য সমান জরুরি; তাই সে ধারাবাহিকতা রাখাটা আরো জরুরি। পৃথিবীর সব জাতি সব গোষ্ঠীর শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিরই বিবর্তন ঘটে। বাঙালি সংস্কৃতিও সেই পথ ধরে চলছে। শত বছর আগের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে আজকের বাঙালি সংস্কৃতির পুরো মিল থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক। তবে ধারাবাহিকতা না থাকলে সেটা এক সময় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

দেশে একটার পর একটা নাম, শুভেচ্ছা বাক্য, লেবাস পরিবর্তন করা প্রত্যক্ষ করে আমি অনেক ভেবেছি। উপলব্ধি করেছি এক মানুষের ছায়া থেকে বা মানুষ থেকে আরেক মানুষকে আলাদা করে দেখবার দরকার আছে। তাই বহির্বিশ্বের বাঙালিরা বাংলা নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস একবার উদ্‌যাপন করতে শুরু করলে আর থামেন না। সেটি চলতেই থাকে। নববর্ষের আনন্দানুষ্ঠান শুরু বাংলা মাস বৈশাখ থেকে শুরু করে চলে প্রায় জৈষ্ঠ মাসের শেষাবধি। কিন্তু নাম থাকে বৈশাখীমেলা। একবার বিলেতের বৃহৎ বৈশাখী মেলা হয়েছে জুলাই মাসে! ভাবা যায়? ঐ একটাই কারণ, এ হচ্ছে বাংলাদেশীদের পরিচিতি পতাকাবাহী অনুষ্ঠান। তাই তা তার শব্দগত অর্থ দেশে না ছড়ালেও বিদেশে তা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বময়।

মানুষের কত কিছুই হারিয়ে যায়। চশমা, ডায়েরী, গয়না, ঘড়ি। এমন কি হারিয়ে যায় মানুষও। শুধু দেহগতভাবে সুস্থ্য মানুষ হারায় না স্মৃতি। স্মৃতি তো চকে লেখা ব্ল্যাক বোর্ড না। চাইলেও মোছা যায় না। আমাদের এক ও অনন্য স্মৃতি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের গাঁথা। ডিকেন্সের কথায় বলা যায়— ইট ওয়াজ আওয়ার বেস্ট অফ টাইম। ইট ওয়াজ আওয়ার ওয়ার্স্ট অব টাইম। এত কষ্ট আমরা এর আগে করিনি। এমন শ্রেষ্ঠ ফলও আমরা এর আগে পাইনি। একাত্তরের অবিস্মরণীয় কর্মকাণ্ডের কোন তুলনা করার উপায় নেই। পরিচয় একটাই, কথা একটাই— সে হোল অনির্বাণ একাত্তর। এর চেয়ে আর কিছু লাগে না। আমাদের পরিচয় ঐ একটাই, কথাও একখান।


শামীম আজাদ | লন্ডন, যুক্তরাজ্য

বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত কবি ও সাহিত‍্যিক।

Previous Story

অকথ্য গালি কেন স্লোগানের ভাষা?

Next Story

পড়শী’র সাথে

Latest from নিয়মিত কলাম

সলঝেনিৎসিন, তাজউদ্দীন এবং নৈতিক রাষ্ট্রনায়কত্বের পথরেখা

মানুষের জীবনে সত্য, সৃষ্টিশীল চিন্তা, আত্মসংযম ও মানবিক কর্তব্য—এই চারটি মূল্যবোধই আমাদের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে। - লিখেছেন শারমিন আহমদ।

অদ্বিতীয়া বইগল্প

“নারীদের খুব সহজেই চরিত্রহীন বলে বিভূষিত করা যায়। ‘বার-বিলাসিনী’, ‘বারনারী’, ‘বারবণিতা’, ‘গণিকা’, ‘বারাঙ্গনা’— আলোচনা করেছেন ড. জাকিয়া আফরিন।