পড়শী: সন্ধিক্ষণে ফিরে দেখা

মাহমুদুল হাসান | ২০ মার্চ, ২০২৬
April 16, 2026

বন্ধু ও সতীর্থ ড. সাবির মজুমদারের উদ্যোগে এবং পুনরোদ্যোগে ‘পড়শী’ নতুন আঙ্গিকে প্রকাশিত হচ্ছে শুনে খুব ভালো লাগছে। এ প্রসঙ্গেই আমন্ত্রণ এলো নতুন পড়শী প্রথম সংখ্যার জন্য একটি লেখা তৈরি করতে হবে। লোভ সামলাতে না পেরে রাজি হয়ে গেলাম। পরে বুঝলাম পড়শী প্রকাশনা বন্ধ হবার পর বহু বছর কলমে কালি ভরা হয়নি, জং ধরা বাংলা কিবোর্ড! তদুপরি সম্পাদকীয় তাগাদায় বাধ্য হয়ে ভীরু হাতে কলম ধরতে হলো। অনুরোধ আছে, পড়শী’র পুনর্জন্মের প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হিসেবে ফিরে তাকাতে হবে সময়ের দিকে—তথাস্তু!

পড়শী’র কথা শুরু করবার আগে আরেকটু পেছনে তাকানো যাক। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। আমি তখন কানাডার অটোয়া শহরে কর্মজীবন শুরু করেছি ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে (মন্ট্রিয়ল) পড়াশোনা শেষ করে। বহুদিন থেকেই প্রবাসে বাংলা প্রকাশনার একটা স্বপ্ন ছিলো ভেতরে—একটা ভিন্ন ধাঁচের প্রকাশনা। নিউইয়র্ক থেকে সে সময়ই গোটা তিন-চারেক বাংলা পত্রিকা ছিল—‘প্রবাসী’ তাদের অন্যতম। সেরকম ‘কাট এন্ড পেস্ট’ ধরনের প্রকাশনায় উৎসাহ ছিল না। লক্ষ্য ছিল—প্রবাসের বাংলা লেখকদের লেখা নিয়ে একটা প্রকাশনা হবে, যাতে শিল্প-সাহিত্যসহ মৌলিক চিন্তা-ভাবনার খোরাক থাকবে। শুরু হলো একটু ভিন্ন ধাঁচের মাসিক প্রকাশনা ‘মাসিক বাংলাদেশ’।

প্রথম দু-এক বছর ব্যাপারটা বেশ কষ্টকর ছিলো। তখনও টেকনোলজি অনেক পেছনে—ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, কম্পিউটারে বাংলা লেখা ছিল একেবারে শৈশবে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নিজস্ব ম্যাকিনটোশ (ম্যাক) কম্পিউটারে সফটওয়্যারের সাহায্যে কম্পোজ করে ফটোকপি করে প্রকাশিত হতে শুরু করলো ‘মাসিক বাংলাদেশ’।

প্রথমদিকে ‘মাসিক বাংলাদেশ’ নামটা নিয়েও বেশ বিপত্তিতে ছিলাম। কমিউনিটিতে প্রশ্ন উঠলো—এ কি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের পত্রিকা? নাহলে ‘বাংলাদেশ’ নামের যৌক্তিকতা কী, বাঙালী পত্রিকা শুধু ‘বাংলা’ নাম নয় কেন! আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী হলেও যে বাংলাদেশী হতে পারি এবং সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালী হতে পারি—এ কথাটি বিশ্বাস করানো খুব সহজ ছিলো না। যাহোক, সময় গড়াতে লাগলো, প্রকাশনার বিষয়বস্তু, লেখকদের সম্পৃক্ততা ইত্যাদি থেকেই ক্রমশ এ সন্দেহটার অবসান করা গেলো।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রকাশনার সাথে তৎকালীন প্রবাসের অনেকেই নানাভাবে জড়িয়ে গেলেন। তাদের সহযোগিতায়, পরামর্শে, অংশগ্রহণে ক্রমশ পত্রিকাটির প্রসার সহজতর হলো, এবং আমার উৎসাহও বাড়তে থাকলো। এদের মধ্যে কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করবো, যাদের কাছে আমি চিরঋণী। অটোয়ার প্রয়াত গণিতের অধ্যাপক ড. মীজান রহমান, টরন্টোপ্রবাসী একুশে পুরস্কার পাওয়া দুই স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব—প্রয়াত কবি ইকবাল হাসান, চিত্রশিল্পী এবং লেখক সৈয়দ ইকবাল, অটোয়ার সাংবাদিক প্রয়াত ফারুক ফয়সাল, টরন্টোর ইকবাল হাসনু এবং হাসান মাহমুদ, নিউইয়র্কের আলম খোরশেদ, মন্ট্রিয়লের সুপ্রিয় মালাকার শুভ, মামুনুর রশীদ, এবং আরো অনেকে। সর্বোপরি, অধুনা টরন্টোপ্রবাসী বন্ধু, সাংবাদিক, কবি এবং প্রকাশক কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। আমি নিশ্চিত ধূসর এবং দুর্বল স্মৃতির আড়ালে নিতান্ত অনিচ্ছায় চাপা পড়ে গেছে কিছু নাম। এজন্য আমি আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থী।

১৯৯৬ সালে পেশাগত কারণে আমি অটোয়া থেকে আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে (ওরেগন) চলে আসি। সেই সঙ্গে গুটিয়ে ফেলতে হয় ‘মাসিক বাংলাদেশ’ প্রকাশনা। এ প্রসঙ্গে এতো কথা এজন্যই বলা যে পরবর্তীতে একই রকম উদ্দেশ্য এবং আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুরু হয় ‘পড়শী’, তবে বেশ কিছুদিন পর।

আমি তখন ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালীতে কর্মরত। প্রকাশনার পোকাটি তখনও মস্তিষ্কে যন্ত্রণা দেয়। সিলিকন ভ্যালিতে বিরাট কমিউনিটি, চায়ের আড্ডায়, দাওয়াতের টেবিলে আলোচনা চলে নানা বিষয়ে; আমি সুযোগ পেলেই উৎসাহীদের সঙ্গে বাংলা প্রকাশনার কথা তুলি। ইতিমধ্যেই নিউইয়র্কে সাপ্তাহিক পত্রিকার সংখ্যা বেড়েই চলেছে, হাতে গুণে শেষ করা অসম্ভব। মূল কারণ, ততদিনে সস্তা কম্পিউটিং এবং প্রিন্টিং-এর কল্যাণে ‘কাট এন্ড পেস্ট’ মডেলের পত্রিকা প্রকাশনা খুবই সহজ হয়ে গেছে।

যাহোক এ সময়ই আমার সঙ্গে সিলিকন ভ্যালিতে আলাপ হলো সাবির মজুমদার এবং ‘যায় যায় দিন’ খ্যাত জাকারিয়া স্বপনের। আমাদের আলোচনা দানা বাঁধলো একটা প্রকাশনার স্বপ্নকে কেন্দ্র করে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একটা মাসিক প্রকাশনা শুরু করবো। আলোচনা প্রায় শেষের দিকে। সে সময় কেন যেন হঠাৎ করেই জাকারিয়া স্বপন পিছিয়ে গেল! এটা আমার কাছে বিস্ময়ই থেকে গেছে! স্বপন আমাদের সঙ্গে কলামিস্ট হিসেবে জড়িত ছিলো অনেকদিন। এ সময়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলো আমার বুয়েট সহপাঠী মাশুকুর রহমান। আমাদের তিনজনের উদ্যোগে শুরু হলো মাসিক প্রকাশনা ‘পড়শী’।

পড়শী’র স্লোগান ছিল ‘বিশ্ব বাঙালির মুখপত্র’। এর তাৎপর্য এই নয় যে এটা সারা বিশ্বের বাঙালি মন জয় করে নেবে, সেটা হলে তো মন্দ ছিলো না। বরং স্লোগানের ব্যাখ্যাটা হলো—বাঙালি ছড়িয়ে পড়েছে এ বৈশ্বিক পৃথিবীতে (Global World), সব দেশে। এই ট্রেন্ড বাড়তেই থাকবে। এই বাঙালি ভাষায়, সংস্কৃতিতে, চলনে-বলনে অনেকখানিই ‘দেশি’ বাঙালির মতো। তারপরও তাদের নিজস্ব ও প্রবাসী সমাজ আছে, টানাপোড়েন আছে, দৃষ্টিভঙ্গি আছে। এগুলোকে তুলে ধরার, প্রতিফলিত করার, প্রকাশ করার অঙ্গীকার নিয়েই শুরু হয়েছিল বিশ্ব বাঙালির মুখপত্র পড়শী।

২০০০ দশকের গোড়ার দিকে, ২০০১ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হলো পড়শী’র প্রকাশনা। আমরা তখন সিলিকন ভ্যালিতে। বন্ধুদের সহযোগিতায় গঠিত হয় প্রথম সম্পাদকমণ্ডলী। ‘মাসিক বাংলাদেশ’-এ যারা লেখক এবং সহযোগী ছিলেন তাদের প্রায় সবাই যুক্ত হন পড়শী’তে নানা ভূমিকায়। ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে শুরু করে পড়শী’র গণ্ডি। এর মাঝে কয়েকজনের সম্পৃক্তি উল্লেখযোগ্য আমার কাছে। এরা হলেন আমার সহপাঠী স্যাক্রামেন্টো প্রবাসী ড. নজমুস সাকিব, সিলিকন ভ্যালির সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ড. জাকিয়া আফরিন এবং নিউইয়র্কের বিশিষ্ট শিল্পী, লেখক এবং মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম। আবারো বলি, প্রকাশনার দীর্ঘ প্রায় দুই দশকে অনেক লেখক, সহযোগী, স্বেচ্ছাসেবী আমাদের এই যাত্রায় হাত বাড়িয়েছেন। তাদের সবার কাছে আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞ। সবার নাম বলে শেষ করা যাবে না।

পড়শী তখন ছাপাখানায় মুদ্রিত হতো। কন্টেন্ট তৈরি হতো এখানে, ছাপা হতো ঢাকায়, মেইলে পৌঁছাতো আমাদের কাছে, তারপর আমরা মেইল করে পাঠকদের পাঠাতাম। সপ্তাহ দুয়েক লেগে যেত এই প্রক্রিয়ায়। পড়শী’র আর্থিক সামর্থ্য ছিলো না যে এখানেই মুদ্রিত হয়।

পড়শী’র একটা বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিটি সংখ্যায় একটি নির্ধারিত প্রচ্ছদ কাহিনী বা কভার স্টোরি। প্রচ্ছদ কাহিনীর বিষয়গুলো নির্বাচনে আমরা একটি প্রক্রিয়া ব্যবহার করতাম। পাঠকদের কাছ থেকে বিষয়বস্তুর আহ্বান জানানো হতো। বিষয় নির্বাচনে পাঠকদের, মানে বিশ্ব বাঙালির, জীবনযাত্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হতো। বৈচিত্র্য থাকতো সমাজ, রাজনীতি, প্রবাস, দেশ, ক্রীড়া প্রভৃতির বিশ্লেষণে। প্রত্যেক সংখ্যায় প্রচ্ছদ কাহিনী তৈরি হতো পাঁচ-সাতটি লেখা নিয়ে। এতে বিষয়বস্তুটিকে বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে দেখার চেষ্টা থাকতো। প্রচ্ছদ কাহিনীর জন্য আমরা একটা বেশ লম্বা লেখক পুলও তৈরি করে তুলেছিলাম। প্রচ্ছদ কাহিনী ছিল পড়শী’র পাঠকদের কাছে একটি জনপ্রিয় বিভাগ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় একসময় ইন্টারনেট হয়ে পড়ে সর্বব্যাপী এবং সর্বগামী। অন্যান্য সব কিছুর মতন প্রকাশনাও মিডিয়াম বদলে অনলাইনে প্রকাশিত হতে শুরু করে। আমরাও শেষে সিদ্ধান্ত নিই যে অনলাইনে প্রকাশনা আমাদের নানাভাবে সাহায্য করবে। আমাদের ছাপার খরচটা বেঁচে যাবে, পাঠকদের কাছে প্রকাশনা পৌঁছানো যাবে খুব তাড়াতাড়ি, কন্টেন্ট তৈরিতেও নানা প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে কাজটা সহজতর হবে। সব ভেবে-চিন্তে আগস্ট ২০০৯ সাল থেকে পড়শী অনলাইনে পত্রিকা হিসেবে প্রকাশনা শুরু করে এবং বছর খানেক পরে বন্ধ হয়ে যায়।

পড়শী’কে ঘিরেই আমরা একটা পরিবার গড়ে তুলেছিলাম। এই ভার্চুয়াল পরিবারের সদস্য ছিলেন পাঠক, লেখক, কর্মী, সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবীরা। এই পরিবারে বিনি সুতোর সাংস্কৃতিক বন্ধন আমাদের টেনে নিয়ে গেছে বহুদিন। বছরের পর বছর, মাসের পর মাস, প্রতি সপ্তাহে আমরা ক’জন বহু ঘন্টা সময় দিয়েছি এই প্রকাশনাকে গতিশীল রাখার জন্য। এক পর্যায়ে দৈহিক ক্লান্তি, ব্যক্তিগত জীবনের নানা দায়িত্ব বড় হয়ে দেখা দেয়। আমরা সিদ্ধান্ত নেই পড়শী প্রকাশনায় ইতি টানবার।

আজ বেশ কয়েক বছর পর পড়শী নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমি আশাবাদী নতুন পড়শী’কে ঘিরে গড়ে উঠবে একটি সাংস্কৃতিক পরিবার, ধীরে ধীরে বেড়ে উঠবে তার পরিসর, পরিবারের সদস্যরা পড়শী’কে লালন করবে, ধারণ করবে, এগিয়ে নেবে তার ঐতিহ্য ও অগ্রযাত্রা।
পড়শীর নবযাত্রা শুভ হোক।


মাহমুদুল হাসান | লং আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক

পড়শী ও আগামীর সহপ্রতিষ্ঠাতা। হাই-টেক কর্মকর্তা। সখ – আবৃত্তি এবং ভ্রমণ।

Previous Story

বাংলাদেশ অর্থনীতি : বর্তমান অন্তরায় ও ভবিষ‍্যত সমস‍্যা

Next Story

শুভ হোক নবরূপা ‘পড়শী’র যাত্রা

Latest from পুরাতন পড়শী

পড়শী’র সাথে

এ বছর এপ্রিল মাস তথা বাংলা বৈশাখ মাস থেকে ‘পড়শী’ আবার প্রকাশিত হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগে পড়শী’র সম্পাদক... - লিখেছেন শেখ ফেরদৌস শামস (ভাস্কর)