দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এক ভিন্ন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। তাদের ওপর অনিশ্চয়তা আর প্রত্যাশার চাপ— দেশের নানা খাতে জমে থাকা সব সংকট যেন একসঙ্গে মুখ তুলেছে। জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ এই দেশে যেদিকে তাকানো যায়, সেখানেই ‘নাই’-এর দীর্ঘ তালিকা। উন্নয়নের কথা আছে, কিন্তু সমবণ্টনের নিশ্চয়তা নেই।
এমন এক সময়ে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল কাজ করা নয়, বরং কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করা। কোন সংকট আগে মোকাবিলা করবে, কোন খাতে দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, আর কোন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নেবে— এই বাছাই প্রক্রিয়াই হবে তাদের প্রথম এবং প্রধান পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত, বিএনপির সফলতা নির্ভর করবে তারা কতটা বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সময়োপযোগী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে তার ওপর।
নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে মানুষের প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা থাকে অর্থনৈতিক স্বস্তি। ভোটের প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা উন্নয়ন-চিত্রের বাইরে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই— দৈনন্দিন জীবনযাপন কতটা সহজ হবে? বাজারে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের মধ্যে থাকবে কি না, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে কি না, আর আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য কিছুটা হলেও ফিরবে কি না— এসব বিষয়েই এখন মানুষের চোখ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে যানবাহনের ভাড়া ও চিকিৎসা— সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রথম প্রত্যাশা হচ্ছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তারা কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। বাজার তদারকি জোরদার করা, সরবরাহব্যবস্থা স্বচ্ছ রাখা এবং মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানসহ কার্যকর কিছু নিলে জনগণ দ্রুত ইতিবাচক ফল দেখতে পাবে।
মানুষের সঙ্গে কথা বলে, বিশেষজ্ঞদের অভিমত পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, বাংলাদেশে এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি খুব বেশি জরুরি। এই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি এটি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য শিল্পকারখানা, আইটি খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। শুধু সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি নয়, বেসরকারি খাতে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরিই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি ও কারিগরি শিক্ষায় জোর দিলে যুবসমাজ বাস্তব সুফল পেতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের স্থিতিশীলতা নিয়েও মানুষের উদ্বেগ আছে। অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যবসায়ীরা চান নীতির ধারাবাহিকতা ও কর কাঠামোর স্বচ্ছতা। সাধারণ মানুষ চান মুদ্রার মান স্থিতিশীল থাকুক।
এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার দাবিও জোরালো। নিম্নআয়ের পরিবার, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভর্তুকি ও সহায়তা বাড়ালে সামাজিক বৈষম্য কিছুটা হলেও কমতে পারে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে মানুষের আশা খুব জটিল নয়— মানুষ চায় স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব ফলই এখন বড় কথা। নতুন সরকার যদি দ্রুত ও দৃশ্যমান কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তবে জনআস্থাও শক্ত হবে। অর্থনৈতিক স্বস্তিই হবে তাদের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মানদণ্ড।
শিক্ষা
এবার আমরা শিক্ষা ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে চায় মানুষ এ নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। তারা চায় স্থিতিশীল, দক্ষতাভিত্তিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা।
প্রথমত, পাঠ্যক্রম ও নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা ও পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্তের দাবি আছে জনসাধারণের। অভিভাবক ও শিক্ষকেরা মনে করেন, ঘন ঘন পাঠ্যবই পরিবর্তন বা পরীক্ষাব্যবস্থায় হঠাৎ সংস্কার শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে। তাই জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষায় জোর দেওয়ার দাবি বাড়ছে। কেবল সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, প্রযুক্তি, কারিগরি ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলাই এখন সময়ের চাহিদা। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে গবেষণা-সুবিধা বাড়ানো এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুশাসন ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রভাব, সহিংসতা বা নিয়োগে অনিয়ম দূর করে যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা স্পষ্ট। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তোলা— এটিকেও অগ্রাধিকার দিতে চায় জনগণ। ২৮ এর জুলাইয়ের পর থেকে দেড় বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫০ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ আছে এই নিয়োগগুলোতে এক বিশেষ রাজনৈতিক দলের স্বার্থে করা হয়েছে। এটা নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ ও ক্ষোভ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে। বিএনপি সরকারের কাছ থেকে এরকম দলকানা কর্মকাণ্ড মানুষ প্রত্যাশা করে না।
গ্রাম ও শহরের শিক্ষা বৈষম্য কমানো, সরকারি বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও সহায়তা বাড়ানোর দাবিও রয়েছে। সামগ্রিকভাবে মানুষ এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চায়, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ, নৈতিক ও প্রতিযোগিতায় সক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে এখানে শেষ কথাটি বলার সময় রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে চাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন, সংস্কৃতি-বিযুক্ত শিক্ষা কখনোই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা হতে পারে না। শিক্ষা কেবল তথ্য অর্জনের বিষয় নয়; এটি মানুষের মানসগঠন, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতার বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে যদি সাংস্কৃতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, তবে তা কেবল দক্ষ জনশক্তি তৈরি করবে, পরিপূর্ণ মানুষ নয়। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা— তারা যেন শিক্ষাকে সংস্কৃতির স্বাভাবিক ধারার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত রাখে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি মানবিক ও শিকড়সচেতন হয়ে উঠতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতন্ত্র ও বাঙালি সংস্কৃতি— এই তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে মানুষের প্রত্যাশা থাকে, এসব মৌলিক আদর্শকে কেবল আনুষ্ঠানিক ভাষণে নয়, বাস্তব নীতিতে ও প্রয়োগে সুরক্ষিত রাখা হবে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রচারের উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। পাঠ্যপুস্তকে তথ্যভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর উপস্থাপন নিশ্চিত করা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধগুলোর আধুনিকায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে ইতিহাস বিকৃতি বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচেতনা রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম, বর্ণ বা ভাষাভিত্তিক বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত এলে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা জনআস্থা বাড়াবে। পাশাপাশি শিক্ষা ও গণমাধ্যমে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করা দরকার।
গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, শক্তিশালী সংসদীয় কার্যক্রম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা— এসবই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মেরুদণ্ড। নতুন সরকার যদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে পারে, তবে গণতন্ত্রের ভিত আরও মজবুত হবে।
চতুর্থত, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করে সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও লোকসংস্কৃতির বিকাশে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। গ্রামীণ সাংস্কৃতিক উৎসব, লোকজ মেলা ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে প্রণোদনা দিলে সাংস্কৃতিক শিকড় আরও গভীর হবে। পাশাপাশি ইউনেসকো স্বীকৃত ঐতিহ্য সংরক্ষণেও সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে এনে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। নীতি, আইন ও সংস্কৃতিচর্চার সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথই হতে পারে সময়োপযোগী অঙ্গীকার।
চট্টগ্রাম বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ কার্যক্রম পরিচালিত হয় এই বন্দর দিয়ে। তাই নতুন সরকার চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরনগরীর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই জোরালো হয়।
প্রথমত, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষুএর সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। আধুনিক কন্টেইনার টার্মিনাল, স্বয়ংক্রিয় কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল কাস্টমস প্রক্রিয়া চালু করলে জাহাজ খালাসের সময় কমবে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমে এবং ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। বন্দরসংলগ্ন সড়ক, রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ সমন্বিতভাবে উন্নত না হলে পণ্যজট কমানো সম্ভব নয়। কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা রক্ষা, ড্রেজিং কার্যক্রম জোরদার এবং বন্দর-সংযোগ সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা হলে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট সুবিধা বাড়বে।
তৃতীয়ত, পরিবেশ ও নগরব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শিল্পায়নের চাপ বহন করছে দীর্ঘদিন। বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা ও পাহাড় কাটা রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সবুজায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ এবং নদী-খাল পুনরুদ্ধার উদ্যোগ নগরবাসীর জীবনমান উন্নত করবে।
চতুর্থত, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরকেন্দ্রিক লজিস্টিকস, শিপিং, আইটি ও শিল্পখাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দিলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে।
সবশেষে, চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। বন্দর উন্নয়ন, নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষা— এই তিনটি ক্ষেত্র সমন্বিতভাবে এগোতে পারলেই চট্টগ্রাম সত্যিকার অর্থে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাই মানুষের প্রধান প্রত্যাশাগুলোর একটি— আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ।
আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক পুলিশিং অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো, তদন্ত দক্ষতা উন্নত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যক্রম নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিনের। অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দ্রুত চার্জশিট প্রদান এবং ভুক্তভোগীবান্ধব সেবা চালু হলে জনআস্থা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ, মাদক ও সংগঠিত অপরাধ দমনে বিশেষায়িত ইউনিটকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। মামলা জট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি, ডিজিটাল কোর্ট ব্যবস্থাপনা এবং বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক মতভেদ বা ভিন্নমত প্রকাশের কারণে আইন প্রয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ দূর করা গেলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হবে।
দুর্নীতি দমন এখন জনমানসে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার জায়গা। দুর্নীতি দমন কমিশনুকে স্বাধীন ও কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির মামলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ই-গভর্ন্যান্স সম্প্রসারণ, টেন্ডার প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের মতো উদ্যোগ দুর্নীতি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও সেবা খাতে ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের দাবি রয়েছে। সাধারণ মানুষ চায়— ভূমি, পাসপোর্ট, লাইসেন্স বা স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সেবা পেতে যেন দালাল বা অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন না হয়।
মানুষের প্রত্যাশা খুব স্পষ্ট— নিরাপদ সমাজ, সমান আইনি সুরক্ষা এবং দুর্নীতিমুক্ত শাসন। নতুন সরকার যদি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুনর্গঠিত হবে। আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হবে স্থিতিশীল ও উন্নত রাষ্ট্রের ভিত্তি।
পরিবেশ
সরকার আন্তরিক হলে যে কোনো অসাধ্য সাধণ করা যায়। এটা প্রমাণ বিএনপি তাদের আগের আমলে প্রমাণ করেছে। পরিবেশ সুরক্ষায় বিএনপি তাদের আমলে কঠোর হস্তে দেশে পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এটাতে তারা সফল হয়েছিল। পরিবেশ দূষণের হারও কমেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি।
পরিবেশ সুরক্ষাও আজ রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হওয়া উচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশে উন্নয়ন পরিকল্পনা যেন প্রকৃতি-বিনাশী না হয়, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। নদী, পাহাড় ও উপকূল রক্ষা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই নগরায়ণ— এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষভাবে পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে। পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পবর্জ্যে নদী দূষণ— এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের। উন্নয়নের নামে যেন প্রকৃতি ধ্বংস না হয়, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান জরুরি। কর্ণফুলী নদী, উপকূল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে না পারলে অর্থনৈতিক অগ্রগতিও টেকসই হবে না। পরিবেশবান্ধব নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনি সম্ভাবনাও বিস্তৃত। রাজনীতিতে আস্থা পুনর্গঠন, অর্থনীতিতে স্থিতি ও গতি ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলায় স্বস্তি নিশ্চিত করা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত খাতকে কার্যকর ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা— এই সমন্বিত উদ্যোগই দেশের সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি হতে পারে। এখন প্রয়োজন দৃঢ় অঙ্গীকার, বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাহস। সময়ই বলে দেবে, প্রত্যাশার এই ভার তারা কতটা সাফল্যের সঙ্গে বহন করতে পারে।

ওমর কায়সার | চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
কবি ও সাংবাদিক।
