লীগের ভোট ও ভবিষ্যৎ

তাসনীম হোসেন | মার্চ ২২, ২০২৬
April 14, 2026

বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে এক মাসেরও বেশি সময় আগে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ভোটে জিতে সরকার গঠন করেছে। বিরোধী দলের আসনে বসেছে জামায়াতে ইসলাম, তাদের ইতিহাসে সর্বাধিক আসন নিয়ে।

নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সার্ভেতে দেখা যাচ্ছিল— জনমতের বিচারে বিএনপি ও জামায়াত প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে আছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও জামায়াতের শক্ত অবস্থান ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াত দলগতভাবে তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি। নির্বাচনের আগের সার্ভেগুলো সব সময়ই কিছুটা ধোঁয়াশাপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে বহু বছর ধরে জনমত জরিপের ঐতিহ্য থাকলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনে সেগুলোর পূর্বাভাস মেলেনি। ভোটাররা হয়তো তাদের প্রকৃত মতামত প্রকাশ করতে চাননি। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।

গত নির্বাচনের আগে জরিপে বিএনপির জনসমর্থন ছিল প্রায় ৩৩% এবং জামায়াতের প্রায় ৩২%। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল— জামায়াত তাদের আনুমানিক ভোট ধরে রাখলেও বিএনপি প্রায় ৫০% ভোট পেয়ে বিপুল জয় লাভ করেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল— বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের মতামত প্রকাশ করেননি বা সিদ্ধান্তহীন ছিলেন।

আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক

এখন আমরা অতীতের নির্বাচনগুলোর দিকে তাকাই। বাংলাদেশে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০২৬— এই পাঁচটি নির্বাচনকে তুলনামূলকভাবে সুষ্ঠু হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ চারটিতে অংশগ্রহণ করেছে এবং দুইবার জিতেছে, দুইবার হেরেছে।

ভোটের হিসাব বলছে—

  • ১৯৯১: ৩০%
  • ১৯৯৬: ৩৭%
  • ২০০১: ৪০%
  • ২০০৮: ৪৮%

অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ কখনোই ৩০%-এর নিচে নামেনি। এমনকি ২০০১ সালে বড় ব্যবধানে আসন হারালেও ভোটের ব্যবধান ছিল খুবই সামান্য। এটি প্রমাণ করে— বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের একটি স্থায়ী ও বড় ভোটব্যাংক রয়েছে।

দীর্ঘ শাসনামলের নানা বিতর্ক, দুর্নীতি বা অপশাসনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দলটির প্রতি সমর্থন টিকে আছে। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো ঐতিহাসিক—মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতার অবস্থান, এবং বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার। যদিও এসব বিষয় নিয়েও বিতর্ক আছে, তবুও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের কাছে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

নিষিদ্ধ দল, অদৃশ্য উপস্থিতি

এত বড় জনসমর্থনের একটি দলকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতৃত্ব বিশৃঙ্খল ও অনেক ক্ষেত্রে পলাতক। মাঠে তাদের কার্যত কোনো উপস্থিতি নেই। তবে দলের সংগঠন না থাকলেও তাদের ভোটাররা কোথাও যায়নি। তারা দলীয় কর্মী নয়, তাই রাজনৈতিক পালাবদলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তারা এখনো আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল।

এই বাস্তবতায় বিএনপি সেই ভোটব্যাংকের একটি অংশ নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছে। লক্ষণীয়ভাবে, বিএনপি এবার ১৯৭১ সালের প্রশ্নকে সামনে এনে জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে— যা তাদের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাজনীতির চিরন্তন সত্য আবারও প্রমাণিত হয়েছে— স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই।

নির্বাচনের ফল ও ‘অদৃশ্য ফ্যাক্টর’

এই কৌশলের ফল বিএনপি দ্রুত পেয়েছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি অংশ, অনেক ক্ষেত্রে অনিচ্ছাসত্ত্বেও, জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। সাংবাদিক নুরুল কবিরের ভাষায়— “নাকে রুমাল চেপে” তারা ভোট দিয়েছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তাই আওয়ামী লীগের উপস্থিতি ছিল অদৃশ্য, কিন্তু প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— এক কথায় “ডিসাইসিভ”।

সামনে কী?
বাংলাদেশে “পার্টি আছে, ভোট নেই”—এমন উদাহরণ অনেক আছে, বিশেষ করে বামদলগুলোর ক্ষেত্রে। কিন্তু “ভোট আছে, পার্টি নেই”— এমন পরিস্থিতি একেবারেই নতুন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জুলাইয়ের সহিংসতা নিয়ে কোনো স্পষ্ট দুঃখপ্রকাশ বা দায় স্বীকার করা হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি নতুন কিছু নয়— ১৯৭১-এর ঘটনাবলী নিয়েও অনেক দল আজও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি।

আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা

পতনের আগে আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ভারতের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই ছিল প্রধান ভরসা। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের অবস্থানও আরও বাস্তববাদী হয়েছে। বর্তমানে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ফলে আওয়ামী লীগের কূটনৈতিক পরিসর আরও সংকুচিত হতে পারে।

পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ

এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক বৈধতা পুনর্গঠন। এর জন্য প্রয়োজন—

  • অতীত ঘটনার দায় স্বীকার
  • দলীয় সংস্কার
  • বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
  • নতুন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব তৈরি

শেখ হাসিনার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—তাঁকে ছাড়া দল কতটা কার্যকর থাকবে, সেটি বড় অনিশ্চয়তা।

সমঝোতা ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

মূলধারায় ফিরে আসতে হলে আওয়ামী লীগের জন্য অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা জরুরি হতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের ন্যূনতম সমঝোতা ছাড়া তাদের জন্য ফিরে আসা কঠিন। তবে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন শুধু দলটির জন্য নয়, দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর থাকে না— এটি ইতিহাসের শিক্ষা।

উপসংহার

সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়— আওয়ামী লীগ কি নতুনভাবে ফিরে আসতে পারবে, নাকি ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে যাবে মুসলিম লীগের মতো? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। চোখ রাখতে হবে ভবিষ্যতের দিকে।


তাসনীম হোসেন | অস্টিন, টেক্সাস

কম্পিউটার প্রকৌশলীর, কাজ করছেন আইবিএম কর্পোরেশনে। লেখালেখি মূলত বাংলা ব্লগ সচলায়তনে।

Previous Story

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন, অপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

Next Story

ইতিহাসের মুক্তির প্রশ্ন

Latest from মূল রচনাবলী

বাংলাদেশ নতুন পথের সন্ধানে

দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এক ভিন্ন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। - লিখেছেন ওমর কায়সার।

ইতিহাসের মুক্তির প্রশ্ন

ইতিহাস এগুচ্ছে কি? এগুচ্ছে বলেই আশা করি, নইলে তো পরিণতি হবে ভয়াবহ—আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব... - লিখেছেন অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।