সকালে চোখ খুলে মোবাইলে টাইমটা দেখে হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ল সুচেতনা। সাতটা বেজে গেল আজ। কি করে সামাল দেবে সকালের সব কাজ আজ সময় মত, এই ভাবতে ভাবতে ব্রাশ করে চা বসাতে গেল সুচেতনা। এখন আবার চা করাও এক ঝক্কি। চায়ে আদা, গোলমরিচ, তুলসী, লবঙ্গ এসব থেঁতো করে দিয়ে চা করতে হয়। অতনুর কড়া নির্দেশ সকালের চা এভাবেই করতে হবে এখন, এতে নাকি ইমিউনিটি বাড়ে।
যাইহোক চা-টা ছেকে অতনুকে ডাক দিল প্রথমে, তারপর অতনুকে বিছানাতেই চা দিয়ে ভাত বসিয়ে সবজি কাটছিল। এমন সময় বুবাই ঘুম থেকে উঠেই বললো- ‘মা আমার চা আর টিফিনটা দাও তাড়াতাড়ি অনলাইন ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।’ সুচেতনা বলল- ‘ব্রাশটা করে টেবিলে বস, আমি দিচ্ছি।’ এরই মধ্যে সুচেতনার চোখ পড়লো চায়ের কাপের দিকে। কাজের মধ্যে চায়ে চুমুক দিতেই ভুলে গেছে। এক চুমুক দিয়েই বুবাইয়ের টিফিনটা টেবিলে দিয়ে সবে ভাবছে বাকি চাটুকু সোফায় বসে খাবে, এমন সময় অতনু চেঁচিয়ে বলল- ‘এই পেপারটা একটু দিয়ে যাও তো।’ চায়ের কাপটা সোফার পাশের টেবিলে রেখে পেপারটা দিতে গেল সুচেতনা। ততক্ষণে চা পুরো ঠাণ্ডা জল, ভাবলো একটু গরম করে নেবে কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল আটটা বেজে গেছে।
ওদিকে রিয়া এখনো ঘুমোচ্ছে। তিনদিন আগেই মেয়েটা ভুগে উঠেছে। শরীরটা এখনো বেশ দুর্বল। সাড়ে আটটায় ওর আবার একটা ওষুধ আছে। সুচেতনা রিয়াকে ডাকবে বলে ওর ঘরে গিয়ে দেখলো রিয়া খাটে বসে ফোনটা ঘাটাঘাটি করছে। সুচেতনা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল- ‘কিরে মা আজ শরীরটা ঠিক আছে তো? আর সকালেই ফোন নিয়ে বসে আছিস! যা মা ব্রাশ করে একটু কিছু খেয়ে নে, তারপর ওষুধটা খেতে হবে তো।’ রিয়া বলে উঠলো- ‘আবার সেই বাজে ওষুধটা? আর সকাল থেকেই ফোন নিয়ে বলা শুরু করলে?’
সুচেতনা আর কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে রিয়ার ব্রেকফাস্ট রেডি করে রান্নাটা শেষ করলো। রিয়ার ঘরে ব্রেকফাস্ট দিতে গিয়েও সুচেতনা দেখলো রিয়া ব্রাশ করে আবার ফোন নিয়ে বসে আছে। এবার সুচেতনা একটু রেগে গিয়েই বলে উঠলো- ‘কিরে তোর শরীরটা ভালো না, বললাম যে এতো ফোন ঘাটিস না, কথা কানে ঢুকলো না?’ রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো- ‘মা একটু স্পেস দেবে প্লিজ? প্রাইভেসি বলে একটা ওয়ার্ড আছে জানো তো? খাবারটা রেখে যাও, খেয়ে আমি ওষুধ খেয়ে নেবো।’ সুচেতনা রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিলো। আজকাল আবার দরজা খোলা রাখলে ছেলেমেয়েদের প্রাইভেসি নষ্ট হয়।
ততক্ষনে অতনুর স্নান হয়ে গেছে। অতনুর খাবারটা টেবিলে বেড়ে দিয়ে সুচেতনা ডাক দিলো- ‘ওগো শুনছো, খেতে এসো।’ হঠাৎ অতনু একটু বিরক্ত হয়েই বলল- ‘ভাবলাম পাঁচ মিনিট একটু বসে তারপর খাবো, তা না খাবার বেড়ে ডাক দিচ্ছে।’ সুচেতনা অবাক হলো একটু, কারণ কোনদিনই তো আলাদা করে জিজ্ঞেস করে খেতে দেয়না। যাইহোক সুচেতনা কোনো উত্তর করলো না।
অতনু খেয়ে রেডি হতে হতে বললো ‘বুবাইয়ের ঘরে ল্যাপটপটা আছে, একটু এনে দাও তো।’ সুচেতনা তাড়াতাড়ি ল্যাপটপটা আনতে গিয়ে বুবাইয়ের ঘরে ঢুকতেই বুবাই চেঁচিয়ে উঠলো- ‘তোমার কি কোনদিন কাণ্ডজ্ঞান হবেনা? অদ্ভুত মানুষ! তুমি জানো আমার অনলাইন ক্লাস চলছে। ক্যামেরা অন করা, আর তুমি ঘরে ঘুর ঘুর করছো’। সুচেতনা নিজেই একটু অস্বস্তিতে পরে বললো’এই তো চলে যাচ্ছি।’
অতনুকে হাতে ল্যাপটপের ব্যাগটা দিতেই বললো ‘জানো ছেলে বিরক্ত হয়, আগেই তো ল্যাপটপটা ওর ঘর থেকে এনে রাখতে পারতে।’ সুচেতনা বললো- ‘কাল রাতে ওর ঘরে বসে কাজ করে ওখানেই যে ল্যাপটপটা রেখে এসেছ কি করে জানবো আমি?’ অতনু কথাটা ঘুরিয়ে বললো- ‘এসব বাদ দাও কাজের কথা শোনো, ব্যাঙ্ক থেকে একটা ফোন আসতে পারে, আমার নম্বরে ফোন করতে বলে দিও। তুমি আবার কিছু বলতে যেওনা যেন। কিছুই তো বোঝ না এসবের। আর তুমি মুখ খুললেই তোমার সব বুদ্ধি ধরা পড়ে যাবে।’ সুচেতনা শুধু একটা ‘হুমম’ বললো। আগে এসব কথায় নিজেকে খুব ছোট লাগত, কষ্ট হত, কান্না পেয়ে যেত খুব। এখন আর কিছু মনে হয়না। অতনু ঘর থেকে বেরিয়ে জুতোর ফিতে লাগাতে লাগাতে বললো- ‘কিগো টিফিনটা দাও,দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।’ সুচেতনা দিয়ে টিফিন গুছিয়ে অতনুকে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা করলো।
আজকে আর চা-টা ঠিক মতো খাওয়া হলো না। এটা অবশ্য নতুন কিছু না, সবার তাগিদ পূরণ করতে করতে বেশির ভাগ দিনই চা জুড়িয়ে যায়, পরেও আর খাওয়া হয়ে ওঠে না। সুচেতনা এবার ঘরটা গোছাবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিল এমন সময় বেল বাজাতে দরজা খুলে দেওয়ায় রেবা দি ঢুকলো। রেবা দিকে আজ বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছে। সুচেতনা বললো- ‘রেবা দি, রান্নাঘরে তোমার টিফিনটা রাখা আছে খেয়ে তারপর কাজ করো’। রেবা দি টিফিন খেতে বসলো আর সুচেতনা আসবাবপত্র গুলো মুছতে লাগলো। রেবা দি খেতে খেতে বললো- “ও বৌদি, জানো আজ না মাদার্স ডে না কি বলে সেটা! আমার টুম্পা দেখি সকালবেলা আমায় এত্ত বড় ক্যাটবেরি দিলো গো। প্রথমে তো একটু বকলাম, বললাম- ‘কোথায় পেয়েছিস এই টাকা।’ তারপর আমায় জড়িয়ে ধরে বলল- ‘মাগো তুমি যে টাকা টিফিনের জন্য দিতে তার থেকে একটু একটু করে জমাতাম, সেখান থেকেই কিনেছি।’ মনটা ভরে গেলো গো বৌদি।আজ আবার বলেছে ও রান্না করবে। আমার নাকি ছুটি।” রেবাদির চোখে মুখে এক অনাবিল পরিতৃপ্তি ফুটে উঠলো।
যাইহোক রেবা দি কাজ করে বেরোতে যাবে, এমন সময় বললো- ‘তা হ্যাগো বৌদি বুবাই আর রিয়া কিছু দিলো নাকি গো?’ সুচেতনা নিজেকে একটু সংযত করে বললো- ‘আরে সবে তো দিনের শুরু। কাল এলে বলবো কি দিলো।’ রেবাদিকে বিদায় দিয়েই পেছন ফিরে দেখি রিয়া দাঁড়িয়ে আছে, ভ্রু কুঁচকে বললো- ‘রেবা মাসির মেয়ে জানে আজ মাদার্স ডে, আর তুমি জানো না! সকাল থেকে তো একবার ফোনটা দেখবে। দেখো ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের স্ট্যাটাসে তোমার সুন্দর সুন্দর ছবিতে ভরিয়ে দিয়েছি আমি আর দাদাই।’ রিয়ার কথা শুনে সুচেতনা মনে মনে হেসে বললো- ‘এখন তো বাবা মায়েরা সন্তানদের জীবনে কম, স্ট্যাটাস-এ বেশি থাকে।’
সুচেতনা এবার নিজের ঘরে গিয়ে আলমারি থেকে পুরোনো ছবি বের করলো। মায়ের ছবিটাতে হাত বোলাতে বোলাতে কখন যেন গালটা ভিজে গিয়েছিল। পাঁচ বছর হলো মা মারা গেছে। কতদিন একটু ‘মা’ বলে ডাকা হয়না। আগে কষ্ট হলেও একটা আশ্রয় ছিল। আর এখন যে কত যন্ত্রনা সহ্য করতে হয় প্রতিনিয়ত কিন্তু তা শুধুই নিজের মধ্যেই থাকে। ছোটবেলা থেকে কোনদিন কোন কিছুতেই মনে হয়নি মা অনধিকার চর্চা করছে বা জীবনে স্পেস বা প্রাইভেসির প্ৰয়োজন আছে। বরং সুচেতনা মায়ের গন্ধ মেখে মায়ের সাথেই লেপ্টে থাকতো সবসময়। স্কুল কলেজের পর মনে হত- কতক্ষণে মায়ের কাছে গিয়ে সারাদিনের সব কথা বলবে। একটু না দেখলেই মাকে বার বার ডাকতো। মায়ের বকুনির মধ্যেও যে ভালবাসা লুকিয়ে আছে তা বুঝতে কখনো অসুবিধা হয়নি। তাই মা বকার পর কখন ডেকে আদর করবে সেই প্রতীক্ষায় থাকতো।
আজ তাই মায়ের অভাব প্রতি মুহূর্তে কষ্ট দেয় সুচেতনাকে। মা হারানোর এই কষ্ট শূন্যতা নিয়ে কাটাতে হবে বাকি জীবনটা। সুচেতনা এবার মায়ের ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরে বললো- ‘মাগো খুব ক্লান্ত লাগে এখন মাঝে মাঝে। তোমার কাছে যেদিন যাবো, একটু কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে দেবে? আর- হ্যাঁ হ্যাপি মাদার্স ডে, যেখানেই থাকো ভাল থেকো মা।’
এপ্রিল ২৬, ২০২৬

ঝর্ণা ভট্টাচার্য্য | কোলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত
গীতিকার, কবি, লেখক এবং সমাজকর্মী।
