পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাঙালির একটি সর্বজনীন উৎসব, যার শিকড় প্রোথিত আছে বাংলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং মোগল আমলের রাজস্ব ব্যবস্থার গভীরে। সম্রাট আকবরের আদেশে হিজরি ও হিন্দু সৌর বর্ষের সমন্বয়ে ‘বঙ্গাব্দ’ প্রবর্তন করা হয়, যেখানে বৈশাখ থেকে নতুন বছর শুরু হয়। কারণ তখন কৃষকের ঘরে নতুন ফসল উঠত।
মূলত, পয়লা বৈশাখ ফসলি বছরের শুরু এবং পুরনো দিনের হিসাব চুকিয়ে নতুন বছরের শুরুতে ব্যবসায়িক ও সামাজিক শুভকামনার লক্ষ্যে পালিত হতো। এটি অতীতের জীর্ণতা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে ব্যবসায়িক ও সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি দিন।
কিন্তু বর্তমানে পয়লা বৈশাখ শুধু একটি ক্যালেন্ডার পরিবর্তন বা নিছক ঐতিহ্য নয়, বরং এটি ‘পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থার’ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাদের লেন্স দিয়ে দেখলে আজকের নববর্ষের প্রাসঙ্গিকতার ভিন্ন রূপ দেখতে পাই।
প্রথমত, উৎসবের পণ্যকরণ হয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেকোনো আবেগ বা সংস্কৃতিকে পণ্যে রূপান্তর করা হয়। আজকের পয়লা বৈশাখ মানেই নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের লাল-সাদা পাঞ্জাবি বা শাড়ি, নামী রেস্তোরাঁয় ‘নববর্ষ থালি’ এবং বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটের ‘নববর্ষ সেল’। যেখানে আগে উৎসব ছিল ঘরোয়া ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে ‘কেনাকাটার উৎসবে’ পরিণত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞাপনের আধিপত্য ও ব্র্যান্ডিং বেড়েছে। পয়লা বৈশাখ এখন কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর বিশাল ‘মার্কেটিং উইন্ডো’। গাড়ি-বাড়ি-গয়না কোম্পানি থেকে শুরু করে মশলা-তেল-নুনের কোম্পানি—সবাই বৈশাখী থিম ব্যবহার করে নিজেদের ব্র্যান্ডিং করে। হালখাতার সেই পুরনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক এখন বড় বড় শোরুমের ক্যাশব্যাক অফার বা কুপনের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে।
আসলে পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার প্রদর্শনের প্রবণতা থাকে। পয়লা বৈশাখের দিন দামী রেস্তোরাঁয় খাওয়ার ছবি বা ব্র্যান্ডেড পোশাক পরে ‘সেলফি’ পোস্ট করা এখনকার সংস্কৃতির অংশ। উৎসবের ঐতিহ্যগত দিকের চেয়ে বাহ্যিক চাকচিক্য বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে, পুঁজিবাদের দৌলতে খানিকটা গ্রামীণ অর্থনীতি শহরে পৌঁছে গেছে। গ্রামীণ লোকশিল্প যেমন মাটির গয়না, তাঁতের শাড়ি, হস্ত ও কুটির শিল্প এখন শহরের বড় বাজারে বিক্রি হচ্ছে। তবে প্রকৃত শিল্পী কতটা লাভবান হচ্ছেন এবং মধ্যস্বত্বভোগী কর্পোরেটরা কতটা মুনাফা লুটছে, তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়। পয়লা বৈশাখ এখন কেবলমাত্র একটা উৎসব নয়, বরং এক বিশাল ‘কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি’।
তবুও, পয়লা বৈশাখ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানোর দিন নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের এক মিলনমেলা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই একটি দিনেই সমস্ত বাঙালি একসুরে গেয়ে ওঠে—‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।
ব্যবসায়িক ও সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ হলো ‘হালখাতা’। পুরনো বছরের সব দেনা-পাওনা চুকিয়ে ব্যবসায়ীরা লাল মলাটের নতুন খাতায় হিসাব শুরু করেন। এটি কেবল লেনদেন নয়, বরং সামাজিক সম্পর্কের উৎসব। দোকানে দোকানে খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করানো, পাড়ার মোড়ে মোড়ে নববর্ষের মেলা—এসবই বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাণ। তবে আগের সেই ঘরোয়া আমেজ এখন অনেকটাই যান্ত্রিক বা প্রদর্শনীমূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের ছোটবেলায় পয়লাবৈশাখে মানুষদের মধ্যে অভাব থাকলেও উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। আজকের পয়লা বৈশাখ অনেক বেশি জমকালো, কিন্তু কোথাও যেন যান্ত্রিক। পোশাকের ব্র্যান্ড বা দামী রেস্তোরাঁর নববর্ষ থালি আজকের উৎসবের মুখ্য, যেখানে আগের দিনের নিখাদ আনন্দ ফিকে হয়ে গেছে।
ডিজিটাল যুগে পয়লা বৈশাখ অনেকটা প্রযুক্তিনির্ভর। ‘শুভ নববর্ষ’ মানেই হোয়াটসঅ্যাপের ফরওয়ার্ড মেসেজ বা ফেসবুক স্ট্যাটাস। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রণাম করা বা গুরুজনদের আশীর্বাদ নেওয়ার স্পর্শ এখন ইমোজির আড়ালে হারিয়েছে। লেনদেন এখন ইউপিআই বা কার্ডে হয়, তাই হালখাতার সেই লাল খাতা আর স্বস্তিক আঁকা, চন্দনের গন্ধ—আজ ঢাকাপড়েছে যান্ত্রিকতায়।
তবুও কেউ কেউ পয়লা বৈশাখের চিরাচরিত ঐতিহ্য প্রাণপণে বাঁচিয়ে রাখছেন। আমাদের ছোটবেলার মেলা ছিল লোকজ শিল্পীদের প্রাণের আড্ডা। আজ মেলাগুলো বড় বড় কর্পোরেট স্পন্সরশিপের অধীনে। মাটির সরা বা পটচিত্র এখন ড্রয়িংরুমের শোপিস, কিন্তু পেছনের লোকগল্পগুলো আগামী প্রজন্মের অনেকের কাছে অজানা।
যৌথ পরিবার এখন মিউজিয়ামে দেখা যায়। আগে উৎসব মানেই পুরো বংশের এক হওয়া। অভাব থাকলেও ভাগ করে খাওয়ার মধ্যে তৃপ্তি ছিল। আজ আমরা একই ছাদের তলায় থেকেও বিচ্ছিন্ন। উৎসবের দিনও একা বা ভার্চুয়াল বন্ধুদের সাথে যুক্ত। এই নিঃসঙ্গতাকেই ঢাকতে আমরা হয়তো আয়োজনকে আরও বেশি ‘জমকালো’ করার চেষ্টা করি।
আমার এই আক্ষেপ একটি ‘সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদ’-এর বহিঃপ্রকাশ। আগামী পয়লা বৈশাখ হয়তো বেশি রঙিন, প্রযুক্তিতে উন্নত, জাঁকজমকপূর্ণ হবে, কিন্তু অভাবী দিনের সহজ-সরল হাসির মধ্যে প্রাণের ছোঁয়া হারিয়ে যাবে।
তবুও বুকে নতুন যুগের একরাশ আশা জাগিয়ে এগিয়ে চলেছি। সেদিনের বাংলার লোকসংস্কৃতি প্রাণের টানে, আর আজও পয়লা বৈশাখ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। যান্ত্রিকতার ভিড়েও যখন বাউল গানের সুর কানে আসে বা কেউ কপালে চন্দনের তিলক আঁকে, তখন বোঝা যায় আমাদের শিকড় কতটা গভীরে। অতীতের জীর্ণতা মুছে নতুন আশার গান শোনানোতেই পয়লা বৈশাখের সার্থকতা।

অশোক রায় | হরিপাল (তারকেশ্বর), পশ্চিম বাংলা, ভারত
অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, থিয়েটার গবেষক এবং স্ক্রিপ্ট ও স্ক্রিনপ্লে লেখক।
