গ্রামের মেলা – বান্নির দিনগুলো কোথায় হারাল?

পাভেল রহমান | ১৭ মার্চ ২০২৬
April 16, 2026

চৈত্র-বৈশাখ এলেই একসময় গ্রামবাংলা জেগে উঠত উৎসবের আমেজে। মাঠের ধারে, নদীর পাড়ে কিংবা কোনো মাজার বা মন্দিরকে ঘিরে বসত মেলা— যা অনেক অঞ্চলে ‘বান্নি’ নামে পরিচিত। দূর থেকে ভেসে আসত বাঁশির সুর, বাউলের গান আর দোকানিদের হাঁকডাক। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এসব মেলাগুলোই ছিল গ্রামীণ জীবনের মিলনকেন্দ্র, চিত্ত-বিনোদনের আশ্রম, লোকসংস্কৃতির ভিত্তি। কিন্তু সময়ের প্রবাহে আজ সেই চেনা দৃশ্য ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-র ভাদুঘর গ্রামের ‘ভাদুঘরের বান্নি’ এই ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রায় চারশ বছর ধরে তিতাস নদী-র পাড়ে প্রতি বছর ১৪ই বৈশাখ বসে এই মেলা। তবে জনসমাগম চলতে থাকে আরও সপ্তাহখানেক আগে থেকেই। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের কোলাহলে মুখর থাকে পুরো এলাকা। শুধু স্থানীয় নয়, দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসে এই মেলায়। একসময় এই বান্নিকে কেন্দ্র করে গ্রামে তৈরি হতো উৎসবের আবহ। শ্বশুরবাড়ি থেকে মেয়েরা বাপের বাড়ি আসত, অতিথি আপ্যায়নে থাকত চিড়া-মুড়ি, কাঁঠালের আয়োজন—গ্রামীণ জীবনের সহজ, আন্তরিক রূপ ফুটে উঠত এ মেলাকে ঘিরে।

ভাদুঘরের বান্নির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আধ্যাত্মিক ইতিহাসও। মুঘল আমলের একটি প্রাচীন মসজিদ এবং হযরত সৈয়দ শাহ সোলাইমান ওসমান গণির মাজারকে কেন্দ্র করে এই মেলার প্রচলন হয়েছে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। ‘মাইজলা পীর’ নামে পরিচিত এই সাধককে অনেকে শাহ জালাল-এর সঙ্গে আগত আউলিয়াদের একজন বলে মনে করেন। একই দিনে তিতাস নদীতে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের পুণ্যস্নান— সব মিলিয়ে এই বান্নি হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।

একসময় এসব মেলা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষিজ সরঞ্জাম, মাছ ধরার জাল, লাঙল, হুক্কা থেকে শুরু করে খাট-পালঙ্ক—নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা জিনিস বিক্রি হতো এখানে। গ্রামের মানুষ বছরের পর বছর অপেক্ষা করতেন এই মেলার জন্য। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে।

নগরায়ণের প্রভাব গ্রামেও পড়েছে। মেলার জন্য প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা কমে গেছে, ফলে আয়োজনের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে করপোরেট বাজারব্যবস্থার প্রসার গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিয়েছে। আগে যে পণ্যের জন্য মানুষ মেলার অপেক্ষায় থাকত, এখন তা সহজেই বাজারে পাওয়া যায়। ফলে মেলার ওপর নির্ভরশীলতা কমে গেছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতিও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। আগে গ্রামের বটতলা বা বাজারে বসত বাউল গানের আসর; এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ও ডিজিটাল বিনোদন। ফলে মানুষের বিনোদনের ধরন বদলেছে, কমেছে মেলায় যাওয়ার আগ্রহ।

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও মেলা সংকুচিত হওয়ার একটি কারণ। কিছু ক্ষেত্রে মেলাকে ধর্মবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। অথচ ঐতিহ্যগতভাবে এসব মেলা ছিল সম্প্রীতি ও মিলনের জায়গা, যেখানে সব ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করত।

পরিসংখ্যান বলছে, একসময় দেশে হাজারের বেশি মেলা অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমি-এর একটি প্রকাশনায় ১,২৯৩টি মেলার তথ্য পাওয়া যায়। বিসিক-এর একটি গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে ১,৩৮৭টি মেলার কথা। বিভিন্ন গবেষণায় আরও বড় সংখ্যা উঠে এসেছে। তবে বর্তমানে এসব মেলার সঠিক কোনো হালনাগাদ তালিকা নেই।

অনেক মেলা বিলুপ্ত হয়েছে, অনেকের পরিসর ছোট হয়ে গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতেই একসময় অর্ধশতাধিক মেলা ছিল। এখন গুটিকয়েকটি আছে, তাও সীমিত পরিসরে। ভাদুঘর গ্রামেই আগে আরও দুটি বান্নি বসত— একটি এখন ছোট আকারে হয়, অন্যটি বন্ধ হয়ে গেছে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনও মেলা হারিয়ে যাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একসময় মেলাকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলত, তা এখন আর আগের মতো নেই। প্লাস্টিক পণ্য ও করপোরেট বাজারের দখলে লোকজ পণ্যের চাহিদা কমেছে। ফলে মেলাকেন্দ্রিক অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

প্রায় তিন যুগ আগে লোকগবেষক মোহাম্মদ সাইদুর এক লেখায় চার হাজারের মতো জায়গায় মেলার কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং একটি তালিকাও প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে অনেকেই সেই তথ্য ধরে গবেষণা করেছেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দেশের অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি জায়গায় মেলা হতো। শুধু চৈত্র সংক্রান্তি আর বৈশাখ মাসেই আড়াই হাজারের বেশি জায়গায় মেলা বসত।

বিগত কয়েক দশক ধরে গ্রামীণ মেলা সংকুচিত হলেও শহরে বৈশাখ উদযাপন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ষাটের দশক থেকে ছায়ানট-এর উদ্যোগে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়, যা এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে।

এসব আয়োজন শহুরে সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করলেও, গ্রামীণ মেলার ঐতিহ্যে প্রাণ ফেরাতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ মেলাগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কোথায় কোথায় মেলা হয়, তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা দরকার। স্থানীয় প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে মেলাগুলো টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে এই মেলাগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরা প্রয়োজন। গ্রামীণ মেলা বা বান্নি হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি উৎসবের বিলুপ্তি নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের হারিয়ে যাওয়া।

তাই এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ, মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়— এটি মানুষের মিলনমেলা, স্মৃতির ভাণ্ডার, আর বাঙালির লোকজ জীবনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।


পাভেল রহমান | ঢাকা, বাংলাদেশ

সাংবাদিক ও নাট্যকর্মী।

Previous Story

পড়শী’র সাথে

Next Story

বৈশাখী যতন

Latest from সমসাময়িক বিষয়

বৈশাখী যতন

পুতুল বিয়ের পরেই কেমন মনখারাপের পালা, মেয়ের মা-কে উজাড় করে সবটা দেওয়ার জ্বালা। - কবিতাটি রচনা করেছেন ঝর্ণা ভট্টাচার্য্য।