‘প্রতিদিনই মায়ের জন্যে। প্রতিদিনই মা-দিবস। আলাদা করে এই দিবস পালন করার কোনও যৌক্তিকতা দেখি না’ এমন ভাবনার সঙ্গে আমি কোনভাবেই একমত পোষণ করতে পারি না। আমরা কি আদৌ মা’কে রোজ রোজ ভালোবাসার কথা বলি? বলি না তো! আমরা কি মাঝে মধ্যে মা’কে উপহার দেয়ার কথা ভাবি? ভাবি না তো! আমরা কি কখনো মাকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী স্বরে বলি, ‘আজ তোমার ছুটি। রান্না করতে হবে না। আমরা তোমাকে বাইরে খাওয়াব’? আমাদের দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যায়, কিন্তু কিচ্ছু বলা হয়ে ওঠে না। কিচ্ছু করা হয়ে ওঠে না মা’র জন্যে। সেই মানুষটির জন্যে, যে নিজেকে বিলিয়ে দেয় পরিবারের সকলের সুখের কথা ভেবে। সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানো থেকে শুরু করে জটিল এই পৃথিবীর বুকে পথ চলতে, যোগ্য করে তুলেন যে মানুষটি, সমাজ সংসারে এত যার অবদান, সেই মা’কে ঘিরে, মা’কে উপলক্ষ করে একটি দিন যদি বিশেষ হয়ে ওঠে, ক্ষতি কী? অনেকেই বলেন, ‘একজন মা তাঁর সন্তানকে পৃথিবীতে আনেন, বিধায় সন্তানের যথাযথ দেখভাল করার দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়। এতে এত আদিখ্যেতার কী আছে!’ অনেকের কাছে বিষয়টি দৃশ্যত এমন মনে হলেও বাস্তবে এমন ভাবনা প্রবল এক ভুল বার্তা দেয় সমাজে।
‘মা’ পৃথিবীর মধুরতম ও ক্ষুদ্রতম শব্দ হলেও এর অর্থ ব্যপক। এর গভীরতা নিজে মা হবার পর পুরোপুরিভাবে বুঝেতে শিখেছি। আমার মা শুধুমাত্র গর্ভধারণ করে আমাকে পৃথিবীতে এনেছেন, তা-ই নয়। যতদিন বেঁচে ছিলেন, অবিচ্ছেদ্য এক বন্ধনে জড়িয়ে রেখেছিলেন। মাকে দেখেছি,আঁধার-ভোরে উঠে আমাদের জন্যে সকালের নাশতা তৈরি করতেন। টেবিলে সাজাতেন। তারপর আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতেন। আমরা সকালের নাশতা খেয়ে স্কুলে যেতাম। দুপুরে ফিরে এসে খাবার টেবিলে মাকে খাবার সাজিয়ে অপেক্ষারত দেখতাম। এমন কী রাতেও ঠিক মতো খেয়েছি কিনা, পড়া শেষ করতে পেরেছি কিনা, সময় মতো ঘুমোতে যাচ্ছি কিনা, সকল দিক নিশ্চিত করতেন। পরীক্ষার সময়টায় রাত জেগে পড়ার সময় মা ঢুলু ঢুলু চোখে পাশে বসে থাকতেন। তাঁর কাজই ছিল যেন অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় আমাদের দৈনন্দিন রুটিন ঠিক রাখা। যেন এটাই নিয়ম। এটাই হওয়ার কথা। পরিবারের সকলকে আগলে রাখাই তাঁর কাজ, তাঁর ধর্ম। অথচ মায়ের নিজের কোনও রুটিন ছিল না। কখন ঘুমোতে যেতেন, জেগে উঠতেন, খেতেন, বিশ্রাম নিতেন, সে খোঁজ রাখার কথা মনে হয়নি কোনদিন। আমরা কোনদিন জানতে চাইনি সে খেয়েছে কিনা, ক্লান্তবোধ করছে কিনা, অসুস্থবোধ করছে কিনা। উপরন্তু সময়মত এটা হল না কেনো, ওটা হল না কেনো, এমন অভিযোগ, অনুযোগের অন্ত ছিল না। আমার মা একই সঙ্গে চাকুরি আর সংসার সামলে কীভাবে এত দিক খেয়াল রাখতেন, সেইসব ভাবলে আজ মনে হয় মা বুঝি দশভুজা ছিলেন। যেন তাঁর দুটি নয়, দশটি হাত ছিল।
এ-তো গেল আমার মায়ের কথা। এবার নিজের কথা বলি। যে আমি চিরকাল খাবার নিয়ে মাকে জ্বালিয়েছি, এটা খাবো না, ওটা খাবো না বলে বিরক্ত করেছি, সেই আমিই একদিন নিজের ভেতরে নতুন এক প্রাণের অস্তিত্ব টের পেলাম। গর্ভের সন্তানের স্বাস্থ্যের ও মঙ্গলের কথা ভেবে একসময়কার অপছন্দের খাবারগুলো তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেতে শুরু করি। দুধ খেতে আমার রাজ্যের অনীহা থাকা সত্ত্বেও নাক টিপে ধরে গটগট করে গিলে ফেলি। সন্তানকে পৃথিবীর আলোবাতাসে নিয়ে আসার পর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। কিসে তার ভালো হবে, কিসে সে যত্নে থাকবে এমন ভাবনা, প্রয়াস থাকে সর্বক্ষণ। একসময়ের ঘুমকাতুরে আমি মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নির্ঘুম কাটিয়ে দেই অজানা আশঙ্কায়। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে মধ্যরাতে গাড়ি ড্রাইভ করে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটি। চোখ বন্ধ হয়ে আসে, অথচ ঘুমানোর সুযোগ নেই। ঘাড় ব্যাথা হয়ে বিছানায় ঢলে পড়তে চায় শরীর, অথচ শোয়ার, বিশ্রাম নেয়ার উপায় নেই। নিজের শখ, আহ্লাদ, স্বপ্ন বিসর্জন দেয়া এক যুদ্ধদিনের গল্প। নিজের অনেকদূর পড়াশোনার স্বপ্ন ছিল, গান গাওয়া, আবৃত্তি করার শখ ছিল। চর্চা করার সময় কোথায়? নিজের ভেতরের এই সকল লালিত স্বপ্নের বীজ আমার সন্তানের মাঝে বপন করে তা বাস্তবায়নের তীব্র ইচ্ছে জাগলো। এক পুত্রকে গানের ক্লাসে, অন্য পুত্রকে বাংলা স্কুলে আবৃত্তির ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দিলাম। আমার গোটা পৃথিবী হয়ে উঠল সন্তানদের ঘিরে। তারা কাঁদলে আমি কাঁদি। তারা হাসলে আমি হাসি। রবিঠাকুর মিথ্যে বলেননি, ‘সন্তানের মুখে হাসি দেখলে মা যেন সবকিছু পেয়ে যায়।’
আমার শাশুড়ির বয়স এখন নব্বইয়ের উপরে। বয়সের ভারে নুয়ে আছেন। কিন্তু তিনি তাঁর মধ্যবয়েসি ছেলে কাজ থেকে ফিরেছে কিনা, খাবার খেয়েছে কিনা নিত্য সে খোঁজ নিতে ভুলেন না। এখনও খাবার তৈরি করে দেন। ব্যবহৃত কাপড় কেঁচে দেন। রাতভর জায়নামাজে বসে দুই হাত তুলে সন্তানের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। অর্থাৎ একজন মা সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন আমৃত্যু। এবং তা স্ব-প্রণোদিত হয়ে। সমাজ-সংসারের কেউ তাঁর ওপর এ দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় না। এই যে নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেন সন্তানের জন্যে, বিনিময়ে আমরা কি মাকে সেই মূল্যায়নটুকু করি? তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রতিদান দেয়ার কথা ভাবি? মার প্রতি কতটুকু মমত্ববোধ ও শ্রদ্ধা জানাই? কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি কিংবা নত হই?
এবার আসি একজন অভিবাসী হিসেবে কীভাবে আমরা ‘মা দিবস’ উদযাপন করি, সেই প্রসঙ্গে। আমি যখন দুই সন্তানের মা হলাম, দেখলাম, ‘মা-দিবস’ এলে চারিদিকে মা’কে ঘিরে কত আয়োজন! শপিংমলগুলোয় নানান রকম অফার, কেনাকাটার আয়োজন, শহর জুড়ে ফুল বিক্রির হিড়িক। পুত্রদ্বয় স্কুল থেকে মায়ের জন্যে সুন্দর সুন্দর কথার মালা গেঁথে কার্ড বানিয়ে নিয়ে আসে। আমি যারপরনাই আনন্দিত হই। পরদিন স্কুলের বাইরে অপেক্ষমাণ সময়ে ভিনদেশি মায়েরা গল্প জুড়ে দেয়, বিশেষ দিবসে তাদের পরিবারের নানান আয়োজনের, উপহার সামগ্রীর, ডিনারে যাওয়ার। আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। গল্প শুনি নিশ্চুপ। কিন্তু আমার বলার মতো কোনও গল্প থাকে না। দীর্ঘশ্বাস ভেসে বেড়ায় হাওয়ায়।
জানি, আমাদের এই বাঙালি সমাজে নারীকেই তার প্রাপ্যটুকু আদায় করে নিতে হয়। সুতরাং একদিন বাংলা সিনেমার বিরতির পরের কাহিনীর মতো গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। পুত্রদ্বয়কে বললাম,
-মায়ের বিশেষ দিবসে তোমাদের বন্ধুরা তাদের মাকে উপহার দেয়?
-দেয় তো
-কী দেয়?
-পুজা ওর মাকে গোল্ড জুয়েলারি দিয়েছে। (বড় বাপজান ভাবলেশহীন স্বরে বলল)
-রমেন ওর মাকে নিয়ে ডিনারে গিয়েছে। (ছোট বাপজানের শীতল কণ্ঠ)
বললাম, বাছারা, তোমরা তোমাদের মাকে নিয়ে কী আয়োজন করেছো? তারা দু’জন মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। বললাম, ‘তোমরা অবশ্যই প্রতি বছর তোমাদের মা’কে ‘মা দিবস’-এ উপহার দিবে, কেমন? নইলে তোমাদের মাঝে কাউকে বিশেষ দিবসে উপহার দেয়ার প্রবণতা তৈরি হবে না।’
তারা একযোগে বলল, কী দেবো?
বললাম, ‘মাকে সুন্দর জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাবে, বাইরে খাবে, উপহার দেবে। ফুল বা অন্যকিছু হতে পারে।’
এভাবেই বিশেষ দিনটি নিজেদের মতো করে হাসি আনন্দে উদযাপন করার প্রচলন শুরু করা হয়। এখন অবশ্য বড় পরিসরে আয়োজন চলে। মা দিবসে বন্ধুদের বিশাল গ্রুপ আয়োজন করে বাইরে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া হয় সপরিবারে। আমরা মায়েরাই একযোগে আওয়াজ তুলেছিলাম, ‘একটি দিন মায়েদের সংসারের ব্যস্ততা থেকে ছুটি দিতে হবে’। বাবারা সানন্দে একমত হয়েছিলেন, সব কাজ থেকে ছুটি নিয়ে পরিবারকে সময় দিতে। সেই থেকে ‘মা দিবস’ এলে বন্ধুদের পরিবার সহ বিশাল এক একান্নবতী পরিবারের মতো দলবেঁধে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, খেতে যাওয়া, দিনভর একসঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোর প্রচলন শুরু হয় এই দূরদেশে। ‘মা দিবস’-এ মাকে ঘিরে এমন আয়োজনে সত্যিই বেশ স্পেশ্যাল লাগে নিজেকে।
কোথায় যেন পড়েছিলাম, পৃথিবীতে তোমার হাজারো বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী থাকবে, কিন্তু সবশেষে তুমি একজন মানুষকেই খুঁজে পাবে, যাকে তুমি শত আঘাত দেয়ার পরও সে শুধু তোমার ভবিষ্যৎ নিয়েই ভাববে। আর তিনি হলেন ‘মা’। মা’কে আমার কাছে সকল সময়ে ‘এক অনন্ত কবিতা’ মনে হয়। কেননা, কবিতা যেমন অনুভূতির ভাষা, তেমনি মা-ও সন্তানের জীবনে আবেগের সবচেয়ে বড় উৎস। মায়ের স্নেহ, মমতা ও ত্যাগ এমন এক গভীর অনুভূতি তৈরি করে, যা শব্দ দিয়ে পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন। ঠিক যেমন একটি সুন্দর কবিতার অর্থ বারবার পড়লেও নতুনভাবে অনুভূত হয়। আর ‘অনন্ত’ শব্দটি এখানে মায়ের ভালোবাসার সীমাহীনতাকে প্রকাশ করে।
সুতরাং আসুন আমরা আমাদের মায়েদের আগলে রাখি গভীর মমতায়, ভালোবাসায়। যেমনটি তিনি আমাদের আগলে রেখেছিলেন। সকলকে ‘মা দিবস’-এর শুভেচ্ছা।
৩০ এপ্রিল, ২০২৬

রিমি রুম্মান | কুইন্স, নিউইয়র্ক
লিখছেন স্কুল জীবন থেকে। ব্লগিং-এর মাধ্যমে লেখালিখিতে প্রকাশ্যে এলেও দেশের জাতীয় দৈনিক, নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক পত্রিকাসহ বেশ কিছু অনলাইন পোর্টালে লেখালেখি। কয়েকটি প্রকাশিত গ্রন্থ।
