শেকড়ের কাছে ফেরা

নিঘাত কারিম
May 23, 2026
8 views
16 mins read

“আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।”
__আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

“আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি” – তাঁদের কথা যাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা আজ লিখে চলেছি। খুব ভালো ভালো গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে, বই হচ্ছে।

“বইয়ের পাতা থেকে” পড়শীর এই অধ্যায়ে লেখা হবে বিখ্যাত দেশি বিদেশি লেখকের বইয়ের পাতা থেকে নেয়া আপনার পছন্দের উক্তি। সেই লেখার মূল বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারি আমাদের লেখায়।

“বইয়ের পাতা থেকে”- এই তিনটি শব্দের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক খোলা দরজা। সেই দরজা খুললেই আমরা ঢুকে পড়ি অন্য এক সময়ে, অন্য এক জীবনে, অন্য এক অনুভূতির জগতে। সেখানে আমরা একা নই, আমাদের সঙ্গে থাকে সমাজের বহু মানুষের চিন্তা, স্বপ্ন, বেদনা, ভালোবাসা, সংগ্রাম। বই শুধু কাগজে মুদ্রিত কিছু শব্দ নয়, বই আসলে মানুষের অভিজ্ঞতার এক দীর্ঘ নদী, যার স্রোতে ভেসে আমরা নিজেদেরও নতুন করে চিনতে শিখি, নতুন করে নিজের ভুবনকে গড়তে শিখি।

“আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি”- এই উচ্চারণ শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়, বরং সেই শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া, যেখান থেকে আমাদের অস্তিত্বের শুরু। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে কবিতা জীবনের কথা লিখে গিয়েছেন তাঁদের জীবনই ছিল এক একটি অমলিন পাণ্ডুলিপি। তাঁদের শ্রম, তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের ভালোবাসা সবকিছু মিশে আছে আজকের আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে। আমরা যখন কোনো গল্প বা কবিতা লিখি, তখন অজান্তেই তাঁদের অভিজ্ঞতার ছায়া এসে পড়ে আমাদের শব্দের ভাঁজে।

বইয়ের পাতায় আমরা যাদের খুঁজে পাই, তারা কখনো বাস্তব মানুষ, কখনো কল্পনার চরিত্র, আবার কখনো ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তারা সবাই আমাদের খুব কাছের হয়ে ওঠে। একটি ভালো লেখা পড়তে পড়তে কখন যে আমরা নিজের জীবনের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাই, তা বুঝতেই পারি না। মনে হয়, এই কথাগুলো তো আমারই ছিল, কেউ যেন আমার মনের ভেতর ঢুকে লিখে আগেই ফেলেছে।

“বইয়ের পাতা থেকে” এই অধ্যায়টি আসলে সেইসব অনুভূতিরই এক সংকলন হতে পারে, যেখানে আমরা তুলে আনব প্রিয় লেখকদের কিছু উক্তি, কিছু পংক্তি, কিছু ভাবনা যা আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। কিন্তু শুধু উদ্ধৃতি দেওয়াই নয়, তার ভেতরের অর্থকে নিজের ভাষায়, নিজের অনুভূতিতে নতুন করে প্রকাশ করাই হবে এই লেখার মূল লক্ষ্য। কারণ, একটি উক্তি তখনই সত্যিকারের জীবন্ত হয়ে ওঠে, যখন তা আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়।

ধরা যাক, কোনো লেখক লিখেছেন ভালোবাসা নিয়ে আর আমরা সেই লেখা পড়ে হঠাৎ নিজের জীবনের কোনো মুহূর্তকে মনে করতে পারলাম। তখন সেই উক্তিটি আর শুধু লেখকের থাকে না, তা হয়ে যায় আমাদের নিজেরও।
ঠিক তেমনি, দুঃখ, বিচ্ছেদ, প্রতারণা কিংবা আনন্দ যে কোনো অনুভূতির ক্ষেত্রেই বই আমাদের এক অদৃশ্য সঙ্গী হয়ে পাশে দাঁড়ায়।

আমাদের সমাজে বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। প্রযুক্তির ভিড়ে বই যেন অনেক সময় হারিয়ে যেতে বসেছে। হার্ডকপি থেকে সময় শুরু হয়েছে সফট কপির কিন্তু সত্যি কথাটা হলো, কোনো স্ক্রিনের আলো কখনোই বইয়ের পাতার সেই নরম স্পর্শকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। একটি বই হাতে নিয়ে পড়ার মধ্যে যে একাগ্রতা, যে নীরবতা, যে গভীরভাবে ডুবে যাওয়া তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। বই পড়া মানে শুধু তথ্য জানা নয়, বরং নিজের ভেতরে এক নতুন জগৎ তৈরি করা।

“বইয়ের পাতা থেকে” লেখার মাধ্যমে আমরা চাইলে সেই হারিয়ে যেতে বসা অভ্যাসটাকে আবার একটু ফিরিয়ে আনতে পারি। আমরা যখন একটি প্রিয় উক্তি শেয়ার করি, তখন আসলে আমরা শুধু শব্দ ভাগ করি না, আমরা ভাগ করি আমাদের অনুভূতি, আমাদের ভাবনা, আমাদের উপলব্ধি। আর এই ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই তৈরি হয় এক নতুন সংযোগ, এক নতুন সম্পর্ক।

এই অধ্যায়ে দেশি-বিদেশি নানা লেখকের লেখা থেকে নেওয়া উক্তি স্থান পাবে। কখনো তা হবে কোনো উপন্যাসের সংলাপ, কখনো কোনো কবিতার পংক্তি, আবার কখনো কোনো প্রবন্ধের গভীর চিন্তা। প্রতিটি উদ্ধৃতির সঙ্গে থাকবে তার ব্যাখ্যা-

  • কেন সেই লাইনটি আমাদের ভালো লেগেছে?
  • কীভাবে তা আমাদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত?
  • লেখাটি আমাদের কী নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে?

আমরা যদি একটু গভীরভাবে ভাবি, তাহলে দেখব বই আমাদের শুধু বিনোদন দেয় না আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়, আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, ভাবতে শেখায়, কখনো কখনো আমাদের ভেঙেও দেয়, আবার নতুন করে গড়ে তোলে। একটি ভালো বই পড়তে পড়তে আমরা আর আগের মতো থাকি না আমরা চরিত্রগুলোর সাথে মিশে যেতে থাকি আমাদের ভেতরে অনেক কিছু বদলে যেতে থাকে।

এই বদলে যাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানুষ হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শেখার ক্ষমতা। আর বই সেই শেখার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মাধ্যম। বই আমাদের শেখায় মানুষ হতে। আমাদের শেখায় সহানুভূতি, ভালোবাসা, সহনশীলতা। আমরা যখন অন্যের গল্প পড়ি, তখন আসলে আমরা অন্যের জীবনের সাথে কিছুটা মিশে যাই কিছু সময়ের জন্য বেঁচে থাকি বইয়ের চরিত্র গুলোর মাঝে। আর এই অভিজ্ঞতাই হয়ত আমাদের আরও মানবিক করে তোলে।

নিজের জীবনে সব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারি না, কিন্তু বই পড়ে আমরা হাজার মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারি। “বইয়ের পাতা থেকে” তাই শুধু একটি সাহিত্যিক উদ্যোগ নয়, এটি এক ধরনের আত্মঅন্বেষণ। এখানে আমরা খুঁজে নেব নিজেদের, খুঁজে নেব আমাদের শেকড়, আমাদের অনুভূতি, আমাদের স্বপ্ন। একটি ছোট্ট উক্তি হয়তো আমাদের দীর্ঘদিনের কোনো প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠতে পারে, অথবা কোনো অন্ধকার সময়ে আমাদের একটু আলো দেখাতে পারে।

তাই “বইয়ের পাতা থেকে” এই অধ্যায়টি হোক এক আন্তরিক যাত্রা শব্দের ভেতর দিয়ে, অনুভূতির ভেতর দিয়ে, মানুষ থেকে মানুষের দিকে। এখানে প্রতিটি উক্তি হবে একটি দরজা, আর সেই দরজা খুললেই আমরা প্রবেশ করব নতুন এক জগতে যেখানে বই শুধু পড়া হয় না, অনুভব করা হয়, জীবনকে আনন্দময় করা। ফিরে আসা হয় শেকড়ের কাছে।


নিঘাত কারিম | হিউস্টন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত বই – ‘গোধূলির ছোঁয়া’ ও ‘প্রতিবিম্বের কাছাকাছি’। প্রকাশিত ছোট গল্পের ই-বুক – যা কিছু গল্প হয়ে রয়।


1 Comment Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’: যন্ত্রের থাবায় রক্তাক্ত পুরাণ

Next Story

স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধে বেরি