ফুটবল বিশ্বকাপ ও শান্তি
প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বের কোনো না কোনো প্রান্তে বসে ফুটবল বিশ্বকাপের মহোৎসব। ২০২৬ সালের এই জুন মাসে আবারও শুরু হয়েছে সেই বহুল প্রতীক্ষিত আয়োজন। এবার যৌথভাবে আয়োজকের ভূমিকায় রয়েছে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। দেড় মাসব্যাপী এই আসরে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ। বিশ্বের প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর সব ম্যাচ উপভোগ করবে। প্রিয় দলের জয়-পরাজয় ঘিরে কোথাও উল্লাস, কোথাও হতাশা, কোথাও আবার উন্মাদনাও দেখা দেবে। চার বছরের দীর্ঘ অপেক্ষারও অবসান ঘটবে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর।
খেলাধুলা মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়— এ কথা আমরা প্রায়ই শুনি। শুধু সাধারণ মানুষ, লেখক বা সাংবাদিক নন, বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কেরাও নানা সময় একই কথা উচ্চারণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা এক সুরেই বলেন, খেলাই পারে মানুষকে কাছাকাছি আনতে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— তাহলে পৃথিবীতে এত যুদ্ধ, সংঘাত ও রক্তপাত কেন? যে দেশগুলো খেলাধুলায় অগ্রসর, তাদের অনেকেই আবার সামরিক শক্তিতেও অগ্রগণ্য। তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নানা অসম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, কিংবা যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এ এক পরিচিত দৃশ্য। কারও কারও কাছে যুদ্ধ যেন কেবল ক্ষমতার খেলা নয়, এক বিশাল ব্যবসাও।
প্রায় তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসে অলিম্পিকের সূচনা হয়েছিল শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শকে সামনে রেখে। কিন্তু আমরা কি নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে এই তিন হাজার বছরে যুদ্ধ কমেছে কিংবা শান্তি বেড়েছে? ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয় না। বরং মনে হয়, যুদ্ধ যেন মানবসভ্যতার এক অনিবার্য ছায়াসঙ্গী হয়ে টিকে আছে যুগের পর যুগ।
তাহলে পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় কী? খেলাধুলা কি সেই সমাধান দিতে পেরেছে? ধর্ম কি পেরেছে? কূটনীতি, সাহিত্য কিংবা শিল্পকলাইবা কতখানি সফল হয়েছে? এমনকি বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘও কি কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পেরেছে? প্রশ্নগুলো তাই বারবার ফিরে আসে।
আরও একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদের প্রতিও। আমরা, সাধারণ মানুষ, সত্যিই কি শান্তি চাই? যদি চাই, তবে আমাদের নির্বাচিত কিংবা মেনে নেওয়া নেতৃত্ব বারবার যুদ্ধের পথে হাঁটে কেন? যুক্তির হিসাবে দুয়ে দুয়ে চার হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবতা যেন অন্য কোনো অঙ্ক মেনে চলে।
তাই একবার নিজেকেই প্রশ্ন করুন— পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আপনার নিজের কী করার আছে? একই প্রশ্ন আমি নিজেকেও করছি। আপনার উত্তর আর আমার উত্তর এক হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবু সেই উত্তর খোঁজার প্রয়াসটাই হয়তো গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার ভাবনা লিখে পাঠাতে পারেন ‘পড়শী’-তে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সঙ্গে সেই চিন্তা ভাগ করে নিতে পারেন। যদিও কে জানে— যুদ্ধ না শান্তি, মানবসভ্যতার এই চিরন্তন প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো আজও অধরা, আরও তিন হাজার বছর পরেও অধরাই থেকে যেতে পারে।

সাবির মজুমদার | শার্লোট, নর্থ ক্যারোলিনা, যুক্তরাষ্ট্র
নির্বাহী সম্পাদক, পড়শী

সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু ক্ষমতার বলয়ে নিজেদের বিলিতে দেয়। ফলে উচ্চবিত্তরা সাধারণ মানুষকে কিভাবে পুঁজি করে নিজেদের ফায়দা লুটতে পারে সেটা করে যায় । এর ফলেই যুদ্ধ চলেছে, চলছে এবং চলবে।