পড়শী মূল রচনাবলী বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং দায়বোধের পাঠ

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং দায়বোধের পাঠ

Post Views: 32
15 min read

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ক নন, তিনি একটি জাতির আত্মপরিচয়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক। তাঁর জীবন, সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগ নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এসব গ্রন্থের মধ্যে অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘কাঁদো, প্রিয় দেশ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি কোনো প্রচলিত জীবনী নয়, বরং একজন বিবেকবান সাহিত্যিকের হৃদয়ের আর্তনাদ, একজন মানবতাবাদীর প্রতিবাদ এবং একজন ইতিহাস-সচেতন মানুষের লেখা নৈতিক দলিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পরপরই অন্নদাশঙ্কর রায় এই গ্রন্থের মূল প্রবন্ধ ‘কাঁদো, প্রিয় দেশ’ রচনা করেন। পরে এর সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রবন্ধ, ইন্দিরা গান্ধীর একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি এবং বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে লেখা একটি কবিতা সংযোজিত হয়। ফলে বইটি শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, এটি ১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের একটি ঐতিহাসিক দলিল।

অন্নদাশঙ্কর রায় বইয়ের ভূমিকাতেই ঘোষণা করেন যে, মানুষের প্রাণরক্ষা মানবতার সবচেয়ে বড় কর্তব্য। তিনি লিখেছেন, রাজনীতি, ধর্ম, জাতি কিংবা রাষ্ট্রীয় পরিচয় এখানে মুখ্য নয়, একজন মানুষকে হত্যা করা মানবসভ্যতার বিরুদ্ধেই অপরাধ। তাই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে তিনি কোনো রাজনৈতিক ঘটনার সীমায় আবদ্ধ রাখেননি, বরং একে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত জঘন্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

লেখকের একটি বিখ্যাত বক্তব্য হলো—
‘তলোয়ারের চেয়ে কলম আরও শক্তিমান।’

এই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে কলমকে বেছে নিয়েছেন। তাঁর মতে, পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনী সব সময় সত্যকে রক্ষা করতে পারে না; কিন্তু সাহিত্য ইতিহাসের কাছে সত্যকে সংরক্ষণ করে রাখে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিরুদ্ধে লিখেছেন।

গ্রন্থজুড়ে অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুকে বারবার ‘জাতির জনক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও বড় পরিচয় হলো—তিনি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নির্মাতা। তিনি মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর তুলনা টেনে বলেন, যেমন গান্ধী ভারতের স্বাধীনতার নৈতিক শক্তির প্রতীক ছিলেন, তেমনি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতীক। গান্ধী যেমন ব্যক্তিগত ক্ষমতার চেয়ে জাতির কল্যাণকে বড় করে দেখেছিলেন, বঙ্গবন্ধুও ঠিক তেমনি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছিলেন।

লেখকের ভাষায়, বঙ্গবন্ধু সাধারণ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জনগণ।

১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি শ্রী প্রবোধচন্দ্র সেনকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, এই চিঠিও বইতে সংযোজন করা হয়েছে। চিঠিটির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর দূরদৃষ্টি। লেখক মুক্তিযুদ্ধের অর্জন রক্ষার জন্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, আদর্শচ্যুতি এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনরুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, তা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়।

বইটির অন্যতম প্রধান বিষয় হলো বঙ্গবন্ধুর জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। অন্নদাশঙ্কর রায় দেখিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি কখনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা অর্জনের রাজনীতি ছিল না। তিনি কারাগারে গেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন—কিন্তু জনগণের অধিকার থেকে সরে আসেননি।

তিনি বাংলার মানুষের ভাষার অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন। লেখকের মতে, এই কারণেই বাংলাদেশের কোটি মানুষ তাঁকে নিজেদের পরিবারের সদস্য মনে করত।
অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতে, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ ছিল কেবল একজন রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ড নয়, এটি ছিল বাংলাদেশের আত্মার ওপর আঘাত। তিনি গভীর বেদনায় লিখেছেন, একজন জাতির প্রতিষ্ঠাতাকে হত্যা করে কোনো জাতি কখনো সম্মানিত হতে পারে না। যে জাতি নিজের ইতিহাসের নির্মাতাকে হত্যা করে, তাকে দীর্ঘদিন সেই অপরাধের ভার বহন করতে হয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু মতভেদের সমাধান হত্যাকাণ্ড হতে পারে না। সভ্য সমাজে হত্যার কোনো নৈতিক বৈধতা নেই।

অন্নদাশঙ্কর রায় মনে করেন, বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় অবদান হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশ কেবল পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়া একটি ভূখণ্ড নয়; এটি একটি ভাষাভিত্তিক, সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্র। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন—যদি বাংলাদেশ নিজের বাঙালি পরিচয় হারিয়ে ফেলে, তাহলে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কোথায় থাকবে? এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে লেখক বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি—অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন।

অন্নদাশঙ্কর রায় কেবল বঙ্গবন্ধুর জন্যই শোক প্রকাশ করেননি; তিনি স্মরণ করেছেন জাতীয় চার নেতা—তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামানকেও। তিনি লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার কয়েক মাসের মধ্যেই স্বাধীনতার এই নেতৃত্বকে কারাগারে হত্যা করা হয়। ফলে এটি ছিল একটি ধারাবাহিক জাতীয় ট্র্যাজেডি। তাঁর ভাষায়, “কাঁদো, প্রিয় দেশ” শুধু বঙ্গবন্ধুর জন্য নয়; স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী সকল মানুষের জন্য।

লেখক শেকসপিয়রের Macbeth নাটক থেকে বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করেছেন— “Will all great Neptune’s ocean wash this blood clean from my hand?” এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ইতিহাসের এই রক্ত কোনো সমুদ্রের জল দিয়েও ধুয়ে ফেলা যাবে না। বরং এই অপরাধ ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। এই সাহিত্যিক প্রয়োগ বইটিকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।

গ্রন্থের পরিশিষ্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ তারিখের একটি চিঠি সংযোজিত হয়েছে। চিঠিতে তিনি অন্নদাশঙ্কর রায়কে জানান যে, তিনি তাঁর প্রবন্ধটি গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়েছেন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ডে ভারতের গভীর শোক ও ঘৃণার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিষয়ে ভারতের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে, কারণ আন্তর্জাতিক কূটনীতির বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই চিঠির মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে “কাঁদো, প্রিয় দেশ” শুধু বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা ছিল না; এটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলেও আলোচিত হয়েছিল। চিঠিটি নিচে তুলে দেয়া হল—

Prime Minister
New Delhi,
September 24, 1975

Dear Shri Ray,

The Chief Minister of West Bengal has sent me a copy of your article on recent events in Bangladesh and I have had it translated. It is deeply moving and has a hard core of valuable analysis. You are aware of the high regard in which we held Sheikh Mujib, and of our revulsion at the gruesome assassination of the entire family. However, we must think of the repercussions of anything that is said or done here. Lest we be misrepresented, we should modulate our public reaction of events in a neighbouring country with the utmost care. What a person of your position in the literature world says will have far-reaching impact, and I am sure that you would not like to cause us any embarrassment.

Yours, sincerely,

Sd/-
(Indira Gandhi)
Shri Annada Shankar Ray
c/o Shri S. S. Ray
Chief Minister of West Bengal
Calcutta

এই চিঠির মাধ্যমে বোঝা যায়, ভারত সরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করেনি। তারা বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে মূল্যায়ন করত। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে তারা একটি ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে ভারত প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণে কূটনৈতিক সংযম অবলম্বন করেছিল। একই সঙ্গে ভারতীয় সরকার অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখার গুরুত্বও স্বীকার করেছিল। এই চিঠির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর দ্বৈত চরিত্র। একদিকে এটি বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও হত্যাকাণ্ডের প্রতি তীব্র নৈতিক ঘৃণার প্রকাশ; অন্যদিকে এটি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা ও কূটনৈতিক সংযমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। লেখক তাঁর কাঁদো, প্রিয় দেশ গ্রন্থে এই চিঠিটি পরিশিষ্ট হিসেবে যুক্ত করে দেখিয়েছেন যে, তাঁর প্রবন্ধটি কেবল সাহিত্যিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; এটি এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজে তা পড়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। ফলে চিঠিটি শুধু একটি ব্যক্তিগত পত্র নয়, বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক মর্যাদা, ১৯৭৫-পরবর্তী দক্ষিণ এশীয় কূটনীতি এবং একজন লেখকের সামাজিক প্রভাব—এই তিনটিরই একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মানবতাবাদ। তিনি বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছেন বলে নয়, তিনি মানুষ হত্যার বিরোধী বলেই প্রতিবাদ করেছেন। তিনি লিখেছেন, কোনো মতাদর্শ, কোনো রাষ্ট্র কিংবা কোনো ক্ষমতা মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। এই দৃষ্টিভঙ্গিই বইটিকে কেবল রাজনৈতিক গ্রন্থ না রেখে মানবিক সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছে।

বইয়ের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরই তাঁকে নিয়ে লেখা অন্নদাশঙ্করের লেখা একটি কবিতা জুড়ে দেয়া হয়েছে।

নরহত্যা মহাপাপ, তার চেয়ে পাপ আরো বড়ো
করে যদি যারা তাঁর পুত্রসম বিশ্বাসভাজন
জাতির জনক যিনি অতর্কিতে তাঁরেই নিধন।
নিধন সবংশে হলে সেই পাপ আরো গুরুতর।

সারা দেশ ভাগী হয় পিতৃঘাতী সে ঘোর পাপের
যদি দেয় সাধুবাদ, যদি করে অপরাধ ক্ষমা।
কর্মফল দিনে দিনে বর্ষে বর্ষে হয় এর জমা
একদা বর্ষণ হয় বজ্ররূপে সে অভিশাপের।

রক্ত ডেকে আনে রক্ত, হানাহানি হয়ে যায় রীত।
পাশবিক শক্তি দিয়ে রোধ করা মিথ্যা মরীচিকা।
পাপ দিয়ে শুরু যার নিজেই সে নিত্য বিভীষিকা।
ছিন্নমস্তা দেবী যেন পান করে আপন শোণিত।

বাংলাদেশ! বাংলাদেশ! থেকো নাকো নীরব দর্শক
ধিক্কারে মুখর হও। হাত ধুয়ে এড়াও নরক।

এই কবিতাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রচিত এক গভীর শোকগাথা। তিনি এখানে কেবল একজন রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করেননি; তিনি দেখিয়েছেন, একজন জাতির জনককে হত্যা করা সমগ্র জাতির জন্য এক অনন্ত নৈতিক বিপর্যয়।

কবিতার শুরুতেই অন্নদাশঙ্কর রায় বলেন, নরহত্যা নিজেই এক মহাপাপ, কিন্তু যে ব্যক্তি একটি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, যিনি জাতির জনক—তাঁকেই যদি তাঁর আপনজনেরা হত্যা করে, তবে সেই অপরাধ সাধারণ হত্যার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ। কারণ এতে শুধু একজন মানুষের জীবনই শেষ হয় না, একটি জাতির বিবেকও আহত হয়।

পরবর্তী স্তবকে বলেন, কোনো জাতি যদি তার পিতৃতুল্য নেতার হত্যাকারীদের ক্ষমা করে বা সেই অপরাধকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়, তাহলে সেই জাতির জীবনে তার ভয়াবহ পরিণতি অনিবার্য। এই অপরাধের ফল একদিন না একদিন ফিরে আসে এবং পুরো সমাজকে তার মূল্য দিতে হয়। কবির মতে, ইতিহাসের বিচার কখনো ব্যর্থ হয় না; অন্যায়ের প্রতিফল একদিন অবশ্যই আসে।

এরপর কবি রক্তপাত ও সহিংসতার চক্রের কথা উল্লেখ করেন। তিনি দেখান, হত্যা আরও হত্যার জন্ম দেয়। সহিংসতা দিয়ে সহিংসতা থামানো যায় না। শক্তি ও প্রতিহিংসার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বরং যারা পাপের আশ্রয় নেয়, তারা শেষ পর্যন্ত সেই পাপেরই শিকার হয়। এভাবেই কবি নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।

কবিতার শেষাংশে কবি সরাসরি বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি যেন দেশটিকে উদ্দেশ্য করে বলেন—“বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!” এই সম্বোধনের মধ্যে রয়েছে গভীর মমতা, বেদনা এবং সতর্কবার্তা। কবি দেশের মানুষকে অনুরোধ করেন, তারা যেন নীরব দর্শকের মতো না থাকে। ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে নীরবতা জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেককে জাগ্রত রাখতে হবে এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

সবশেষে কবি এক মর্মস্পর্শী চিত্র এঁকেছেন—নরক যেন এখনও হাত বাড়িয়ে আছে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের যে অমানবিকতা ও নৈতিক অধঃপতন, তার প্রভাব তখনও শেষ হয়ে যায়নি; বরং তার ক্ষত জাতির অন্তরে রয়ে গেছে। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইতিহাসের এমন নিষ্ঠুর ঘটনা জাতির চেতনায় দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সতর্ক করে।

এটি আসলে কেবল শোকের কবিতা নয়, এটি মানবতা, ন্যায়বিচার এবং ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার এক শক্তিশালী কাব্যিক উচ্চারণ। বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি কবি পুরো জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, জাতির জনকের হত্যাকাণ্ড কোনো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—এটি একটি জাতির নৈতিক পরীক্ষার মুহূর্ত, যার বিচার ইতিহাস একদিন অবশ্যই করবে।

লেখকের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সত্যকে চিরকাল চাপা দেওয়া যায় না। তিনি মনে করেন, আদালতের বিচার যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, ইতিহাসের বিচার আরও কঠোর। যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছেন, তাঁরা সাময়িকভাবে সফল হতে পারেন; কিন্তু ইতিহাসে তাঁদের স্থান কখনো সম্মানের হবে না। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর অবদান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে আমরা দেখতে পাই, অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই মূল্যায়ন অনেকাংশেই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

আজও বঙ্গবন্ধুর জীবন, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয় পরিচয় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রধান ভিত্তি। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘কাঁদো, প্রিয় দেশ’ আমাদের সেই সত্য নতুন করে উপলব্ধি করতে শেখায়। তাই এই গ্রন্থ শুধু অতীতের স্মারক নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি অপরিহার্য পাঠ, যা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক গুরুত্ব, মানবিক মহত্ত্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে নতুনভাবে অনুধাবন করতে সাহায্য করে।

২ আগস্ট, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

লেখক, গবেষক ও গ্রন্থ সমালোচক।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।