পড়শী বই আলোচনা স্বর্গ নরক – শেখ ফজলল করিম

স্বর্গ নরক – শেখ ফজলল করিম

Post Views: 23
3 min read

“কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?
মানুষেরই মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর!
রিপুর তাড়নে যখনই মোদের বিবেক পায় গো লয়,
আত্মগ্লানির নরক-অনলে তখনই পুড়িতে হয়।
প্রীতি ও প্রেমের পূণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরষ্পরে,
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরই কুঁড়ে ঘরে।”

ছেলেবেলায় আমাদের এই কবিতাটি পড়তে হয়েছে আর এর চারলাইন থাকত ভাব সম্প্রসারণ-এর জন্য। তখন এতো গভীর ভাবে বুঝার ক্ষমতা ছিল না এই লাইনগুলোর। ছোট্ট মনে দাগ কাটতো। কিন্তু পাঠ্য বইয়ের পড়া মনে করে এর গভীরতা তখন টের পাইনি।

এই কবিতায় শেখ ফজলল করিম একটি গভীর জীবনদর্শন তুলে ধরেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, স্বর্গ ও নরক কোনো দূরবর্তী স্থান নয়, বরং মানুষের নিজের জীবন, মন এবং কর্মের মধ্যেই তার অস্তিত্ব।

কবি শুরুতেই প্রশ্ন করেছেন, “কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?” এর মাধ্যমে তিনি প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের আচরণ, চিন্তা ও অনুভূতিই স্বর্গ-নরক সৃষ্টি করে।

যখন মানুষ লোভ, ক্রোধ, হিংসা, অহংকার বা অন্য কোনো কুপ্রবৃত্তির (রিপুর) বশে অন্যায় কাজ করে, তখন তার বিবেক তাকে তাড়িত করে। সেই অনুশোচনা, অপরাধবোধ ও আত্মগ্লানি মানুষের মনে যে দহন সৃষ্টি করে, সেটিই নরকের আগুনের মতো কষ্ট দেয়। অর্থাৎ, অন্যায়ের শাস্তি অনেক সময় মানুষের নিজের মনেই শুরু হয়।

অন্যদিকে, যখন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে, সম্মান করে, ক্ষমা করে এবং সহানুভূতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন তাদের জীবন আনন্দ, শান্তি ও সুখে ভরে ওঠে। এমনকি একটি সাধারণ কুঁড়েঘরও তখন স্বর্গের মতো মনে হয়। কারণ প্রকৃত সুখ ধনসম্পদে নয়, মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত।

মানুষের জীবনে এর প্রয়োগ-

একজন অসৎ ব্যক্তি বাইরে থেকে ধনী ও সফল হলেও, অপরাধবোধ ও অশান্তি তাকে ভেতরে ভেতরে কষ্ট দেয়। এটাই তার জন্য নরক। একজন সৎ, দয়ালু ও ভালোবাসাপূর্ণ মানুষ হয়তো খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন, কিন্তু মানসিক শান্তি ও ভালোবাসার কারণে তার জীবনই স্বর্গের মতো হয়ে ওঠে।

একটি পরিবারে যদি ঝগড়া, অবিশ্বাস ও ঘৃণা থাকে, তবে সেই বাড়ি নরকের মতো মনে হয়। আর যদি সেখানে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা থাকে, তবে ছোট্ট ঘরও স্বর্গ হয়ে ওঠে।

মানুষের কর্ম, বিবেক, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্পর্কই তার স্বর্গ ও নরক নির্ধারণ করে। তাই স্বর্গ বা নরক খুঁজতে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের মনকে সুন্দর রাখা এবং অন্যের প্রতি মানবিক আচরণ করাই পৃথিবীতেই নরক থেকে দূরে থেকে স্বর্গীয় জীবন গড়ার পথ।

২৯ আগস্ট, ২০২৬

হিউস্টন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত বই – ‘গোধূলির ছোঁয়া’ ও ‘প্রতিবিম্বের কাছাকাছি’। প্রকাশিত ছোট গল্পের ই-বুক – “যা কিছু গল্প হয়ে রয়”।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।