১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটনে ঐতিহাসিক ভাষণে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর অমর স্বপ্নের কথা— “I Have a Dream.” তাঁর সেই স্বপ্ন ছিল বর্ণবৈষম্যের অবসান, স্বাধীনতা, সমঅধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের জন্য তাঁকে জীবনও দিতে হয়েছিল।
আমিও একটি স্বপ্ন দেখি।
তবে আমি মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো ইতিহাস-সৃষ্টিকারী মহান ব্যক্তিত্বের সারিতে দাঁড়াবার দু:সাহস আমার নেই।আমি একজন সাধারণ মানুষ।কিন্তু স্বপ্ন দেখার অধিকার তো সাধারণ মানুষেরও আছে।আর আমার স্বপ্ন কোনো একটি দেশ, জাতি, ধর্ম কিংবা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।আমার স্বপ্ন সমগ্র পৃথিবীকে নিয়ে— এমন একটি পৃথিবী, যেখানে মানুষ মানুষের শত্রু নয়; যেখানে শক্তির পরিবর্তে ন্যায়, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমা, ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা এবং যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি মানবসভ্যতার মূল চালিকাশক্তি হবে।
মাদার তেরেসার নামে বহুল প্রচলিত একটি কথায় এই সত্যটিরই গভীর প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়—আমরা শান্তি হারাই,যখন ভুলে যাই যে আমরা পরস্পরেরই আপনজন।
অশান্ত পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতা—
আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে আশাবাদের চেয়ে উদ্বেগই বেশি জাগে। দেশে দেশে যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সীমান্তবিরোধ,সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা,সন্ত্রাস, জাতিগত সংঘাত,অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং পরাশক্তির প্রতিযোগিতা মানবসভ্যতাকে ক্রমেই বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধেও যেন যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।বন ধ্বংস, নদী-সমুদ্র দূষণ, নির্বিচার সম্পদ আহরণ,পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত—এসব আমাদের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলছে।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—এত অশান্তির কারণ কী? কারা দায়ী? এবং এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা কি থামানো সম্ভব?
আমার বিশ্বাস,সম্ভব।তবে তার আগে সমস্যার শিকড়ে পৌঁছানো অপরিহার্য।
বিশ্বে অশান্তির মূল কারণ—
দেশের ভেতরের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধের পেছনে নানা কারণ থাকলেও কয়েকটি বিষয় প্রায় সর্বত্রই ঘুরেফিরে সামনে আসে:
প্রথমত, ন্যায়বিচারের অভাব। মানুষের জীবন,স্বাধীনতা,সমতা, মতপ্রকাশ,শিক্ষা,কর্মসংস্থান,চলাফেরা এবং মর্যাদার মৌলিক অধিকার যখন কেড়ে নেওয়া হয়, তখন ক্ষোভ জন্ম নেয়।সেই ক্ষোভ দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা হলে একসময় তা সহিংসতায় রূপ নেয়।
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অগণতান্ত্রিক শাসন।
জনগণের সম্মতি ব্যতিত ক্ষমতা দখল,নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস,বিরোধী মত দমন,বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতীর অভাব রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
তৃতীয়ত, সীমাহীন অর্থনৈতিক বৈষম্য।
একদিকে অঢেল সম্পদ, অন্যদিকে ক্ষুধা, বেকারত্ব ও বঞ্চনা— এই বৈপরীত্য সমাজে ক্ষোভ, অপরাধ, উগ্রবাদ ও সংঘাতের জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করে।
চতুর্থত, ভূখণ্ড ও সম্পদের প্রতি অদম্য লোভ।
ভূমি, সমুদ্রসীমা, পানি, খনিজ, জ্বালানি, বাণিজ্যপথ ও বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা যুগে যুগে যুদ্ধের কারণ হয়েছে।
পঞ্চমত, ধর্মীয়, জাতিগত ও মতাদর্শিক অসহিষ্ণুতা।
নিজের বিশ্বাসকেই একমাত্র সত্য এবং অন্যকে শত্রু মনে করার প্রবণতা সমাজকে বিভক্ত করে। ধর্ম মানুষের নৈতিক উৎকর্ষের শক্তি হওয়া উচিত; ক্ষমতা ও রাজনীতির অস্ত্র নয়।
ষষ্ঠত, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও আধিপত্যবাদ।
নিজের জাতি কিংবা রাষ্ট্রকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক, সামরিক বা অর্থনৈতিক আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক শান্তির অন্যতম বড় বাধা।
সপ্তমত, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি।
একটি হত্যার জবাবে আরেকটি হত্যা, একটি হামলার জবাবে বহুগুণ বড় হামলা—এভাবে প্রতিশোধের চক্র কখনও শান্তি আনে না; কেবল নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন ঘৃণা রেখে যায়।
অষ্টমত, অস্ত্র প্রতিযোগিতা।
নিরাপত্তার নামে বিশ্ব যে বিপুল অর্থ অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধযন্ত্র নির্মাণে ব্যয় করছে, তার সামান্য অংশও যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুধা দূরীকরণ ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যয় করা হতো, তবে বহু সংঘাতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিকড় দুর্বল হয়ে যেত।
সবগুলো কারণ বিশ্লেষণ করার পর একটি শব্দই আমাদের সবার সম্মুখে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে প্রতিভাতহয়ে ওঠে,যা হচ্ছে ন্যায়বিচারের অনুপস্তিতি।
মার্টিন লুথার কিং যথার্থই বলেছিলেন, “কোথাও একটি অন্যায় হলে তা সর্বত্রই ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি।”
মানুষ কি জন্মগতভাবে হিংস্র?
জ্যাঁ-জাক রুশোর বিখ্যাত The Social Contract-এর সূচনা— “মানুষ জন্মগ্রহণ করে স্বাধীন হয়ে, অথচ সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত”—আজও আমাদের ভাবায়।
আমার বিশ্বাস,অধিকাংশ মানুষ জন্মগতভাবে যুদ্ধবাজ,অপরাধী কিংবা অত্যাচারী নয়।পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিবেশই তাকে গড়ে হিংশ্র বা শান্তিপ্রিয় করে তোলে। একটি শিশু যদি শৈশব থেকেই বৈষম্য, অপমান,ঘৃণা ও সহিংসতার মধ্যে বেড়ে ওঠে,তার মনের মাঝে প্রতিশোধ স্পৃহা জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
আর তাই,শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজটি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নয়—শিশুর পরিবার, বিদ্যালয় ও সামাজিক পরিবেশ থেকেই শুরু করা অপরিহার্য।
যেখানে যুদ্ধের জন্য হচ্ছে সীমাহীন অর্থ ব্যয়,সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এত নগণ্য বরাদ্দ কেন? এখানেই মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
যুদ্ধ ঠেকানোর নামে আমরা যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অর্থ ব্যয় করি; কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন,সংলাপ,মধ্যস্থতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারে তার তুলনায় অতি সামান্য সম্পদ বিনিয়োগ করি।
প্রতিটি রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে।প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও প্রয়োজন।কিন্তু প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত যুদ্ধ প্রতিরোধ, যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলা নয়।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা আজও বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বেসামরিক মানুষকে রক্ষা, নিরাপত্তা ও শান্তি-প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার কাজে নিয়োজিত। কিন্তু শুধু শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠিয়ে স্থায়ী শান্তি আসে না; বিরোধের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল কারণও দূর করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় কিছু বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ—
বিশ্বশান্তি কোনো অলীক কল্পনা নয়। তবে শুধু বক্তৃতা,প্রার্থনা বা সম্মেলন দিয়ে তা অর্জিত হওয়া সম্ভব নয়।প্রয়োজন কিছু সুস্পষ্ট ও বাস্তব পদক্ষেপ যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. ন্যায়বিচারকে শান্তির প্রথম শর্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
দমন-পীড়নের ওপর প্রতিষ্ঠিত নীরবতা শান্তি নয়। রাষ্ট্রের ভেতরে আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
২. যেকোনো সংঘাতে যুদ্ধসিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে বাধ্যতামূলক সংলাপ ও মধ্যস্থতার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী,আঞ্চলিক সংস্থা বা জাতিসংঘের মাধ্যমে আলোচনা ও সালিশের সুযোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত নয়।
৩. অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র, গণবিধ্বংসী অস্ত্র এবং স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্রের প্রসার রোধে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকেই প্রথমে দায়িত্ব নিতে হবে।
৪. সামরিক বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ মানবিক উন্নয়নে ব্যয় করা যেতে পারে।
বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র যদি তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের সামান্য অংশও ক্ষুধা, শিক্ষা,জনস্বাস্থ্য,পানি,শরণার্থী পুনর্বাসন ও জলবায়ু মোকাবিলায় ব্যবহার করে,তবে সংঘাতের বহু কারণ আগেই প্রশমিত হবে।
৫. শিশুশিক্ষায় ‘শান্তি শিক্ষা’ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
সহমর্মিতা, মতের ভিন্নতাকে সম্মান, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং মানবিক মূল্যবোধকে বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের অংশ করতে হবে।
৬. ধর্মীয় নেতাদের শান্তির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা নিতে হবে।
কোনো ধর্মই নিরপরাধ হত্যা ও ঘৃণাকে মানবতার আদর্শ হিসেবে শিক্ষা দেয় না। ধর্মকে বিভেদের অস্ত্র নয়, মানবিক ঐক্যের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
৭. ঘৃণা ও মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে সামাজিক ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব বাড়াতে হবে।
অপপ্রচার ও পরিকল্পিত বিদ্বেষ আজ মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করেই সহিংসতায় উসকানি ও সংগঠিত মিথ্যাচার মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৮. বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর করতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইন যদি শুধু দুর্বলদের জন্য প্রয়োগ হয় এবং শক্তিশালীরা নিজেদের স্বার্থে তা উপেক্ষা করতে পারে, তবে বিশ্বব্যবস্থার উপর আস্থা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে পড়বে।সবার স্মরনে রাখা প্রয়োজন, একই অপরাধের জন্য মিত্র ও প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে দুই ধরনের মানদণ্ড শান্তিকে ধ্বংস করে।
৯. স্থানীয় পর্যায়ে পুনর্মিলনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দীর্ঘ সংঘাতের পর শুধু বিজয়ী ও পরাজিত নির্ধারণ নয়— সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার, ক্ষমা, ক্ষতিপূরণ এবং সামাজিক পুনর্মিলনের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
১০. বিশ্বনেতাদের ভাষা বদলাতে হবে।
একজন রাষ্ট্রনায়কের একটি দায়িত্বহীন বক্তব্য কখনও লাখো মানুষকে উত্তেজিত করতে পারে।নেতৃত্বের অর্থ শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়— সংযম প্রদর্শনও নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আজ তাই বিরামহীন সংহাত এবং আত্মঘাতী যুদ্ধের কারণে মানবজাতিকে অনিবার্য ধ্বংস হাত হতে রক্ষা করার জন্য তাদের সম্মুখে রয়েছে কেবল একটিই বিকল্প-শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতি,ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বের সকল শান্তিপ্রিয় মানুষদের এক কাতারে দাঁড়িয়ে শান্তির অন্বেষণে ঝাঁপিয়ে পড়া—-
কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছিল— একটি ভাইরাসের সামনে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রভান্ডারও ছিল অসহায়। সেই সংকট একই সঙ্গে দেখিয়েছে, মানবজাতি পরস্পরের ওপর কত গভীরভাবে নির্ভরশীল।
ধনী রাষ্ট্র দরিদ্র রাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকতে পারে না। শক্তিশালী রাষ্ট্র দুর্বল প্রতিবেশীকে অস্থিতিশীল রেখে নিজেও স্থায়ী সমৃদ্ধি উপভোগ করতে পারে না।
তাই প্রশ্নটি খুব সহজ— যে লক্ষ্য আলোচনা, সহযোগিতা ও সমঝোতার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব, তার জন্য কেন মানুষের রক্ত ঝরবে?
চলুন না, আমরা মিলে ‘না’ বলি যুদ্ধকে, ‘হ্যাঁ’ বলি শান্তিকে।
আমি আজ পৃথিবীর সব মানুষের কাছে, বিশেষ করে রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ,সামরিক নেতা,ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী এবং ক্ষমতাবানদের কাছে গভীর এবং বিনীত আবেদন জানাই—
ঘৃণাকে না বলুন।
আগ্রাসনকে না বলুন।
প্রতিহিংসাকে না বলুন।
বর্ণবাদকে না বলুন।
গণহত্যাকে না বলুন।
যুদ্ধকে না বলুন।
আর—
সহমর্মিতাকে হ্যাঁ বলুন।
সংলাপকে হ্যাঁ বলুন।
ন্যায়বিচারকে হ্যাঁ বলুন।
পুনর্মিলনকে হ্যাঁ বলুন।
ভালোবাসাকে হ্যাঁ বলুন।
শান্তিকে হ্যাঁ বলুন।
শান্তিকে স্বাধীনতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। কোনো মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাকে শান্তিতে বসবাস করতে বলা যায় না। ন্যায়বিচারহীন শান্তি আসলে শান্তি নয়; তা কেবল চাপিয়ে দেওয়া নীরবতা।
মানবসভ্যতা চেঙ্গিস খান, হিটলার, মুসোলিনি এবং নির্মম ঔপনিবেশিক শক্তির ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছে। আবার একই মানবসভ্যতা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.), মহাত্মা গান্ধী, মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা ও মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো মানুষও পেয়েছে— যাঁরা ভিন্ন ভিন্ন সময় ও প্রেক্ষাপটে মানবিকতা, ক্ষমা, ন্যায় কিংবা অহিংস সংগ্রামের শক্তি দেখিয়েছেন। সুতরাং প্রশ্নটি এই নয় যে মানুষ শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম কি না।
প্রশ্নটি হচ্ছে— আমরা কি সত্যিই প্রতিষ্ঠা করতে চাই?
আমি এখনো স্বপ্ন দেখি— একদিন সীমান্ত থাকবে, কিন্তু সীমান্তের ওপারের মানুষ শত্রু হবে না। ধর্ম থাকবে, কিন্তু ধর্মের নামে রক্ত ঝরবে না। সেনাবাহিনী থাকবে, কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে যুদ্ধ ঠেকানো। রাজনীতি থাকবে, কিন্তু ক্ষমতার জন্য মানুষের জীবন বলি দেওয়া হবে না।
আমি স্বপ্ন দেখি এমন এক পৃথিবীর, যেখানে একটি শিশুকে আর বোমার শব্দে ঘুম থেকে উঠতে হবে না; কোনো মা তার সন্তানের মৃতদেহ বুকে নিয়ে কাঁদবেন না; কোনো মানুষ শুধু তার বর্ণ, ধর্ম, জাতিসত্তা কিংবা রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য নির্যাতিত হবে না।
হ্যাঁ, আমিও একটি স্বপ্ন দেখি—
একটি শান্তিময় পৃথিবীর, এবং শান্তিপ্রিয় এক মানবজাতির।
আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সময় যদি কখনো থেকে থাকে— সে সময়টি এখনই।

