পড়শী খেলা খেলা বাংলাদেশের ক্রিকেটের মুদ্রার দুই পিঠ

বাংলাদেশের ক্রিকেটের মুদ্রার দুই পিঠ

Post Views: 210
14 min read

বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আশা আর হতাশা পাশাপাশি হাঁটে। দ্বিধা আর দ্বিধাহীনতা নিয়ে। অনেকটা শরৎকালের মেঘের মতো অনিশ্চিত। এই ঋতুতে প্রকৃতিতে অনবরত চলতে থাকে মেঘ-রোদের লুকোচুরি খেলা। কখন যে বৃষ্টি নামবে, কখন যে রোদ উঠবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবস্থা অনেকটা তদ্রুপ।

এই দলটিকে ঘিরে যখন নিরাশার আঁধার নেমে আসে, তখন চারপাশ আলোকিত করে তোলে। আবার দলটিকে নিয়ে যখন আশার প্রদীপ জ্বলে উঠে, তখন হয়ে যায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই চালচিত্রটি দারুণভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কয়েক দিনের ব্যবধানে একই দল এমন দুই দৃশ্যপট দেখিয়েছে, যা পুরোপুরি বিপরীতমুখী। একটিতে চমকপ্রদ বিজয়, অন্যটিতে অসহায় আত্মসমর্পণ। দুটোই ছিল অভাবিত ও অপ্রত্যাশিত।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট খেলার খুব একটা সুযোগ হয় না। এই সফরের আগে দুই দল খেলেছে মাত্র ছয়টি টেস্ট। ২০০৩ সালের পর দ্বিতীয়বার অস্ট্রেলিয়া সফরে খেলতে যায় বাংলাদেশ। অর্থাৎ ২৩ বছর পর তাদের মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ আসে। অথচ এমন একটা সফরের আগে দলের অবস্থা অনেকটা তালগোল পাকিয়ে যায়। দলীয় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ইনজুরি, দল নির্বাচন ও প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে অস্থিরতার বিষয়টি আলোচিত হয়।

পেস বোলারদের স্বর্গভূমি অস্ট্রেলিয়া সফরে দলের প্রধান অস্ত্র হওয়ার কথা ছিল দুর্দান্ত ফর্মে থাকা নাহিদ রানার। কিন্তু পেশিতে চোটের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সম্ভাবনাময় ফাস্ট বোলারদের একজন রানাকে ছাড়াই খেলতে যেতে হওয়াটা ছিল বাংলাদেশ দলের জন্য বড় ধরনের একটা ধাক্কা। বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম এবং দলের নির্ভরযোগ্য ব্যাটার লিটন দাস ইনজুরি নিয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় খেলতে যান।

খেলোয়াড়দের আঘাতজনিত কারণে দলটি পূর্ণাঙ্গ শক্তির ছিল না। তদুপরি অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে হারারেতে সর্বশেষ টেস্টে স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ও ৮৫ রানে হেরে বাংলাদেশ দলের মনোবলে খানিকটা চিড় ধরা অস্বাভাবিক নয়। সব মিলিয়ে দলের হালহকিকত মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। সঙ্গত কারণেই এই দলটিকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কথা নয়। বরং দলের বিপন্নতার কথা ভেবে ক্রিকেটানুরাগীদের উদ্বিগ্ন হয়ে উঠাটা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু প্রচলিত প্রবাদ অনুসারে বলা যায়, ‘মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক’। আর বাংলাদেশের ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এ কথা বোধকরি অনেক বেশি প্রযোজ্য। তাই বলে এতটা!

ডারউইনের সেই বিকেলটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে আলাদা করে লেখা থাকবে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার টেস্ট জয়ের স্বপ্ন, যে স্বপ্নকে এত দিন অনেক দূরের মনে হয়েছিল, তা বাংলাদেশ এভাবে বাস্তব করে ফেলবে, এটা ছিল ভাবনার অতীত। টেস্টের চতুর্থ দিনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ! অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস ২৮৪ রানে থামিয়ে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য অনায়াসে পেরিয়ে যায় তারা। অস্ট্রেলিয়ার ক্যামেরন গ্রিনের শতরানও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জয় ঠেকাতে পারেনি। এই টেস্টে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল সমষ্টিগত নৈপুণ্য।

নাহিদ রানা আর শরিফুল ইসলামের অনুপস্থিতিতে পেস অ্যাটাক ভঙ্গুর হয়ে পড়লেও তা একটুও বুঝতে দেননি ডানহাতি পেসার হাসান মাহমুদ। তিনি একাই ৯ উইকেট তুলে নিয়ে ধসিয়ে দেন অজিদের ব্যাটিং লাইনআপ। অবশ্য মেহেদী হাসান মিরাজ ব্যাট-বল, দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ব্যাট হাতে ৬৫ রান আর বল হাতে পাঁচ উইকেট। তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি এবং অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রান দলের স্কোরকে সুসংহত করে। অন্যদেরও কম-বেশি অবদান রয়েছে।

এই পরাজয় অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো কাঁপিয়ে দেয়। ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয় দলটি। প্রশ্নবিদ্ধ হয় টেস্টের সেরা দলের এমন নতজানু পারফরম্যান্স। পক্ষান্তরে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে বাংলাদেশ। যদিও সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালদের চমকপ্রদ নৈপুণ্যে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে একবার হারানোর গৌরব আছে বাংলাদেশের, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের হারানো প্রকৃতঅর্থেই দুরূহতম। শ্রীলঙ্কার মতো দল আজও তা সম্ভব করতে পারেনি।

ক্রিকেট সাহিত্যের জনক নেভিল কার্ডাস লিখেছেন,
‘ক্রিকেট একটি চমৎকার খেলা -যা আমাদের গভীরভাবে আলোড়িত করতে পারে, যা আমাদের হৃদয়কে আনন্দে ভরিয়ে তুলতে পারে আবার ভেঙেও দিতে পারে’। ক্রিকেটের এই আনন্দ-বেদনা, হর্ষ-বিষাদ, দয়ালুতা-নিষ্ঠুরতা বাংলাদেশ দল খুব দ্রুতই অনুধাবন করতে পেরেছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় অবিশ্বাস্য এক জয়ের মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখা হয়ে যায়। মুখে হাসি আর অন্তরে বিষ নিয়ে অজিরা প্রতিশোধের লকলকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়ে মাত্র দুই দিনে টেস্ট জিতে নিয়েছে!

এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কখনো ছিল না। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে খেলার আগে স্বাগতিক দেশের সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার ডেভিড হুকস মন্তব্য করেন, ‘টেস্টে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া দলের বাংলাদেশকে একদিনেই হারানো সম্ভব’। ক্রমাগত হারতে থাকা সে সময়ের নতুন টেস্ট খেলুড়ে দল বাংলাদেশকে খাটো করে তিনি এই বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। সে সফরে দুই টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হারলেও ডারউইনে তিনদিনে আর কেয়ার্নসে চারদিনে হার মানেন খালেদ মাহমুদরা।

এবার হুকসের তাচ্ছিল্যকর মন্তব্যের সত্যের কাছাকাছি চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ম্যাকেতে দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ দুটি ইনিংসেই ১০০ রানও করতে পারেনি -টেনেটুনে ৬৪ ও ৯৫। বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্ক একাই ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংকে ছিন্নভিন্ন করে দেন। ৬ উইকেট নিয়ে তাঁকে সঙ্গত করেন ডানহাতি পেসার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ও ৫১ রানে জিতে সিরিজ ১–১এ সমতা আনে। অবশ্য প্রথম টেস্টে জয়ী না হলে অন্য কোনো ডেভিড হুকস হয়তো বাংলাদেশ দলকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতেন। কেননা, সেই ডেভিড হুকস তো অসম্মানজনক মন্তব্য করার পর বেশি দিন বেঁচে ছিলেন না।

এবারের সফরের দুই ম্যাচই আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থা খুব পরিষ্কার করে দিয়েছে। দলে প্রতিভা আছে। সাহস আছে। মাঝে মাঝে বিশ্বমানের ক্রিকেটের ঝাঁজও পাওয়া যায়। কিন্তু পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা নেই। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের কি মাঝে-মধ্যে একটা-দুটো জয় হলেই চলবে না-কি এমন একটা দল গড়ে তুলতে হবে, যারা প্রতিপক্ষের কাছে নিয়মিতই সমীহযোগ্য হয়ে ওঠবে। প্রশ্নটা কিন্তু সেখানেই।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ৪২৬ রান করে বাংলাদেশ দেখিয়েছে, ব্যাটিংয়ে সামর্থ্য আছে। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টের দুই ইনিংসেই দ্রুতলয়ে পতন শুধু ভালো বোলিং দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাংলাদেশের ক্রিকেটের পুরোনো রোগটি আবার সামনে এসেছে। ব্যাটিংয়ের ভিত নড়বড়ে হলে পুরো দলটাই হঠাৎ বালুর বাঁধের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। এক/দুজন ব্যাটারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, নতুনদের অনিয়মিত পারফরম্যান্স এবং চাপের সময়ে উইকেট ধরে রাখার অক্ষমতা, এসব কাটিয়ে উঠতে না পারলে বড় দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত সাফল্য পাওয়া কঠিন।

অন্যদিকে বোলিং নিয়ে বেশ আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। ম্যাকেতে হেরে গেলেও প্রথম ইনিংসে ৭ উইকেট নেওয়ায় বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো পেসারের সেরা বোলিং এখন শরিফুল ইসলামের । অর্থাৎ বাংলাদেশের বোলিং এখন আর শুধু টিকে থাকার অবলম্বন নয়, লড়াই করার অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালে ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২-১এ হারার আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২–১, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২–১ এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২-১এ জেতায় বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটে ইতিবাচক ধারার ইঙ্গিত দেয়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ ১–১এ শেষ হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হারলেও জিম্বাবুয়েকে হারিয়েছে। অর্থাৎ ক্রিকেটারদের মধ্যে সামর্থ্যের অভাব নেই। সমস্যা হচ্ছে, সামর্থ্যকে ধারাবাহিক করার ধারা তৈরি হয়নি।

আমরা কি শুধু সিরিজ জিতবো না-কি দীর্ঘমেয়াদি দল তৈরি করবো? আমরা কি তারকা তৈরি করবো না-কি প্রয়োজনীয় ক্রিকেটার তৈরি করবো? আমরা কি প্রতিটি পরাজয়ের পর নতুন কাউকে খুঁজবো না-কি একই ভুলের কারণ খুঁজবো?সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্রিকেট কি আবেগ দিয়ে চলবে না-কি পরিকল্পনা দিয়ে? কারণ ডারউইনের জয় প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ শক্তিমান অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারে। ম্যাকের পরাজয় আবার মনে করিয়ে দিয়েছে, একটি ম্যাচ জেতা আর একটি শক্তিশালী ক্রিকেট দল হয়ে উঠা এক কথা নয়। বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে।

সামনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ -দুটি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি। সেখানে হয়তো আবার পরীক্ষা হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের। ডারউইন কি ছিল টেস্ট ক্রিকেটে নতুন বাংলাদেশের জন্মক্ষণ না-কি শুধুই একটি বিস্ময়কর দিন, সেটার উত্তর দেবে সামনের দিনগুলো। ক্রিকেটে সবচেয়ে কঠিন কাজ জয় পাওয়া নয়, জয়ের অভ্যাস তৈরি করা। বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন সেই অভ্যাসের সন্ধানেই আছে।

আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু হার-জিতের নয়, সমস্যা হলো দলের পারফরম্যান্স স্থায়ী না হওয়া। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে বিস্ময়করভাবে হারানো, তারপর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ম্যাকেতে লজ্জাজনকভাবে হার। অসম এই দুই ফল পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের ক্রিকেট কেন এতটা দোলাচলে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সমস্যা প্রতিভার অভাব নয়, সমস্যা হলো নীতি নির্ধারণে অস্থিরতা।

একটা ভালো ম্যাচ হলে আমরা বলি, দল বদলে গেছে। একটা খারাপ ম্যাচ হলে বলি, দল শেষ। একজন তরুণ ভালো খেললে তাঁকে ভবিষ্যতের তারকা বানিয়ে ফেলি। দুই ম্যাচ খারাপ হলেই তাঁকে বাদ দেওয়ার দাবি ওঠে। অর্থাৎ মূল্যায়নটা দীর্ঘমেয়াদি নয়, ম্যাচভিত্তিক। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ব্যাটিংয়ে। ২০২৫ সালেও বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক রান করার অভ্যাস তৈরি না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছিল। একজন পোড় খাওয়া ক্রিকেট সংগঠক বলেছেন, নিয়মিত রান করা একটি অভ্যাস, যা ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেই তৈরি করতে হয়। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ধারাবাহিকতা তৈরির প্ল্যাটফর্ম নয়, তার ভিত্তি তৈরি হয় ঘরোয়া ক্রিকেটে। বাংলাদেশে একজন ক্রিকেটার ৮০-১০০ রান করলে তাঁকে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু তিনি পরের ম্যাচে কত করলেন? তারপরের ম্যাচে? ভিন্ন উইকেটে? চাপের ম্যাচে? বিদেশে? একটি ভালো ইনিংস একজন ক্রিকেটারের প্রতিভার প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু ধারাবাহিক ভালো ইনিংসই তাঁর মানের প্রমাণ। এই জায়গায় বাংলাদেশের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি।

২০২৬ সালেও দলের মিডল ও লোয়ারঅর্ডারের ব্যাটিং নিয়ে একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ শেষ সাত উইকেট হারিয়েছিল মাত্র ৩৯ রানে। সেই দলের অধিনায়ক লিটন দাসও লোয়ারঅর্ডারের ব্যাটিংকে বড় সমস্যা হিসেবে স্বীকার করেন। আরেকটি বড় সমস্যা, পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক সময় মনে হয়, প্রতিটি ব্যর্থতার পর আবার নতুন করে শুরু করা হচ্ছে। নতুন ক্রিকেটার। নতুন কম্বিনেশন। নতুন ব্যাটিং অর্ডার। নতুন কৌশল।

কিন্তু একটা দলকে প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে নির্ধারিত পরিকল্পনায় পরীক্ষা করার প্রবণতা কম। ফলে ক্রিকেটারও জানেন না, তাঁর জায়গাটা কোথায়? তাঁকে ঠিক কী করতে হবে? এতে আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়। আর আত্মবিশ্বাসহীন ক্রিকেটারই ডারউইনে অসাধারণ খেলতে পারেন, কিন্তু ম্যাকেতে বিপদ দেখেই ভেঙে পড়েন।

সাম্প্রতিক সময়ের বোলিং ইতিবাচক মানসিকতার প্রত্যাশা দেখিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় দুই টেস্টের সিরিজে হাসান মাহমুদের ৯, শরিফুল ইসলামের ৭, মেহেদী হাসান মিরাজের ৬, তাসকিন আহমেদের ৪ উইকেট বোলিংয়ের সামগ্রিক পারফরম্যান্সেরই প্রতিফলন। এই বোলাররা দেখিয়েছেন, এই দল প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সামর্থ্য আছে। কিন্তু সামর্থ্য আর সক্ষমতা এক জিনিস নয়। সামর্থ্য হলো, একদিন অসাধারণ কিছু করতে পারা। সক্ষমতা হলো, প্রতিটি সিরিজে, ভিন্ন পরিবেশে নিজের কাছাকাছি মান ধরে রাখা।

বাংলাদেশ এখনো প্রথমটির কাছাকাছি, দ্বিতীয়টির সন্ধানে রয়েছে। তাই কয়েকটি জায়গায় পরিবর্তন দরকার।
১. ঘরোয়া ক্রিকেটকে সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। শুধু রান-উইকেটের সংখ্যা নয়, পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব দিতে হবে।
২. জাতীয় দলে স্থিরতা দরকার। একজন ক্রিকেটারকে দুই/তিন ম্যাচের ফল দিয়ে বিচার করলে হবে না।
৩. ব্যাটিংয়ের মৌলিক দক্ষতায় দীর্ঘমেয়াদি কাজ করা দরকার। বিশেষ করে নতুন বল, দ্রুত বোলিং, অতিরিক্ত বাউন্স ও বিদেশের কন্ডিশন।
৪. ক্রিকেটার তৈরির প্রক্রিয়াকে ফলাফলের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিপিএল বা আন্তর্জাতিক ম্যাচে সাময়িক সাফল্য নয়, চার/পাঁচ বছরের ক্রিকেটার তৈরির পরিকল্পনা দরকার।
৫. সবচেয়ে বেশি দরকার আত্মসমালোচনা। হারলেই দোষীসাব্যস্ত করা নয়। কেন হারলাম, সেটা খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ঘরোয়া ক্রিকেটকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও বাণিজ্যিক করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের বিপিএল না করে কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে। তার ফল পেতে অপেক্ষায় থাকতে হবে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে প্রতিষ্ঠিত শক্তি বলা যাবে না। আবার ব্যর্থ দলও বলা যাবে না। সার্বিক অর্থে সম্ভাবনাময় কিন্তু দোলাচলময় অস্থির একটি ক্রিকেট দল। ডারউইনের জয়ে তাই খুব বেশি আশাবাদী হওয়া উচিত নয়, আবার ম্যাকের পরাজয়ও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। দুটো ম্যাচকে পাশাপাশি রেখে মূল্যায়ন করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিভা তৈরি হয়েছে, এখন ধারাবাহিকতা তৈরির পালা। সেই ধারাবাহিকতা কোনো একজন অধিনায়ক, কোচ কিংবা তারকা ক্রিকেটার তৈরি করতে পারবে না। এটা তৈরি করতে হবে পুরো ক্রিকেট ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোর মাধ্যমে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বাস্তবমুখী নতুন একটি ক্রিকেটদর্শন, যা সুগম করবে ধারাবাহিকতার পথ।

৩১ আগস্ট, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়াবিষয়ক গবেষক। সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন বিষয়ে লেখার প্রতি ঝোঁক রয়েছে। কয়েকটি গ্রন্থের প্রণেতা।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।