(১)
আরব সাগরের নোনা বাতাস যখন মুম্বাইয়ের বুকে আছড়ে পড়ে, তখন শহরের কোলাহল ও ব্যস্ততা যেন এক নিমিষে গান হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষভাগে মেঘলা আকাশের বুক চিরে আমার উড়োজাহাজ যখন ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করল, তখন মুম্বাই ভিজছিল শ্রাবণের হালকা বর্ষায়।
মুম্বাই কেবল ভারতের আর্থিক রাজধানী বা বলিউডের রূপালী জগতের মূলকেন্দ্র নয়; এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং নানা সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। ভৌগোলিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আজকের এই সুবিশাল মহানগরীটি একসময় কোনো একক ভূখণ্ড ছিল না। মুম্বাই গঠিত হয়েছিল সাতটি পৃথক দ্বীপ নিয়ে—বোম্বে (মুম্বাই), প্যাটেল (পারেলে), মাজাগাঁও, মহিম, ওয়ার্লি, বান্দ্রা ও কোলাবা।
১৯৯৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বোম্বে’ নাম বদলে ‘মুম্বাই’ করা হয়। পর্তুগিজ শব্দ ‘বোম বাহিয়া’ (ভালো উপসাগর) থেকে ইংরেজদের দেওয়া ‘বোম্বে’ নামটি তুলে দিয়ে স্থানীয় মারাঠি সংস্কৃতির প্রতীক ‘মুম্বা দেবী’র নামানুসারে শহরের নাম ‘মুম্বাই’ রাখা হয়।
খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে এটি সম্রাট অশোকের মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে সিলহারা রাজবংশ, সুলতানি শাসক এবং ১৫৩৪ সালে পর্তুগিজদের অধীনে যায় এই দ্বীপপুঞ্জ। ১৬৬১ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সাথে পর্তুগিজ রাজকুমারী ক্যাথরিনের বিয়ের উপহার (যৌতুক) হিসেবে চার্লস এই দ্বীপগুলোর মালিকানা পান!
এরপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মাত্র ১০ পাউন্ড বাৎসরিক ভাড়ায় দ্বীপগুলো লিখে নেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ‘হরনবি ভেলার্ড’ প্রকল্পের মাধ্যমে সাতটি দ্বীপকে জোড়া লাগিয়ে বিশাল ভূখণ্ড তৈরি করা হয় এবং সমুদ্রের বুক থেকে আজকের আধুনিক মুম্বাইয়ের জন্ম হয়।
বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে দক্ষিণ মুম্বাইয়ের দিকে যাত্রার মধ্য দিয়েই শুরু হলো আমার তিন দিনের সংক্ষিপ্ত অথচ বৈচিত্র্যময় মুম্বাই সফর। থাকার জায়গা স্থির হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী ও বিলাসবহুল ‘হোটেল ওবেরয়’ (The Oberoi)। দক্ষিণ মুম্বাইয়ের নরিমান পয়েন্টে অবস্থিত এই হোটেলটি শুধু আতিথেয়তার জন্যই বিখ্যাত নয়, এর বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের নীল সাগর ও মেরিন ড্রাইভের দৃশ্য এক কথায় অতুলনীয়।
১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হোটেল ওবেরয় কেবল আতিথেয়তার প্রতীক নয়, ক্ষিণ মুম্বাইয়ের আধুনিক অভিজাত্য ও নরিমান পয়েন্টের আধুনিক রূপান্তরের এক নীরব সাক্ষী। হোটেলের আইকনিক লাউঞ্জের সুবিশাল কাঁচের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে যখন কফি কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম, তখন বাইরের উত্তাল আরব সাগর আর নরিমান পয়েন্টের স্কাইলাইনকে মনে হচ্ছিল ফ্রেমবন্দী কোনো ক্যানভাস।
ষোল তলায় আমার রুম। লাগেজপত্র রিসিপশন থেকে রুমে আনা হলো। হোটেলের সিকিউরিটি বেশ কড়াকড়ি মনে হলো। সবাইকে চেক করা হচ্ছে প্রথম ফ্লোরে রিসিপশনের পথে। তবে হোটেলের সব স্টাফ আন্তরিক। এখানকার আতিথিয়তা মনে রাখার মতো।
রুমে ঢুকে জানালার কাছে দাঁড়াতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল বর্ষাস্নাত বিশাল আরব সাগর। দিগন্তজোড়া জলরাশি আর পাড়ে আছড়ে পড়া ফেনিল ঢেউ নিমেষেই সফরের সব ক্লান্তি দূর করে দিল। ভারতের অন্যান্য শহর দেখার সুযোগ হলেও মুম্বাইয়ে প্রথমবারের মতো আমার আসা।
মুম্বাইয়ের ইতিহাস কিংবা দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার আগে যার কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন আমাদের সফরসঙ্গী ও গাইড মিস্টার রাকেশ দুবে। উত্তর প্রদেশের বারাণসীর বাসিন্দা এই মানুষটির বয়স চল্লিশের কোঠায় হলেও তার রসিকতা এবং চঞ্চলতা ছিল একদম তরুণদের মতো। পুরো পথেই ক্লান্তহীনভাবে নানা স্থাপনা আমাদের কাছে সে বর্ণনা করছিলো।
পিওর ইউপি (উত্তর প্রদেশ) হিন্দি উচ্চারণে তার কথা বলার ধরনই ছিল আলাদা। যেকোনো ইতিহাস বা তত্ত্বকথা তিনি অত্যন্ত রসাত্মকভাবে উপস্থাপন করতেন। গাড়িতে ওঠার পরপরই চওড়া হাসি দিয়ে পানের পিক ফেলার ভঙ্গিতে বললেন, “সাহেব, মুম্বাই মে দো চিজেঁ কভি ভি মিল সকতি হ্যায়—এক খ্বাব (স্বপ্ন), অউর দুসরা ট্রাফিক! লেকিন জাব তক দুবেজি আপকে সাথ হ্যায়, আপকো ট্রাফিক ভি বরদাশত হো যায়েগা!”
রাকেশ দুবে নিজেকে রসিকতা করে বলতেন ‘মুম্বাই কা আনঅফিসিয়াল গভর্নর’। তিনি বলতেন, “বানারস কা পান অউর মুম্বাই কা কাম—দোনো হি মেরে খুন মে হ্যায়!” মুম্বাইয়ের প্রতিটি গলি, কোন আম্বানি কোন রেস্তোরাঁয় চা খান, শাহরুখ খানের বাড়ির পাহারাদারদের ভেতরের খবর—সবকিছুই যেন দুবেজির নখদর্পণে। তার উপস্থিতি এই তিন দিনের সফরকে কেবল দর্শনীয় স্থানের তালিকা পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং আড্ডায় ও হাসিতে ভরিয়ে তুলেছিল।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি কিছুটা কমতেই রাকেশ দুবে আমাদের নিয়ে বের হলেন মেরিন ড্রাইভের (Marine Drive) দিকে। হোটেল ওবেরয় থেকে বের হলেই শুরু হয় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অর্ধচন্দ্রাকৃতি সমুদ্রসৈকত সড়ক। স্থানীয়রা একে ভালোবেসে বলেন ‘কুইন্স নেকলেস’ বা রাণীর হার। কারণ রাতের বেলা ওপর থেকে দেখলে এই সড়কের ল্যাম্পপোস্টের সারিকে মনে হয় কোনো রাণীর গলার হীরার হার।
আমরা মেরিন ড্রাইভের কংক্রিটের বাঁধের ওপর বসলাম। সমুদ্রের প্রকাণ্ড ঢেউগুলো এস আছড়ে পড়ছিল পাথরে, আর তার জলকণা এসে লাগছিল মুখে। দুবেজি সেখান থেকে বারাণসীর ঘাট আর মুম্বাইয়ের মেরিন ড্রাইভের এক অদ্ভুত তুলনা দাঁড় করালেন। বললেন, “সাহেব, বারাণসীতে মানুষ আসে মুক্তির খোঁজে, আর মুম্বাইতে আসে জীবনের খোঁজে! দেখুন, এই সাগরের কোনো শেষ নেই, তেমনি মানুষের চাহিদারও শেষ নেই।”
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই সড়কের বাতিগুলো জ্বলে উঠল, সত্যিই মনে হলো আলো দিয়ে তৈরি কোনো মহামূল্যবান হার আরব সাগরের গলায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হোটেলে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার মুম্বাই এক্সপ্লোরেশনে বের হলোম। প্রথমে গেলাম অ্যাপোলো বান্ডারে অবস্থিত ‘গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া’ (Gateway of India)-র সামনে। ১৯১১ সালে সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও রানি মেরির ভারত আগমন স্মরণে তৈরি এই বিশাল তোরণটি আজও আরব সাগরের পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর ঠিক বিপরীতেই ১৮৯৩ সালে জামসেটজি টাটার তৈরি বিখ্যাত ‘তাজমহল প্যালেস হোটেল’ (The Taj Mahal Palace)। গথিক ও রেনেসাঁ স্থাপত্যের এই অনবদ্য মিশ্রণটি শুধু বিলাসবহুল হোটেল নয়, মুম্বাইয়ের অদম্য ভাবমূর্তির এক রক্তমাংসের প্রতীক।
(২)
পরদিন সকালে আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল ‘হাজী আলী দরগাহ’ (Haji Ali Dargah)। এটি পঞ্চদশ শতকের এক সুফি সাধক পীর হাজী আলী শাহ বুখারীর স্মৃতিবিজড়িত এক বিস্ময়কর স্থাপত্য। ওরলি উপকূল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরে সাগরের মাঝে একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে অবস্থিত এই দরগাহ। বিশেষত্ব হলো, জোয়ারের সময় দরগাহে যাওয়ার বাঁধানো পথটি সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন মনে হয় পুরো দরগাহটি যেন সমুদ্রের ওপর ভেসে আছে! আর ভাটার সময় পথটি জেগে ওঠে।
আমরা যখন পৌঁছালাম, তখন সবে ভাটা শুরু হয়েছে। দুবেজি আমাদের সাবধানে হেঁটে যাওয়ার তাগিদ দিয়ে বললেন, “সাহেব, পীর বাবার দরবারে মন থেকে যা চাইবেন, মিলবে। তবে শর্ত হলো হৃদয় পরিষ্কার রাখতে হবে!”
সাগরের নোনা হাওয়া ও সুফি সংগীতের মূর্ছনায় দরগাহের পরিবেশটা এক পবিত্র প্রশান্তিতে ভরা ছিল। দরগাহে প্রার্থনা জানিয়ে ও সাগরের মাঝখানের এই নীরবতা উপভোগ করে আমরা পরবর্তী গন্তব্যের দিকে রওনা হলাম।
হাজী আলী দরগাহের আধ্যাত্মিক আবহ থেকে বের হয়ে আমরা ঢুকলাম এক ভিন্ন মুম্বাইতে—যেখানে কেবল বৈভব, প্রাচুর্য আর আধুনিকতার স্পর্শ। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল লোয়ার প্যালের বিখ্যাত ‘প্যালাডিয়াম শপিং মল’ (Palladium Mall)।
প্যালাডিয়াম মুম্বাইয়ের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার অন্যতম প্রতীক। বিশ্বের নামীদামী সব ব্র্যান্ড, গুচি, আর্মানি থেকে শুরু করে লুই ভিটোর আউটলেট সাজানো এখানে। শপিং মলের কাঁচঘেরা আধুনিক স্থাপত্য ও চকচকে পরিবেশ দেখে দুবেজি মুখ বাঁকিয়ে হেসে বললেন, “সাহেব, এখানে একটি জ্যাকেটের দামে আমার বারাণসীতে একটি ছোটখাটো জমি কেনা হয়ে যাবে! কিন্তু দেখুন, মানুষের শখ বড় অদ্ভুত জিনিস।”
মল ঘুরে দেখে ও দুপুরের মধ্যাহ্নভোজ সেরে আমরা এগোলাম মুম্বাইয়ের আরেক বিস্ময় ‘অ্যান্টিলিয়া’র (Antilia) দিকে। দক্ষিণ মুম্বাইয়ের অল্টামাউন্ট রোডে অবস্থিত ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ২৭ তলা বিশিষ্ট এই ব্যক্তিগত বাসভবনটি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল বাড়ি। প্রায় চার লক্ষ বর্গফুটের এই প্রকাণ্ড ভবনটির স্থায়িত্ব ও নকশা অত্যন্ত আধুনিক। ছয় তলা জুড়ে কেবল গাড়ি পার্কিং, তিনটি হেলিপ্যাড এবং প্রায় ৬০০ জন কর্মী নিয়ে এটি পরিচালনা করা হয়।
অ্যান্টিলিয়ার সামনে দাঁড়াতেই এর বিশালতা দেখে চোখ ছানাবড়া হওয়ার জোগাড়। সাধারণ ইটের ভবনের চেয়ে এটি সম্পূর্ণ আলাদা নকশার। দুবেজি হাত উঁচিয়ে বললেন, “সাহেব, এটাকে বলে স্বপ্নের উচ্চতা! মুকেশ ভাই এখানে থাকেন আর পুরো দেশের অর্থনীতি পরিচালনা করেন। তবে চিন্তা করবেন না, ওনারও দিনে ৩টির বেশি রুটি খাওয়া বারণ!” দুবেজির এই রসালাপ শুনে আমরা হেসে ফেললাম। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল অর্থের সংমিশ্রণে তৈরি এই প্রাসাদ মুম্বাইয়ের আমূল বৈষম্য ও রূপকথাকে একসাথে তুলে ধরে।
হোটেলে ফেরার পথে ট্রাফিকে আটকে থাকার সময় দুবেজি গাড়ির এসি এডজাস্ট করতে করতে বললেন, ‘সাহেব, মুম্বাইয়ের মানুষ সময় বাঁচানোর জন্য দৌড়ায়, আর মুম্বাইয়ের ট্রাফিক মানুষকে সবুর করতে শেখায়! এই শহরের আসল পাওয়ার স্ট্রিং আম্বানি বা শাহরুখের হাতে নয়, ট্রাফিক পুলিশের হাতের সিগন্যালে!’ তাঁর এই তাৎক্ষণিক দর্শনে আমরা না হেসে পারলাম না।
(৩)
তৃতীয় দিনে আমাদের গন্তব্য ছিল মুম্বাইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ—বান্দ্রা (Bandra) এবং বলিউডের তারকাদের রাজত্ব। দক্ষিণ মুম্বাই থেকে বান্দ্রা যাওয়ার জন্য আমরা পার হলাম প্রকৌশলের এক অনবদ্য নিদর্শন—‘বান্দ্রা-ওয়ার্লি সি লিংক’ (Bandra-Worli Sea Link)। সাগরের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া এই আট লেনের ক্যাবল-স্টেড সেতু দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা চমৎকার। একদিকে আরব সাগর, অন্যদিকে মুম্বাইয়ের স্কাইলাইন।
বান্দ্রায় পৌঁছানোর পর পরিবেশটাই বদলে গেল। পর্তুগিজ ঐতিহ্যের ছাপ, ক্যাফে কালচার, আর দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আর্ট নিয়ে বান্দ্রা যেন শিল্পীদের শহর। তবে আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল তারকাদের বাড়িগুলো একনজর দেখা।
বান্দ্রার আধুনিকতার দিকে যাওয়ার পথে কোনো এক স্টেশনের বাইরে চোখে পড়ল সাদা টুপি পরা মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ‘ডাব্বাওয়ালাদের’। কোনো কম্পিউটার বা জিপিএস ছাড়া প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের টিফিন বক্স নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়ার এই অসামান্য দক্ষতা দেখে দুবেজি গর্ব করে বললেন, ‘সাহেব, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এদের ওপর কেস স্টাডি করে, আর আমাদের দুবেজিদের ঘর থেকে আনা রুটি এদের ভরসাতেই গরম থাকে!’ একই সাথে দূর থেকে ছুটে চলা মুম্বাই লোকাল ট্রেনগুলোর খোলা দরজায় ঝুলে থাকা মানুষের সারি দেখিয়ে দিল—এই শহর কখনো ঘুমায় না, থামে না।
দুবেজি আমাদের গাড়িটি নিয়ে থামালেন ‘গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টস’-এর সামনে। এখানে থাকেন বলিউড ভাইজান সালমান খান। খুবই সাধারণ দেখতে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, অথচ এর বাইরে শত শত ভক্তের ভিড়। সবাই একটিবার নিজের চোখে প্রিয় তারকাকে দেখতে মুখিয়ে আছে।
এরপর গাড়ি এগিয়ে গেল ব্যান্ডস্ট্যান্ডের দিকে। বিশাল সমুদ্রের ঠিক পাশেই অবস্থিত ‘মান্নাত’ (Mannat)—বলিউড বাদশা শাহরুখ খানের রাজকীয় বাংলো। মান্নাতের সুবিশাল কালো লোহার গেটের সামনে যেন উৎসবের পরিবেশ! দেশ-বিদেশ থেকে আসা শত শত মানুষ মান্নাতের সাইনবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন।
দুবেজি গাড়ি থেকে নেমে ভক্তদের ভিড় দেখিয়ে বললেন, “সাহেব, ভারতে দুটি জিনিস নিয়ে কোনো তর্ক নেই—একটি ক্রিকেট, অন্যটি সিনেমা! শাহরুখ খান এই বাংলো বানিয়েছেন নিজের মেহনতে। এই যে দেখছেন মানুষের ভিড়, এরা কেউ ওনার আত্মীয় নয়, কিন্তু সবাই ওনাকে ভালোবাসে। একেই বলে মায়ানগরীর জাদু।”
মান্নাতের সামনে ভিড় কাটিয়ে যাওয়ার সময় দুবেজি জুহু-র দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘ঐ দিকে বচ্চন সাবের ‘জলসা’ (Jalsa)। প্রতি রবিবারে বিগ বি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাত নাড়েন। বোম্বেতে ঈশ্বর দর্শন আর বচ্চন দর্শন—দুটোই ভক্তদের কাছে সমান!’ বান্দ্রার বিখ্যাত পালি হিলসের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় চোখে পড়ল নামীদামী সব ক্যাফে, যেখানে হয়তো যেকোনো মুহূর্তে কোনো বলিউড তারকাকে কফি কাপ হাতে দেখা মিলে যেতে পারে।
আমরা শাহরুখ, সালমানের বাড়ির পাশাপাশি আনুমানিক দূরত্বের অন্যান্য তারকাদের আবাসন এলাকাও পার হলাম। পুরো বান্দ্রা যেন এক জীবন্ত চলচ্চিত্রের সেট, যেখানে স্বপ্ন আর বাস্তব মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।
বান্দ্রার গ্ল্যামার কাটিয়ে সফরের শেষ বিকেলে আমরা পৌঁছালাম বিখ্যাত ‘জুহু বিচে’ (Juhu Beach)। মুম্বাই এসে জুহু বিচে সূর্যাস্ত না দেখলে সফর অপূর্ণ থেকে যায়।
বর্ষার বিকেলেও বিচে মানুষের ভিড় ছিল দেখার মতো। ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক, বাচ্চাদের প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে খেলা আর ঢেউয়ের কলতান—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। মুম্বাইয়ের স্ট্রিট ফুডের কথা না বললে এই ভ্রমণ কাহিনী অসম্পূর্ণ থাকবে। জুহু বিচে গিয়ে আমরা স্বাদ নিলাম বিখ্যাত ‘পাভ ভাজি’, ‘ভেলপুরি’ এবং ‘বডা পাভ’-এর।
মশলাদার তাজা পাভ ভাজির ওপর মাখনের আস্তরণ আর সাথে লেবুর রস—স্বাদটি সত্যি মুখে লেগে থাকার মতো। দুবেজি নিজে হাতে আমাদের ভেলপুরি প্লেট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “সাহেব, ওবেরয়ের ফাইভ স্টার খাবার এক জায়গায়, আর জুহু বিচের ভেলপুরি এক জায়গায়! মুম্বাইকে বুঝতে হলে এই মাটির গন্ধ নিতে হবে।”
বিকেলের সূর্য যখন আরব সাগরের পানির গভীরে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছিল, আকাশের মেঘে তখন লাল, কমলা আর বেগুনি রঙের খেলা। সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এই তিন দিনে যেন এক স্বপ্নের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেলাম।
তিন দিন সময়টা একটি শহরের জন্য খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু মুম্বাই এমন একটি শহর, যা কম সময়েও মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। এর ইতিহাস যেমন সমৃদ্ধ, এর আধুনিকতা তেমনই ঝকঝকে। এখানে একদিকে রয়েছে ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের প্রাসাদোপম অট্টালিকা, অন্যদিকে রয়েছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের বাঁচার সংগ্রাম।
হোটেল ওবেরয়ের রাজকীয় আতিথেয়তা, মেরিন ড্রাইভের বাতাস, হাজী আলীর প্রশান্তি, আম্বানি-শাহরুখদের প্রাচুর্য, জুহু বিচের কোলাহল এবং সর্বোপরি গাইড মিস্টার রাকেশ দুবেজির হাসিমুখ ও অনন্য রসিকতা—সব মিলিয়ে এই সফরটি আমার স্মৃতির পাতায় চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
আমার কেবলই মনে হচ্ছিল মুম্বাই একটি মামুলী শহর নয়, এটি একটি অনুভূতি। এটি এমন এক মায়ানগরী, যা মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখায় এবং সেই স্বপ্নকে তাড়া করার সাহস জোগায়। বিমানবন্দরে ফেরার পথে পিছন ফিরে তাকাতেই মনে হলো, শহরটি যেন ফিসফিস করে বলছে—”ফির আওগে না?” (আবার আসবে তো?)।

