নোবেল পুরস্কার: দূর হোক ক্ষুধা, দারিদ্র, যুদ্ধ
আজকের এই অবারিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ইন্টারনেটের যুগে আমরা খুব সহজেই সবকিছু সত্যি সত্যি বাতাসের আগেই জেনে যাই। পড়শীর অক্টোবর সংখ্যাটি যখন পাঠকের হাতে পৌঁছাবে তখন সবাই এই বছরের নোবেল বিজয়ীদের নামও জেনে যাবেন। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্রে কিংবা অর্থনীতি বা সাহিত্য যাই হোক না কেন আমাদের বাঙালিদের জন্য সবগুলো নামই উচ্চারণ করা বেশ কঠিন। অথচ নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের সূচনা লগ্ন থেকে মাত্র ১২ বছরের মাথায় আমাদের ঘরের একজন মানুষ, যার নাম উচ্চারণ করতে আমাদের একটুও কষ্ট হয়নি বা হয়না সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্য নোবেল পুরস্কার পেলেন। তারপর অপেক্ষা করতে হলো দীর্ঘ ৮৫ বছর, ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে অমর্ত্য সেন নোবেল পেলেন। ২০০৬ সনে শান্তিতে ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস এবং তার প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাঙ্ক পাবার পর ২০১৯ সালে আরেক বাঙালি অভিজিৎ ব্যানার্জি অর্থনীতিতে নোবেল প্রাইজ পেলেন। তার মানে, ১২৫ বছরের ইতিহাসে মাত্র চারজন বাঙালি। কিন্তু তাই বলে প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার কে কে পেল, সবার মত আমরা বাঙালিরাও খুব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি। যদি আরেকজন বাঙালি, যার নাম আমরা সহজেই উচ্চারণ করতে পারি কিংবা মনে হতে পারে পাশের বাড়ির কেউ একজন নোবেল জিতে যায়!!
নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের পর থেকেই বিতর্কও সাথে সাথেই চলেছে। বিশেষ করে একটা কথা খুব প্রচলিত, যারা অশান্তি সৃষ্টি করে, তারাই নাকি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়ে থাকে। কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের আদরের মানুষ না হলে নোবেল পুরস্কার জোটে না। অনেক ক্ষেত্রে না হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই অভিযোগগুলো হয়তো কিছুটা সত্যি। কিন্তু তাতে করে এই পুরষ্কার পাওয়া নিয়ে যে মাতামাতি বা নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মহত্ব কোন অংশে কমেনা। কাজের স্বীকৃতির সবচেয়ে বড় মাপকাঠি এই পৃথিবীতে এখনো এই নোবেল পুরস্কারই। পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন যারা নোবেল পুরস্কার পাবেন তারা ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবেন, কিন্তু সবাই ভালোবাসার জায়গায় থাকবেন কিনা তা বলা কঠিন। সময়ের সাথে সাথে ভূমিকা বদলে কেউ কেউ জনগণের আশার বিপরীতেও দাঁড়িয়ে যান।
১২৫ বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ~১০০০ জন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যার মধ্যে ১১২ জন এবং ২৮ টি অর্গানাইজেশন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করে অনুতপ্ত হয়ে মানুষের কল্যাণের জন্য যে নোবেল পুরস্কার দেবার প্রবর্তন করেছিলেন, তারপরও দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে এই পৃথিবী। আর প্রতিবছর অনেকগুলো যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পাড়ি দিতে হচ্ছে। ভয়ে থাকি, যে কোন মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। এখনো পৃথিবীতে অস্ত্রের বিপুল বাণিজ্যিকরণ চলছে, ক্ষুধায় মানুষ মারা যাচ্ছে, মানুষের সাথে সাথে রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাসও চূড়ান্ত পর্যায়ে।
যারা নোবেল বিজয়ী হচ্ছেন তারা মানুষের কল্যাণে তাদের জীবনকে উৎসর্গ করছেন। কিন্তু এই মানুষগুলোর জীবন উৎসর্গ, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তাদের কাছে হয়তো কোনই অর্থ বহন করে না। তাদের কাছে হয়তো ক্ষমতাই চূড়ান্ত লক্ষ্য। বিচার বিবেচনা করলে দেখা যাবে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষই কল্যাণকামী, খুব কম মানুষ হত্যা বা আগ্রাসনকে সমর্থন করে। তাই প্রতিবছর নোবেল পুরস্কার দেয়া হলেও, যতদিন না যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারা পৃথিবীর কল্যাণের জন্য চিন্তা করবেন, ততদিন পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার শুধু শোকেসে সাজিয়ে রাখার মতোই একটি পুরস্কার হয়ে থাকবে।

