এক শীতের রাতে সে হেঁটে যাচ্ছিল ব্যাগ হাতে। তিন দিকে টিলা আর পাহাড়, আরেক দিকে চা বাগানে ঘেরা কলোনির রাস্তা দিয়ে। সার কারখানার গেটের উল্টো দিকের বড় একটা মাঠ সংলগ্ন ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে স্কুটার না নিয়ে রিক্সা নেবে, যদিও কুয়াশাভেজা শীতের রাত। রেল স্টেশনটা প্রায় মাইল তিনেক দূরে। কলোনির সীমানা পেরিয়ে রাস্তাটা চলে গেছে দুদিকে পাহাড়, টিলা আর চা বাগানের মাঝ দিয়ে রেল স্টেশন পর্যন্ত। খোলা রিক্সায় বসে পাহাড়ের বুনো গাছ–গাছালির কুয়াশামাখা অপূর্ব ঘ্রাণ নিতে নিতে সে পৌঁছাবে রেল স্টেশনে। গভীর রাতের ট্রেনে ছেড়ে যাবে এই মায়া উপত্যকা, সাড়া দিতে জীবনের অমোঘ আহবানে। তার যাত্রা বহু দূরের এক মহাদেশে। নিঝুম কলোনির রাস্তা দিয়ে সে হেঁটে যাচ্ছিল। কোনো এক বাসায় স্কুলের ফাংশনে আবৃত্তির জন্য এক বালক কচি কণ্ঠে পড়ে যাচ্ছিল – ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও। তারই রথ নিত্যই উধাও।’ বালক কি জানে সে কী পড়ছে, বিষাদ মনে সে ভাবল। সে জানে এইখানে তার আর কখনো ফেরা হবে না।
ব্যাগ হাতে সে হেঁটে যাচ্ছিল কলোনির ভেতরের রাস্তা দিয়ে। রাস্তার দুদিকে সারি বাঁধা বাসা আর লাগোয়া বাগান। যাকে সে দেখেছে অনেক দিন, অনেক মাস। তাকে এখন একবার কি দেখা যায় না? যেতে যেতেই মনে হলো তার। এই কলোনির নির্ভয় রাতে অনেকেইতো রাতে দরোজা বন্ধ করার আগে একবার বারান্দায় দাঁড়ায়, চারদিক দেখে। নাহ, সে বারান্দায় নেই!
মনে পড়ছিল কয়েক বছর আগের এক রাতের কথা। কলোনির এক প্রান্তে টিলার ওপর গেস্ট হাউজ, সামনে রাস্তা নেমে গেছে টিলার ঢাল বেয়ে। ঢালু সেই রাস্তাটা দিয়ে কিছুটা দূরে স্কুলের সহপাঠী মেয়েটির বাসার দিকে হেঁটে যাচ্ছিল তারা। স্কুলের সিনিয়র ক্লাশে তারা তখন। স্যারের বাসা থেকে পড়ে এসেছে। মেয়েটির বাসার একটা লাইন পর তার বাসা। ষাটের দশকের শেষ দিকে বড় ভাইয়ের বাসায় থেকে সারকারখানার স্কুলে পড়াশুনা করছিল সে। মেয়েটিও পড়ছিল তার বোনের বাসায় থেকে। কোনো বাসার রেডিওতে রাতের অনুরোধের আসরে বাজছে তখন – ‘রংধনু চোখে চোখে, কথা বলি মুখে মুখে, এখানে মনের কথা বল না…… কথা হবে মনে মনে, তুমি আমি নিরজনে, যেখানে দিগন্তে, আকাশ আর মাটিতে দেখা হয় পৃথিবীর প্রান্তে।‘ মেয়েটি তাকে বলেছিল, গানটা সুন্দর না? মনে রেখ। গানের কথাগুলো মনে রেখ।
দুদিন পর গভীর রাতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বোয়িং পেরিয়ে যায় ১৯৭৬ সালের বাংলাদেশের সীমানা। প্লেনের ছোট জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে দৃষ্টি দিয়ে সে একবার ভাবল, প্লেনটা কি ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানার উপর দিয়ে যাচ্ছে!
বহু বছর পর। ভোরের আলো তখনো ভালোভাবে ফোটেনি। শিকাগো, ইলিনয়ের ঘুমন্ত বাসার কিচেনে এক কাপ কফি আর দুটো কুকি খেয়ে বের হতে বাসার দরজা এমনিতেই লক হলো। গাড়ি বের করে রিমোটের বোতাম টিপে গ্যারাজ লক করল। একটু থেমে চারদিক দেখছিল সে। মাইল বিশেক দূরে তার অফিস। অনেক বছর চাকুরি করে নিজে একটা অফিস করেছে সে। এক অর্থে সফল মানুষ। কিন্তু ঠিক জানে না সে, কেন তার কিছু ভালো লাগে না ইদানিং। জানালার কাঁচ নামিয়ে চারদিক কেন যেন সে আবার দেখল। গাড়ির ড্যাশবোর্ডে একটা ফ্ল্যাশ ড্রাইভ। মনে পড়ল, ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করা কয়েকটা গান আছে ওটাতে। জানালা উঠিয়ে প্লেয়ার অন করতেই – ‘রংধনু চোখে চোখে, কথা বলি মুখে মুখে, এখানে মনের কথা বল না …. এখানে হিসাব গোনা দেনা আর পাওনা, এখানে দেখা হয় কী পেলাম কী দিলাম। এখানে সবাই একা, এখানে চোখের দেখা, এখানে মনের কথা বল না।’ অনেকক্ষণ ধরে গানটা শুনল সে। ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে। কতকাল আগে এক মায়াবী সবুজ উপত্যকায় এক কিশোরী বলেছিল, গানটা সুন্দর না? মনে রেখ। গানের কথাগুলো মনে রেখ।
ফিরে আসা
বুলবুলি তোর পিছন কেন লাল
আল্লাতালায় বানাইয়াছে হিন্দু মুসলমান ।।
মাঠটার এক পাশে একটু দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের খেলা দেখছিল সে। মাঠের শেষে পাহাড়। খেলোয়াড়েরা পিচ্চি, পাঁচ থেকে বারো বছরের মতোই হবে। মাঠের বেশিরভাগ জুড়ে যে খেলাটা চলছে সে ওটার নাম জানে, কিং কুইন। একটা টেনিস বল দিয়ে কে কার পিঠে কত জোরে লাগাতে পারে। আরেক দিকের ছোট জায়গাটায় বেশি পিচ্চিরা খেলছে অদ্ভুত আরেক খেলা, যার কোন নাম নেই। এ ওকে ছুঁয়ে দিচ্ছে, ধাক্কা দিচ্ছে। মাঠ–লাগোয়া একটা বাসার বাগানের আতা গাছ থেকে এক জোড়া বুলবুলি উড়ে যাচ্ছিল অন্য বাসার বাগানে। সেটা দেখেই কোনো পিচ্চি ছেলে গেয়ে উঠেছিল ওই রাইম, সাথে সাথে অন্যরাও। খিল খিল করে হাসছিল পিচ্চি মেয়েরা। বয়স ভুলে হেসে উঠেছিল সেও। এজন্যই তো আসা।
অনেক বছর পর সে ফিরেছিল। মাইজগাঁও স্টেশনে ভোরের ট্রেনে নেমে, বহু বছর আগে এখান থেকে চলে যাওয়ার রাতের মতো রিকশা নিয়েছিল। ক্রিসমাসের ছুটিতে শিকাগো থেকে কী এক ঘোরে বাংলাদেশ। ঢাকায় নেমেছিল সকালে, রাতের ট্রেনে উঠে বসেছিল সেই পুরাতন ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানার দিকে। সেখানে তার বড় ভাই এখনো চাকরি করেন, রিটায়ারমেন্টের সময় ঘনিয়ে এসেছে যদিও। মাত্র বারো দিনের ছুটির দশ দিনই থাকবে সে এখানে, যাবে না আর কোথাও।
তখন সকাল, রিক্সায় বসে চারদিক দেখছিল অবাক হয়ে। সব কিছু কত বদলে গেছে! রাস্তার পাশের ছোট গাছগুলো অনেক বড় এখন, কৃষ্ণচূড়া, সেগুন। পাহাড়ের আর চা বাগানের গাছগুলো কত গভীর। তার স্কুলের ছাতিম গাছটাও। সবগুলো বাসার সামনের বাগানে অনেক গাছ- ফুলের, ফলের। বাগানের সামনের রাস্তায় দুটো বাঁশের ওপর আড়াআড়ি বাঁশে কাপড় শুকাচ্ছে শীতের কোমল রোদে।
তার ভাইয়ের বাসা হাউজিং কলোনিতে হলেও রিকশাওয়ালাকে কলাবাগান, গেস্ট হাউজের রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে বলেছিল সে। স্কুলটা ঘিরে একটা কুৎসিত দেয়াল। কেন এটা বানানো হলো, সে ভাবল। স্কুলটা ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া ছিল তার সময়ে। কী সুন্দর দেখাতো তখন।
দুপুরে ঘুমিয়ে বিকেল আর রাতে কলোনির রাস্তায় অবিরাম হেঁটে যাচ্ছিল সে। সন্ধ্যা হয়ে এলে কোনো এক লাইনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুনেছিল এক কচি কণ্ঠ জোরে জোরে পড়ছে, ব হ্রস্ব ইকার ড এ শূন্য আকার ল – বিড়াল, মেকুর। বিড়ালের সিলেটি নাম শুনে আবারও হেসেছিল সে। এইবার একটু জোরে। আশে পাশে তাকিয়েছিল, কেউ দেখেনি তো? শিকাগোতে এই ভাবে শেষ কবে হেসেছিল সে? তার ভাইয়ের আগের বাসাটার কয়েক লাইন পরের একটা বাসার সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল সে। বহু বছর আগে তার কিশোরী সহপাঠি “… কথা হবে মনে মনে, তুমি আমি নিরজনে, যেখানে দিগন্তে, আকাশ আর মাটিতে দেখা হয় পৃথিবীর প্রান্তে” শুনতে শুনতে বলেছিল, গানটার কথাগুলো সুন্দর না? মনে রেখো, কথাগুলো মনে রেখো। সে আর এখানে নেই। বাগানের হাসনাহেনার নিবিড় সুবাস ছড়িয়ে ছিল শীতের সন্ধ্যায়।
তাদের কাছে, আর ফিরবে না যারা
দেখতে দেখতে ছুটির দিনগুলো ফুরিয়ে আসছিল। একদিন তার বড় ভাই বললেন আমেরিকায় চলে যাবার আগে একবার বাড়ি গিয়ে বাবা মা’র কবর জিয়ারত করা দরকার। আবার কবে সে আসবে তার তো কোন ঠিক নেই। তার ভাবী সায় দিয়েছিলেন। আসলে এই কথাটা বলবেন বলে কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলেন। শেষে ঠিক হয়েছিল একসঙ্গে সবাই কিশোরগঞ্জ যাবেন, দেশের বাড়িতে। দুদিন থেকে ফিরে আসবেন এখানে। তারপর এখান থেকেই সে ফিরে যাবে শিকাগো।
ছোটবেলার শেখা কোরআন পড়া সে ভোলেনি। তখন তো ছিল শুধু আরবি। এখন বাংলা অর্থসহ কোরআন পাওয়া যায়। আমেরিকায় নিয়মিত পড়া না হলেও রমজান মাসে অল্প হলেও সে পড়ে। তার দুই ছেলে এক মেয়েকে উৎসাহ দেওয়াও উদ্দেশ্য। যদিও ওরা ধীরে ধীরে পুরোদস্তর আমেরিকান হয়ে যাচ্ছে। তবুও যতটা পারা যায় ধর্ম আর দেশের সংস্কৃতি ধরে রাখা। অন্ততঃ জানিয়ে রাখা। সে জানে তার আর তার স্ত্রীর দায়িত্ব এই জানিয়ে দেওয়া পর্যন্ত। বেছে নেবে তারা, ছেলে মেয়েরা। এর বেশি তাদের কিছু করার নেই।
বাংলা অর্থসহ কোরআন শরীফ নিয়ে কিশোরগঞ্জের এক গহীন গাঁয়ের ইট বেরিয়ে থাকা দেয়ালঘেরা পুরোন কবরস্থানে বাবা মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে পশ্চিম দিকে ফিরে সে ধীরে ধীরে পড়ে যাচ্ছিল সুরা ইয়াসীন। “সালামুন কাওলাম মিররাব্বির রাহীম – দয়াময় প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদেরকে সালাম বলে সম্ভাষণ করা হবে।” আকুল অবিরাম চোখের জল ভিজিয়ে দিচ্ছিল তার গাল। অন্তর্গত কান্নার দমকে ভেঙে যাচ্ছিল তার কণ্ঠ বার বার। সেই যে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার বাসা থেকে চলে যাবার কয়েক দিন আগে এখানকার বাড়িতে এসে বিদায় নিয়ে গিয়েছিল আর তো ফিরে আসা হয়নি। বাবা মা’র সাথে আরতো দেখা হলো না সেই বিদায় বেলার পর। যদিও সে জানে, তার বিশ্বাস তাকে বলে – আবার দেখা হবে। এই পৃথিবীর মাটিতে নয়, অন্য এক পৃথিবীতে। সে নিশ্চিত জানে। অনেক সময় নিয়ে কোরআন পড়ে ফিরে আসতে আসতে গভীর মায়ায় কবর দুটোর দিকে তাকিয়ে নিরুচ্চারে সে বলছিল, আব্বা আম্মা শোন, আমি ভালো আছি। আল্লাহ নিশ্চই তোমাদের যত্নে রেখেছেন। আমি আবার আসব। দেরীতে হলেও আসব। অদূরের মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিন মাগরেব নামাজের আজান দিচ্ছিলেন তখন।
এই গহীন গ্রামেও এখন বিদ্যুৎ বাতি জ্বলে। রাস্তাও হয়েছে সুন্দর। অথচ সত্তুরের দশকেও ছিল মাটির রাস্তা। কতদূর হেঁটে তারপর বড় রাস্তা আর গাড়ি পাওয়া যেত। কেরোসিনের কুপি আর কদাচিৎ হ্যাজাক বাতি। সন্ধ্যার একটু পরেই নিঝুম নিস্তব্ধ হয়ে যেত চারদিক। আচ্ছা সে যদি বিএসসি পাশ করার পর আমেরিকা না গিয়ে এখানেই থেকে যেত তাহলে কী হতো? সে হয়তো মাস্টার্স করত। কোথাও কোন চাকরি হতো। একসময়তো বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেই হতো। সংসার হতো। সন্তানেরা আসতো পৃথিবীতে, এক সময় জীবনের কারণেই দূরেও চলে যেত। আমেরিকাতেও অনেকটা একই রকমতো। শুধু সেখানকার সবকিছু অনেক পরিচ্ছন্ন। জীবনের সুযোগ হয়তো একটু বেশি। কিন্তু অভাব সেখানেও আছে, অন্যরকম হলেও অভাব এখানেও আছে। কোন জীবনটা বেশি ভালো কে জানে। অথবা আমার এই জীবনের নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে নেই। অন্য কারো হাতে, গভীর আড়ালে থাকা সর্বদর্শী যিনি।
দুদিন পর বাড়ি থেকে ভৈরব রেলস্টেশনের দিকে ভাড়া করা গাড়িতে যেতে যেতে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটটাতে বসে সে ভাবছিল, কেন সে আমেরিকা যাবার স্বপ্ন দেখেছিল? এই গ্রামের নীরব পরিবেশের প্রায় বিপরীত ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা কলোনির সারিবদ্ধ বাসাবাড়ি, বাজার, স্কুল, পার্ক, খেলার মাঠ, ক্লাব, অদ্ভুত এক শব্দে অনবরত চলতে থাকা সার কারখানা, পত্রিকায় দেখা উন্নত আর ধনী দেশগুলোর ছবি, এই সবই কি তার মনে ছায়া ফেলেছিল?
ভৈরব থেকে তার ভাই ভাবী বাচ্চারা সিলেটের ট্রেনে উঠেছিল। সে গিয়েছিল ঢাকা, এয়ারলাইন্সের অফিসে গিয়ে তার প্লেনের টিকেট পরিবর্তন করে এক সপ্তাহ পরের টিকেট নিয়েছিল। হোটেলে থেকে পরের দিন দুপুরের ট্রেনে মাইজগাঁও স্টেশন, সারকারখানা।
নিজের ভেতরে উঁকি দেওয়ার ক্ষণ
আমবাগান কলোনির ই টাইপ বাসার কাঠের ফ্রেমে মশা আটকানোর নেট দিয়ে ঘেরা পর্দা টানা বারান্দায় বেতের সোফায় বসে পিঠা আর চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিল সে স্কুলের সহপাঠি, ছেলেবেলার বন্ধু মামুনের সাথে। তার বাবা চাকুরি করেছেন এখানেই। এই সার কারখানার বড় ধরনের মেরামত পুনর্বাসন কাজ হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে নতুন করে কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল। সদ্য বিএসসি পাশ করা মামুনের চাকুরি হয়েছিল তখনই। বছর দুয়েক আগে তার বাবা রিটায়ার করে চলে গেছেন গ্রামের বাড়িতে। যদিও সেটা আর গ্রাম নেই, উপজেলা সদরের মফস্বল শহর এখন। হাসতে হাসতে মামুন বলছিল,
তোর মাথায় আমেরিকা যাওয়ার বুদ্ধি আসছিল কীভাবে রে? আমিতো এই ফ্যাক্টরিতে চাকরি করার কথাই মনে করতাম খালি। অন্যরা কেউ ভাবতো ডাক্তার হইব, ইঞ্জিনীয়ার হইব, বড় চাকরি করব, এইসব। আমিতো ততটা ভালো ছাত্র ছিলাম না, কাজেই এইখানে চাকরি পাইলেই যথেষ্ঠ মনে করতাম। তুই কীভাবে আলাদা হইলিরে?
ঠিক জানিনা কীভাবে। কিশোরগঞ্জের ঘুম ঘুম গ্রামের পরিবেশ, তার তুলনায় এখানকার কেমন একটু চঞ্চল পরিবেশ। এইটাও তো ঠিক এইটা একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউন। এই দেশের অন্য এলাকার পরিবেশের চাইতে আলাদা। তবে এখানে সব কিছুই লিমিটেড। অনেক বেশি টাকা কারও নাই। অনেক বেশি কাজের সুযোগও নেই। কিন্তু সময় কাটানোর মাঠ আছে, ক্লাব আছে, লাইব্রেরি আছে। ইচ্ছা করলে পাহাড়ে, চা বাগানে, খাসিয়া পুঞ্জিতে যাওয়া যায়। অনেকটাই আমেরিকার যে কোনো ছোট শহরের মতোই। খালি ওইখানে সবাই গাড়িতে চড়ে, এইখানে সবাই হাঁটে।
শেষের কথাটায় দুই বন্ধু হা হা করে হেসে উঠেছিল। একটু পর সে বলছিল, আসলে কীভাবে জানি না, এই ফ্যাক্টরির পরিবেশ আর কয়েকটা বিদেশি ম্যাগাজিনে দেখা আমেরিকার খুব সুন্দর পরিবেশ দেখে আমার খালি মনে হইত আমেরিকার কোনো ইউনিভার্সিটিতে যদি পড়তে পারতাম, ওইখানে যদি কাজ করতে পারতাম। আসলে কিশোরগঞ্জে বাড়িতে থাকলে হয়তো এই চিন্তা মাথায় নাও আসতে পারত। এই পরিবেশটাই মনে হয় আমাকে আরও বড় হইতে হবে, দুনিয়া দেখতে হবে এইসব শিখাইছিল।
ওইখানে তোদের খাওয়া দাওয়ায় কী অবস্থা? মামুন জানতে চেয়েছিল কথা প্রসঙ্গে।
ভালোই, সব কিছুই পাওয়া যায়। হালাল। আমদানী করা দেশি মাছও, তবে ফ্রোজেন। তার চেয়ে আমেরিকার মাছই ভালো। তবে রান্না করতে হয় একটু স্পেশাল করে। তোর ভাবি মাঝে মাঝেই পিঠা বানায়। ছেলে মেয়েরাও তো পছন্দই করে। সবই ঠিক আছে। ঝুট ঝামেলা নাই, পলিটিক্স নাই। কাজ করতে হয় অনেক, সেই পরিবেশও আছে। তবে সব বাঙালি একসাথে হইলে মাঝেসাঝে একটু আধটু কুটনামি হয় আরকি! নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, আটলান্টায় অবশ্য একটু বেশি। ইলিনয়ে তেমন না। বাঙালি একটু কম তো। কিন্তু ওইখানে সবাইরেই ভালোই খাটাখাটনি করতে হয়। কাজ নাই খাওয়া নাই। পলিটিক্সের সময় এই জন্যই কারোই তেমন নাই। সবাই ছুটে রোজগারের ধান্দায়। আমারেও সারা দিনই ব্যস্ত থাকতে হয়। কিন্তু, এই ব্যস্ততা ভালোই লাগে। ব্যস্ততা না থাকলে বরং খারাপ লাগে।
বেড়াইতে যাস না? দেশটাতো খুব সুন্দর, টিভি সিনেমাতে দেখছি।
তা যাই। সারা দেশটাই দেখা হইয়া গেছে প্রায়। পাহাড়ে জঙ্গলে ক্যাম্পার ভ্যানে, তাবু খাটাইয়াও থাকছি সবাইরে নিয়া। খালি আলাস্কা যাই নাই। ঐ স্টেটটা বেশি ঠান্ডা। তবে প্ল্যান করছি আগামী বছর যাব। আসলেইরে দেশটা খুব সুন্দর। ফল সিজনে গাছের পাতাগুলি যেই রকম রঙিন হয়, সোনালী হয়, মনে হয় যেন গাছগুলির ভেতর থেকে নরম সোনালী আভা বের হইতেছে। মাইলের পর মাইল এই রকম, ইন্টারস্টেট হাইওয়ে দিয়া ড্রাইভ করার সময় আসলেই মনটা একেবারে ভরে যায়। সবই সুন্দর। তবুও আজকাল কেমন জানি একা একা লাগে। এই আরকি।
একটু আনমনা হয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বারান্দার নেটের মধ্য দিয়ে অন্ধকারে তাকিয়েছিল কিছুক্ষণ। বলেছিল, তবে এইটা ঠিক, আমেরিকা তরুণ আর যুবকদের। মধ্য বয়সে হয় আমার দশা। এই যেমন তোরে খুঁজতে আসছি – বলে হা হা করে হাসছিল সে। আর বুড়াদের জন্য আমেরিকা হইল সুন্দর একটা জেলখানা। একটু কি বিষাদ ছিল তার শেষ কথাটায়!
কেমেস্ট্রির পিরিওডিক টেবিল মুখস্ত করা থামিয়ে মামুনের ক্লাশ নাইনে পড়ুয়া ছেলে মাসুদ তাদের কথা শুনছিল। তার বাবার বন্ধুর দেওয়া চমৎকার ওয়াটারম্যান কলমটা দিয়ে খাতায় আঁকাআঁকি করতে করতে ঘোর লাগা চোখে ভাবছিল আমিও আমেরিকাতেই যাব, পড়ব, থাকব। বড় বৈজ্ঞানিক হব। ওনার মতো মাঝে মাঝে এই দেশে আসব, বেড়াতে।
কয়েকদিন পর নিউইয়র্কগামী বাংলাদেশ বিমান ব্রাসেলসের পথে পভীর রাতে উড়াল শুরু করলে সীটের সামনের ভিডিও স্ক্রীনে বার বার সে দেখছিল কখন বিমানটা বাংলাদেশের সীমানা ছেড়ে যায়। একসময় পকেট থেকে তার ভাতিজীর দেওয়া কলমটা দিয়ে প্লেনের টিস্যু পেপারে লিখছিল বিআইডিসি, সারকারখানা, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, বাংলাদেশ, শিকাগো, ইউএস। কানে ভাসছিল তার টেনে পড়া ভাতিজা, এইটে পড়া ভাতিজীর কথা – আমরাও কাকা আমেরিকায় যাবো। তুমি নিয়া যাবা। ওইখানে পড়বো, চাকরি করবো থাকবো। সারা আমেরিকা ঘুরে ঘুরে দেখবো। ক্যাম্পিং করবো তোমার মতো।
মনে পড়লো আরও, তার বন্ধু জানিয়েছিল সেই কিশোর বেলার মেয়েটির সংসার কী আশ্চর্য তারই মহাদেশের এক শহরে। হয়তো দেখা হবে কোনদিন, জীবনানন্দের কবিতার মত “জীবন গিয়েছে চ’লে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার, তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার।” হয়তো দেখা হবে পৃথিবীর কোন প্রান্তে যেমনটি শুনেছিল তারা কিশোর বেলার সংগীতে। সীটটা রিক্লাইন করে প্লেনের হালকা কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে চোখ দুটো বন্ধ করতে করতে ভেবেছিল সে। প্লেনের এঞ্জিন আর এয়ারকন্ডিশনারের চাপা যান্ত্রিক শব্দমাখা মৃদু আলোর কেবিনে প্রায় সব যাত্রীই ঘুমাচ্ছিল অথবা চোখ মুদেছিল তারই মতো। আটত্রিশ হাজার ফুট উপরের গভীর অন্ধকার কেটে রুপালি ডানার এয়ারবাস তখন এগিয়ে যাচ্ছিল পৃথিবীর আরেক প্রান্তের গন্তব্যে।

সাঈদ হাসান শিকদার | ঢাকা, বাংলাদেশ
অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব। ট্রান্সপোর্টেশন প্ল্যনিং কনসালটেন্ট। প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয়েছে “পূণ্যপথের যাত্রীরা – হজ, হজযাত্রী ও পথ।”
