আর নয় বৃক্ষনিধন, করো সবে বৃক্ষরোপণ

শ্যামসুন্দর দেবনাথ
May 20, 2026
8 views
33 mins read

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বনবাণী’ (১৯৩১) কাব্যের ‘বৃক্ষবন্দনা’ কবিতায় লিখেছেন-  

“অন্ধ ভূমি গর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান                                                

প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ,আদি প্রাণ।”

প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেম ও দর্শনের প্রতীক বৃক্ষ বাস্তবিকই ধরিত্রীর শ্যামল শোভা ও প্রাণের আদিম রূপ।বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতেও প্রতীয়মান হয় যে, পানির নিচে প্রায় ১০০ কোটি বছর আগে জন্ম নেয়া এককোষী শৈবাল নামক ক্ষুদ্র উদ্ভিদ কোটি কোটি বছরের বিবর্তন ও অভিযোজনের মাধ্যমে ডাঙ্গায় বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেন ও নিজেদের খাদ্য উৎপাদন শুরু করে। উদ্ভিদের মাধ্যমে পরিবেশ বাসযোগ্য হয়ে উঠায় প্রাণীজগৎ বিকশিত হয়েছে। উদ্ভিদ ও প্রাণী একে অপরের পরিপূরক কিন্তু খাদ্যশৃংখলের গোড়ায় উদ্ভিদ থাকায় প্রাণিকুলের অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে উদ্ভিদ জগতের উপর নির্ভরশীল। 

প্রাণিজগতের সেরা তথা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ প্রসঙ্গে কবি বড়ু চণ্ডীদাস বলেছেন,”সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”। মানবসভ্যতার উচ্চ শিখরে উঠেও কবি বড়ু চণ্ডীদাসের এই মানবিক অমর বাণীকে অসত্য প্রমাণিত করার মাধ্যমে বৃক্ষনিধন যজ্ঞে প্রকৃতিকে ঘৃতাহুতি দিয়ে আত্মঘাতি কর্মকাণ্ড নির্বিচারে চালিয়ে যাচ্ছে মানুষই।মার্কিন কবি আলফ্রেড জয়েস কিলমার এর “I think I shall never see/ A poem lovely as a tree” (“মনে হয় বৃক্ষের মতো সুন্দর একখানা কবিতা আমি কশ্মিনকালেও দেখবো না”) এবং অন্যান্য রোমান্টিক কবিদের দৃষ্টিতে ‘প্রকৃতির জীবন্ত,নিঃস্বার্থ ও পবিত্র এক অনুপম শিল্পকর্ম’-কে নিধন করে মানুষ নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থের প্রয়াসে কোটি কোটি বছরের ধারাবাহিকতায় অভিযোজিত আপন সভ্যতার শিকড়ই উপড়ে ফেলছে। কবি-দার্শনিকের ভাষার গুরুত্ব অবহেলা করলেও গবেষক- বিজ্ঞানীদের যুক্তি-তথ্য-তত্ত্ব-সতর্কবার্তাও এদের নিকট উপেক্ষিত উদাসীনতার দৃষ্টিতে আচ্ছন্ন। 

বৃক্ষ প্রকৃতির অকৃত্রিম বন্ধু ও ছায়া-ছাতা দাতা। মাটির গভীর থেকে বৃক্ষ অনন্য এক আলোকবন্দনা। জীবন,প্রাণিকুল ও পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষের অবদান অনস্বীকার্য। 

কোনো অরণ্য, বনভূমি বা নির্দিষ্ট এলাকার গাছপালা নির্বিচারে কেটে ফেলা বা ধ্বংস করাই বৃক্ষনিধন। মানুষের আবশ্যকতায় বিশেষ বসতি স্থাপন, কৃষি জমি বৃদ্ধিকরণ, রাস্তাঘাট তৈরিকরণ ইত্যাদি অথবা ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রকৃতির সমতায়ণ বা ভারসাম্য নষ্ট করে ব্যাপকভাবে গাছ কেটে ফেলাকে বলা হয় বৃক্ষনিধন। বন উজাড়,বনভূমি নিঃশেষকরণ, বন নিধন বা অরণ্য পরিষ্কার করার লক্ষ্যে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছপালা সমূলে উপড়ে ফেলা বা পুড়িয়ে ধ্বংস করাও বৃক্ষ নিধনের নামান্তর।

বৃক্ষনিধনে মানুষের বাধ্যবাধকতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে– বাসগৃহ বা বাসস্থান তৈরি, চাষাবাদের জন্য জমি বা ফসলিজমি সৃষ্টি বা বৃদ্ধিকরণ,জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে বাড়তি বসতঘর-বাড়ি, আবাদিজমি, যানবাহন দ্রুত বৃদ্ধির ফলে রাস্তাঘাট প্রশস্তকরণ, মৎস্যচাষের জন্য পুকুর-দিঘি-জলাশয় খনন,প্রয়োজনীয় মাংসের যোগান দেয়ার জন্য খামার তৈরিকরণ, দৈনন্দিন খাবার রান্নার কাজে জ্বালানি কাঠের সংগ্রহে,দরকারি আসবাবপত্র তৈরির লক্ষ্যে টিকসই কাঠ যোগার করতে, জলযান তথা নৌকা-জাহাজ, এমনকি স্থলযান রেলগাড়ির জন্যও কাঠের চাহিদা মিটানো; ধর্মনীতি অনুযায়ী মৃতের সৎকারে বাস ও কারোর ক্ষেত্রে কাঠ সংগ্রহ করতে, বাঁধ-সেতু নির্মাণে(কোথাও কোথাও কাঠের সেতু গড়তে) কাঠের প্রয়োজন; অট্টালিকা তৈরিতেও কাঠ বা বাঁশের সহযোগিতা নিতে হয়। এছাড়াও কাগজের মণ্ড,রেয়নশিল্পের কাঁচামাল ও দিয়াশলাই তৈরিতে গাছের প্রয়োজন। ধূনা, লাক্ষা, গদ, কুইনাইন, কর্পূর, তারপিন তৈল, রাবার ইত্যাদি তৈরিতে উপযুক্ত গুণাবলীর বৃক্ষ আবশ্যক। নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে তলিয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তেও প্রচুর গাছ-গাছরা কেটে নেওয়া হয় অথবা তা নদী গর্ভে তলিয়ে যায়, ফলে নদীমাতৃক দেশগুলোতে নদী ভাঙ্গনজনিত কারণে প্রচুর পরিমাণ বৃক্ষ-গাছগাছরা নিধন হচ্ছে।

সভ্যতার বিকাশের ধারায় নগরসভ্যতা গড়ে ওঠায় শহর-বন্দরের পরিসর দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে– এই ক্রমবর্ধিষ্ণু নগরায়ণের ফলে বৃক্ষনিধনও বেড়ে চলছে। ইন্টারনেটের যুগে মোবাইল ফোনের টাওয়ার বসানোর ফলে আশেপাশের ফলজ গাছপালা বিশেষ করে নারিকেল, তাল, সুপারি প্রভৃতি গাছের ফলনে ক্ষতি এমনকি বেশিরভাগ থেকে লক্ষণ ফুটে ওঠে; যদিও এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। 

কোনো কোনো দেশে কখনো দাবানলের ফলে বনাঞ্চলের ব্যাপক অতি সাধিত হয়। এছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়, তুফান, বান-বন্যায়ও গাছগাছলার অনেক ক্ষতি হয়ে থাকে।পৃথিবীর ভূমির প্রায় ৩১ শতাংশ বনভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত, যা এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে হ্রাস পাচ্ছে।

জগতের বিখ্যাত কবি-দার্শনিকরা প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেম ও প্রাণের আদিসত্ত্বা বা উৎস হিসেবে শ্রদ্ধা জানানোর একটা শৈল্পিক রূপ হচ্ছে তাদের বৃক্ষবন্দনা বা বৃক্ষপূজা।

বৃক্ষনিধন সম্পর্কে বিশ্বের বিখ্যাত কবিদের মন্তব্য থেকে প্রাপ্ত দিকগুলো তুলে ধরা হলো:

(ক) রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গির ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডওয়ার্থের (৭/৪/১৭৭০–২৩/৪/১৮৫০) মতো কবিরা বৃক্ষ বা অরণ্যকে প্রশান্তির আধার ভাবতেন। নির্বিঘ্নে বৃক্ষ বা অরণ্য নিধনে তারা মানুষের মস্তিষ্কের উপর অশুভ শক্তির প্রভাব হিসেবে দেখতেন।

(খ) মানুষের অপ্রতিরোধ্য লোভ ও পরিবেশগত বিপর্যয় সম্পর্কে আমেরিকান কবি কার্ল ডেনিস (১৭.৯.১৯৩৯) তার ‘The Greenhouse Effect’ কবিতায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। তিনি সতর্কবার্তায় বলেছেন যে,মানুষের লোভ ও পরিবেশের প্রতি উদাসীনতার ফলে যে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি উদ্ভূত হচ্ছে,তা পৃথিবী থেকে মানুষের অস্তিত্বই বিপন্ন করতে পারে। 

(গ) প্রকৃতির সাথে মানুষের দ্বন্দ্ব নিয়ে আমেরিকান কবি অ্যান্ড্রিয়েন সিসিল রীচ (১৬.৫.১৯২৯ –২৭.৩.২০১২) তার ‘The Trees’ কবিতায় বলেছেন যে, মানুষের তৈরি ঘরের ভেতরে গাছ বা প্রকৃতিকে বন্দী করে রাখা যায় না। গাছ তার শিকড় উপড়ে প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চায়, যা প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য বিস্তারের ব্যর্থ চেষ্টা। 

(ঘ) রূপক অর্থে বৃক্ষনিধন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মতো অনেক কবিই বৃক্ষকে ‘বোবা বন্ধু’ বা ‘আলোর তৃষ্ণায় আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে থাকা শান্ত সঙ্গী’ মনে করেন। তাই এই বৃক্ষনিধনকে মানুষের মানবিক গুণাবলীর বিনাশ এবং আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ার প্রতীক হিসেবে দেখছেন। আর এই ধ্বংসযজ্ঞ করাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনিবার্য হুমকিস্বরূপ মনে করেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের’চৈতালি’কাব্যগ্রন্থের ‘সভ্যতার প্রতি’ কবিতায় একটি কালজয়ী পংক্তি “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর” যান্ত্রিকতার যুগে কৃত্রিম সভ্যতার নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী রূপ দেখে ব্যাকুলিত ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন কবি প্রকৃতি ও অরণ্যের শান্ত, সুনিবিড় আশ্রয়ে ফিরে যাবার আকুল আহবান জানিয়েছেন।

শেখ সাদীর মত বিখ্যাত দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের মতে, বৃক্ষনিধন মানব অস্তিত্ব ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মারাত্মক হুমকি। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন মানব নিধনেরই নামান্তর।তারা মনে করেন, প্রকৃতিই স্রষ্টাকে দর্শন করার জায়গা;বৃক্ষের ক্ষতি মানে প্রকৃতির উপর ভালোবাসার অভাব। 

পৃথিবীতে প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য গাছপালা অক্সিজেন সরবরাহ করে আর ক্ষতিকারক কার্বনডাই-অক্সাইড গ্যাস শোষণ করে। ফলে এই ধরিত্রী আজও বাসযোগ্য, নির্মল ও স্নিগ্ধ। মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকার অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা নিশ্চিতকরণে গাছপালার আবশ্যিকতা অস্বীকার করার জো-টি নেই। খাদ্যশস্য, বস্ত্রের উপাদান,বাসগৃহের নির্মাণসামগ্রী, শিক্ষার উপকরণ সামগ্রীর উৎপাদনে, এমনকি চিকিৎসা ক্ষেত্রেও বৃক্ষ বা গাছগাছড়ার অবদান অনস্বীকার্য। দেশের মোট ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ গাছপালা বা বনাঞ্চল থাকা আবশ্যক।কিন্তু বৃক্ষনিধনের ফলে তা হ্রাস পেয়ে প্রায় ১৪-১৬ শতাংশে নেমে আসায় বিভিন্নমুখী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হতে হচ্ছে মানবসভ্যতা ও প্রাণিকুলকে।

বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের গবেষণামতে: বৃক্ষনিধন হলো– প্রকৃতির ফুসফুস ছেঁটে ফেলা; যা শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট করে না, সম্পূর্ণভাবে জীবজগতের অস্তিত্বকে ধ্বংস করার নৃশংসতম নিয়ামক। তাদের মতে, পৃথিবীতে প্রাণিকুলের টিকে থাকার জন্য সৃষ্ট পরিবেশ থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণকারী ও অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রাকৃতিক যন্ত্র হচ্ছে বৃক্ষ; যা নিধন করার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তুসংস্থানের চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। তাদের দৃষ্টিতে বৃক্ষনিধনের মুখ্য প্রভাব সমূহ:

(ক) বৃক্ষরাজি সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেন (O2) উৎপাদন করে। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে পরিবেশে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পায়। 

(খ) বায়ুমণ্ডল থেকে গাছপালা কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) শোষণ করে থাকে।গাছগাছলি কেটে ফেলায় বা পুড়িয়ে ফেলার ফলে প্রচুর পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ছেয়ে যায়,যা গ্রীনহাউজ প্রভাব বাড়িয়ে ধরিত্রীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে;হিমবাহ গলে যায় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের রোগ-বালাইয়ের সৃষ্টি হয়।

(গ) বনজঙ্গল হচ্ছে অগণিত অণুজীব,কীটপতঙ্গ, পশু-পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির আবাসস্থল। বনভূমির সে সব গাছগাছড়া নিধনের কারণে এসব প্রজাতির আশ্রয়স্থল ধ্বংস হয়, যা খাদ্যশৃঙ্খলা ভেঙ্গে দিয়ে জীববৈচিত্র্যকে দ্রুত বিলুপ্তির পথে নিয়ে যায়।

(ঘ) বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৃক্ষকুল বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প ছড়ায়,যা মেঘ তৈরি ও বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে খাদ্যশস্য উৎপাদনের সহায়তা করে। বৃষ্টিপাত কমে যায় ও খরার ঝুঁকি বাড়ায়।

(ঙ) গাছের শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। বৃক্ষ নিধনের ফলে ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পায় এবং বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত না হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, যা খরার সৃষ্টি করে।

(চ) বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর আবিষ্কার– গাছেরও প্রাণ আছে, অনুভূতি আছে। তাই বৃক্ষনিধন বলতে একটি বস্তুর নয়, একটি জীবেরই অস্তিত্ব বিনাশ করা বুঝায়।

(ছ) বনবিজ্ঞান অনুযায়ী– বনের বড়ো গাছপালা মাটির অভ্যন্তরের ছত্রাক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছোট চারাকে পুষ্টি সরবরাহ করে,বিপদের সংকেত পাঠায়। বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে এই জটিল সংযোগ ব্যবস্থা ও ধ্বংস হয়ে যায়। 

(জ) পাহাড়ি অঞ্চলে বৃক্ষানিধনের ফলে ভূমিধ্বসের ঝুঁকি বাড়ে। 

(ঝ) পুরাকালে এবং বৈদিক দর্শন অনুযায়ী– উদ্ভিদজগৎ হচ্ছে ধরণীর প্রাথমিক উৎপাদক ও অস্তিত্ব রক্ষার মূল ভিত্তি। মুনি-ঋষি-সাধুপুরুষ ও প্রাচীন দার্শনিকগণ বৃক্ষতলে বসে প্রকৃতির আদি স্রষ্টার ধ্যান করতেন,মানুষের কল্যাণকর নীতি- আদর্শগত দিকনির্দেশনামূলক অসংখ্য তথ্য ও শিক্ষণীয় তত্ত্ব আবিষ্কার করে রেখে গিয়েছেন। 

অনেকে বৃক্ষকে পূজাও করতেন। বৃক্ষতল আর বৃক্ষছায়া মানুষের মনোজগতকে সুশীতল-সুশান্ত করে, চিন্তাশীলতাকে ঋদ্ধ করে রাখে। বৃক্ষনিধনের কারণে মানুষের চিন্তা চেতনায় যে উদগ্রতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা বৈদ্যুতিক পাখায় বা এসি রুমে বসেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। 

(ঞ) অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রাসাদিকরণ, কংক্রিটের রাস্তাঘাট-ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং গাছপালার অভাবে শহরগুলোতে তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি থাকে, যাকে বলে ‘তাপদ্বীপ’ (Heat Island) অথবা ‘আর্বান হিট আইল্যান্ড’ (Urban Heat Island).

প্রকৃতির ওপর মানুষের শিষ্টাচারবর্জিত লোভ-লালসা ও অসংযত ক্ষুধার প্রতিক্রিয়া দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় বিশ্বপ্রকৃতির নিয়ন্ত্রকের নিকট বিচারের দায়িত্ব তুলে ধরেছেন- “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ  ভালো?”

 বৃক্ষনিধনে প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে মানুষকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ও গাওয়া নিম্নোক্ত গানটি একাধিক শততম বছরে এসেও এর অবদান প্রাসঙ্গিক-

“মরু বিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ 

ধূলিরে ধন্য করো করুণার পুণ্যে হে কোমল প্রাণ।”

আর নয় বৃক্ষনিধন, করো সবে বৃক্ষরোপণ।

করো বৃক্ষসংরক্ষণ,বন্ধ হোক পরিবেশ দূষণ।


শ্যামসুন্দর দেবনাথ | শরীয়তপুর, বাংলাদেশ

কবি, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠক।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

দেশ নিয়ে প্রবাসীরা

Next Story

বিশ্ব আ‍্যজমা দিবস – ২০২৬

Latest from পৃথিবী ও পরিবেশ

সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও পুরস্কারের মহিমা : বিডি ক্লিন-এর উদাহরণ

১. পুরস্কারের সীমাবদ্ধতা: নোবেল শান্তি পুরস্কারসহ বিভিন্ন উচ্চ-প্রোফাইল পুরস্কারের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব... - লিখেছেন ড. আনিস রহমান।

নাব্য নদী থেকে বিলুপ্তির পথে: পশ্চিমবঙ্গের সরস্বতী নদীর ইতিহাস, ভূগোল ও মানুষের জীবনজীবিক

মনসা মঙ্গল কাব্যে চাঁদ সদাগরের কাহিনিতে সরস্বতী নদীর উল্লেখ শুধুমাত্র ধর্মীয় বা পৌরাণিক গল্প নয়; এটি প্রাচীন বাংলার... - লিখেছেন রূপায়ণ সরদার।