মানব সভ্যতায় যুদ্ধের ইতিহাস বেশ পুরনো। আমাদের জানা ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়েই যুদ্ধের একটি ভৌগোলিক রূপ ছিল, যুদ্ধক্ষেত্র ছিল, কখনো তা যুদ্ধের নিয়ম ভঙ্গ করে আমাদের বসবাসের নগরীতে চলে এলেও। এরপর যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং পারমানবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা যুদ্ধের অন্য এক চেহারা আমাদের সামনে আনে; যে যুদ্ধ আর ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়, এমনকি সৈন্য সামন্তের সম্মুখ যুদ্ধও যেখানে অনেকাংশে অনুপস্থিত। যার ফলে তাকে বলা হল ঠাণ্ডা যুদ্ধ বা Cold War! এরপর যুদ্ধের প্রকৃতি আরও অনেক পাল্টেছে; যুদ্ধ আর বৈরি রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন গোষ্ঠীও যুদ্ধের অংশ হয়েছে, হয়েছে অসম যুদ্ধ, বদলে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রের ধারণা। তবে, যুদ্ধের এই সব সংজ্ঞাই বদলে গেছে ঠিক এই সময়ে এসে, কারণ এখন শক্তির পরিমাপক অত্যাধুনিক অস্ত্র কিংবা সামরিক শক্তি নয়; বরং অ্যালগরিদম। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্র লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ কিংবা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ – এই সবকিছুতেই এখন মানুষকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের আগ্রাসনে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ব্যাপকতা সাধারণ মানুষের সামনে চলে এসেছে। যুদ্ধের ঐতিহাসিক সকল সংজ্ঞাই এখানে অপ্রতুল, অথচ সেসব সংজ্ঞায়নের উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিসমূহ। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত এসব যুদ্ধ, সংঘাত বা হামলাকে কোন ছকে ফেলা হবে? এসব ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগই বা কীভাবে হবে? যুদ্ধের কৌশলের সাথে সাথে যুদ্ধের এই অভাবনীয় রূপকে বুঝতে আমাদের কি নতুন করে ভাবা দরকার?
এই সব প্রশ্ন যখন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত নজরদারির মাধ্যমে গাজায় হাজারো মানুষকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে ইসরায়েল। মাত্র কিছুদিন আগেই, এআই এর ‘’ভুলে’’ আমেরিকা-ইসরায়েল ইরানে একটি স্কুলে বোমা ফেলেছে, যেখানে প্রায় ১৮০ জন শিক্ষার্থী মারা গেছে।
আর এখানেই এআই ব্যবহারের মূল দ্বন্দ্ব। যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার উপর কতটা নির্ভরশীল হওয়া উচিৎ? কিংবা আরও যৌক্তিকভাবে বললে, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাকে কতখানি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া উচিৎ, যেখানে মানুষের জীবন, সভ্যতা, বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতি জড়িত? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, দায় কার?
ইরানের এই ১৮০ জন শিক্ষার্থীর উদাহরণই ধরা যাক। আমেরিকান মিলিটারি প্রজেক্ট মাভেন এআই এর সাহায্যে তথ্য বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে কল্পনাতীত দ্রুততায় যে কাজ করে, তা মানুষের পক্ষে করা কিংবা যাচাই করা পুরোপুরি অসম্ভব। সিএনএনের রিপোর্ট মতে, তারাই ইরানের মিনাব শহরের সেই স্কুলটিকে একটি সামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করে ও পরে তথ্য হালনাগাদ করতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে সেখানে হামলা হয়। লক্ষ্যনীয় হল, পুরো ঘটনাটি সামনে আসার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হল এআই এর সক্ষমতা এবং একে আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। আর এর নিচে চাপা পড়ে গেল যে আইনি প্রশ্ন, তা হল, এই ১৮০ জন শিশুর মৃত্যুর দায় কার? মিলিটারি কমান্ডারের, এআই কোম্পানির, নাকি বিশ্লেষকের? এটি কি যুদ্ধপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে?
মনে রাখা প্রয়োজন, এই প্রশ্নগুলো কেবল তাত্ত্বিক নয়। এগুলো সরাসরি যুদ্ধাপরাধের দায় কার উপর বর্তাবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ কীভাবে হবে- এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ের সাথে জড়িত। স্পষ্টতই, মানবাধিকার আইনের প্রয়োগ এসব ক্ষেত্রে আরও কঠিন হবে। ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটার প্রবণতাই শুধু বাড়বে না, এর এক ধরনের স্বাভাবিকিকরণও দেখা যাবে, যা আমরা ইতোমধ্যেই দেখছি।
সেই সাথে ভাবা দরকার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কি সত্যিই মানুষের হাতে থাকছে? এআই এর বিশ্লেষণ কতখানি প্রভাবিত করছে এসব সিদ্ধান্ত? মানুষের ‘কমান্ড’ কি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় রূপান্তরিত হচ্ছে? কারণ এআই আক্ষরিক অর্থেই মানুষের বিবেচনা করার ক্ষমতার থেকে দ্রুত কাজ করে। পালান্টিয়ার বা অ্যানথ্রোপিকের মত প্রতিষ্ঠানগুলো এই গতিকেই প্রচার করেছে নিখুঁত সিদ্ধান্ত গ্রহণের হাতিয়ার হিসেবে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই গতিই এখন মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ২০২১ সালে আমেরিকান ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স সতর্ক করেছিল যে, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার এ ধরনের ব্যবহার সংঘাতকে আমাদের চিন্তার বাইরে নিয়ে যাবে, কূটনীতি ভেঙ্গে পড়বে। তবে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নৈতিক ও মানবিক বিবেচনা। দুর্ভাগ্যজনক হল, ঠিক এই বাস্তবতার মুখোমুখিই এখন আমরা দাঁড়িয়ে।
এখানেই শেষ নয়। যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এই যে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার নির্বিচার ও যথেচ্ছ ব্যবহার আমরা দেখছি, তার প্রভাব বরং আরও অনেক গভীর। সহজ কথায়, কোন মানুষ মরবে নাকি বাঁচবে, কোন একটি স্থাপনা, তা যতই ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করুক, এখন কেবল একটি ডাটা পয়েন্ট। যুদ্ধক্ষেত্রের সাথে যুদ্ধ পরিচালনাকারীদের একটি দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। এই দূরত্ব কেবল স্থানিক নয়; মানসিকও। আর এই ধরনের দূরত্ব যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের দিককে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলতে সক্ষম। ফলে জানমালের ধ্বংসকে এখন কেবল একটি চেকবক্সে টিক দেওয়ার মত ছোট্ট একটি কাজে পরিণত করা হয়েছে। এর ভয়াবহ পরিণতি সামনের দিনগুলোতে আমাদের সামনে আরও স্পষ্ট হবে।
এই সবগুলো বিষয় আমাদের দুটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি এমন যুদ্ধব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি, যেখানে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা সীমিত এবং অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে? এবং এই পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য আমরা প্রস্তুত হচ্ছি কি না?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই বিষয়ে বারবার সতর্ক করছে। জাতিসংঘ সম্পূর্ণ সংক্রিয় অস্ত্রের সক্ষমতা সীমিত রাখা এবং এই একটি বৈশ্বিক রূপরেখার প্রতি জোর দিচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অফ দ্যা রেড ক্রস যুদ্ধ বা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে শক্তি ব্যবহারের উপর “মানুষের অর্থপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ (meaningful human control) এর ব্যাপারে আইন প্রণয়ন করতে আহ্বান করছে। অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মত মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সোচ্চার হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো এ ধরনের কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, বরং ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো ঠিক বিপরীত দিকেই এগুচ্ছে।
প্রায় ৬৫ বছর আগে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার “মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স” এর ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন, যেন অস্ত্রের উৎপাদক এবং সামরিক ব্যবস্থা রাজনীতি ও গণতন্ত্রকে প্রভাবিত না করতে পারে। তিনি হয়তো তখনো এমন বিশ্ব ব্যবস্থা কল্পনা করেননি, যেখানে শুধু রাজনীতি বা গণতন্ত্র নয়, মানুষের বেঁচে থাকার সিদ্ধান্তও দিয়ে দিচ্ছে কোন কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত সিস্টেম। শুধু তাই নয়, ক্ষমতাধর এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা যেখানে নীতিনির্ধারকদের চেয়ে কম প্রভাবশালী নয়।
এ কারণেই প্রয়োজন বৈশ্বিক জনমত গঠন। রাষ্ট্রগুলো যখন এসব প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে, তখন মানবাধিকারকে রক্ষা করার দায়িত্ব সাধারণ মানুষকেই নিতে হয়। এই দায়িত্ব আমরা কতটা পালন করতে পারবো, তার উপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা কতটা গুরুত্ব পাবে।
৩১ মে, ২০২৬

জান্নাতুল মাওয়া | ঢাকা, বাংলাদেশ
শিক্ষা উন্নয়নকর্মী, কাজ করছেন শিক্ষা প্রযুক্তি ও তরুণদের উন্নয়ন নিয়ে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পরে আগামী’র খান একাডেমি বাংলা প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন৷ বর্তমানে Bangladesh Youth Leadership Center (BYLC)-এ কর্মরত আছেন।
