পড়শী রাজনীতি বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: সত্যিই কি কিছু বদলেছে?

বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: সত্যিই কি কিছু বদলেছে?

Post Views: 15

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন সময় বারবার এসেছে, যখন আমরা মনে করেছি, এবার হয়তো একটি রাজনৈতিক নতুন, সুস্থ ধারা ধারা শুরু হবে, সেটা ৯০-এ হোক বা ২৪-এ। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রতিবারই গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নতুন প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আবার ফিরে আসে, রাষ্ট্র কি সত্যিই বদলায়, কাঠামো কি সত্যিই বদলায়? নাকি কেবল ক্ষমতার মুখগুলো বদলে যায়?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যেন এক ধরনের পুনরাবৃত্তির ইতিহাস। এক সময় যারা রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলে, ক্ষমতায় গিয়ে তারাই অনেক সময় একই রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নির্ভর করে বিরোধী কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। ফলে রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত হলেও নাগরিকের অভিজ্ঞতা সবসময় সমানভাবে বদলায় না। এই কারণেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বোঝার জন্য শুধু নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তনের দিকে তাকালে হবে না; দেখতে হবে, ভিন্নমত প্রকাশের জন্য একজন সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদ বোধ করছেন।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল, ভয়, এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে দেশ বেরিয়ে আসবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো বহুল সমালোচিত আইন বাতিল বা সংশোধনের উদ্যোগ সেই আশাকে আরও জোরালো করেছিল। কিছুদিন আগে এই আইনটি নিয়ে গবেষণা করার পর আমার একটি প্রশ্ন থেকেই যায় ! একটি আইন বাতিল করলেই কি ভয়ের সংস্কৃতি শেষ হয়ে যায়? নাকি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকলে দমন-পীড়নের পদ্ধতি কেবল নতুন ভাষা ও নতুন আইনি কাঠামো খুঁজে নেয়?

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো দল, সংগঠন বা সরকারের করুণা নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখনই, যখন সরকারবিরোধী বক্তব্য, অজনপ্রিয় মতামত কিংবা সংখ্যালঘু অবস্থানও সমানভাবে প্রকাশ করা যায়। যে সমাজে কেবল জনপ্রিয় বা ক্ষমতাসীনদের অনুকূল মতামত নিরাপদ থাকে, সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আংশিক; পূর্ণাঙ্গ নয়।

এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণাও কম হয়নি Iআগামবেন তাঁর State of Exception গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে নিরাপত্তার অজুহাতে রাষ্ট্র কখনও কখনও এমন ক্ষমতা ব্যবহার করে, যা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক শাসনব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ বা জনশৃঙ্খলার প্রশ্ন অনেক সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ফলে নাগরিকের সমালোচনা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-উদ্বেগের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।জুডিথ বাটলার এর Precarious Life ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাটলার যুক্তি দেন যে রাষ্ট্র ও সমাজ সব জীবনের মূল্য সমানভাবে নির্ধারণ করে না; কিছু কণ্ঠকে বৈধ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, অন্যদের কণ্ঠকে সহজেই অগ্রাহ্য, অবৈধ বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য এবং কোন বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য, তার মানদণ্ডও পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। ফলে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রটি প্রায়ই রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। মিশেল ফুকো আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, শাস্তি কখনও নিরপেক্ষ নয়; বরং রাষ্ট্র কাকে শাস্তি দেবে, কাকে উপেক্ষা করবে এবং কার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে, এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিফলন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ বা জনপরিচিতির ভিত্তিতে আইনি প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য নিয়ে জনপরিসরে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই আন্দোলন নিয়ে সমালোচনা করার কারণে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে ঘিরে আইনি পদক্ষেপ এবং সামাজিক বিতর্ক আবারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একইভাবে বেশ কয়েকজনের সাংবাদিক ও শিল্পীদের বিরুদ্ধে নিজ্বস্য মত প্রকাশের কারণে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড বা সংশ্লিষ্ট অভিযোগে মামলা হওয়ার ঘটনাও দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে; যদিও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস, কিংবা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে মিথ্যা ন্যারাটিভ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টার ক্ষেত্রে কোনো আইনি পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়না I যাহোক এসব মামলার বিচারিক ফলাফল আদালত নির্ধারণ করবে। তবে গণতান্ত্রিক আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক দল গুলো কি এখনোও এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে রাজনৈতিক মত, সাংস্কৃতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মতামত সহজেই অপরাধমূলক তদন্তের বিষয় হয়ে উঠছে?

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী দল, সাংবাদিক, লেখক এবং মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। আজ যদি নতুন জুলাই অভ্যুর্থান পরবর্তী ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়, তবে তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সমস্যাটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এবং প্রশ্ন এসেই যায় আদতে জুলাই অভ্যুর্থান কতটুকুই রাজনৈতিক কাঠমোর সংস্কার করতে পেরেছে?

গণতন্ত্রের শক্তি বিরোধী কণ্ঠকে নীরব করার মধ্যে নয়; বরং সেই কণ্ঠকে সহ্য করার মধ্যে। যে রাষ্ট্র নিজের সমালোচককে শত্রু হিসেবে দেখে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক এবং সরকারের কঠোর সমালোচক, উভয়েই একই আইনি সুরক্ষা ভোগ করেন। বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সরকার পরিবর্তনের চেয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন অনেক বেশি জরুরি। ঘৃণার থেকে সংলাপ এবং রাজনৈতিক সমঝোতা বেশি জরুরি। আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন আইন রাজনৈতিক প্রতিশোধের অস্ত্র না হয়ে নাগরিক অধিকারের রক্ষাকবচ হবে। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ক্ষমতা স্থায়ী নয়; কিন্তু রাষ্ট্রের আচরণ যদি না বদলায়, তবে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতিও বারবার অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন সরকার গঠন নয়, বরং এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ ভয়ের কারণে নয়, স্বাধীন নাগরিক হিসেবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে।

৬ জুন, ২০২৬


শিকাগো, ইলিনয়, যুক্তরাষ্ট্র

ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয় শিকাগো তে ক্রিমিনোলজি, ল এন্ড জাস্টিস বিভাগে পিএইচডি শিক্ষার্থী। গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্রগুলো হলো পেনোলোজি এন্ড কারেকশন, জেন্ডার এন্ড ক্রাইম, এবং কিশোর অপরাধ।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।