রবীন্দ্রনাথের আইনি ভাবনার ব্যাপ্তি ও পরিসর এতটাই বিস্তৃত যে তার চৌহদ্দি পরিমাপ করতে গেলে ব্যক্তি-আঙ্গিক থেকে নয়, বরং দলগতভাবে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের প্রচেষ্টা অপরিহার্য। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, ভাষণ, এমনকি ব্যক্তিগত দিনলিপিতে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে দারুন স্বচ্ছন্দে আর অনায়াস প্রাঞ্জলতায় আইন, আদালত, ন্যায়, প্রমাণ, বিচার, শাসনের মত শব্দসমষ্টির স্বতঃস্ফূর্ত আবাহন ঘটিয়েছেন, সেখানে কয়েক পৃষ্ঠায় তাঁর আইনি মননকে ধারণ করার চেষ্টা প্রায় অসম্ভব এক অভিযান বৈকি।
১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ, ইংরেজি ১৮৬১ সালের ৭ মে, কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে যে শিশুটির জন্ম, আশি বছরের জীবনপরিক্রমায় তিনি রেখে গেছেন প্রায় দুই সহস্রাধিক গান, সহস্রাধিক কবিতা, শতাধিক ছোটগল্প, এক ডজনের অধিক উপন্যাস, অগণিত প্রবন্ধ, নাটক, ভ্রমণকথা ও পত্রসাহিত্য। তাঁর বিপুল সাহিত্যকর্ম নিজেই এক সুবিশাল সমুদ্রের উপমা। কবি, দার্শনিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, গীতিকার, সুরকার, সমাজ-সংস্কারক, শিক্ষাব্রতী, চিত্রশিল্পী হিসেবে বহুমাত্রিক ভূমিকায় তিনি যা রেখে গেছেন, তার শতাংশ অর্জনেও মানবজীবনকে পরিপূর্ণ বলা চলে। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদের জন্য এশীয়দের মধ্যে তাঁর প্রথম নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি বিশ্বসভায় বাঙালির আসনকে মহিমান্বিত করেছে। সর্বজনপরিচিত উপাধি ‘বিশ্বকবি’-তে তাঁর কবিসত্তা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি মিলেমিশে একাকার হয়েছে। বিশ্বজনীন মানসের শিখরে অধিষ্ঠিত থেকে এখনও তিনি আধুনিকতম বাঙালি হিসেবে আমাদের পথ দেখিয়ে চলেছেন। সেই বহুমুখী রবীন্দ্রপ্রতিভার এক অপ্রচারিত অথচ অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর আইনি মনন।
রবীন্দ্রনাথ আইন পেশাজীবী ছিলেন না। তবু তাঁর রচনার অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য আইনি অনুকল্প, যা জাঁদরেল আইনজ্ঞদের পক্ষেও বোধ করি অনুধাবন করা সহজ হবেনা। কেন তিনি এত নিপুণভাবে আইন বুঝতেন, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দুটি জায়গায় নোক্তা দিতে হয়। প্রথমত, ব্যারিস্টারি পড়ার অভিপ্রায়ে ১৮৭৮ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে তিনি বিলেত গিয়েছিলেন। লন্ডনে কিছুকাল অধ্যয়নও করেছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি শেষতক অর্জিত হয়নি বটে, কিন্তু আইনের পাঠ্যপুস্তক ও ইংরেজ সমাজের বিধি-বিধানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় একেবারে ঠুনকো ছিল না। ১৮৯৪ সালের ২৪ অক্টোবর ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা এক চিঠিতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন,
“আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমি যদি ব্যারিস্টার কিম্বা সিভিলিয়ান হয়ে আসতুম তা হলে আমি আমার নির্দিষ্ট কাজের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে যেতুম। সাহিত্যচর্চায় মন দেবার কোনো আবশ্যক অনুভব করতুম না।”
তবে বিধাতার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। তাঁর ব্যারিস্টার না হওয়াটা সীমাহীন সৌভাগ্যের আশীর্বাদ হয়ে এসেছে আমাদের জন্য। সেই কলম থেকেই জন্ম নিয়েছে কালজয়ী চরণ ‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি; আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।’ একটি জাতির জাতীয় সংগীত এক অসমাপ্ত ব্যারিস্টারির ছাইভস্ম থেকে যে জেগে উঠতে পারে, সেই অসম্ভব বুঝি কেবল রবীন্দ্রনাথের জীবনেই সম্ভব হয়েছে। আদালতের সনদ তিনি পাননি, কিন্তু ইতিহাসের আদালতে তিনিই বাঙালির পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল মুসাবিদা করে গেছেন।
দ্বিতীয় কারণ, পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে ১৮৯০ সালের দিকে, যৌবনের প্রারম্ভে, রবীন্দ্রনাথ পরিবারের জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরের জমিদারি দেখাশোনার সূত্রে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, প্রজাস্বত্ব, খাজনা-আদায়, ভূসম্পত্তি ও কৃষি-সম্পর্কিত খুঁটিনাটি আইন সব কিছুর সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। পদ্মার বোটে ভাসতে ভাসতে তিনি যেমন ‘ছিন্নপত্র’-এর অমর চিঠিগুলি লিখেছেন, তেমনি কাছারিতে বসে রায়তের দরখাস্ত পড়েছেন, মহকুমা আদালতের রায় ও তার প্রতিক্রিয়া দেখেছেন, পল্লীমানুষের অনন্ত মামলা-মোকদ্দমার চক্র অবলোকন করেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ভারতীয় গ্রামীণ সমাজের আইনগত সংকটের অন্তঃস্থল চিনিয়েছিল। তাঁর শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পগুলির অধিকাংশই এ জমিদারি-পর্বের ফসল, আর সেই গল্পের পাতায় পাতায় দারোগা, আদালত, সাক্ষী, জেরা ও রায়ের ছায়া পড়েছে অনিবার্যভাবে। পুঁথিগত বিদ্যা ও মাঠের অভিজ্ঞতার মিলিত ফল হিসেবেই রবীন্দ্ররচনায় আইনি ভাষার এমন সাবলীল প্রবাহ লক্ষ করা যায়।
আইন, আদালত, আপিল, প্রমাণ, দারোগা, পুলিশ, মার্শাল ল’, হাইকোর্ট, এ সকল আইনি পরিভাষা তাঁর রচনাসাম্রাজ্যে অসংখ্যবার উঁকি দিয়েছে। কখনও গল্পের শরীরে, কখনও প্রবন্ধের যুক্তি-পরম্পরায়, কখনও কবিতার পঙ্ক্তিতে। এই ব্যবহার নিতান্ত আলংকারিক নয়; এর প্রতিটি প্রয়োগে কবির সুচিন্তিত বিচারবুদ্ধির ছাপ মুদ্রিত আছে।
‘বাংলাভাষা পরিচয়’ গ্রন্থে মামলা-মোকদ্দমার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে কবিগুরু এক অপূর্ব মন্তব্য করেছেন, ‘মামলা-মোকদ্দমা শব্দটা ব্রিটিশ আদালতের দীর্ঘ প্রলম্বিত বিপত্তির দ্বিপদী-প্রতীক’। মোটে দু-চারটি শব্দে কবি যা ধরিয়ে দিয়েছেন, তার নিহিত অর্থ অনুধাবনে আজও নিশ্চয়ই অনেক বিচার-গবেষকের পাণ্ডিত্য নিঃশেষ হয়ে যাবে। ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থা যে দীর্ঘসূত্রিতার এক অভেদ্য কারাগার রচনা করেছিল, তার নির্যাস কবি একটি দ্বিপদী শব্দবন্ধে গেঁথে দিয়েছেন।
এই কালজয়ী উপলব্ধির সাহিত্যিক বিস্তার আমরা পাই ‘ব্যবধান’ গল্পে। সুহৃদ-পরিজনের ঘনিষ্ঠ বন্ধন মামলার আগুনে কীভাবে ছারখার হয়ে যায়, কীভাবে আদালতের বারান্দায় পা রাখার পর থেকে আত্মীয়তার মাধুর্য তীব্র বিষে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে, সেই করুণ অথচ অমোঘ পরিণতি কবিগুরু এই গল্পে এঁকেছেন। বিচারাঙ্গনে যাঁদের জীবন কাটে, তাঁদের কর্মজীবনের পরতে পরতে এই সত্য আজও সমান অভিঘাত তৈরি করে। অসংখ্য পারিবারিক বিরোধ, ভাইয়ে-ভাইয়ে, বাবা-পুত্রে, জামাই-শ্বশুরে যে বিচ্ছিন্নতা আমরা দেখি, তার মূলে অনেক সময় থাকে কেবল দু-তিন কাঠা জমি কিংবা একটুকরো ভিটেমাটি; কিন্তু মামলায় ঢুকে পড়ার পর সম্পদের যা ক্ষয়, সম্পর্কের ক্ষয় তার অনেকগুণ। কবি যখন এই গল্প লিখেছেন, তখন তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আদালত শেষ গন্তব্য নয়, আদালত শেষ আশ্রয়। যেখানে সমঝোতা সম্ভব, সেখানে আদালত যেন শেষ অস্ত্র।
ভূমি-আইনের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে মর্মন্তুদ কাব্যরূপ বোধহয় ‘দুই বিঘা জমি’। ‘এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’, এই পঙ্ক্তি যেন ভূমি-অধিগ্রহণ ও জবরদখলের বিরুদ্ধে এক চিরকালীন অভিযোগপত্র। উপেনের দুই বিঘা জমি বাবু আইনের মারপ্যাঁচেই কেড়ে নিয়েছিলেন; ‘মিথ্যা দেনার খতে’ সর্বস্বান্ত উপেন আদালতে গিয়েও প্রতিকার পায়নি। আইন এখানে ন্যায়ের রক্ষাকবচ নয়, শক্তিমানের হাতিয়ার। আইন ও ন্যায় যে সর্বদা সমার্থক নয়, ক্ষমতার করতলগত হলে আইনও যে নিপীড়নের যন্ত্রে পরিণত হতে পারে, এই দার্শনিক সত্যটি কবি একটি কাহিনিকাব্যে চিরস্থায়ী করে গেছেন।
বিচার-প্রক্রিয়ার অন্তর্গত ট্র্যাজেডির আরও সফল উন্মোচন হয়েছে ‘শাস্তি’ গল্পে। স্বামী ছিদামের মুখের একটি মিথ্যা কথায় নিরপরাধ চন্দরা খুনের দায় কাঁধে তুলে নেয়; জেরায়, সাক্ষ্যে, বিচারে সত্য আর উদ্ধার হয় না; ফাঁসির মঞ্চের দিকে যেতে যেতে চন্দরার শেষ উচ্চারণ কেবল একটি শব্দ, ‘মরণ!’ এই গল্প প্রতিটি বিচারকের জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা। স্বীকারোক্তি মাত্রই সত্য নয়; আদালতে যা প্রমাণ বলে গৃহীত হয়, তার আড়ালে অভিমান, ভয়, প্রেম ও প্রতিশোধের কত জটিল মনস্তত্ত্ব কাজ করতে পারে, ‘শাস্তি’ তা যেভাবে দেখিয়েছে, পৃথিবীর কোনো সাক্ষ্য-আইনের ভাষ্যগ্রন্থ তা পারেনি। ফৌজদারি বিচারের মূলমন্ত্র যে সতর্ক সংশয়, স্বীকারোক্তিকেও যে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে হয়, রবীন্দ্রনাথ তা আমাদের শিখিয়েছেন একটি গ্রাম্যবধূর নীরব মৃত্যুর ভেতর দিয়ে।
এ প্রসঙ্গেই মনে পড়ে ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পের প্রধান চরিত্র শশিভূষণের আইন-চিন্তা। আদালত-অঙ্গনের সঙ্গে শশিভূষণের সম্পর্ক বিরূপ; তবু আইনের প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন বিস্ময়কর রকম স্পষ্ট। কবিগুরু লিখেছেন,
“আইন অত্যন্ত মন্দগতি-সে একটা বৃহৎ জটিল লৌহযন্ত্রের মতো; তৌল করিয়া সে প্রমাণ গ্রহণ করে এবং নির্বিকার ভাবে সে শাস্তি বিভাগ করিয়া দেয়, তাহার মধ্যে মানবহৃদয়ের উত্তাপ নাই।”
এ যেন আইনি দর্শনের এক স্বয়ংসম্পূর্ণ পঙ্ক্তি। লৌহযন্ত্রের প্রতীক ব্যবহার করে কবি আইনের ক্রিয়াপদ্ধতির এক অসাধারণ প্রতিকৃতি এঁকেছেন। আইন তো প্রমাণ ওজন করেই সিদ্ধান্ত দেয়; নির্বিকার, নিঃস্পৃহ, নৈর্ব্যক্তিক। এই বস্তুনিষ্ঠতা আইনের শক্তি; কিন্তু এই বস্তুনিষ্ঠতার অভ্যন্তরে যদি মানবিক উত্তাপ না থাকে, তবে তা শুধু যন্ত্রই, ন্যায় নয়। ন্যায়ের দেবীর চোখে পট্টি বাঁধা থাকে নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে; কিন্তু সেই পট্টি যদি হৃদয় পর্যন্ত নেমে আসে, তবে বিচার অন্ধই থেকে যায়। বিচারক যখন রায় লেখেন, তিনি যদি কেবল প্রমাণের ভার ওজন করে শাস্তি বণ্টন করে নিজের কর্তব্য সম্পন্ন মনে করেন, তাহলে তিনি আইনের সেবা করেছেন বটে, তবে ন্যায়ের সেবা করেছেন কিনা সন্দেহ। বিচারের মধ্যে মানবহৃদয়ের উষ্ণতা সঞ্চারের যে দাবি কবি তুলেছিলেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক, সমান জরুরি।
আইনের যন্ত্রসদৃশ প্রকৃতি যেমন কবিকে বিচলিত করেছিল, তেমনই বিচারের বিলম্ব ও প্রতিকারহীনতা তাঁকে গভীর বেদনায় ক্ষতবিক্ষত করেছিল। সমাজে বিরাজমান অন্যায়, অত্যাচার ও শক্তের নিপীড়ন দেখে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে ‘নৈবেদ্য’-পরবর্তী পর্বের সেই অমর প্রার্থনায় কবি লিখেছিলেন,
“আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।”
এই দু’টি পঙ্ক্তি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ আইনি মন্তব্যগুলির অন্যতম। বস্তুত পৃথিবীর তাবৎ বিচারশাস্ত্র যে কথাটি বলতে চেয়েছে ‘বিলম্বিত বিচার বিচার-অস্বীকারেরই নামান্তর’ এই সূত্রে, কবি সেই কথাটিকেই দিয়েছেন অশ্রুর ভাষা। যখন কোনো অপরাধপীড়িত পরিবার বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ছোটাছুটি করেও প্রতিকার পায় না, যখন ভিকটিম সমাধিস্থ হওয়ার পরও মামলা ঝুলে থাকে, তখন সত্যিই বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। লক্ষণীয়, এই কবিতাতেই কবি ক্ষমার সীমাও নির্দেশ করেছেন, ‘ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা, হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা তোমার আদেশে।’ অন্যায়কারী ও অন্যায়-সহিষ্ণু উভয়কেই তাঁর ঘৃণা যেন তৃণসম দহন করে, এই প্রার্থনা আসলে রাষ্ট্রের দণ্ডনীতিরই কাব্যিক ভিত্তিভূমি। বিচারক না হয়েও, প্রাতিষ্ঠানিক আইনজ্ঞ না হয়েও, এই অভিন্ন উপলব্ধিতে যিনি তাড়িত হয়েছিলেন, তিনিই আমাদের রবীন্দ্রনাথ।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা Alternative Dispute Resolution (এডিআর), আজকের সময়ে আইন-পরিমণ্ডলে এ এক বহুচর্চিত প্রসঙ্গ। মামলার ভারে ন্যুব্জ বিচার ব্যবস্থা, মামলাজটে বিপন্ন বিচারক, প্রতিকার-প্রার্থনায় ক্লান্ত নাগরিক, এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আমরা সহজ-সাবলীল বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উপায়ের সন্ধান করছি। অথচ আশ্চর্যের কথা, এই চিন্তা নতুন নয়। ১৩১২ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ আজ থেকে সওয়াশ’ বছর আগে, ‘অবস্থা ও ব্যবস্থা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
“যাহাতে মামলা-মকদ্দমায় লোকের চরিত্র ও সম্বল নষ্ট না হইয়া সহজ বিচারপ্রণালীতে সালিশ-নিষ্পত্তি দেশে চলে তাহার ব্যবস্থা করা কি আমাদের সাধ্যাতীত? সমস্তই সম্ভব হয়, যদি আমাদের এই-সকল স্বদেশী চেষ্টাকে যথার্থভাবে প্রয়োগ করিবার জন্য একটা দল বাঁধিতে পারি।”
কবি দু’টি ভয়ংকর ক্ষতির কথা বলেছেন, ‘চরিত্র ও সম্বল’। মামলা শুধু সম্পদ গ্রাস করে না, চরিত্রও ক্ষয় করে। দীর্ঘ মামলার ভারে মানুষ মিথ্যা বলতে শেখে, সাক্ষী কিনতে শেখে, উকিলের কাছে অনিচ্ছায় কপটতা শেখে। সম্বলের ক্ষয় হয়তো একদিন পূরণ হয়, চরিত্রের ক্ষয় সহজে পূরণ হয় না। সমাধানের পথ কবি দেখিয়েছেন ‘সালিশ-নিষ্পত্তি’তে। যে সালিশ আমাদের সমাজে চিরন্তন ছিল, যে গ্রাম-পঞ্চায়েত আমাদের পূর্বপুরুষের বিচারধারা ছিল, তাকেই কবি জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন – শুধু প্রবন্ধে নয়, কর্মেও। পতিসরে তাঁর জমিদারি এলাকায় পল্লী-সংগঠন ও সমবায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি এই বিশ্বাসেরই রূপায়ণ ঘটাতে চেয়েছিলেন। তিনি কেবল রোগ চিহ্নিত করেননি, পথের সন্ধানও দিয়েছেন, ‘একটা দল বাঁধিতে পারি’। সংঘবদ্ধ স্বদেশী চেষ্টার মধ্যেই সমাধানের চাবিকাঠি। সময়ের চেয়ে কতটা অগ্রসর ছিলেন তিনি, এ প্রবন্ধ পাঠ করলে শ্রদ্ধায় চিত্ত পূর্ণ হয়ে ওঠে।
পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্কের প্রশ্নে কবিগুরুর আইনি ভাবনা আরও মর্মস্পর্শী। আধুনিকায়নের প্রতিঘাতে আমাদের পরিবারগুলি আজ এক ক্রান্তিকাল পার করছে। পারিবারিক সহিংসতার মামলা, যৌতুকের মামলা, দাম্পত্য কলহের মামলা, এসব দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বকবি বিশ্বাস করতেন, পারিবারিক সুসম্পর্ক ও বন্ধন বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই আইনি সংকটগুলি এড়ানো সম্ভব। ১৩০১ বঙ্গাব্দে ‘ছেলেভুলানো ছড়া’ প্রবন্ধে কবি লিখেছেন,
“তখন ইংরেজের আইন ছিল না। অর্থাৎ দাম্পত্য অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভার পাহারাওয়ালার হাতে ছিল না। সুতরাং আত্মীয়গণকে উদ্যোগী হইয়া সেই কাজটা যথাসাধ্য সহজে এবং সংক্ষেপে সাধন করিতে হইত। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বোধ হয় ঘরের বধূ-শাসনের জন্য পুলিসের আইনের চেয়ে সেই গার্হস্থ্য আইন, কনস্টেবলের হ্রস্বযষ্টির অপেক্ষা সহোদর ভ্রাতার হুড়কো ঠেঙা, ছিল ভালো। আজ আমরা স্ত্রীকে বাপের বাড়ি হইতে ফিরাইবার জন্য আদালত করিতে শিখিয়াছি, কাল হয়তো মান ভাঙাইবার জন্য প্রেসিডেন্সী ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দরখাস্ত দাখিল করিতে হইবে।”
এই অংশটি পাঠ করলে মনে হয়, কবি যেন আমাদের সমকালের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে চলেছেন। তিনি উপহাসের ছলে যা বলেছিলেন, কালক্রমে তা-ই প্রায় বাস্তব হয়ে উঠেছে। আজ আমরা সংসারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিরোধের জন্যও থানা-পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছি, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দরখাস্ত করছি, পারিবারিক আদালতে ঢুকে পড়ছি। আইন তার প্রসারমান হাত নিয়ে আমাদের ঘরের অভ্যন্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ঘরের পরিধি সংকুচিত হচ্ছে, আদালতের পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে। কবিগুরুর আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। আইন হয়েছে, আরও হচ্ছে- হবে; আইন-গবেষণাও হচ্ছে বিস্তর; কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধনগ্রন্থি কি আর ফিরে আসছে? আমাদের পূর্বপুরুষেরা পাখির নীড়ের মতো যে স্নেহাবিস্ট গার্হস্থ্য পেয়েছিলেন, আমরা কি তা পাচ্ছি? মায়া-মমতা-ভালোবাসার সেই সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে শেষপর্যন্ত আইনের কাছে নয়, আমাদের ফিরতে হচ্ছে কবিগুরুর কাছে।
আইনি ভাবনার পাশাপাশি কবিগুরুর সক্রিয় আইনি প্রতিরোধের ইতিহাসও স্মরণযোগ্য। বিশ্বকবি প্রত্যক্ষ রাজনীতির মানুষ ছিলেন না; তবে রাজনীতি-সচেতন ছিলেন প্রবলভাবে। তাঁর সমকালের রাজনৈতিক প্রাণপুরুষ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে কেবল আত্মিক নয়, ব্যক্তিপর্যায়ে গভীর যোগাযোগ ছিল তাঁর; গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ অভিধায় ভূষিত করার কৃতিত্বও বহুলাংশে তাঁরই। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির পিপাসায় তিনি জীবনভর সাহিত্য রচনা করেছেন, গান লিখেছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ১৯১৫ সালে ইংরেজ সরকার তাঁকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে নিরস্ত্র জনতার উপর গুলিবর্ষণে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ সে বছরের ৩০ মে ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে লেখা ঐতিহাসিক পত্রে সেই নাইটহুড উপাধি ফিরিয়ে দেন; লিখেছিলেন, সম্মানের তকমা যখন অসম্মানের পাশে জ্বলজ্বল করে, তখন সকল বিশেষত্ববর্জিত হয়ে স্বদেশবাসীর পাশে দাঁড়ানোই তাঁর কাম্য। এ এক নিছক সাহিত্যিক প্রতিক্রিয়া নয়, এ এক রাজনৈতিক-আইনি বিদ্রোহ। ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর সর্বোচ্চ সম্মাননা যিনি ফিরিয়ে দিতে পারেন, তিনি সেই কাঠামোর ভেতরে থেকেই তার অমানবিকতার বিরুদ্ধে নৈতিক রায় ঘোষণা করেন। তাঁর সাড়া জাগানো কবিতা ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ এবং গান ‘একলা চলো রে’ এই রাজনৈতিক-আইনি প্রেক্ষাপটেই পাঠযোগ্য। ভয়শূন্য চিত্ত, উন্নত মস্তক, জ্ঞানের মুক্ত প্রবাহ, যুক্তির স্রোতে অভ্যাসের মরুবালুরাশি হারিয়ে না যাওয়া, এই যে ভাষা, তা আদতে মৌলিক মানবাধিকারের এক কাব্যিক ঘোষণাপত্র, জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার তিন দশক আগে রচিত।
অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান আইনি পাঠেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আইন তো সাম্যেরই ভাষা; আইনের চোখে সকলে সমান। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ-নির্বিশেষে নাগরিকের অধিকার এক ও অভিন্ন। ‘কালান্তর’ গ্রন্থে কবি লিখেছেন,
“ভারতবর্ষের অধিবাসীদের দুই মোটা ভাগ, হিন্দু ও মুসলমান। যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে এক পাশে সরিয়ে দিলেই দেশের সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তা হলে বড়োই ভুল করব।”
এ মন্তব্যে যে অন্তর্নিহিত সাংবিধানিক চেতনা ধ্বনিত হয়েছে, তা আমাদের সংবিধানের ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ এবং ‘রাষ্ট্র-পরিচালনার মূলনীতি’-র সঙ্গে প্রায় সমানুভূত। ‘গোরা’ উপন্যাসের সমাপ্তিতে গোরা যখন আবিষ্কার করে যে জন্মসূত্রে সে কোনো জাত-ধর্মের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, তখন সে-ই হয়ে ওঠে প্রকৃত বিশ্ব নাগরিক; জন্মপরিচয় নয়, মানবপরিচয়ই সে নাগরিকত্বের ভিত্তি। এই দার্শনিক ঘোষণা আধুনিক সংবিধানতত্ত্বেরই পূর্বাভাস। কবি যেন প্রায় শতবর্ষ আগেই আমাদের সংবিধান-প্রণেতাদের পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের আইনি ভাবনার সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিক হল তাঁর দৃষ্টির মানবিক প্রকৃতি। তিনি আইনকে শুধুমাত্র শাস্তির যন্ত্র হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন সমাজের সুরক্ষা-কাঠামো হিসেবে, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক রক্ষার শৃঙ্খলা হিসেবে। আবার আইনের সীমাবদ্ধতাও তিনি স্বীকার করেছেন। তাঁর অভিমত ছিল, যেখানে আইন পৌঁছাতে পারে না, সেখানে পৌঁছায় ভালোবাসা; যেখানে শাস্তির হাত পৌঁছায় না, সেখানে পৌঁছায় শিক্ষার আলো। দণ্ড ও ক্ষমার এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে; দণ্ডদাতার হাতে দণ্ডের চেয়ে বড় যে বেদনা থাকা চাই, ‘যে দণ্ড আঘাত করে অপরাধীর চেয়ে দণ্ডদাতাকে বেশি’, সেই উপলব্ধিই ন্যায়বিচারের শেষ কথা। আইন ও মানবিকতার এই দ্বৈত পথ-পরিক্রমায় তিনি কখনও একপাক্ষিক নন। বিচারব্যবস্থার প্রতি তাঁর সমালোচনা কেবল নেতিবাচক নয়, তা গঠনমূলক; তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে, পথ দেখায়।
ব্যক্তিজীবনে আদালত-অঙ্গনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্কহীন থেকেও যে সুনিপুণ ঢঙে কবিগুরু আইনি ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। প্রয়াত প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের আজীবন রবীন্দ্র-পাঠে এই সত্য বার বার উন্মোচিত হয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে না পড়লে বাঙালি বিচারক যেন তাঁর মাটির শিকড়কেই ভুলে যেতে বসেন। ‘গোরা’ উপন্যাসে জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন যেমন আইনি-নৈতিক প্রশ্ন, ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে স্বদেশী আন্দোলনের প্রসঙ্গ যেমন আইনের সীমার প্রসঙ্গ, ‘রক্তকরবী’ নাটকে যক্ষপুরীর রাজার জালের আড়ালে কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রশ্ন যেমন প্রশাসনিক আইনের প্রসঙ্গ, ‘বিসর্জন’ নাটকে রাজা গোবিন্দমাণিক্যের বলিনিষেধ যেমন প্রথা ও বিবেকের সংঘাতে আইনের জন্মরহস্যের প্রসঙ্গ, তেমনি আমরা জানি , সমাজের সর্বত্রই আইন ও ন্যায়ের দ্বন্দ্ব আজ এক অন্তঃস্রোত হয়ে বহমান।
কবিগুরুর আইনি ভাবনা আমাদের কী শিক্ষা দেয়? সবচেয়ে বড় শিক্ষা, আইনকে মানুষের জন্য রাখতে হবে, মানুষকে আইনের জন্য নয়। আইন যেন না হয় এমন এক কারিগরি যন্ত্র, যার ভিতরে মানবহৃদয়ের উত্তাপ নেই। আরেক শিক্ষা, বিলম্বিত বিচার বিচারহীনতার নামান্তর; বিচারের বাণী যেন নীরবে নিভৃতে কেঁদে না যায়। তার পরের উপলব্ধি, মামলা-মোকদ্দমার বাইরেও সমাধান সম্ভব; সালিশ-নিষ্পত্তির সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা যায়। এর পাশাপাশি কবি আমাদের বুঝিয়েছেন, আইন যেন পরিবারের অভ্যন্তরে বিনাশী রূপে প্রবেশ না করে; পারিবারিক বন্ধন রক্ষার দায় শেষ পর্যন্ত পরিবারেরই। আর সবশেষে, আইন যেন কখনও সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের যন্ত্র না হয়ে ওঠে; আইন সর্বদা সাম্যের ভাষা।
এভাবেই বাঙালি জাতিসত্তার নির্মাতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কেবল আমাদের সাহিত্যিক অহংকার নন, তিনি আমাদের আইনি-নৈতিক চিন্তার চিরন্তন উৎসমুখ। ১৮৬১-র জোড়াসাঁকো থেকে আজকের যে দীর্ঘ পরিক্রমা, সে পথে কবিগুরু আজও আমাদের সঙ্গী। তাঁর কবিতার পঙ্ক্তি আমাদের সংবিধানের প্রাণ-সংগীতে গাঁথা; তাঁর গদ্যের প্রজ্ঞা আদালত-প্রাঙ্গণে অলক্ষ্যে বিচরণ করে। এজলাসে বসে যখন কোনো বিচারক প্রমাণের পাল্লা ওজন করেন, তখনও তাঁর কানে বাজে, বাজা উচিত, সেই সতর্কবাণী- যন্ত্র হয়ো না, মানুষ থেকো।
ঋণস্বীকার: এ লেখার তথ্য, উদ্ধৃতি ও ভাবনার অনেকখানি আহরিত হয়েছে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের রবীন্দ্রবিষয়ক বিভিন্ন লেখা ও গ্রন্থ পাঠ থেকে। রবীন্দ্রসাহিত্যে আইনি মননের সন্ধানে তিনিই আমাদের অগ্রপথিক; তাঁর প্রজ্ঞার কাছে এ লেখা চিরঋণী।
১ জুলাই, ২০২৬
