পড়শী হাসতে নেই মানা যমুনা ব্রিজে ট্র্যাজেডি যখন কমেডি

যমুনা ব্রিজে ট্র্যাজেডি যখন কমেডি

Post Views: 5
10 min read

আনারুল ইসলাম ওরফে আনু মিয়ার জীবনে দুঃখের কোনো শেষ ছিল না। প্রথম দুঃখ—তাহার নাম ‘আনু’। লোকে তাহাকে ডাকিবার সময় কেমন যেন একটা তাচ্ছিল্য করে। কেউ আনুকে সংক্ষিপ্ত করে ডাকে ’অনু’, কেউ শধু ’অন’। দ্বিতীয় দুঃখ—তাহার প্রেমিকা মরিয়র আক্তার মিতু। মিতু মেয়েটি রূপে অপরূপা হইলেও গুণে যে লক্ষ্মী নয়, তাহা আনু নিজের হাড়ের মজ্জায় মজ্জায় টের পাইয়াছে।

তবে মিতুর একটা মহৎ গুণ ছিল, তাহার চোখ দুটি ছিল অত্যন্ত ডাগর ডাগর। বিমল মিত্রের উপন্যাসের নায়িকাদের মতো যখন সে ডাগর চোখ মেলিয়া আনুর দিকে তাকাইত, আনুর বুকের ভেতর কেমন যেন ওলোটপালট হইয়া যাইত। সেই ওলোটপালটের সর্বশেষ ফলাফল— আজ তাহারা যমুনা ব্রিজের টাঙ্গাইল অংশের উপর দাঁড়াইয়া আছে। উদ্দেশ্য মহৎ এবং চূড়ান্ত। তাহারা একসঙ্গে মরিতে আসিয়াছে।

নদীর পানি আজ বেশ ঘোলাটে। আষাড় মাস, বর্ষার পানি টইটুম্বুর। আনু ব্রিজের রেলিংয়ে হাত দিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিল। তাহার পড়নে একটি হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি। সে মনে মনে ভাবিয়াছিল, মৃত্যুর আগে অন্তত তাহাকে যেন একটু বিষাদগ্রস্ত ও রোমান্টিক দেখায়। তার কাছে নীল হচ্ছে বিষাদগ্রস্ত ও রোমান্টিকতার প্রতীক।

মিতু তাহার পাশে দাঁড়াইয়া পরম নিশ্চিন্তে এক প্যাকেট পটাটো চিপস চিবাইতেছিল। মৃত্যুর আগে চিপস চিবানো হলে তাতে কোন স্বাদ পাওয়া যায় কিনা— এ বিষয়ে বিজ্ঞান কী বলে আনুর জানা নাই। তবে মিতুর চোয়ালের নড়াচড়া দেখিয়া মনে হইতেছে, সে বেশ উপভোগ করিতেছে। চিবানোর কচাকচ শব্দ বিলঙ্খন শোনা যাইতেছে।
আনু করুণ স্বরে ডাকিল, “মিতু।”

মিতু চিপসের প্যাকেটে হাত ঢুকাইতে ঢুকাইতে বলিল, “বলো আনু। শেষবারের মতো কিছু বলবে?”

“আমরা যে একসঙ্গে ঝাঁপ দেব, তোমার ভয় করিতেছে না?”

মিতু একটা চিপস মুখে দিয়া চিবাইতে চিবাইতে অবলীলায় বলিল, “ভয় করবে কেন? মরণ তো একবারই। তাছাড়া কবি বলেছেন না— ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’। আমরা তো সুন্দর ভুবনেই মরছি।”

মিতুর আরো মনে হইলো যমুনা নদীটা বেশ সুন্দর। তবে পানিটা একটু বেশি নোংরা মনে হচ্ছে। ঝাঁপ দেওয়ার পর মুখে ঢুকে গেলে কেমন একটা বিশ্রী স্বাদ লাগবে। বিষয়টা তাকে বেশ বিচলিত করিল।

আনু স্তম্ভিত হইয়া গেল। মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের মুখে জল আসে, চোখ দিয়া অশ্রু ঝরে। আর মিতু চিন্তা করিতেছে যমুনার পানির স্বাদ লইয়া! সে বিষণ্ণ গলায় বলিল, “তুমি কি আসলেই আমাকে ভালোবাসো, মিতু?”

মিতু তাহার ডাগর চোখ দুটি আনুর চোখের ওপর রাখিল। বাতাসে তাহার চুল উড়িতেছে। সে অত্যন্ত নরম গলায় বলিল, “ভালোবাসি দেখেই তো মরতে এসেছি, আনু। নইলে এই তপ্ত দুপুরে কে ব্রিজের ওপর এসে দাঁড়িয়ে থাকে? বাসায় অতি প্রিয় টিভি সিরিয়াল চলছিল, তাও ফেলে চলে এলাম।”

আনুর বুকটা অভিমানে ফুলিয়া উঠিল। আহা, প্রেম! এই প্রেমের জন্যই তো জীবন উৎসর্গ করা যায়।

ঘড়িতে তখন ঠিক বেলা একটা। ব্রিজের ওপর মানুষের আনাগোনা কম। দুই-একটা দুর পাল্লার বাস দ্রুত পার হইয়া যাইতেছে। বাতাস একটু তপ্ত।

আনু মিতুর হাতটা ধরিতে গেল। কিন্তু মিতু অত্যন্ত কৌশলে হাতটা সরাইয়া লইয়া বলিল, “ধরো না, লোকে দেখবে তো।”

আনু অবাক হইয়া বলিল, “আরে, একটু পরেই তো আমরা মরে যাব। তখন লোকে দেখলেই কী, আর না দেখলেই কী?”

“তবুও। কেমন দেখায় না? হাত ধরে ঝাঁপ দিলে যদি বাতাসে হাত ছুটে যায়, তখন লোকে ভাববে আমাদের কেমিস্ট্রি ভালো ছিল না। তার চেয়ে বরং তুমি আগে লাফ দাও, আমি তোমার ঠিক পেছনেই লাফ দিচ্ছি। ওয়ান, টু, থ্রি বলবে কিন্তু।”

আনু একটা গভীর শ্বাস লইল। পৃথিবীর সমস্ত আলো-বাতাস সে শেষবারের মতো ফুসফুসে ভরিয়া লইল। তাহার মনে হইল, এই ত্যাগ তাহাকে অমর করিয়া রাখিবে। সে মিতুর দিকে চাহিয়া বলিল, “তাহলে আমি গেলাম। ওপারে তোমার জন্য অপেক্ষা করব।”

“আচ্ছা যাও। সাবধানে লাফ দিয়ো। ব্রিজের নিচে কোনো নৌকা-টৌকা আছে কিনা দেখে নিয়ো। মাথায় চোট লাগলে আবার কেলেঙ্কারি হবে।”

আনু আর কালক্ষেপণ করিল না। সে চোখ বন্ধ করিল। মনে মনে স্রষ্টার নাম স্মরন করিল এবং ব্রিজের রেলিং টপকাইয়া দিল এক জাঁকজমকপূর্ণ লাফ।

বাতাস কাটিয়া সে যখন নিচের দিকে পড়িতেছিল, তাহার মনে হইল সে যেন মুক্ত বিহঙ্গ। তাহার কানে বাতাসে মিতুর সুরেলা কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিতেছে (যদিও পুরোটাই তাহার কল্পনা)।

ছলাৎ!

বিশাল এক শব্দ করিয়া আনু যমুনার ঘোলা পানিতে তলাইয়া গেল। পানির নিচে গিয়া তাহার প্রথম যে অনুভূতিটি হইল, তাহা অত্যন্ত জাগতিক— যমুনার পানি আসলেই অত্যন্ত বিশ্রী এবং কাদাযুক্ত। মিতুর কথাই সত্য।

পানি হইতে মাথা তুলিয়াই আনু খাবি খাইতে খাইতে ব্রিজের দিকে তাকাইল। তাহার ধারণা ছিল, এতক্ষণে মিতুর ঝাঁপ দেওয়া শরীরটি শূন্যে ভাসিতে দেখিবে।

কিন্তু না।

ব্রিজের রেলিংয়ের ওপর মিতু অত্যন্ত সুস্থ ও স্বাভাবিক শরীরে দাঁড়াইয়া আছে। বাতাস তাহার শাড়ির আঁচল উড়াইয়া লইয়া যাইতেছে। সে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়া আনুর হাবুডুবু খাওয়া দেখিতেছে। যেন সে কোনো ওয়াটার পার্কের ডলফিন শো উপভোগ করিতেছে।

আনু পানির তোড়ে ভাসিয়া যাইতে যাইতে চিৎকার করিল, “মি-তু! লাফ দাও! লাফ দাও, লাফফফফফ!”

মিতু ব্রিজের ওপর হইতে দুই হাত মুখের কাছে নিয়া চোঙার মতো করিয়া চিল্লাইয়া বলিল, “পানি কেমন আনু? গরম ঠান্ডা, সর্দি লাগবে না তো?”

“লাফ দাও বলছি!” বলতে বলতে আনুর মুখে এক ঢোক নোংরা পানি ঢুকিয়া গেল।

মিতু তাহার ঘড়ির দিকে তাকাইল। তারপর ব্রিজের ওপর হইতেই চিৎকার করিয়া বলিল, “আমার মনে হয় আজ আর লাফ দেওয়া ঠিক হবে না আনু। পানিটা বড্ড নোংরা। তাছাড়া আমার নতুন সালোয়ার-কামিজটা নষ্ট হয়ে যাবে। আম্মা বকবে। আমি বরং আসি? দুপুর গড়িয়ে গেল, খিদে পেয়েছে।”

আনু তার বিশ্বাসের চরম সীমায় আঘাত পাইল। সে হাত-পা ছুড়িতে ছুড়িতে বলিল, “তুমি বিশ্বাসঘতকতা করলে মিতু? তুমি লাফ দিলে না?”

মিতু একটু লজ্জিত হাসিল। সেই হাসিটি অত্যন্ত নিষ্পাপ, ঠিক যেন থ্রিলার উপন্যাসের রহস্যময়ী নায়িকাদের মতো। সে মিষ্টি করিয়া হাত নাড়িল।

“রাগ করো না আনু। সংসার চালাতে গেলে একজনের তো বেঁচে থাকতে হয়, তাই না? দুজনেই মরে গেলে আমাদের গল্পটা লোকে জানবে কী করে? আমি যাই, আমার প্রিয় টিভি সিরিয়ালটার আবার সময় হয়ে গেছে। ভালো থেকো ওপারে!”

এই বলিয়া মিতু অত্যন্ত ধীরস্থির পায়ে, যেন কিছুই ঘটে নাই— এমন এক ভঙ্গিতে ব্রিজ ধরিয়া হাঁটা দিল। তাহার হাঁটার গতিতে কোনো তাড়াহুড়ো নাই, চোখে কোনো অশ্রু নাই। সে পকেট হইতে মোবাইল ফোনটি বাহির করিয়া হয়তো কোনো রিলস দেখায় মশগুল হইয়া গেল।

আনু ততক্ষণে বুঝিয়া গিয়াছে— প্রেমের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। বিশেষ করিয়া যখন পেটে যমুনার ময়লা পানি ঢুকিতে শুরু করিয়াছে, তখন তাহার বাঁচিবার আকুতি চরমে পৌঁছিল। সে ডাইনোসরদের মতো চিৎকার করিয়া বাঁচাও বাঁচাও বলিতে লাগিল।

অদূরেই কয়েকজন জেলে নৌকা লইয়া মাছ ধরিতেছিল। আর ব্রিজের ওপর টহলরত পুলিশও ততক্ষণে ঘটনা দেখিয়া ফেলিয়াছে।

“আরে, পাগলাটা লাফ দিল কেন?” বলিয়া পুলিশ চিৎকার জুড়িল।

পুলিশের ডাক আর আনুর করুণ চিৎকার শুনিয়া স্থানীয় ডুবুরি ও জেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়িল। মিনিট দশেকের টানাটানি এবং বেশ কয়েক লিটার যমুনার পানি পেটে পুরিবার পর আনুকে যখন নৌকায় তোলা হইল, তখন তাহার অবস্থা আধমরা শালিকের মতো। নীল পাঞ্জাবিটি ভিজিয়া গায়ের সঙ্গে লেপ্টে গিয়াছে, মাথার চুলগুলো মুখের ওপর আছড়ে পড়েছে।

পুলিশ অফিসার তাহার দিকে চাহিয়া অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলিলেন, “কী হে ছোকরা? মরতে গিয়েছিলে কেন? প্রেমে ছ্যাঁকা?”

আনু কাশিতে কাশিতে পেটের পানি উগরাইয়া দিল। তারপর ধরা গলায় বলিল, “ছ্যাঁকা না স্যার, পুরো ফ্রাই প্যানে ফেলে ভাজি করে দিয়েছে।”

“মেয়েটি কোথায়?”

“সে সিরিয়াল দেখতে বাড়ি চলে গেছে স্যার।”

পুলিশ অফিসার কিছুক্ষণ আনুর দিকে চাহিয়া রহিলেন। তারপর তাহার কাঁধে হাত রাখিয়া পরম মমতায় বলিলেন, “বাছা, জগতে কত রকম বোকামি আছে। কিন্তু বাঙালি মেয়ের সঙ্গে মরার চুক্তি করে ব্রিজে যাওয়া হচ্ছে সবচেয়ে বড় বোকামি। ওরা জামা কাপড় নষ্ট হওয়ার ভয়ে বৃষ্টিতে বের হয় না, আর তুমি ভেবেছ তোমার সঙ্গে যমুনায় ঝাঁপ দেবে?”

আনু কোনো উত্তর দিল না। সে নৌকার কাঠের পাটাতনে শুইয়া আকাশের দিকে চাহিয়া রহিল। আকাশটা আজ বড় বেশি নীল। দুনিয়াটা আসলে চমৎকার। শুধুমাত্র ডাগর চোখের মেয়েরা যখন একসঙ্গে মরার প্রস্তাব দেয়, তখন আগে পাছে ভালো করে না ভেবে ব্রিজে যাওয়াটাই চরম ভুল।

পরদিন থানার ওসি সাহবের রুমে বসিয়া আনু খবর পাইল, পুলিশ মিতুকে খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। মিতু নাকি পুলিশকে বলিয়াছে, “আমি তো ওকে ধাক্কা দিইনি। ও নিজেই লাফিয়েছে। আর আমার সাঁতার জানা নেই, তাই আমি বাড়ি চলে এসেছি। এতে আমার দোষটা কোথায়?”

এ কথা শুনে আনু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিল। বিমল মিত্রের উপন্যাসের নায়িকারা আসলেই বড় অদ্ভুত আর রহস্যময়ী হয়। তাহারা রূপালী গিটার ভাঙিয়া ফেলে না, কিন্তু আস্ত একটা জ্যান্ত প্রেমিককে যমুনার পানিতে ফেলিয়া অনায়াসে সিরিয়াল দেখিতে চলিয়া যায়।

২১ জুলাই, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

সরকারি চাকুরীজীবি, পাশাপাশি লেখালেখি ও গবেষণা কাজে লিপ্ত। ছোটগল্প, ছোট উপন্যাস ও রম্য রচনা প্রধানত লেখার মুলধারা।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।