পড়শী পড়শীর আরশি উত্তরণের পথে

উত্তরণের পথে

Post Views: 5
8 min read

সময়চক্রে পরিবর্তন অনিবার্য, ঘটে আসছে নিরন্তর পৃথিবীর আদি থেকে অদ্যাবধি। পরিবর্তন জীবনের ধর্ম- পরিবর্তনের ধারায় বদলে গিয়েছে পুরো বিশ্ব, মানুষের জীবনধারা এবং সমাজ ও সংস্কৃতি। চলমান সময়ের সারথী হয়ে চড়াই-উৎরাই এর আলো-আঁধারিতে আমাদের অবস্থান, আমাদের জীবন যাপন। প্রতিটি মানুষের যেমন ভিন্ন ভিন্ন সত্তা আছে, মনন ও মানসিকতায় পার্থক্য আছে, তেমনি আমাদের স্বপ্নও সবার এক নয়, কর্ম সবার এক নয়, আমাদের অর্জন-বিসর্জনের সমীকরণও সবার এক নয়। যা কিছু মানুষের জন্য সমাজের জন্য কল্যাণকর, তা মানুষের মহতী ভাবনা ও কর্মযোগের উন্মেষ থেকেই ঘটে আসছে যুগ যুগ ধরে। ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আমাদের আন্দোলিত করে, প্রভাবিত করে, উদ্দীপ্ত করে, অনুপ্রাণিত করে, জাগরিত করে- সমাজকে সমৃদ্ধ করে এগিয়ে নিয়ে যায় প্রগতির পথে, আমাদের স্বপ্নের পাখা মেলে উড়ান দেয় অর্জনের প্রত্যাশায়।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রবাসী বাঙালিরা সামাজিকভাবে আমাদের সীমানায়, আমাদের সামাজিক বলয়ে কিভাবে বেঁচে আছি অথবা উত্তরণের পথে আমরা কতটুকু এগিয়ে যেতে পেরেছি, তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করার প্রয়াসেই এ অবতারণা। চর্বিত চর্বনের মতো লাগতেই পারে, তবে বিষয়টিকে ঘিরে বার বার ফিরে আসি উত্তরণ নিয়ে কথা বলতে এক ভিন্ন আশা নিয়ে, তার বিশেষ কারণ আমাদের সমাজের অনেক কিছু থেকেও অনেক কিছু নেই, সার্বিক অর্জন নিয়ে আমাদের যে আত্মতৃপ্তি, তা সত্যিকার অর্থে অন্যান্য অভিবাসী সমাজের তুলনামূলক প্রেক্ষাপটে কাঙ্ক্ষিত রেখায় পৌঁছতে পারেনি বলে মনে হয়, তাইতো মনের গভীরে এক অতৃপ্ততা ঘুরে বেড়ায়, এক অভাববোধ তাড়িয়ে বেড়ায়, কিছু একটা করার প্রত্যাশায় মনটা উদগ্রীব হয়ে উঠে।

প্রবাসের মাটিতে আমরা যারা বসবাস করছি, বিশ্বের যে প্রান্তেই হোক না কেনো, সব জায়গায়ই বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে গড়ে উঠেছে আমাদের প্রবাসী সমাজ, বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার প্রেক্ষাপটেতো বটেই। এছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমাদের প্রবাসী বাঙালি সমাজের এক বিরাট অংশ। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অভিবাসী জীবন বেছে নেয়ার পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে, সবারই প্রেক্ষাপট আসলে ভিন্ন। নানা কারণে অভিবাসী জীবন বেছে নিলেও জীবনধারায় প্রবাসী প্রেক্ষাপটের প্রভাব মোটামোটি সবার জন্যই কাছাকাছি।তবুও নানা চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে যার যার নিজস্ব বলয়ে এগিয়ে চলে প্রবাসীদের জীবন- ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন।

সীমিত পরিসরে উল্লেখ করতে হয় বৃহত্তর অভিবাসী সমাজের পাশাপাশি সার্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থান কিছুটা হালকা, খুব একটা ভালো জায়গায় নেই। যদিও অভিবাসী সমাজের ইতিহাসের দিকে তাকালে এটাই প্রতিভাত হয় যে একটি অভিবাসী সমাজের সামাজিক উত্তরণের জন্য, একটি স্থিতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় ১৫০ বছরে অভিযাত্রায় এগিয়ে যেতে হয়। সে তুলনায় আমাদের অভিযাত্রার এখনো অনেকটা পথ বাকি, তবে অগ্রযাত্রা থেমে নেই… ধীর গতিতে হলেও এগিয়ে চলছে আমাদের সমাজ বিগত শতবর্ষের অভিবাসী সমাজের পথচলায় পরিবর্তনশীল জীবনধারায় উত্তরণের পথে আমরা কতটুকু এগিয়ে যেতে পেরেছি তার উত্তর খুঁজতে গেলেই আমাদের অবস্থানগত বিশ্লেণনের প্রেক্ষাপটে আমাদের কিছুটা শ্লথ গতির চিত্র ফুটে উঠে। গত কয়েক দশকে আমাদের চারপাশে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যে কল্পনাতীত পরিবর্তন, তা ভীষণভাবে লক্ষণীয়! আমাদের সমাজও তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, তবে বিবেচ্য বিষয় হলো সে অগ্রযাত্রায় আমরা কতোটা এগিয়ে যেতে পেরেছি সবার সাথে। তাই আজ আমাদের আত্মবিশ্লেষণের সময়, ঘুরে দেখার সময়, মূল্যায়নের সময় উত্তরণের পথে এগিয়ে যাবার প্রত্যয়ে। আজ আমাদের সময় এসেছে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে আগামীর পরিকল্পনা করার, স্বপ্নবুননের… বসে না থেকে এখন আমাদের সময় নতুন জাগরণের।

কিছুই অর্জন হয়নি তা নয়, বেশ কিছু অর্জন আমাদের জন্য আনন্দের এবং গর্বের, কিন্তু সার্বিকভাবে আমরা এখনো সেই অবস্থানে পৌঁছতে পারিনি যেখানে আমাদের পৌঁছে যাওয়া উচিত ছিল। একটি সমাজের উন্নয়নের এবং উত্তরণের যেসব মাপকাঠি বা সূচকগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে আমাদের সমাজের আর্থ-সামাজিক অবস্থান, সেগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়ার বা ব্যবহার করার দিকে আমাদের তেমন কোন উদ্যোগ বা প্রয়াস নেই। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গড়ে উঠা বাঙালি সমাজে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য সংগঠন, সেখানে সাহিত্য-সংকৃতির চর্চা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে, কিন্তু প্রকৃত সামাজিক উত্তরণের জন্য প্রযোজ্য অবদান রক্ষাকারী উদ্যোগ গ্রহণ তেমন একটা হয়ে উঠে না। আমাদের আর্থ-সামাজিক উত্তরণের জন্য যেসব বিষয়গুলোর দিকে আমাদের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন, সেগুলোর দিকে এসব সংগঠনগুলো তেমন জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না, সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোর মধ্যে দিয়ে বিনোদনই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বেশির আয়োজনের। মানব সম্পদ উন্নয়, যুব উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন- এসব বিষয়ে আমরা এখনো সম্পূর্ণ সচেতন নই বা নানা আয়োজনে মাইক্রোফোনের আওয়াজে বা লেখার আঁচড়ে আমরা এগুলোর উল্লেখ করে থাকি প্রায়শই, কিন্তু বাস্তবমুখী কর্মপ্রয়াস গ্রহণ বা বাস্তবায়ের কোন উদ্যোগ নেই বললেই চলে।, মূল ধারায় আমাদের পদচারণা শুরু হয়েছে, ভূমিকাও মোটামোটি প্রশংসাযোগ্য, কিন্তু আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য যতটুকু অনুপ্রেরণা দেয়া প্রয়োজন বা যেটুকেউ প্রয়াস নিয়ে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন কিংবা তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার জন্য যেসব প্রেষণামূলক উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য, সেক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি।

বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের সামাজিক ঐক্য দুর্বল, সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষয়িষ্ণু, বিভিন্ন সংগঠন বা সংস্থাগুলো যার যার নিজস্ব গন্ডীতে কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে চলছে, সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী সমন্বয় বা শক্তিশালী সম্মিলিত প্রয়াস আমাদের সমাজে নেই। সবার সম্মিলিত সহযোগিত ছাড়া একটি সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয়, ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে বৃহত্তর উন্নয়ন পরিকল্পনায় অংশীদার হয়ে ভূমিকা রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। যে কোন উদ্যোগ বা সাংগঠনিক কার্যক্রমের ত্রুটিবিচ্যুতি থাকতেই পারে, নেতৃত্বে সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে বেগ পেতে হতে পারে, কিন্তু আমাদের উচিত সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যেকোন কল্যাণকর উদ্যোগকে, সংগঠনকে সহযোগিতা করা- আমাদের সমাজের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য, আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও উত্তরণের জন্য। তাই নেতিবাচক মনোভাব ঝেড়ে ফেলে ইতিবাচক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে, আমাদের নতুন প্রজন্মের প্রয়োজনে, আমাদের বর্তমানকে সুরক্ষিত করে ভবিষ্যৎকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে। ছিন্নমূল সমাজের অধিবাসী হতে চাই না আমরা, সমাজকে তরুণ প্রজন্মের জন্য, আগামীর জন্য গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। যাকিছু হয়নি তা নিয়ে হতাশার অন্ধকার নয়, সম্মিলিত শক্তিতে এগিয়ে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী সমাজ গঠন হোক আমাদের পথচলার অনুপ্রেরণা, আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর সমাজ গঠন হোক আমাদের স্বপ্ন!

মানব সভ্যতার ইতিহাস বলে— যে পরিবর্তন মানুষের কল্যাণে, সমাজের উন্নয়ন ও মহত্ত্বের আকাঙ্ক্ষায় জন্ম নেয়, তার আলোয় আলোকিত হয় সমাজ এবং প্রজন্মের পথ। আমাদের আজকের উদ্যোগ এবং কল্যাণকর্মই হোক আগামীর পথচলার দিকনির্দেশক আলোকবর্তিকা। আমাদের সমাজে জাগরণ হোক, সামাজিক নেতৃত্ব সুদূরপ্রসারী কল্যাণ ভাবনায় উজ্জীবিত হোক, তরুণ প্রজন্মের মাঝে জন্ম নিক আশার আলো, উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলুক আমাদের কর্মময় পথচলা। সবার জীবন সুন্দর ও সাফল্যময় হোক, আমাদের সমাজ সমৃদ্ধশালী ও আলোকিত হোক- সমাজের উত্তরণের পথে এগিয়ে যাবার এটাই হোক ঐকান্তিক প্রত্যাশা!

২ আগস্ট, ২০২৬

উডব্রিজ, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক, সম্পাদক, সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মী। লেখালেখি এবং সম্পাদনার সাথে সম্পৃক্ত দীর্ঘ চার দশকেরও বেশী সময় ধরে। প্রকাশিত গ্রন্থ দু’টি।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।