পড়শী মূল রচনাবলী ২১ আগস্ট: রাষ্ট্রের জন্য এক কঠিন শিক্ষা

২১ আগস্ট: রাষ্ট্রের জন্য এক কঠিন শিক্ষা

Post Views: 17
4 min read

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২১ আগস্ট ২০০৪ একটি কালো অধ্যায়। এই দিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন, আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন। গণতান্ত্রিক রাজনীতির মঞ্চে এমন হামলা শুধু একটি দলের ওপর আক্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং আইনের শাসনের ওপরও এক নির্মম আঘাত।

ঘটনার পর দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা। তদন্ত কর্মকর্তা বারবার পরিবর্তন, বিচার বিভাগীয় কমিশনের ভিন্ন ব্যাখ্যা, বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া’ অধ্যায় এবং পরে নতুন করে তদন্ত—এসব কারণে মামলাটি দীর্ঘদিন বিতর্কের মধ্যে ছিল। পরবর্তী সময়ে নতুন তদন্ত, সম্পূরক অভিযোগপত্র এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালে রায় ঘোষণা হয়। তবে এই মামলার তদন্ত ও বিচার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন— রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার। রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার যদি পক্ষপাতের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি হলেও জনমনে সংশয় থেকে যায়। আবার বিচার বিলম্বিত হলে ভুক্তভোগীদের ক্ষত আরও গভীর হয় এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তাই যে কোনো আলোচিত ঘটনার তদন্তে পেশাদারিত্ব, প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান এবং বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে তদন্ত ও বিচারকে রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের হাতিয়ার না বানিয়ে সত্য উদ্ঘাটনের প্রক্রিয়াকে সম্মান জানানো। কারণ একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা নির্ধারিত হয় শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে নয়; বরং রাজনৈতিক সহিংসতার মতো কঠিন ঘটনাগুলোর মোকাবিলায় তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সক্ষমতার মাধ্যমেও।

ইতিহাসের এমন ঘটনাগুলোর মূল্যায়নে রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গণতান্ত্রিক নীতি। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একইভাবে যেকোনো বড় অপরাধের তদন্ত হতে হবে স্বচ্ছ, পেশাদার এবং এমনভাবে, যাতে বিচার শুধু হয় না— বিচার হয়েছে বলেও জনগণের আস্থা তৈরি হয়।

আজ, দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। এই সময়ে ২১ আগস্টের স্মৃতি ফিরে আসা স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দেবে। কিন্তু সেই আলোচনা যদি কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষারোপের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ইতিহাস থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া হবে না। বরং প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে সহিংসতা কোনোভাবেই বৈধতা পাবে না এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে সত্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হবে।

২১ আগস্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো বিজয় নেই। এমন ঘটনা শেষ পর্যন্ত একটি দলকে নয়, সমগ্র রাষ্ট্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই নিহতদের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, কিন্তু গ্রেনেড, গুলি বা হত্যার ভয় থাকবে না; যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে ব্যালটের মাধ্যমে, সহিংসতার মাধ্যমে নয়। ২১ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই— ক্ষমতা বদলাবে, সরকার বদলাবে, কিন্তু গণতন্ত্রের মঞ্চে যেন আর কখনো গ্রেনেডের শব্দ ফিরে না আসে।

২৮ জুলাই, ২০২৬

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

কবি ও সাংবাদিক।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।