বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের এক সুপরিচিত নাম ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি একজন অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মী। কর্মক্ষেত্রে তিনি ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ও গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ত সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার প্রতিষ্ঠিত নাগরিক সংগঠন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর মাধ্যমে। তিনি সুজন-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। এছাড়াও জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। গণতন্ত্র, রাজনীতি, সুশাসন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, সংবিধান, সংস্কার সহ নানা বিষয়ে তার প্রকাশিত বেশ কিছু বই রয়েছে। এছাড়াও ক্যাথি বার্ক (Cathy Burke) রচিত “Today I Saw A Revolution – From Grassroots to Global Change: The Badiul Majumdar Story” নামে তার জীবনীও প্রকাশিত হয়েছে। বইটি এমাজন থেকে পাওয়া যায়।
সম্প্রতি পড়শীকে দেওয়া এক দীর্ঘ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. মজুমদার তার জীবন, সুজন-এর শুরুর কথা, সুজন-এর কর্মকান্ড, বাধা-বিপত্তি, নিজের আশা-আকাঙ্খা, অর্জন, দেশ ও নির্বাচন নিয়ে ভাবনা, এবং বর্তমান রাজনীতি সহ অন্যান্য নানা বিষয়ে আলাপ করেন। পড়শীর পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এহসান নাজিম ও ড. সাবির মজুমদার। ভিডিও সাক্ষাৎকারটির ট্রান্সক্রিপশনে সহায়তা করেন বি এম ফজলে রাব্বি (মুন) এবং সম্পাদনায় সহায়তা করেন আলী নাসিক আইমান।
পড়শী: দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন কাটানোর পর, এত একটা সুন্দর ব্যবস্থাপনার মধ্যে স্থির থাকার পর, হঠাৎ করে দেশে ফিরে যাওয়ার তাড়না বোধ করলেন কেন এবং কেন গেলেন?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: আমার অতীতে আমি একজন অ্যাক্টিভিস্ট ছিলাম এবং এখনও একজন অ্যাক্টিভিস্ট। আমার প্রথম অ্যাক্টিভিজম শুরু হয় ১৯৬২ সালে। সেই আইয়ুব খানের আমলের শিক্ষা আন্দোলন থেকে এবং তারপর উনসত্তর-এর গণআন্দোলন। উনসত্তর-এর গণআন্দোলনে আমার একটি ভূমিকা ছিল এই অর্থে যে আমাদের সব আন্দোলন তো হয়েছে তখনকার ইকবাল হল থেকে (বর্তমানের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। সেই সময়ে আমি হলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আমাদের প্রচেষ্টায়ই উনসত্তরের গণআন্দোলন হয় এবং আই হ্যাড এ ডিপ ইনভলভমেন্ট। তাই আমার সবসময় মনে হয়েছে যে আমার একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। এই বাংলাদেশটা সৃষ্টি করতে আমার একটি ছোট ভূমিকা ছিল। সো আই হ্যাড অ্যান অবলিগেশন টু গো ব্যাক।
এরপরে আমি ক্লেরমন্ট গ্রাজুয়েট স্কুল-এ যাই। তো আমার প্রফেসরদের একজন ছিলেন পিটার ড্রাকার – ওয়ান অফ দ্য মোস্ট ওয়েল নোন একাডেমিকস, যিনি প্রিন্সিপালস অফ ম্যানেজমেন্ট লেখেন। তাঁর উপর অনেক বইও লেখা হয়েছে। ইন হিজ ওউন ওয়ার্ডস, হি ওয়াজ মাই গডফাদার ইন দোজ ডিফিকাল্ট ডেইজ। তারপর একাত্তর সালে যুদ্ধ হলো এবং আমি আমার পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। আমার সন্তান-সম্ভবা স্ত্রী দেশে একা ছিলেন। উই ডিডন্ট নো হোয়াট ওয়াজ হ্যাপেনিং। সেই সময়ে আমার পূর্বের অ্যাক্টিভিজম-এর কারণে আমি বদ্ধপরিকর ছিলাম দেশে গিয়ে মুত্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করব। পিটার ড্রাকার প্রিভেন্টেড মি ফ্রম গোয়িং ব্যাক। তিনি বলেন যে তোমার দরকার হবে, ইউ উইল বি নিডেড। এছাড়াও বিদেশে থাকলে আপনি আপনার দেশকে আরও বেশি ভালবাসেন। তাই এইজন্যই পরবর্তীতে বড় ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে গেলাম। আমি আমার টেনিউরড ফুল প্রফেসরশিপ ছেড়ে দিয়ে গেলাম। তার আগে আমি একবছর নাসার জন্য কাজ করেছিলাম। তবুও সেই সবকিছু ছেড়ে কয়েকটি স্যুটকেস ও চারটি ছোট সন্তান নিয়ে ফিরে আসলাম।
পড়শী: তাহলে তো অবশ্যই একটা মানসিক যুদ্ধ নিজের সাথে করতে হয়েছে- ওই সময়ে কিছুটা হলেও। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হলো আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন এবং আপনার মনে খুব একটা দ্বিধা ছিল না। তো সেই সূত্রেই প্রশ্নটা করি। ফিরে যাওয়ার পর সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাথে জড়িত হলেন। আপনি সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কখনো কি মনে হয়েছে যে আপনি সফল হয়েছেন? যেই বিশ্বাসটা নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন, যা অর্জন করতে চেয়েছিলেন, সেক্ষেত্রে কি কখনো মনে হয়েছে যে কিছু করতে পেরেছি বা কোনটা করতে পারি নাই?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: অবশ্যই। তা না হলে কিন্তু টিকে থাকতে পারতাম না। কারণ আপনি জানেন যে বাংলাদেশে অনেক চ্যালেঞ্জ, অনেক হ্যারাসমেন্টের মুখোমুখি হতে হয় – ভেরি ফিউ থিংস ওয়ার্ক দেয়ার। তা সত্ত্বেও আমরা টিকেছি। আমার ফ্যামিলি খুবই সাপোর্টিভ ছিল। আমার ওয়াইফ খুবই সাপোর্টিভ এবং আমার সন্তানরাও খুবই সাপোর্টিভ ছিল।
আমার বিশ্বাস যে আমরা কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনতে পেরেছি। বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পরে ২ বছরের মত সময় আমি সারাদেশে ঘুরে বেড়াই অ্যান্ড আই রিলার্নড দা কান্ট্রি [আমি নতুন করে দেশটি সম্পর্কে জানি]। কারণ আমি সত্তর সালে দেশ ছেড়ে এসেছি, একানব্বই সালে ফিরে গিয়েছি বাংলাদেশে। এর মধ্যে দেশে অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। সো আই রিলার্নড অ্যান্ড গট মাইসেলফ একুয়েন্টেড। ১৯৯৩ সালে ইউএসআইডি-র একটি প্রজেক্ট-এর সাথে সম্পৃক্ত হই। আমি ইউএসআইডি-র টেকনিক্যাল অ্যাসিস্টেন্স প্রজেক্ট-এর নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম। দ্যাট ডিডন্ট ওয়ার্ক আউট আনফরচুনেটলি। বস্তুত দ্যাটস নট হোয়াট আই ওয়ান্টেড টু ডু। তারপর আমি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর সাথে সম্পৃক্ত হই। হাঙ্গার প্রজেক্টে যুক্ত হয়ে আমরা একটি ভলান্টিয়ার বেজড মুভমেন্ট আরম্ভ করি।
আমাদের দেশে অনেক এনজিও মূলত অর্থ নিয়ে এসে নিজেদের লোকবলের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এই প্রকল্পায়ন প্রক্রিয়ায় সাস্টেইনেবিলিটি অফ দি ওয়ার্ক এবং হোয়েদার অর নট ইট মেকস এ লং টার্ম ডিফারেন্স, দ্যাট ইজ লিস্ট অফ দি কনসার্ন। টাকা আনলো, খরচ করলো এবং একটা রিপোর্ট দিল, দ্যাটস ইট। কিন্তু আমি সেটা করতে চাইনি। আই ওয়াজ ট্রেইন্ড অ্যাজ অ্যান ইকোনমিস্ট, এ ট্র্যাডিশনাল নিও ক্লাসিক্যাল ইকোনমিস্ট। তবে দরিদ্র্য মানুষের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে পরবর্তীতে আমার মধ্যে রূপান্তর ঘটে।
বাংলাদেশে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে, ইট ট্রান্সফর্মড মি ড্রাসটিক্যালি। ইনফ্যাক্ট, ইন বাংলাদেশ আই ফাউন্ড নিউ টিচার্স।যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বিশ্ববিখ্যাত স্কলার আমার শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশে আমি নতুন নতুন শিক্ষক খুঁজে পাই। তারা সাধারণ মানুষ, নিরক্ষর, তারা দরিদ্র। বাট দে রিয়েলি ট্রান্সফর্মড মি। দে মেড মি এ ডিফারেন্ট পার্সন দ্যান আই ওয়াজ। অ্যান্ড ইট ওয়াজ ভেরি স্যাটিসফায়িং, ভেরি এনজয়েবল।
আমরা একটি ভলান্টিয়ার বেইজড মুভমেন্ট তৈরি করার চেষ্টা করি এবং আমাদের লক্ষ্য ছিল – পিপল এন্ডিং দেয়ার ওউন হাঙ্গার (মানুষ নিজেরাই মূলত নিজেদের ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীভূত করবে)। তারা নিজেরাই হবে তাদের ভাগ্যোন্নয়নের প্রধান কারিগর। আমরা তাদেরকে মোবিলাইজ করি, তাদেরকে ক্ষমতায়িত করি, তাদের উদ্বুদ্ধ করি, এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করি যেন তারা নিজেরাই তাদের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারেন। তো এভাবেই আমরা আরম্ভ করি এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে প্রশিক্ষিত ও সংগঠিত করি। বিভিন্ন ধরনের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করি।
লাকসামে অবস্থিত আমাদের গণউদ্যোগ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজকে প্রথম সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী। আমাদের ভলান্টিয়ার (স্বেচ্ছাসেবক)-দের মাধ্যমেই এই বিদ্যালয় তৈরি হয়। যদিও আমি এবং আমার স্ত্রী এর জন্য একটি জমি কিনতে ও ভবন নির্মাণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছি। কিন্তু আমাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ একত্রিত হয়ে প্রথম যেটা করে তা হল, তারা মাটি কেটে জায়গা উঁচু করে বাঁশ বেত দিয়ে প্রথম স্ট্রাকচার তৈরি শুরু করে। বর্তমানে এটি একটি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ। বহু লোক আমাকে, আমার স্ত্রীকে বলেছে, আমাদের নামে, আমাদের বাপের নামে, দাদার নামে স্কুলের নাম রাখতে। আমরা বলছি – নো, দিস ইজ পিপলস ইনিশিয়েটিভ।
বিদ্যালয়টি বহু বছর থেকে উপজেলায় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। গ্রামের মেয়েদের স্কুল এবং মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে বাবা-মার খুব আগ্রহ কম এবং মেয়েদেরও আগ্রহ কম এবং তাদেরকে বাল্য বিয়ে দিয়ে দেয়। কেনারূপ বাজবিচার না করে আমরা সবাইকে ভর্তি করি। এর মধ্যে কেউ কেউ ষষ্ট শ্রেনীতে ভর্তি হওয়ার সময় বাংলা-ইংরেজী পড়তে এবং যোগ-বিয়োগ অঙ্কও করতে পারেনা। তবুও এটি এখন উপজেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়। এরপরে এবার এটি হলো কুমিল্লা জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় এবং আমাদের প্রিন্সিপাল হলেন কুমিল্লা জেলার শ্রেষ্ঠ প্রিন্সিপাল। এরপর তিনি সারাদেশে তৃতীয় শ্রেষ্ঠ প্রিন্সিপাল হলেন। প্রথম আলো গত বছর সাতজন শিক্ষককে সম্মানিত করেছে – তিনিও তার মধ্যে একজন ছিলেন। বর্তমানে এটি বেশ সুপরিচিত একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে, যার জন্য আমরা অত্যন্ত গর্বিত।
অনেকগুলো বিষয়ের পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে আমরা সত্যিই গর্বিত। এছাড়াও আমরা হাজার হাজার মানুষকে প্রশিক্ষিত করেছি। তাদেরকে আত্মনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছি এবং তাদের প্রায় সকলেই নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, যাদের মধ্যে অনেক হতদরিদ্র নারীও রয়েছেন। এটি খুবই আনন্দদায়ক ছিল।
আমি অবসর নিয়েছি ২০২৪-এ। কেউই চাননি আমি অবসরে যাই এবং তারা – আমাদের সকল স্বেচ্ছাব্রতীরা – চেয়েছিলেন যেন আমি কাজ চালিয়ে যাই। তবে আমি তাদের সাথেই আছি, কারণ এদের সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
এর মাঝখানেই সুজন সৃষ্টি হয়। সুজন সৃষ্টির ব্যাকগ্রাউন্ড হলো, আমরা দেখলাম, এই যে মানুষ, তারা যতই চেষ্টা করুক না কেন, তারা বেশি দূরে এগুতে পারে না। কারণ পথের বাধা এত প্রবল, এত প্রকট, এত ব্যাপক যে তারা পদে পদে বাধাগ্রস্থ হয়। একটা বিখ্যাত উক্তি আছে- পথের বাধা সরিয়ে দিন, মানুষকে এগুতে দিন। এই জন্য আমরা ভাবলাম, আমাদের রাজনীতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের গভর্নেন্সে (শাসনব্যবস্থায়) পরিবর্তন অবশ্যই দরকার। এই জন্য আমি আর প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ – টিআইবি এর সাবেক চেয়ারম্যান) ২০০২ সালে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সৃষ্টি করি।
প্রথমে ভাবলাম যে, আমরা যদি ক্লিন (ভাল বা সৎ) মানুষদের, ক্লিন প্রার্থীদের নির্বাচিত করতে পারি তাহলে অবস্থার পরিবর্তন আসবে। সেটি সমস্যাটির সমাধান করবে। কিন্তু দ্রুতই আমরা উপলব্ধি করি যে, সেটি সমস্যাটির একটি অংশ মাত্র এবং আমাদের পুরো ব্যবস্থাটারই পরিবর্তন করতে হবে। আমাদেরকে আমাদের গণতন্ত্রের ঘাটতিগুলো এবং শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলো দূর করতে হবে। এভাবেই সুজন সৃষ্টি ও বিকশিত হয়। তাই আপনার প্রশ্নের উত্তরটা অনেক অনেক দীর্ঘ, তবে বিনা দ্বিধায় বলতে পারি- আমরা যা করতে পেরেছি তার জন্য সত্যিই বেশ গর্বিত এবং খুব আনন্দিত।
সুজন বর্তমানে নাগরিক সমাজের সবচেয়ে সুপরিচিত ও সমাদৃত সংগঠন, যার পুরোটাই স্বেচ্ছাসেবক নির্ভর। আমাদের প্রায় ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। আমরা এটি এক লাখে নিয়ে যেতে চাই। এছাড়াও হাঙ্গার প্রজেক্টও সারা দেশব্যাপী বেশ সুপরিচিত। আমরা যা অর্জন করতে পেরেছি তা নিয়ে আমরা খুবই গর্বিত।
পড়শী: সুজন তৈরি করলেন। তারপরে একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুললেন সুজনের মাধ্যমে, যার একটি উদ্দেশ্য ছিল ক্লিন পলিটিক্স। আপনারা অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করলেন এবং সেগুলো প্রকাশ করতে লাগলেন। তবে একটা বিষয় লক্ষ্য করি যে, সুজন প্রকাশিত তথ্যগুলোকে বিরোধী দল স্বাগত জানাচ্ছে আর সরকারি দল বলছে এটা বিকৃত তথ্য। এই বিষয়টা কিভাবে দেখছেন?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: আমি আপনাকে একটি উদাহরণ দেই। ২০১৪ সালের এক তরফা জাতীয় নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়েছিল এবং সেগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল। কারণ আওয়ামী লীগ ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে নির্বাচনের ব্যপারে তাদেরকে বিশ্বাস করা যায়। তাই তারা এসব সিটি কর্পোরেশনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। চারটি সিটি কর্পোরেশন হল সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল। ঐ সিটি কর্পোরেশনগুলোতে এর আগে নির্বাচন হয়েছিল ২০০৭-এ, যখন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল; শামসুল হুদা কমিশনের সময়ে, যে কমিশনকে নিরপেক্ষ হিসেবে দেখা হয়। ঐ চারটা সিটি কর্পোরেশননের ২০০৭ সালের নির্বাচনে সবগুলোতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মেয়র পদে ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করে। এরপর ২০১৩-তে আশ্চর্যজনকভাবে দুটি প্রধান দলের – বিএনপি ও আওয়ামী লীগের – একই প্রার্থীরা আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
ইতোমধ্যে আমাদের প্রচেষ্টায় ২০০৫-এ আদালতের মাধ্যমে একটা রায় হলো যে- প্রত্যেক প্রার্থীকে তাদের অতীত বৃত্তান্ত, তাদের মামলার বিবরণ, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, তাদের ও তাদের উপর নির্ভরশীলদের আয়, সম্পদ এসব তথ্য এফিডেভিট বা হলফনামার মাধ্যমে ঘোষণা করতে হবে। এটি ২০০৭ সালের চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে কার্যকর হয়। ঐ চারটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থীদের এগুলো জমা দিতে হয়েছিল এবং আমাদের কাছে সেই হফলনামাগুলো ছিল। তারপর ২০১৩-তে যখন নির্বাচন হলো তখন আমাদের হাতে দুই সময়েরই তথ্য আসলো – ২০০৭ এর এফিডেভিট ও ২০১৩ এর এফিডেভিট। আমরা তুলনা করে দেখলাম যে যারা আগেরবার মেয়র পদে জয়ী হয়েছিল তাদের আয় ও সম্পদ আকাশচুম্বী হয়ে গিয়েছিল। যদিও তখন বেইজটি ছিল ছোট। সেগুলোই ভাল দিন ছিল। এখন তো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনেকে শত শত মিলিয়ন ডলার কামাই করে।
অপরদিকে আগেরবার (২০০৭ সালে) বিএনপির প্রার্থী যারা ছিল, তাদের কারো কারো আয় ও সম্পদ সামান্য বেড়েছে বা প্রায় একই ছিল, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমেছেও। ২০১৩ সালে বিরোধীদল বিএনপির সব প্রার্থীরা মেয়র পদে জয়ী হন। ২০১৩ সালের এই চারটি সিটি কর্পোরশেনের নির্বাচনে পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগ একটি সংবাদ সম্মেলন করে বলে যে- সুজন সব বানোয়াট তথ্য দিয়ে তাদের প্রার্থীদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করেছি, যার ফলে তারা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। স্পষ্টত এটি ছিল একটি মিথ্যা অপবাদ। তবে, আমি আনন্দের সাথে বলতে পারি যে, এই হলফনামা ঘোষণার বিষয়টি আবশ্যকীয় করার ক্ষেত্রে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছি। আমরা প্রত্যেকটি নির্বাচনে সকল নির্বাচনী এলাকা থেকে হলফনামাগুলো সংগ্রহ করে প্রসেস করেছি। প্রত্যেকটি নির্বাচনে আমরা আসনভিত্তিক সকল প্রার্থীর তুলনামূলক ছক তৈরি করেছি। প্রতিটি আসনে কোন প্রার্থীর কত আয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা কি, কোন প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোন কোন মামলা আছে ও ছিল, প্রার্থীর ও প্রার্থীর উপর নির্ভরশীলদের সম্পদ ও দায়দেনা কত, আয়কর কত দিয়েছেন – এই সব তথ্যই তূলনামূলক ছকের মাধ্যমে আমরা প্রকাশ করেছি। ফলে ভোটাররা তথ্যের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত হয়ে ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে।
যখন আমরা শুরু করি, তখন হলফনামায় প্রকাশিত তথ্য সম্পর্কে কেউই আগ্রহী ছিল না। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এটি বাতিল করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছ। কিন্তু এখন এটি সকলেই কাজে লাগান এবং গণমাধ্যম এগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। বস্তুত হলফনামার মাধ্যমে তথ্য প্রদানের বিষয়টির এখন প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়ে গিয়েছে। এতে আমরা অবশ্যই অত্যন্ত আনন্দিত। একইভাবে, বেশ কিছু আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রেও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যেমন, এই যে জুলাই জাতীয় সনদ হলো – এই ‘জাতীয় সনদ’ শব্দদ্বয় সুজন প্রথম ব্যবহার করেছিল। ২০১৩ সালে প্রথম আমাদের মনে হয় যে, সুনির্দিষ্ট কিছু মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতায় আসা উচিৎ। আমরা একটা জাতীয় সনদের খসড়া তৈরি করে রাজনৈতিক দলের সাথে শেয়ার করলাম। আমরা চেয়েছিলাম তারা আলাপ-আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তাবিত সনদটি কাজে লাগাক। কিন্তু তা হয়নি। এরপর আমরা সেটি পরিমার্জন করতে থাকি। ২০২৪ সালে যে একতরফা নির্বাচন হলো, শেখ হাসিনার ‘আমি আর ডামির নির্বাচন’, তখন সারাদেশে সমাজের সকল ক্ষেত্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ করে প্রস্তাবিত সনদটিকে আমরা আরো রিফাইন করেছি। ২০২৫ সালে আমরা আমাদের প্রস্তাবিত সনদের বিষয়গুলোর উপর সারাদেশে একটা জরিপ পরিচালনা করেছিলাম, যার মাধ্যমে সনদের বিষয়ে জনমত তৈরি হয়। আমরা জরিপের ফলাফল ঐকমত্য কমিশনে জমা দিয়েছি। প্রসঙ্গত, আন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে আমি ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ছিলাম। প্রথমে আমি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি।
শুরু থেকেই আমরা শুধু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই নয়, বরং আমাদের সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, সকল প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক সংস্কারের পক্ষে প্রস্তাব উত্থাপন করেছি। আমরা তখন জাতীয় সনদের ধারণাটি উদ্ভাবন করি এবং এর একটি খসড়া তৈরি করি। এটারই একটা পরিবর্তিত রূপ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আটমাসব্যাপী আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’-এ পরিণত হয়।
এছাড়া আমরা আরো অনেকগুলো কাজ করেছি। যেমন, আমি একটা ‘মামলাবাজ’ হয়েছি। আমি বহুবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। প্রথমবার তথ্য অধিকারের একটি বিষয় নিয়ে আদালতে যাই। রাজনৈতিক দল তাদের আয়ের যে হিসাব-নিকাশ নির্বাচন কমিশনে দেয়, সুজনের পক্ষ থেকে আমরাই এই হিসাব দেওয়ার বিধান করিয়েছিলাম। ওই যে রিপ্রেজেন্টেশন অফ পিপল অর্ডার (আরপিও), যেটা মূল নির্বাচনী আইন, ২০০৭-এ যখন শামসুল হুদা কমিশন দায়িত্ব নেয়, তখন আমরা ওটাকে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে একটা নতুন খসড়া তাদেরকে দিয়েছিলাম। কমিশন আমাদের দেওয়া প্রস্তাবের বেশির ভাগই গ্রহণ করে। তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নিরীক্ষণ করা (audited) হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে। কিন্তু দলগুলোর জমা দেওয়ার পরে আর নির্বাচন কমিশন এগুলো প্রকাশ করে না। তখন আমরা আদালতে যাই এবং হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দেন যে- নির্বাচন কমিশনকে এগুলো প্রকাশ করতে হবে। আদালত মূলত বলেন যে, সরকারি কর্তৃপক্ষসমূহের তথা সরকারি দফতরে যেসব তথ্য রয়েছে সেসবই পাবলিক ইনফরমেশন, যা অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে।
এরপরে আবারও আমরা কোর্টে গিয়েছি। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পরে। আপনাদের মনে আছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দুইভাবে বাতিল করা হয়। একটা করল আদালতের মাধ্যমে, খায়রুল হকের রায়-এর ভিত্তিতে। সুজনের পক্ষ থেকে আমরা পাঁচজন সেটি চ্যালেঞ্জ করি, যাতে আমি প্রধান বাদী ছিলাম। আমরা সেটির রিভিউ চাই এবং রিভিউ-তে খায়রুল হকের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত রায় বাতিল করা হয়।
পরে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবারও বাতিল করে সংসদের মাধ্যমে – সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করে। আমরা আবারও পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাই এবং ঐ পঞ্চদশ সংশোধনীর বিষয়ে আমরা হাইকোর্টের রায় পেয়েছি। হাইকোর্টের রায়ে অনেকগুলো বিষয়ে আমরা প্রতিকার পেয়েছি। পরবর্তীতে আমাদের আপিলের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের রায় হয়েছে। তত্ত্ববধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা সহ আমরা যা যা চেয়েছিলাম তার বেশিরভাগই আমরা পেয়েছি, তবে আমরা সব প্রতিকার পাইনি। তাই আমরা আবারও রিভিউ এর আবেদন করতে পারি।
এই সবগুলোতে আমি প্রধান বাদী ছিলাম, তবে পরবর্তী একটি মামলাতে আমি একাই বাদী। আপনারা অবগত আছেন যে, বর্তমান সরকার সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় অধ্যাদেশটা বাতিল করেছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় একাধিক অধ্যাদেশের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় সৃষ্টি এবং সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এগুলো নিশ্চিত হলো। এই বিষয়ে আদালতের একটা রায় হয়েছিল ২০২৫ সালে। আদালতের রায় উপেক্ষা করেই নতুন নির্বাচিত সরকার অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে।
আমি আদালতের দ্বারস্থ হই, প্রতিকার আদালতের এখতিয়ারাধীন। তবে বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে, আন্দোলনের মাধ্যমে, অ্যাক্টিভিজম-এর মাধ্যমে, এবং আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে, আমাদের মনে হয় যে আমরা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছি। অবশ্যই আমাদের এবং ছাত্র-জনতার শ্রেষ্ঠ অর্জন হল হাসিনাকে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করতে পারা।
স্বৈরাচারী সরকারের পতনে আমি ও সুজন সামনের সারিতে ছিলাম। এ জন্য আমার বাসাও আক্রান্ত হয়েছে। বহু রকম নিগ্রহের শিকার হয়েছি আমরা। এটি আমাদের মুখ্য অর্জন যে আমরা এমন একজন স্বৈরাচারীকে হটাতে সক্ষম হয়েছি যে অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে।
পড়শী: সবসময় সরকারি দল আপনাদেরকে টার্গেট করে, যে সরকারই থাকুক।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: শুধু তাই নয়, আমরা অনেক বঞ্চনার শিকার হয়েছি। ২০০২ সালে সুজনের সৃষ্টির পর থেকে। আমার ছেলে মাহবুব মজুমদার, ম্যাথ অলিম্পিয়াডের কোচ সে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালেয়র ডীন। এবার সে একুশে পদক পেয়েছে। সে এমআইটি’র গ্র্যাজুয়েট, স্ট্যানফোর্ড থেকে মাস্টার্স, কেমব্রিজের পিএইচডি। তারপরে ইম্পেরিয়াল কলেজের পোস্ট ডক্টোরাল। আমেরিকাতে বহু জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্ত। তা সত্ত্বেও তাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চাকরি দেয় নাই বিএনপির আমলে। তখন আমাকেও কুমিল্লা বার্ডের পরিচালনা পর্ষদ থেকে কোনো রকমের নেটিশ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়। আমরা এই ধরণের বঞ্চনার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। তারপর আমার বাড়ি আক্রমণ হলো।
বিএনপির আমলে আমাদেরকে বলা হত আমরা আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের আমলে আমরা অবশ্যই তাদের চিহ্নিত শত্রু। এখন বিএনপি যা করছে, আমাদের মনে হয় যে তারা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক পথে নেই। আমরা এগুলো বলা শুরু করেছি। যেমন, তারা গণভোটের জনরায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। ইতোমধ্যেই আমরা বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। এবং আওয়ামী লীগের লোকজন তো অবশ্যই আমাদের উপর সাংঘাতিকভাবে ক্ষিপ্ত। তারা আমাদের গালিগালাজ করছে। কারণ উই আর দি পার্মানেন্ট অপজিশন [আমরা স্থায়ী বিরোধীদল]। সত্যিকারের দেশপ্রেম প্রদর্শিত হয় সরকারের গুন-গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে নয়, বরং সরকারের ভুল-ক্রটি তুলে ধরার মাধ্যমে। এটাই নাগরিক সমাজের দায়িত্ব।
পড়শী: সুজন-এর আন্দোলনগুলো সবসময় আমরা দেখতে পাচ্ছি শিক্ষিত শহরকেন্দ্রিক নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর ৮০ শতাংশ লোক যারা শহরের বাইরে থাকে, তারা কীভাবে আপনাদের এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হচ্ছে বা কীভাবে তাদেরকে সচেতন করে তুলছেন?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: আমরা প্রথাগত একটি এনজিও না। আমরা ডোনারের (দাতাদের) টাকা এনে কতগুলো কর্মী দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি না। হ্যাঁ, ডোনারের কিছু টাকা পয়সা আমাদের নিতে হয়েছে। এখনও নিচ্ছি। কারণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে অর্থের প্রয়োজন।
কিন্তু আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের এক বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। দেশ বরেন্য ব্যক্তিদের নিয়ে আমাদের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। প্রত্যেকটা জেলায় আমাদের স্ট্রাকচার আছে, ভলান্টিয়ার স্ট্রাকচার। আমাদের কমিটি প্রায় সবগুলো উপজেলায় আছে এবং অনেকগুলো ইউনিয়নে আছে। তারপরে সিটি কর্পোরেশনে আছে, পৌরসভায় আছে। সমাজের সব ক্ষেত্র থেকেই আমাদের স্বেচ্ছাব্রতী রয়েছে, শহর থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত। তারা সব পর্যায়ের মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করেন।
যেমন, এই যে গণভোট। আমরা সরলভাবে মনে করেছিলাম যে, যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়ে জুলাই সনদ সাইন করেছে এবং তারা একমত হয়েছে যে গণভোট হবে এবং গণভোটকে তারা সমর্থন করবে, তাই গণভোট পাস হবে। তবে দ্রুতই আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের বৃহত্তম দলটি এটির পুরোপুরি পক্ষে নয়। মাত্র একবার আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এটির পক্ষে বক্তব্য রাখেন। ইলেকশন-এর পরে তো তারা গণভোটের জনরায়কে হিমাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে।
মাঠপর্যায়ে তাদের লোকজন গণভোটের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের অপপ্রচার চালিয়েছে। তা সত্ত্বেও গণভোট পাস হয়েছ এবং এর একটি বড় কারণ হল যে সুজন গণসচেতনতা সৃষ্টিতে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। আমরা আমাদের সব ভলান্টিয়ারদেরকে মোবিলাইজ করে গ্রামেগঞ্জে, বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্পেইন করেছি। ফলে গণভোটের পক্ষে ৭০ শতাংশ সমর্থন পাওয়া গিয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগ এর বিরোধীতা করেছে। তাদের অনেকেই ভোট কেন্দ্রে যায় নাই। বিএনপিও তলে তলে এটার বিরোধীতা করেছে। জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি – এরাও বিরোধিতা করেছে। আর অন্যান্য সব দল সাপোর্ট করেছে। তবে গণভোট পাশ হওয়াটা একটা বেশ বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তাই আপনার প্রশ্নের উত্তর হল, আমাদের কাজ সাধারণ মানুষকে ঘিরে এবং তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, তথ্যের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন করা যাতে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৩০,০০০ এর বেশী স্বেচ্ছাব্রতীই সুজনের শক্তি।
পড়শী: এই প্রসঙ্গে একটু প্রশ্ন তাহলে করি। এই যে গণভোট পাস হলো, ৭০ শতাংশ ভোট দিল – তাহলে তো সুজনের উপর এখন একটা বিরাট দায়িত্ব পড়ে গেল। এই বর্তমান সরকারকে কীভাবে নিয়ে আসা যায় এই গণভোটের রায়কে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে, তাই না?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: অবশ্যই। এটি এক কঠিন কাজ। ওই যে সেই পুরনো কথা, আপনি একটি প্রাণীকে পানি পর্যন্ত টেনে আনতে পারবেন, কিন্তু পানি খেতে বাধ্য করতে পারবেন না। ক্ষমতাসীনদের মধ্যে অবশ্যই একটি ভুল ধারণা যে, সফল হওয়ার জন্য তাদের একই কাঠামো, একই ক্ষমতা, একই কর্তৃত্ব প্রয়োজন। তাই হাসিনা যেই বিধি-বিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ব্যবহার করে শাসন করেছে, সেই পথই তাদের অনুসরণ করতে হবে। তবে পুরানো পথে হেঁটে, বিদ্যমান কাঠামো রেখে, নতুন গন্তব্যে পৌঁছা যাবে না। একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সৃষ্টি করা যাবে না। সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে না।
হাসিনা তো ট্যাঙ্কে চড়ে ক্ষমতা দখল করে নাই। হাসিনা উর্দি পরেও আসে নাই। হাসিনা সংবিধানও বাতিল করে নাই। হাসিনা ওই প্রচলিত ব্যবস্থা ও কাঠামোই ব্যবহার করেছিলেন। খালেদা জিয়া যেমন দলের প্রধান ছিলেন, সংসদের নেতা ছিলেন, এবং সরকার প্রধান ছিলেন – হাসিনাও তাই ছিলেন। তারপরে আমাদের রাষ্ট্রপতির কোন ক্ষমতা নাই। সংসদ সদস্যদের ফ্লোর ক্রসিং সম্ভব ছিল না। আমাদের সবগুলো ইন্সটিটিউশনে সরকারি দল থেকে নিয়োগ দেওয়া হতো। যে ব্যবস্থা হাসিনার সময়ে ছিল, বেগম খালেদা জিয়ার সমযয়েও তাই ছিল। স্বৈরাচার হওয়ার জন্য হাসিনা সেই পুরানো ব্যবস্থাই ব্যবহার করেছিল। পুরানো পথেই হেঁটে ছিল। একমাত্র পার্থক্য হল হাসিনা প্রতিশোধপরায়ণ ছিল।
মনে রাখা প্রয়োজন, হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন একটা যুগান্তকারী নির্বাচনী ইশতেহার দিয়ে, যা দিনবদলের সনদ বলে পরিচিত। আমার দৃষ্টিতে হাসিনা দিনবদলের সনদ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাই তিনি খারাপ পন্থা, দমনপীড়নের পথ ধরেন। তার মধ্যে ধারণা হয়েছিল যে তাকে বিরোধী দলকে খতম, সমালোচকদেরকে দমন করতে হবে, কারণ তিনি ক্রমান্বয়ে অজনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছিলেন। ঐ যে ২০১৩ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঠকেছিলেন। তারপর থেকে তিনি একতরফা কিংবা পাতানো নির্বাচনের কৌশলের অবলম্বন করেন। তিনি ঠিক করেন যে তিনি আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকবেন। কারণ ক্ষমতা ছাড়লেই ঐ যে বাঘের পিঠে চড়ার মত অবস্থা হবে – বাঘের পিঠে চড়লে বাঘের পিঠ থেকে নামা খুব মুশকিল। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে- তিনি ক্ষমতায় থাকবেন বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন এবং অন্যান্য যারা প্রতিবাদী কণ্ঠ তাদেরকে শায়েস্তা করার মাধ্যমে। এটাই মূলত পার্থক্য। আমার মনে হয় যে, বর্তমান সরকারও ভুলভাবে মনে করে যে তাদেরও সেসব নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দরকার। সবগুলো প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে, প্রধানমন্ত্রী সব ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে। যাতে তারা যেকোনো কিছু যেকোনো সময় করতে পারেন। এরই মধ্যে শুরু করেছেন তারা। তারা জনগণের রায় মানতে অপারগতা প্রদর্শন করছেন। সংবিধান অমান্য করা শুরু করেছে। দলীয় ব্যক্তিদেরকে সব জায়গায় বসাচ্ছেন। এমনি পরিস্থিতিতে তাদেরকে এই আত্মঘাতি পথ থেকে সরিয়ে আনা খুবই কঠিন কাজ হবে।
পড়শী: কিন্তু সুজন থাকবে আন্দোলনের সাথে?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: অবশ্যই। আমরা ইতোমধ্যেই সোচ্চার হয়েছি এবং আমরা সোচ্চার হওয়া অব্যাহত রাখব। তবে আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন যে এখন তো মারামারি শুরু হয়েছে। এটা একটা অশনি সংকেত। বল প্রয়োগ করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, কিন্তু জনগণের সম্মতি অর্জন করা যায় না। আমরা চাই আমাদের অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হবে, প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ হবে, কার্যকর হবে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, মানবাধিকার নিশ্চিত হবে। এই সবগুলোই তো আমাদের কাঙ্ক্ষিত – গণভোটের মাধ্যমে যেটা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
গণভোটে জনরায় অনুযায়ী সরকারি দলের সংসদ সদস্যদেরকে অবশ্যই সংসদ সদস্য হিসেবে একটা শপথ নিতে হবে, যার ভিত্তিতে তারা পাঁচ বছরের জন্য সরকার গঠন করবে। একইসাথে গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যেটা অনুমোদন দিয়েছে, সেটা হলো তাদেরকে আরেকটা শপথ নিতে হবে- ১৮০ দিনের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এই বিষয়গুলোতে তারা একমত হয়েছে এবং তারা তো লিখিতভাবে জুলাই সনদের ব্যাপারে অঙ্গীকার করেছে যে তারা অক্ষরে অক্ষরে এটা পালন করবে, এটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে।
১৩৩টা অধ্যাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জারি করেছে। এর উদ্দেশ্য ছিলো কতগুলো সুদূর প্রসারী সংস্কার করা। কিন্তু মূল যে অধ্যাদেশগুলো, যেমন মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, গুম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, তারপর বিচারবিভাগীয় স্বাধীন সচিবালয় সংক্রান্ত, এগুলো কোনটাই বর্তমান সংসদ অনুমোদন করেনি। যেগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ। এখন তারা এগুলো পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন তাদের মতো করে এবং এগুলোকে স্যানিটাইজ করার চেষ্টা করছেন।
পড়শী: আপনার রাজনীতিতে মানে সক্রিয় রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা কতদূর?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্ভাবনা ক্ষীণ। বস্তুত নাই। কারণ আমি যদি সক্রিয় রাজনীতিতে, মানে দলীয় রাজনীতিতে, যুক্ত হই তাহলে আমি কোনো পরিবর্তন আনতে পারব না। পরিবারতন্ত্রের কারণে দলীয় রাজনীতিতে বাইরের সবাই দ্বিতীয় সারির এবং পরিবারের যিনি প্রতিনিধি তিনিই হলেন সর্বেসর্বা। আমাদের দেশে রাজনীতিটা একটা ধর্মের মতো হয়ে গিয়েছে। দলের প্রধান, যিনি পরিবারের প্রতিনিধি, তিনি হলেন ধর্মগুরু। অন্য সবাই তার অনুগত অনুসারী। তাছাড়া আমার তো বয়স হয়েছে। না, এটা একেবারেই প্রশ্নাতীত।
পড়শী: একই সুত্রে আরেকটা প্রশ্ন হল যে, সুজন তো একটা অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ বা একটা মুভমেন্ট সারাদেশের জন্য। সেটার রাজনীতিকরণের সম্ভাবনা কদ্দুর?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: না, আমার মনে হয় না। আমরা প্রথম থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা নাগরিক সমাজের একটি নিরপেক্ষ সংগঠন হবো এবং মানুষের পক্ষের শক্তি হবো এবং আমরা মানুষের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করবো। আমরা সেটাই করতে চাইছি। তাই সুজনের একটা রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নাই। যদিও আমাদের স্বেচ্ছাব্রতীদের কারো কারো রাজনৈতিক অভিলাস থাকতে পারে। বাংলাদেশের তো যে অবস্থা- এত রাজনীতিকিকরণ, অনেকেরই রাজনীতি করার আকাঙ্খা থাকতে পারে। তাদের কেউ কেউ হয়তো কোন দলের সমর্থকও হতে পারেন। কিন্তু যারাই কোন দলের সাথে যুক্ত হন বা হবেন- তারা আর সুজনের সদস্য থাকেন না। তাই সুজন একটি নিরপেক্ষ সংগঠনই থাকবে, কোন দলের লেজুড় নয়।
৪ আগস্ট, ২০২৬
পড়শীর পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন…

পোর্টল্যান্ড, ওরেগান, যুক্তরাষ্ট্র
প্রকৌশলী, কবি, লেখক এবং সংগঠক। দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত “সৃজন পাঠশালা”র কাজে তার অবসর কাটে।

