৫ই মে (মঙ্গলবার) ২০২৬ হলো বিশ্ব অ্যাজমা (হাঁপানি) দিবস। এই বছরের প্রতিপাদ্য বা থিম হলো “অ্যাজমা রোগীদের জন্য প্রদাহ-বিরোধী ইনহেলারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা- এখনো একটি জরুরি প্রয়োজন। (Access to anti-inflammatory inhalers for everyone with asthma– still an urgent need). বিশ্ব আ্যজমা দিবসের পত্তন হয় ১৯৯৮ সালে। জিনা (GINA) এর প্রবর্তন করে। জনসচেতনতা বাড়াতে সারা বিশ্বে প্রতিবছরের মে মাসের প্রথম মঙ্গলবার পালিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাজমা ডে’।
হাঁপানি বা অ্যাজমা শ্বাসনালির দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ। বিশ্বজুড়ে ২৬ কোটির বেশি মানুষ অ্যাজমা বা হাঁপানিতে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর ৪,৫০,০০০-এর বেশি মৃত্যু এই রোগের কারণে হয়। অ্যাজমার কারণে মৃত্যুর ৮০% এর বেশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে। বাংলাদেশেও প্রায় ৭০-৮০ লক্ষ মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন। এক থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি। শহরের তুলনার গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়। এককভাবে ষ্টেরয়েড ইনহেলার অথবা উপশমকারি ঔষধের সংমিশ্রণে ইনহেলার আ্যজমা চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকরী।
উপসর্গ কী?
হাঁপানি শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এর মূল উপসর্গগুলো হলো শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুকে বাঁশির মতো শব্দ হওয়া, বুকে চাপ অনুভূত হওয়া বা দমবন্ধভাব। বছরে বেশ কয়েকবার, বিশেষ করে অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে এলেই এসব উপসর্গ শুরু হয়ে যায়। হাঁপানি রোগীরা বিভিন্ন পদার্থের প্রতি অতি সংবেদনশীল থাকে। সেসব জিনিসের সংস্পর্শে তাদের উপসর্গ বাড়ে।
কেন অ্যাজমা হয়?
১. অ্যালার্জেন: ঘরের কিংবা বাইরের হাউস মাইট, মোল্ড, ফুলের রেণু, পশুপাখির লোম বা পাখা ইত্যাদি বস্তুর প্রতি অতি সংবেদনশীলতা।
২. সংক্রমণ: ফ্লু বা ভাইরাস সংক্রমণ উপসর্গ বাড়ায়।
৩. ধোঁয়া, ধুলা, ঠান্ডা আবহাওয়ার নানা তারতম্য উত্তেজক হিসেবে কাজ করে।
৪. ওষুধ: ব্যথানাশক রক্ত তরল করার ওষুধ উপসর্গ বাড়াতে পারে।
৫. ব্যায়াম, দৌড়, খেলাধুলা বা অতি পরিশ্রমের পর হাঁপানির লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
৬. অতিরিক্ত আবেগ, হাসি, কান্না, মানসিক চাপ হাঁপানির সমস্যা বাড়াতে পারে।
শনাক্ত করবেন কীভাবে?
বেশির ভাগ অ্যাজমা রোগীর শৈশব বা অল্প বয়স থেকেই হাঁপানি, অ্যালার্জি, অতি সংবেদনশীলতার ইতিহাস থাকে। এ ধরনের রোগের ইতিহাস থাকে পরিবারেও। কারও যদি হাঁপানির লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের কাছে গেলে চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা ও ইতিহাস বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে অ্যাজমার অ্যাটাক হলে বুকের এক্স–রে করানো উচিত। রক্তে অ্যালার্জির মাত্রা, ফেনো, স্পাইরোমেট্রি বা শ্বাসের পরীক্ষা ইত্যাদি করাতে হতে পারে।
চিকিৎসা কী?
হাঁপানির চিকিৎসা জীবনব্যাপী চলবে, কারণ এই রোগ কখনোই পুরোপুরি সেরে যায় না। কিন্তু এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। হাঁপানির ওষুধ প্রধানত দুই প্রকার। উপশমকারী: যেমন সালবিউটামল এবং প্রতিরোধকারী যেমন লিউকোট্রিন অ্যান্টাগনিস্ট, স্টেরয়েড ইনহেলার, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসনালি সংকোচন রোধক ইনহেলার, ডক্সিসাইক্লিন ইত্যাদি। এ ছাড়া রোগীকে এই রোগের সঙ্গে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে শিখতে হবে। একে বলা হয় শ্বাসযন্ত্রের পুনর্বাসন। এর মধ্যে আছে রোগটি সমন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ। রোগটি সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। যেসব কারণে রোগের মাত্রা বাড়ে, সেগুলো পরিহার করতে হবে আর শ্বাসযন্ত্রের ব্যায়াম করতে হবে।
মনে রাখতে হবে যে হাঁপানি নিরাময়যোগ্য রোগ নয়। তবে নিয়মিত চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগের গতি নিম্নমুখী করা সম্ভব। নিয়মিত এবং আপৎকালীন ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং সব ধরনের প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইনহেলারভীতি অনেক। যথানিয়মে ইনহেলার গ্রহণ নিরাপদ এবং হাঁপানি থেকে সুস্থ থাকার জন্য জরুরি। এ ছাড়া হাঁপানির রোগীকে চিকিৎসকের নির্দেশমতো ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা নিতে হবে এবং সংক্রমণ এড়িয়ে চলতে হবে।
১ মে, ২০২৬

মোঃ জাকির হোসেন সরকার | ঢাকা, বাংলাদেশ
অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ। সভাপতি, বাংলাদেশ ইন্টারভেনশনাল পালমনোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড স্লিপ সোসাইটি (বিপস)।
