বাংলাদেশে ফুটসালের উত্থান

বাংলাদেশে ফুটসালের উত্থান

আলী নাসিক আইমান
June 14, 2026
7 views
13 mins read

একসময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। নাম করা সব ক্লাব ও দর্শক-সমর্থক সমাগমে ফুটবল ম্যাচগুলো জমিয়ে রাখত পুরো দেশকে। তবে নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ থেকে জনপ্রিয়তার শীর্ষের জায়গাটি ক্রমেই ক্রিকেটের দখলে চলে যেতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিতে জয়লাভ ও ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা লাভের কারণে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ক্রমেই ফুটবলকে ছাড়িয়ে যায়।

তবে, সাম্প্রতিককালে ফুটবল আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে তার পূর্বের জনপ্রিয়তার ধারায়। আর সেই ধারাবাহিকতায়ই, ঠিক ফুটবল না হলেও, শহুরে জনগোষ্ঠীর মাঝে নতুন জনপ্রিয়তার জায়গা করে নিতে আরম্ভ করেছে একই রকম খেলা ফুটসাল।

ফুটবল ও ফুটসালের মাঝে সামান্য কিছু পার্থক্য রয়েছে। ফুটসাল মূলত ফুটবলেরই একটি সংক্ষিপ্ত রূপ। ফুটসালে প্রতি দলে ৫ থেকে ৬ জন খেলোয়াড় থাকে। আর মাঠের দৈর্ঘ্য হয় ২৭ থেকে ৪২ গজ আর প্রস্থ হয়ে থাকে ১৭ থেকে ২৭ গজ পর্যন্ত। খেলা হয় সাধারণত মোট ৪০ মিনিটে। তবে, আমাদের আলোচনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পার্থক্য সেটি হল, ফুটসাল সাধারণত খেলা হয় কৃত্রিম টার্ফ বা ঘাসের মাঠে।

বাংলাদেশের মত জনবহুল দেশে, বিশেষ করে ঢাকার মত এত ঘনবসতিপূর্ণ শহরে খেলার জায়গা বর্তমানে প্রায় নেই বলাই চলে। আর এমন পরিস্থিতিতে ফুটবল খেলার মত বিশাল মাঠ আছে মাত্র হাতেগোণা। তাই শহুরে তরুণ ‍ও ক্রিড়োৎসাহীরা ইচ্ছা সত্ত্বেও ফুটবল খেলার সাধ মেটাতে পারেন না। আর এখানেই সুযোগ খুঁজে নিয়েছেন কিছু উদ্যোক্তা, যার ফলশ্রুতিতে ফুটসাল হয়ে উঠেছে শহুরে তরুণদের জনপ্রিয় খেলা। এই উদ্যোক্তারা শহরের পরিত্যক্ত জমি, এমনকি ভবনের ছাদকে পরিণত করেছেন খেলার মাঠে। শহরে ইতোমধ্যেই গজিয়ে উঠেছে বেশ অনেক কয়টি ফুটসাল মাঠ। আর এসব ফুটসাল মাঠে শহরের ব্যস্ত জীবনের মাঝেই নিয়মিত ফুটসালে মেতে উঠছেন শহরের বিভিন্ন বয়সের মানুষ, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশই শহুরে বা কর্পোরেট চাকরিজীবি।

এসব মাঠে প্রতি ৯০ মিনিটের জন্য সাধারণত ১,৫০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। টাকার এই পরিমাণ নির্ভর করে মাঠের অবস্থান, অন্যান্য সুবিধা, ও দিনের সময় বা সপ্তাহের দিনের ওপর। চাকরিজীবিদের মাঝে জনপ্রিয় হওয়ায় বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মূল্য থাকে বেশি। এছাড়াও সপ্তাহান্ত বা ছুটির দিনগুলোতেও খেলতে গেলে টাকা একটু বেশিই গুনতে হয়। বেশিরভাগ মাঠেই রয়েছে সন্ধ্যার পর আলোর ব্যবস্থা যাতে রাতেও এসব মাঠে খেলা যায়।

এসব মাঠ তৈরিতে খরচের হিসাবটাও বেশ নাগালের মধ্যেই। জমিতে যদি বেশি কাজ না করাতে হয় তাহলে অনেকক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকাতেই কৃত্রিম টার্ফ তৈরি সম্ভব। তবে প্রতি দু-তিন বছর অন্তর টার্ফটি পরিবর্তন করতে হয় যাতে আবারও বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। পত্রিকার বরাতে জানা যায়, শুধু ঢাকাতেই ২০টির বেশি এমন ফুটসাল মাঠ রয়েছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি। এক হিসেবে ঢাকায় এমন ফুটসাল মাঠ তৈরিতে ৩০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রয়োজন হয়। একই জায়গায় পাশাপাশি একাধিক মাঠ থাকলে বিনিয়োগের পরিমাণও সে হিসেবে বেড়ে যায়। পত্রিকার সূত্রমতে, এক প্রাক্কলনে বাংলাদেশের ফুটসাল খাতে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫০ থেকে ২০০ কোটির মত।

এসব মাঠ শুধু যে সেখানে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দিচ্ছে তাই কিন্তু নয়। এগুলোকে ঘিরে বাংলাদেশে এখন গড়ে উঠেছে এক ফুটসাল সংস্কৃতি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ফুটসাল লীগ ও টুর্নামেন্ট আয়োজিত হচ্ছে নিয়মিত। এসব টুর্নামেন্টে আবার স্পন্সর ও বিনিয়োগ করছে বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানীগুলো। এছাড়াও এগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যারা শুধু মাঠ বুকিংই করে না, বরং যথেষ্ঠ খেলোয়াড় না থাকলে খেলোয়াড়দের মধ্যে সংযোগ করে দল গঠনেও সহায়তা করে।

এই ফুটসাল সংস্কৃতি এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছেড়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও পৌঁছে গিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসেই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত আয়োজিত হয়েছে ফুটসাল লীগ। মিরপুরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই লীগে পুরুষ ও নারী বিভাগে পৃথক পৃথকভাবে ১১টি করে দল অংশ নেয়। এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ ফুটসাল দল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। গত জানুয়ারিতে প্রথম সাফ নারী ফুটসালের শিরোপা জয়ী হয় বাংলাদেশ। মূলত, ২০১৮ সালে মেয়েদের এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপ থেকেই বাংলাদেশে ফুটসালের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

ফুটসালের এই উত্থান বাংলাদেশের ক্রীড়ার ভগ্নদশার মধ্যেও এক আশার আলো নিয়ে এসেছে। অর্থের টানাপোড়েন, জায়গার সঙ্কট, আর সুযোগের অভাবেও ফুটসালের অবিশ্বাস্য সাফল্য প্রমাণ করেছে যে, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক উদ্যোগ, উদ্ভাবনী শক্তি, আর মুক্তবাজার অর্থনীতির সমন্বয় ন্যূনতম সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাতেই ক্রীড়াক্ষেত্রকে চাঙ্গা করে তুলতে পারে। আর এটি যে শুধু ফুটসালের ক্ষেত্রে সত্যি তা নয়, বরং সকল খেলার ক্ষেত্রেই ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও মানসিকতা ক্রীড়াক্ষেত্রে অভাবনীয় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।


আলী নাসিক আইমান | ঢাকা, বাংলাদেশ

সাংবাদিক ও কলামিস্ট।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

বিভক্ত বাংলাদেশ
Previous Story

বিভক্ত বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

আইনস্টাইনের মহাবিশ্ব
Next Story

আইনস্টাইনের মহাবিশ্ব

Latest from অর্থচিত্র

বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দুর্দিন! কী করণীয়

বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের চরম দুর্দিন চলছে! এক সময় দেশে শত শত প্রেক্ষাগৃহ ছিল, আজ সেখানে কার্যকর হলের সংখ্যা নেমে এসেছে... আলোচনা করেছেন মাছুম বিল্লাহ।