আইনস্টাইনের মহাবিশ্ব

আইনস্টাইনের মহাবিশ্ব

তানভীর হোসেন
June 14, 2026
25 views
16 mins read

১৯০৫ সাল। সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরের পেটেন্ট অফিসে বসে কাজ করছেন এক তরুণ পরীক্ষক। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। চোখ দুটো উজ্জ্বল। তাঁর কাজ হলো অন্য মানুষের আবিষ্কারের নকশা পরীক্ষা করা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় একেবারেই সাধারণ মানুষ। কিন্তু তাঁর মাথার ভেতর চলছিল মহাবিশ্বকে নতুন করে বোঝার এক নীরব সাধনা। তাঁর নাম, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।

সেই সময় পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ ছিল এক অদ্ভুত দ্বিধার মধ্যে। একদিকে আইজ্যাক নিউটনের চিরয়াত বলবিদ্যা গ্রহ-নক্ষত্রের গতি নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করছে। আবার অন্যদিকে আলো, বিদ্যুৎ ও পরমাণুর জগতে নতুন নতুন পরীক্ষাগুলো যেন বলছিল, প্রকৃতির ভেতরে আরও গভীর কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে।

আলোর রহস্য

সবচেয়ে বড় ধাঁধা ছিল আলো নিয়ে। আসলে সমস্যাটি শুধু আলোকে নিয়ে নয়, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম নিয়েও ছিল। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ বলছিল, আলো হলো একটি তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ এবং এটি একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলে। কিন্তু নিউটনের চিরায়ত গতিবিদ্যা অনুযায়ী গতির মান পর্যবেক্ষকের গতির ওপর নির্ভর করার কথা। ফলে বড় এক প্রশ্ন দেখা দিল, আলোর ক্ষেত্রেও কি সেটাই হবে, নাকি আলোর গতি সবার জন্য একই থাকবে?

তখন তরুণ আইনস্টাইনের মাথায় এক অদ্ভুত চিন্তা খেলা করা শুরু করলো। তিনি কল্পনা করলেন, আলোর রশ্মির পাশাপাশি যদি একই গতিতে ছুটতে পারতাম, তাহলে কী দেখতাম? এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় তাঁর বিখ্যাত “বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব” বা থিওরি অফ স্পেশাল রিলেটিভিটি।

আপেক্ষিক সময়

আইনস্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন, মহাবিশ্বে এমন একটি গতি আছে যেটা সবার জন্যই সমান। আর সেটাই হচ্ছে আলোর গতি। আপনি স্থির থাকুন কিংবা ভয়ংকর বেগে ছুটুন, আলোর গতি কিন্তু বদলাবে না। তাঁর এই ধারণার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক বৈপ্লবিক সত্য। কারণ আলোর গতি যদি সব পর্যবেক্ষকের জন্য একই থাকে, তাহলে বদলাতে হবে সময়কেই।

আইনস্টাইন বললেন, সময় কোনো চিরস্থায়ী মহাজাগতিক ঘড়ি নয়। এটি আপেক্ষিক। একজন মানুষ যদি আলোর গতির কাছাকাছি বেগে মহাকাশ ভ্রমণ করে ফিরে আসে, তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীতে অনেক বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। অর্থাৎ চলমান মানুষের জন্য সময়ের গতি ধীর হয়ে গেছে। শুধু সময়ই নয়, দৈর্ঘ্যও সংকুচিত হতে পারে। ভরও শক্তিতে রূপ নিতে পারে।

একই সাথে বিশেষ আপেক্ষিকতা দেখিয়েছিল, বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বও আসলে একই বাস্তবতার দুই ভিন্ন রূপ। একজন পর্যবেক্ষকের কাছে যেটা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র, অন্য একজন চলমান পর্যবেক্ষকের কাছে সেটি চৌম্বক ক্ষেত্র হিসেবেও দেখা দিতে পারে।

ভর ও শক্তি

বিশেষ আপেক্ষিকতা থেকেই বেরিয়ে আসে বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরণ,

E = mc²

এখানে,
E = শক্তি (Energy)
m = ভর (mass)
c = আলোর গতি (speed of light)

ছোট্ট এই সমীকরণটি জানিয়ে দিল, ভর আর শক্তি আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। অতি সামান্য ভরের মধ্যেও বিপুল পরিমাণ শক্তি লুকিয়ে রয়েছে। সূর্যের আলো থেকে শুরু করে পারমাণবিক বিস্ফোরণ, সবকিছুর ভেতরেই কাজ করছে এই ভর-শক্তির সম্পর্ক।

মহাকর্ষের ধাঁধা

কিন্তু আইনস্টাইনের কৌতূহল তখনো শেষ হয়নি। কারণ বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করতে পারছিল না।

সপ্তদশ শতাব্দীতে আইজ্যাক নিউটন বলেছিলেন, মহাকর্ষ হলো এক ধরনের বল। সূর্য পৃথিবীকে টানে, পৃথিবী চাঁদকে টানে। কিন্তু আইনস্টাইনের মনে প্রশ্ন জাগল, এই “টান” আসলে কীভাবে কাজ করে? মাঝখানে তো কোনো অদৃশ্য দড়ি নেই!

তারপর একদিন তাঁর মাথায় এলো সেই বিখ্যাত চিন্তা। তিনি কল্পনা করলেন, একজন মানুষ উঁচু কোন‌ ভবন থেকে পড়ছে। পড়ার সময় সে কি তার নিজের ওজন অনুভব করবে?

এর উত্তর হলো, না। কারণ সে এবং তার চারপাশের সবকিছু একই সাথে নিচে পড়ছে। তার কাছে মনে হবে মহাকর্ষ হঠাৎ যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। পরে আইনস্টাইন বলেছিলেন, এটাই ছিল তাঁর জীবনের “সবচেয়ে সুখের চিন্তা”। সেখান থেকেই জন্ম নেয় “সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব” বা থিওরি অফ জেনারেল রিলেটিভিটি।

স্থান-কালের বাঁক

ধীরে ধীরে আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন মহাকর্ষ আসলে কোনো রহস্যময় বল নয়। বরং ভর-শক্তি স্থান-কালকেই বাঁকিয়ে দেয়। স্থান আর সময় আসলে আলাদা কিছু নয়। তারা একসঙ্গে মিলেমিশে তৈরি করেছে এক চার-মাত্রিক বুনন, যাকে আমরা বলি স্পেসটাইম বা স্থান-কাল।

মনে করুন, একটি টানটান রাবারের চাদরের ওপর ভারী একটি বল রাখা হয়েছে। চাদরটি তাহলে বেঁকে যাবে। সেই বাঁকা চাদরে একটি মার্বেল রাখলে সেটি বড় বলটির দিকে গড়িয়ে যাবে। দেখে মনে হবে, বড় বলটি যেন মার্বেলটিকে কাছে টানছে। কিন্তু বাস্তবে মার্বেলটি শুধু বাঁকানো চাদরের ওপর স্বাভাবিক পথেই চলছে।

মহাকর্ষও ঠিক তেমনি। সূর্যের বিশাল ভর তার চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়। পৃথিবী সেই বাঁকানো পথ ধরে ঘুরতে থাকে। আমরা যাকে মহাকর্ষ বলি, সেটি আসলে স্থান-কালের বক্রতার জ্যামিতি।

নতুন মহাবিশ্ব

এই ধারণাকে গাণিতিক ভাষায় প্রকাশ করতে আইনস্টাইনের লেগে যায় প্রায় দশ বছর। অবশেষে ১৯১৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বা থিওরি অফ জেনারেল রিলেটিভিটি। এই তত্ত্ব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, বিশাল ভরের পাশে আলোও বেঁকে যাবে।

১৯১৯ সালে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিটিংটন সেই আলোর বেঁকে যাওয়া পর্যবেক্ষণ করেন। ফলাফল মিলে যায় আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে। পরদিন বিশ্বের সংবাদপত্রে প্রধান শিরোনাম হলো, মানুষ মহাবিশ্বকে নতুন চোখে দেখতে শিখেছে।

আজ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে আমরা জানি, আইনস্টাইনের সেই চিন্তাগুলো শুধু তত্ত্ব ছিল না। ব্ল্যাক হোল, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ, এমনকি আমাদের মোবাইলের GPS – সবকিছুর গভীরে লুকিয়ে আছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা।

সুইজারল্যান্ডের পেটেন্ট অফিসের এক তরুণ পরীক্ষকের কল্পনা শেষ পর্যন্ত বদলে দিয়েছিল মহাবিশ্বকে বোঝার ভাষা। তারপর থেকে মহাবিশ্ব শুধু আকাশের দূরবর্তী নক্ষত্রলোক নয়, বরং স্থান, কাল ও বাস্তবতার এক জীবন্ত বিস্ময় হয়ে উঠেছে মানুষের কাছে।


তানভীর হোসেন | ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়া

বিজ্ঞান লেখক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় বিজ্ঞান নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। সাম্প্রতিককালে তাঁর লেখা বই “শতাব্দীর বিজ্ঞান” ও “বিচিত্র বিজ্ঞান।”


Leave a Reply

Your email address will not be published.

বাংলাদেশে ফুটসালের উত্থান
Previous Story

বাংলাদেশে ফুটসালের উত্থান

মানসিক সুস্থতা
Next Story

মানসিক সুস্থতা – আমাদের সবার কাম্য

Latest from বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

তথ্য প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের উন্মুক্ত বাজারে শিল্পবোধের চর্চা যেন ভার্চুয়াল পণ্য

সময়ের বহমান ধারা যে নতুনত্বের জন্ম দেয় তা কম বেশী সকলেরই জানা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি ও সভ্যতার ... অরূপরতন আচার্য্য আলোচনা করেছেন বিভিন্ন

ভালোবাসা ৩.০ : একাকীত্ব, প্রযুক্তির সঙ্গ ও পে-ওয়াল

এআই প্রেমিক বা প্রেমিকার কথা শুনলে অনেকে প্রথমে শিশুতোষ কল্পনা মনে করে হাসি-ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেন। কিন্তু ২০২৬ সালের... - লিখেছেন সাকির মোহাম্মদ।

মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়

রাতের আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় সবকিছু যেন নীরব নিথর, সবকিছু থমকে আছে। অথচ এই নীরবতার আড়ালে চলছে অবিরাম... - লিখেছেন তানভীর হোসেন।