ভূমিকা:
শিহাব শাহরিয়ার
মানুষের বিনোদনের নানা মাধ্যম রয়েছে। গল্প, গান, নাটক, কবিতা, যাত্রাপালা, পুঁথিপাঠ, বায়োস্কোপ, সিনেমা ইত্যাদি। এই বিনোদনের শুরুর কাল, মানুষের জীবন স্পন্দন বা প্রবাহলগ্ন থেকেই। ধীরে ধীরে মানুষ যখন সমাজবদ্ধ হলো, রাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় এলো এবং নিজেকে প্রকাশ করা শুরু করলো, তখন থেকেই আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে শুরু করল এবং এই শারীরিক অবয়বের ভেতরে যে মনের আরেকটি আয়না থাকে, তাকেও তাজা রাখতে চাইল। এই চাওয়ার—জলস্রোতের নামই হলো বিনোদন। পরিশুদ্ধ ভাষায় বললে, বিনোদন হলো এমন কিছু মাধ্যম, যারা দ্বারা মনের শান্তি বা প্রশান্তি বা মন আনন্দিত হয় বা মন প্রমোদিত বা আমোদিত হয়। সুতরাং মানুষ তার সৃজন-ক্ষমতা দিয়ে বিনোদনের ক্ষেত্র বা মাধ্যমগুলো তৈরি বা নির্মাণ বা সৃষ্টি করতে লাগল। এখন তথ্য-প্রযুক্তি ও আধুনিক সভ্যতার চরম সময়ে অবস্থান করলেও মানুষ তার বিনোদন থেকে বিচ্যুত হয়নি। এর আগে যদি নির্দিষ্ট করে বাংলা ভূমিতেই থাকি তাহলে দেখতে পাবো—এক সময়ে গ্রামীণ নিস্তরঙ্গ জীবনে উল্লিখিত মাধ্যমগুলো সাধারণ মানুষদের আনন্দ দিতো। এই আনন্দ-আয়োজনের অন্যতম ক্ষেত্র হলো কৌতুক বা জোকস্। এখন কৌতুক কি? কৌতুক বা জোকস হলো হাস্যরসের এমন একটি সংক্ষিপ্ত মৌখিক বা লিখিত রূপ, যা মূলত মানুষকে হাসাতে বা বিনোদন দিতে শব্দ, সংলাপ বা ঘটনার নাটকীয় মোড় (পাঞ্চলাইন) ব্যবহার করে। এটি সাধারণত যৌক্তিক অসঙ্গতি, বিদ্রূপ বা শব্দের খেলার মাধ্যমে তৈরি হয় এবং শেষের দিকে উত্তেজনা উপশম করে আনন্দ দেয়।১ (সূত্র: ইন্টারনেট)।
কৌতুক কেন, কবে ও কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল তা নিশ্চয়ই গবেষণার বিষয়, তবে কৌতুক যে নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবাইকেই হাসায় কিছু শব্দ কিছু বাক্যের মাধমে। এতে গল্প থাকে, নাটকের মতো আকর্ষণ থাকে এবং সংলাপ থাকে। সংলাপের শেষে এসে হাসির চরম রসটি ফুটে ওঠে। বলা হয়েছে: ‘কৌতুক হল হাস্যরসের একটি প্রকাশ যেখানে মানুষকে হাসানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট এবং সু-সংজ্ঞায়িত আখ্যান কাঠামোর মধ্যে শব্দ ব্যবহার করা হয় এবং সাধারণত এটিকে আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বোঝানো হয় না। এটি সাধারণত একটি গল্পের আকারে থাকে, প্রায়শই সংলাপসহ, এবং একটি পাঞ্চ লাইনে শেষ হয়, যার মাধ্যমে গল্পের হাস্যকর উপাদানটি প্রকাশ করা হয়; এটি শ্লেষ বা অন্য ধরণের শব্দ খেলা, বিদ্রূপ বা শ্লেষ,যৌক্তিক অসঙ্গতি, অতিশয়োক্তি বা অন্যান্য উপায়ে করা যেতে পারে। ভাষাবিদ রবার্ট হেটজরন সংজ্ঞাটি দিয়েছেন: ‘কৌতুক হল মৌখিক সাহিত্যের একটি সংক্ষিপ্ত হাস্যরসাত্মক অংশ যেখানে মজার চূড়ান্ত পর্যায়টি শেষ বাক্যে ঘটে, যাকে পাঞ্চলাইন বলা হয়…আসলে, প্রধান শর্ত হল উত্তেজনা একেবারে শেষে তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত। উত্তেজনা কমানোর জন্য কোনও ধারাবাহিকতা যোগ করা উচিত নয়। এর ‘মৌখিক’ হওয়ার বিষয়ে, এটা সত্য যে কৌতুক মুদ্রিত হতে পারে, কিন্তু যখন আরও স্থানান্তরিত হয়, তখন কবিতার মতো হুবহু পাঠ্য পুনরুৎপাদন করার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই’।২ (সূত্র: ইন্টারনেট)।
কৌতুক কথ্য ও লিখিত রূপ দু’ভাবেই প্রকাশ পায়। তবে লিখিত রূপটিই প্রধান, কারণ কৌতুক সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। বাংলাদেশেও সাহিত্যের একটি জায়গা দখল করেছে। সমকালীন বাংলা কৌতুক লেখক হিসেবে অনেকেই নাম করেছেন। এরমধ্যে অনতম একজন হলেন—আহসান হাবীব। তিনি একধারে কার্টুনিস্ট, কৌতুক লেখক লেখক, সম্পাদক। কৌতুক বিষয়ে তাঁর গ্রন্থও বেরিয়েছে এবং তা বেশ জনপ্রিয়। এখানে তাঁর ‘৯৯৯ জোকস্ বা কৌতুক ১টা ফ্রি’ ২০টি কৌতুক পাঠকের জন্য পত্রস্থ হ’ল।
হাস্যরসাত্মক গল্প ও কৌতুক
আহসান হাবীব
কৌতুক: ১
ডাক্তার: আপনি বলছেন আপনি সারারাত ধরে ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখেন।
রোগী: হ্যাঁ।
ডাক্তার: কত দিন ধরে এটা চলছে?
রোগী: প্রায় এক বছর।
ডাক্তার: হুঁ, কিন্তু আপনার অন্য কোনো স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে না? যেমন ধরুন, খাবারদাবার বা বেড়াতে যাওয়া…?
রোগী: হুঁ, ও-সব করতে গিয়ে আমি আমার ব্যাটিংটা মিস করি আর কি?
কৌতুক: ২
প্রথম বন্ধু: রবীন্দ্রনাথ কি কখনো ফুটবল খেলেছিলেন?
দ্বিতীয় বন্ধু: বোধহয় খেলেছিলেন, কারণ তার একটা গানে আছে—‘বল দাও মোরে বল দাও’।
কৌতুক: ৩
ধর্ম ক্লাসে স্বর্গ-নরক ব্যাখ্যা করার পর শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, তোমরা কে কে স্বর্গে যেতে চাও হাত তোলো।
সবাই হাত তুলল শুধু একজন ছাড়া।
: কী ব্যাপার, তুমি স্বর্গে যেতে চাও না?
: না স্যার, মা আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে বলেছে।
কৌতুক: ৪
: জান মা, আপা না অন্ধকারে দেখতে পায়!
: কেমনে বুঝলি?
: আমি শুনেছি ও-ঘরে অন্ধকারে আপা রফিক ভাইয়াকে বলছে— এ কী! আজ শেভ কর নি?
কৌতুক: ৫
প্রথম বন্ধু: কিরে কেমন আছিস?
দ্বিতীয় বন্ধু: ভালো না দোস্ত! পিয়া আমার জীবনটা বরবাদ করে দিয়েছে!
প্রথম বন্ধু: আমারটাও!
দ্বিতীয় বন্ধু: বলিস কি! তোকেও…!
প্রথম বন্ধু: হ্যাঁ, ওর সাথেই আমার বিয়ে হয়েছে।
কৌতুক: ৬
ছেলে অঙ্ক পরীক্ষার নম্বর জেনে বাড়ি এসেছে স্কুল থেকে।
মা জিজ্ঞেস করলেন, কত পেয়েছিস?
: মাত্র একের জন্য এক শ’ পাই নি।
: তাই নাকি, নিরানব্বই পেয়েছিস!
: না, দুটো শূন্য পেয়েছি।
কৌতুক: ৭
অধ্যাপক: হয়তো দেখতে আমার ভুল হয়েছে, কিন্তু মনে হল তুমিই যেন কথা বলছ।
ছাত্র: নিশ্চয়ই আপনার দেখতে ভুল হয়েছে; কারণ ঘুমের মধ্যে আমি কথা বলি না।
কৌতুক: ৮
স্কুলের প্রথম দিনে ছেলে বাড়ি ফিরল।
বাবা আদর করে কাছে ডেকে বললেন, স্কুলে কী শিখলে, বাবা?
ছেলে বলল, কিছুই না। আবার নাকি কাল যেতে হবে।
কৌতুক: ৯
মাছ ধরতে বসেছে এক মাছ-শিকারি।
পাশ দিয়ে যেতে যেতে একজন জিজ্ঞেস করল, কি ভাই, কয়টা মাছ ধরলেন?
মাছ-শিকারি বলল, পরেরটা ধরলে একটা হবে।
কৌতুক: ১০
প্রচণ্ড অলস এক লোক বড়শিতে মাছ তুলে বসে আছে।
পাশ দিয়ে একজনকে যেতে দেখে কোমল স্বরে বলল, ভাই, মাছটা একটু খুলে দিবেন!
একটু বিরক্ত হলেও মাছটা খুলে দিল লোকটি। তারপর বলল, এত অলস আপনি! এক কাজ করেন। একটা বিয়ে করেন, ছেলেপেলে হলে আপনাকে কাজে সাহায্য করতে পারবে।
: ভাই, আপনার জানাশোনা কোনো গর্ভবতী মেয়ে আছে?
কৌতুক: ১১
রাস্তায় দাঁড়িয়ে খুব আয়েশ করে সিগারেট খাচ্ছিল এক লোক।
তাই দেখে অন্য এক লোক বলল, দিনে কয় প্যাকেট সিগারেট খান আপনি?
: পাঁচ প্যাকেট।
: তার মানে তিন শ’ টাকার! কত বছর ধরে খাচ্ছেন?
: বিশ বছর।
: বলেন কি! জানেন, সিগারেট না খেলে আপনি আপনার পিছনের ওই তিন তলা বাড়িটার মতো একটা বাড়ি বানাতে পারতেন?
আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে লোকটি উদাস গলায় বলল, ওই বাড়িটা আমারই।
কৌতুক: ১২
লিপস্টিক কেনার জন্য স্বামীর কাছে টাকা চাইল স্ত্রী।
স্বামী বিরক্ত হয়ে বলল, তোমার লিপস্টিক কিনতে কিনতেই তো আমি ফতুর হয়ে যাব!
স্ত্রী হেসে বলল, হলে আমি কী করব! অর্ধেক তো তোমার পেটেই যায়!
কৌতুক: ১৩
ভোজনবিলাসী এক ভদ্রলোক স্যুপের অর্ডার দিলেন।
ওয়েটার স্যুপ নিয়ে এলে ভদ্রলোক বললেন, তোমার বুড়ো আঙুল আমার স্যুপে ডুবে আছে।
: ভয় নেই স্যার, আপনার স্যুপ তেমন গরম নয়।
কৌতুক: ১৪
স্ত্রী: কাল তো আমাদের বিয়ে-বার্ষিকী!
স্বামী: আমাকে কী করতে হবে?
স্ত্রী: কিছু না, এই গোটা পঁচিশেক মুরগির রোস্টের ব্যবস্থা করলেই হবে。
স্বামী: পঁচিশ বছর আগের ভুলের জন্য আবার পঁচিশটা প্রাণী হত্যা করা কি ঠিক হবে?
কৌতুক: ১৫
নিজেকে খুব পাকা শিকারি হিসাবে জাহির করে মামা ভাগ্নেকে নিয়ে শিকার করতে গেল।
এক ঝাঁক উড়ন্ত বক দেখে মামা বলল, দেখিস, এখান থেকে গুলি করে একটাকে ফেলে দেব।
মামা গুলি করল কিন্তু একটা বকও পড়ল না। কিন্তু তারা উড়ে চলে যাচ্ছে।
: কই মামা, গুলি তো লাগল না।
: পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনাটাই এখন ঘটেছে-গুলি লাগার পরও বক উড়ে যাচ্ছে।
কৌতুক: ১৬
গ্রামের এক স্কুল পরিদর্শন করতে গেলেন এক পরির্দশক। ক্লাসে ঢুকে এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, বল তো, সোমনাথের মন্দির কে ভেঙেছে?
ছাত্র বলল, আমি ভাঙি নি স্যার!
পরির্দশক রেগে শিক্ষককে বললেন, আপনার ছাত্র এ-সব কী বলছে!
শিক্ষক নরম গলায় বললেন, স্যার, আমি জানি, ও মন্দির ভাঙার মতো ছেলে না।
পরিদর্শক ক্লাসে ছেড়ে হেডমাষ্টারের রুমে গেলেন।
: আপনার ছাত্র-শিক্ষক এ-সব কী বলছে! সোমনাথের মন্দির নাকি তারা ভাঙে নি।
হেডমাষ্টার বললেন, জী স্যার, আমি জানি, আমার ছাত্র-শিক্ষকরা এমন কোনো কাজ করে নি।
পরির্দশক ফিরে গিয়ে ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে বিস্তারিত জানিয়ে ওই স্কুল বাতিল করার জন্য সুপারিশ করলেন।
মন্ত্রী সব শুনে বললেন, সামান্য একটা মন্দির ভাঙার জন্য কেন এত হইচই করছেন। টাকা নিয়ে যান। নতুন করে একটা বানিয়ে দিন।
কৌতুক: ১৭
ডলি, ডলি বলে চিৎকার করতে করতে স্বামীর ঘুম ভেঙে গেল।
স্ত্রী: কী ব্যাপার, স্বপ্নে ডলি, ডলি করছিলে কেন?
স্বামী: রেসের সময় আমি ডলি-ঘোড়ার উপর বাজি ধরেছিলাম। বাজিতে জিতেছি। এই নাও পাঁচ শ’ টাকা。
কয়েক দিন পর স্ত্রী স্বামীকে বলল, এই শোন, আজ তোমার সেই রেসের ঘোড়া ফোন করেছিল।
কৌতুক: ১৮
পার্কে পাশাপাশি বসে আছেন দু’জন।
একজন অন্য জনকে বলল, কী দিনকাল যে এল! আজকাল আর পোশাকআশাক দেখে চেনা যায় না- ছেলে না মেয়ে। ওই যে ওই মেয়েটিকে দেখেন। কে বলবে যে সে মেয়ে!
: যে মেয়েটির কথা বলছেন ও কিন্তু আমারই মেয়ে।
: দুঃখিত! আমি জানতাম না আপনি ওর বাবা!
: মাফ করবেন! আমি ওর বাবা নই, মা।
কৌতুক: ১৯
স্কুলে রওনা হতে দেরি হয়ে গেছে লাজমীর।
হাঁটতে হাঁটতে তাই সে বলছে, আল্লাহ আমি যেন সময় মতো স্কুলে পৌঁছতে পারি!
আল্লাহ, আমাকে সাহায্য কর!
হঠাৎ সে একটা হোঁচট খেল। হোঁচট খেয়ে বলল, আল্লাহ তোমাকে সময় মতো স্কুলে পৌছে দিতে বলেছি, ধাক্কা দিতে তো বলি নি।
কৌতুক: ২০
মেয়ের বাবা: এইমাত্র মেয়েটার গান যে শুনলেন, এর জন্যে আমার বহু টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
পাত্রপক্ষ: হ্যাঁ, তা হবেই। প্রতিবেশীদের সঙ্গে নির্ঘাত মামলা লড়তে হয়েছে!
১০ মে, ২০২৬

শিহাব শাহরিয়ার | ঢাকা, বাংলাদেশ
কবি, ফোকলোর গবেষক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, কলামিস্ট, উপস্থাপক। সম্পাদনা করছেন লোকনন্দন বিষয়ক পত্রিকা ‘বৈঠা’। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৩১টি।

আহসান হাবীব | ঢাকা, বাংলাদেশ
বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট, রম্য সাহিত্যিক এবং কমিক বই লেখক। পল্টু-বিল্টু, পটলা-ক্যাবলা তার তৈরী কিছু বিখ্যাত কমিক্স চরিত্র। তিনি জনপ্রিয় মাসিক রম্য পত্রিকা উন্মাদের বর্তমান প্রধান সম্পাদক।
